Beta

চেয়েছি পানি, দিচ্ছে বিদ্যুৎ, সেটাও গুরুত্বপূর্ণ : প্রধানমন্ত্রী

০৯ জুন ২০১৯, ২১:৩৩

নিজস্ব প্রতিবেদক
রোববার বিকেলে গণভবনে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ছবি : ফোকাস বাংলা

তিস্তার পানি সমস্যা প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, আমরা চেয়েছি পানি, তারা দিচ্ছে বিদ্যুৎ, সেটাও গুরুত্বপূর্ণ। ৬০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎকে কাজে লাগিয়ে আমরা দেশের উন্নয়ন করছি। পানি তো আমরা বৃষ্টিতে পাই। সে পানি কীভাবে ধরে রাখা যায় সে ব্যবস্থা করছি। পানি যথাযথভাবে সংরক্ষণ করা হলে পানির জন্য বাংলাদেশকে অন্য কারো কাছে যেতে হবে না।

প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন গণভবনে আজ রোববার এক সংবাদ সম্মেলনে তিস্তার পানি ভাগাভাগির প্রসঙ্গে সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এসব কথা বলেন।

শেখ হাসিনা বলেন, ‘বাংলাদেশ একটি ডেল্টা (দেশ)। সমস্ত নদী হিমালয়ের প্রবাহ থেকে সৃষ্টি হয়ে বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। তাই আমরা যদি পানির যথাযথ সংরক্ষণ করতে পারি তাহলে পানির জন্য অন্যের কাছে যেতে হবে না।’

সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রীর ত্রিদেশীয় (জাপান, সৌদিআরব ও ফিনল্যান্ড) সফর নিয়ে এ সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়।

একের পর এক সব সমস্যার সমাধান করা হবে জানিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, ‘সমুদ্রসীমার মতো কঠিন সমস্যাও আমরা সমাধান করেছি। বন্ধুত্বপূর্ণভাবে ছিটমহল সমস্যার সমাধানও করেছি।’

প্রধানমন্ত্রী সংবাদ সম্মেলনে বলেন, সবাইকে ঈদের শুভেচ্ছা জানানচ্ছি। কেননা ঈদের সময় আমি থাকতে পারিনি। তবে আমি নাতি-নাতনিদের সাথে সময় কাটাতে পেরেছি। জাপান, সৌদি আরব ও ফিনল্যান্ড সফর করেছি। আমি ওমরাহ করার সময় ঠাণ্ডা ও জ্বরে আক্রান্ত হয়েছি। এ কারণে পুরো লিখিত পেপার পড়তে পারছি না। আমি মূল পয়েন্টগুলো পড়ছি। আপনারা পড়ে নিবেন। পুরো পেপার্সটা পঠিত বলে গণ্য হবে।

জাপান আমাদের বন্ধুপ্রতীম দেশ

প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমি সফরে প্রথমে জাপানে গিয়েছি। ওই সফরে জাপানের আমাদের কমিউনিটির সাথে দেখা করি, মতবিনিময় ও শুভেচ্ছা বিনিময় হয়। জাপানের প্রধানমন্ত্রীর দ্বিপাক্ষিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। আপনারা সবাই জানেন, জাপান আমাদের বন্ধুপ্রতীম দেশ। কিন্তু হলি আর্টিজানের ঘটনার পর ব্যবসায়ীদের মধ্যে একটা দ্বিধা-দ্বন্দ্ব কাজ করছিল। আমার এ সফরের পর এ শংকা কেটে গেছে। হলি আর্টিজানে নিহত পরিবারগুলোর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছি। সবার প্রতি সমবেদনা জানিয়েছি।

জাপান আমাদের অকৃত্রিম বন্ধু। মুক্তিযুদ্ধের সময় এবং যুদ্ধের পরও আমাদের সহযোগিতা করেছে। আমরা এ জন্য তাদের অভিনন্দন জানাই। আমাদের অর্থনৈতিক যে লক্ষ্যমাত্রা তা তুলে ধরি। জাপানের সাথে ইতোমধ্যে মাতারবাড়ীসহ কয়েকটি প্রজেক্টের চুক্তি করেছি। তারা বিনিয়োগ করে যাচ্ছে। আমরা তাদের আড়াইহাজারে জায়গা দিয়েছি। জাপান সরকার ইতোমধ্যে আমাদের আর্থিক লোন দিয়েছে। এখন জাপানের সাথে ৪০তম ওডিএ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। সেখানে ২ দশমিক ৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের ঋণ চুক্তি হয়। আমরা যেসব প্রজেক্ট হাতে নিয়েছি সেসব বিষয় উল্লেখ করেছি। 

