Beta

লিবিয়ায় নিয়ে নির্যাতন, মুক্তিপণ বাণিজ্য

২১ জানুয়ারি ২০১৯, ১৩:০৮ | আপডেট: ২১ জানুয়ারি ২০১৯, ১৩:২৮

কিশোরগঞ্জের ভৈরবের দালাল জুয়েল (বাঁয়ে ওপরে), মিলন মিয়া (বাঁয়ে নিচে), পিন্টু মিয়া (মধ্যে), সোহাগ (ডানে ওপরে) ও খোকন মাহমুদ। ছবি : সংগৃহীত

কিশোরগঞ্জের ভৈরবে বেশ কয়েকটি মানব পাচারকারী চক্রের খপ্পড়ে পড়ে এবং তাদের প্রতারণার ফাঁদে পা দিয়ে শত শত যুবকের জীবনে নেমে এসেছে অন্ধকার। সহ্য করতে হয়েছে অমানসিক নির্যাতন। পরিবারগুলোকে মাথায় নিতে হয়েছে লাখ লাখ টাকার ঋণের বোঝা। দেশ ছেড়ে ভালো রুটি-রোজগারের স্বপ্ন বোনা তাদের দুই চোখে এখন বিবর্ণ স্মৃতি। শরীরে অত্যাচারের যন্ত্রণা। পরিবারগুলোতে সব হারানোর আহাজারি। ঋণের সুদের চাপে দিশেহারা অভিভাবকরা।

ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সদস্যরা জানান, ভৈরব পৌর এলাকার দক্ষিণ জগন্নাথপুরের খোকন মাহমুদ, তাঁতারকান্দির জুয়েল, লক্ষ্মীপুরের উজ্জ্বল, মধ্য জগন্নাথপুরের মরহুম হাজি বশির কমিশনারের মেয়ের জামাই পিন্টু, দড়িচণ্ডীবের এলাকার মিলন মিয়া, কালিকাপ্রসাদ পশ্চিমপাড়ার সোহাগ এবং পাশের নরসিংদীর রায়পুরা উপজেলার রামনগরের শহীদের নেতৃত্বে ভৈরবে গড়ে উঠেছে বেশ কয়েকটি মানব পাচারকারী চক্র। তাদের পরিবারের সদস্য ও মনোনীত লোকজনের সহায়তায় টাকা গ্রহণ করে যুদ্ধবিধ্বস্ত লিবিয়া হয়ে সমুদ্রপথে ইউরোপের দেশ ইতালিতে পাঠানোর কথা বলে বেকার যুবকদের সাড়ে চার থেকে পাঁচ লাখ টাকায় লিবিয়া পাঠানো হয়।

সেখানে যাওয়ার পর লিবিয়ার স্থানীয় লোকজনের যোগসাজশে বাংলাদেশিদের অজ্ঞাত স্থানে আটক করে পাসপোর্ট এবং সঙ্গে থাকা ডলার কেড়ে নেওয়া হয়। পরে সেখানে আটকদের ওপর চালানো হয় অকথ্য শারীরিক নির্যাতন। বলা হয়, দেশ থেকে অভিভাবকদের কাছ থেকে ১২ থেকে ১৩ লাখ টাকা মুক্তিপণ এনে দিতে। এর মধ্যে দেশে থাকা অভিভাবকরা সন্তানদের এই কয়েক দিনের খোঁজ-খবর না পেয়ে অস্থির দিন কাটাতে থাকেন। ছুটতে থাকেন দালালদের আত্মীয়স্বজনের বাড়ি বাড়ি। কিন্তু তখন তাদের কাছ থেকে তেমন কোনো সহায়তা পান না তারা।

এদিকে নির্যাতন সহ্য না করতে পেরে লিবিয়ায় আটকে থাকারা দেশে তাদের অভিভাবকদের ফোন করে দুর্দশা এবং মুক্তিপণ না দিলে তাদের জীবন বিপন্ন হবে বলে কান্নাকাটি করেন। তখন অভিভাবকরা ধার-কর্জ করে, জমি-ভিটে বিক্রি করে দালালদের ব্যাংক হিসাব অথবা তাদের পরিবারের সদস্যদের কাছে পৌঁছে দেন টাকা। তখন যাদের মুক্তি মেলে তাদের কেউ নিঃস্ব হয়ে দেশে ফিরে আসে। কেউ বা ব্যর্থতা ঢাকতে অবৈধ হয়ে লিবিয়া থেকে যান। পুলিশের ভয়ে টুকটাক কাজ করে নিজের জীবন চালান। আর যারা দালালদের দাবি করা টাকা পরিশোধে ব্যর্থ হয় অথবা আংশিক পরিশোধ করেন, তাদের সন্ধান পান না পরিবারের লোকজন।

মুক্তিপণ পরিশোধ করে দেশে ফিরে আসা ভৈরবের শিবপুর ইউনিয়নের রঘুনাথপুরের তৌকির মিয়া ও শম্ভুপুরের অলিউল্লাহ জানান, মিলনের মাধ্যমে তারা লিবিয়া যাওয়ার পর সোহাগ তাদের অজ্ঞাত স্থানে জিম্মি রেখে অমানসিক শারীরিক নির্যাতন চালায়। পরে বিষয়টি দেশে তাদের অভিভাবকদের জানালে তারা জমি-ভিটে বিক্রি এবং ঋণ করে মুক্তিপণের টাকা পরিশোধ করে দেশে ফিরিয়ে আনেন।

পৌর এলাকার পঞ্চবটী গ্রামের জয়নাল আবেদীন রিটন অভিযোগ করেন, স্থানীয় দালাল খোকন মাহমুদের মাধ্যমে তিনি তার মেয়ের জামাই পিয়ার হোসেনকে লিবিয়া পাঠান। সেখানে পৌঁছার পর খোকনের মনোনীত প্রতিনিধি রাসেল তাকে অজ্ঞাত স্থানে জিম্মি করে নির্যাতন চালায়। এ নিয়ে অনেক দেন-দরবারের পর মুক্তিপণের টাকা পরিশোধ করে মেয়ের জামাইকে তিন মাস পর দেশে ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হন।

একই গ্রামের বউবাজার এলাকার ঝুমুর বেগম জানান, তিনি দালাল জুয়েলের প্ররোচনায় ঋণ করে ছেলে শুভকে লিবিয়া পাঠান। সেখানে তার ছেলেকে জিম্মি করলে তিনি সাড়ে সাত লাখ টাকা মুক্তিপণ দিয়ে ছেলেকে দেশে ফিরিয়ে আনেন।

অল্প বয়সে বিধবা এই নারী আরো জানান, সেলাই কাজ করে চার সন্তানকে নিয়ে সংসার চালান তিনি। দরিদ্রতা থেকে মুক্তির আশায় ঋণ করে ছেলেকে বিদেশ পাঠাতে গিয়ে উল্টো সমস্যায় পড়েছেন। এখন তিনি পাওনাদারদের চাপে অপমানের জীবনযাপন করছেন।

এদিকে পাচারকারীদের দাবি করা মুক্তিপণের টাকা পুরোপুরি পরিশোধ করে বা দেশে দেনদরবার করে টাকা কম পরিশোধ করেছেন, এমন অনেকে তাদের সন্তানদের সন্ধান পাচ্ছেন না।

উপজেলার শিমূলকান্দি ইউনিয়নের গোছামারা গ্রামের একটি বাণিজ্যিক ব্যাংকের পিয়ন আবদুল আওয়াল জানান, সংসারে সচ্ছলতার জন্য ইন্টারমিডিয়েট পাস করার পর তার ছেলে বায়েজিদ বোস্তামীকে দালাল জুয়েলের মাধ্যমে লিবিয়া পাঠান। সেখানে যাওয়ার পর পিন্টু ও তার লোকজন ছেলেকে জিম্মি করে অনেক মারধর করে। ছেলের নির্যাতনের কথা শুনে তিনি পিন্টুকে ১৬ লাখ টাকা দেন। সেই টাকায় পিন্টু নিজে ইতালি চলে যায়। কিন্তু আজ দেড় বছরের বেশি সময় চলে গেলেও তিনি তার সন্তানের সন্ধান পাচ্ছেন না। এদিকে বিভিন্ন এনজিও থেকে গ্রহণ করা বিশাল ঋণের চাপে তিনি এখন ফেরারি জীবনযাপন করছেন।

একই এলাকার প্রবাস ফেরত আজাহার মিয়া জানান, তিনি নিজে লিবিয়া ছিলেন। তিনি তার ছেলে দ্বীন ইসলামকে লিবিয়া নেন। পরে সেখানে দালাল উজ্জ্বল ও পিন্টু তার ছেলেকে ইতালি পাঠানোর লোভ দেখিয়ে জিম্মি করে ১২ লাখ মুক্তিপণ দাবি করে। তিনি লিবিয়াতে পিন্টুকে ছয় লাখ ও দেশে পিন্টুর স্ত্রী অনির কাছে এক লাখ টাকা পরিশোধ করেন। কিন্তু টাকা পরিশোধের পরেও তার ছেলের সন্ধান তিনি পাচ্ছেন না। বেঁচে আছে না মরে গেছে, তাও তিনি জানেন না।

আজাহার মিয়ার প্রতিবেশী দেলোয়ার মিয়া জানান, পিন্টু মিয়া লিবিয়াতে তার ছোট ভাই সারোয়ারকে জিম্মি করে অকথ্য নির্যাতন করে দেশে ফোন দেয়। মুক্তিপণ দাবি করে ছয় লাখ টাকা। তিনি জমি বিক্রি করে সাড়ে তিন লাখ টাকা পরিশোধ করেন। কিন্তু টাকা পরিশোধের পর পিন্টু জানান, তার ভাই পালিয়ে গেছে তাদের কাছ থেকে। এখন ভাই আদৌ কী অবস্থায় আছে, কেমন আছে। বেঁচে আছে না মরে গেছে, তাও তিনি জানেন না বলে জানান।

উপজেলার শিবপুর ইউনিয়নের রঘুনাথপুর গ্রামের ইমন মিয়ার মা ফিরোজা বেগম, সাইফের বাবা ইসমাইল মিয়া ও শম্ভুপুর গ্রামের জুনায়েদ মিয়ার চাচা সায়দুল্লাহ মিয়া জানান, তারা মিলনের মাধ্যমে তাদের সন্তানদের লিবিয়া পাঠান। সেখানে যাওয়ার পর সোহাগ স্থানীয় লোকদের যোগসাজশে জিম্মি করে নির্যাতন চালায়। সে খবর শুনে তারা সোহাগের বাবা কামাল মিয়া ও মিলনের কাছে পাঁচ থেকে ছয় লাখ টাকা করে মুক্তিপণ বাবদ তুলে দেন। কিন্তু টাকা দেওয়ার পরও তারা তাদের সন্তানদের সন্ধান পাচ্ছেন না। দেশে থাকা মিলন মিয়া ও কামাল মিয়া তাদের পাত্তা দিচ্ছেন না।

এ বিষয়ে শিমূলকান্দি ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান মো. জুবায়ের আলম দানিছ জানান, তিনি বিষয়টি সম্পর্কে অবগত আছেন। তার কাছে কয়েকটি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার লিখিত অভিযোগ করেছে। তিনি সেই অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে দালাল পরিবারের সদস্যদের নোটিশ দিলেও তারা আসেনি। তিনি এদেরকে মানব পাচারকারী চক্র হিসেবে আখ্যায়িত করে সংশ্লিষ্ট বিভাগসহ সরকারের কাছে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান।

এদিকে অভিযুক্ত দালালদের বাড়িতে যোগাযোগ করা হলে তাদের স্বজনরা এ বিষয়ে কথা বলতে অপারগতা প্রকাশ করেন। তবে অভিযুক্ত মিলন মিয়া জানান, তিনি ঢাকার একটি রিক্রুটিং এজেন্সির স্থানীয় প্রতিনিধি হিসেবে লোকজনকে লিবিয়া পাঠানোর মধ্যস্থতা করেন। লিবিয়া যাওয়ার পরের ঘটনার সঙ্গে তিনি জড়িত নন।

অন্যদিকে অভিযুক্ত সোহাগের মা নিলুফার বেগম জানান, সোহাগের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে পরিবারের কোনো যোগাযোগ নেই। ক্ষতিগ্রস্তরা কীভাবে সোহাগের কাছে টাকা দিয়েছেন, তারা তা জানেন না। ক্ষতিগ্রস্ত লোকজন তাদের ওপর নানাভাবে চাপ তৈরি করছেন। লোকজনের চাপে তিনি ও তার স্বামী পালিয়ে বেড়াচ্ছেন।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ভৈরব উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ইসরাত সাদমীন জানান, বিষয়টি তিনি শুনেছেন। তবে এখন পর্যন্ত তার কাছে কেউ লিখিত অভিযোগ করেননি। তবে যেহেতু বিষয়টি তিনি শুনেছেন, খোঁজ-খবর নিয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন।

Advertisement