এরপর জাপানের নিকাই একটি জাপানের মিডিয়া। সেখানে সাক্ষাৎকারে আমি বলেছি, এশিয়ায় অনেক ধনী, উন্নত, অনুন্নত এবং দারিদ্র্য দেশ আছে। সে তুলনায় মানুষ অনেক বেশি। ঐক্যবদ্ধভাবে যদি এসব দেশ কাজ করে তাহলে এসব দেশ উন্নয়নশীল হতে পারে।

ওআইসি সম্মেলনে যোগদান 

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, জাপান সফর শেষে ওআইসি সম্মেলনে যোগ দিতে যাওয়ার সময় যখন সৌদি আরব যাচ্ছি তখন পাইলট আমাকে বললো আমরা এখন চট্টগ্রামের ওপর দিয়ে যাচ্ছি। তখন মনে হলো, ধ্যাত কোথায় যাচ্ছি নিজ দেশ ছেড়ে! ইচ্ছে করছে এখানে নেমে পড়ি। একদিন পরে গেলে ভালো মনে হতো। কিন্তু ওআইসি সম্মেলনে যেতেই হবে। তবে আপনারা জানেন, কক্সবাজার এলাকায় আন্তর্জাতিক মানের একটি এয়ারপোর্ট তৈরি করেছি। এখানের রানওয়েটা আমরা বড় করে দিচ্ছি। দেশি-বিদেশি পর্যটকদের জন্য এখানে আমরা আরো উন্নত ব্যবস্থা নিব। আমরা কক্সবাজারের কিছু এলাকা শুধু বিদেশি পর্যটকদের জন্য করে দিব। কক্সবাজার একটা আর্ন্তজাতিক রুট। আমি মনে করি আমরা যদি কক্সবাজারকে সুন্দরভাবে গড়ে তুলতে পারি বিদেশি অনেক বিমান এখানে ফুয়েলের জন্য অবতরণ করবে। এতে শুধু তেল নয় বিচ এলাকায় আমাদের একটা আয় হবে। এটা একটা বড় পর্যটন এলাকা গড়ে উঠবে। এটা একটা বড় অর্জন হবে।   

শেখ হাসিনা বলেন, ওআইসি সম্মেলন অনেক গুরুত্বপূর্ণ ছিল। সৌদি আরবে পৌঁছানোর পর রোজার কারণে রাত ১১টায় সম্মেলন শুরু হয়। রাত ৩টায় শেষ হয়। এশিয়ার পক্ষ থেকে আমি বক্তব্য দিয়েছি।    ওআইসির সম্মেলনে জঙ্গিবাদ দমন গুরুত্ব পায়। এ ছাড়া আমাদের দেশে রোহিঙ্গা ঈস্যু নিয়েও আলোচনা করেছি। এসব সমস্যা দ্রুত সমাধানের জন্য ভালোভাবে তুলে ধরি। মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে আইটি এবং ভাষা শিক্ষার জন্য বক্তব্য দিয়েছি। এরপর আমরা সবাই সন্ধ্যায় ওমরাহ করতে যাই। ওমরাহ সময় টিপ টিপ বৃষ্টি হচ্ছিল। সে সময় সুন্দর একটি আবহাওয়া তৈরি হয়েছিলো। মদিনায় জিয়ারত শেষে পরদিন ফিনল্যান্ডে চলে যাই।

ফিনল্যান্ড সফর  

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ৪ জুন ফিনল্যান্ডের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে বৈঠক হয়। ফিনল্যান্ড অনেক ধনী দেশ। এটি একটি শান্তিপূর্ণ দেশ, সবাই শান্তিপ্রিয় মানুষ। সেখানে তাদের প্রচুর রিসোর্স রয়েছে। বাংলাদেশের তিনগুণ হবে। তাদেরকে আমাদের দেশে বিনিয়োগ করতে বলেছি। আইটি সেক্টরে তারা বিনিয়োগ করতে আগ্রহী রয়েছে। একটি টিম শিগগিরই আসবে। ওখানে বাংলাদেশের মাত্র তিন হাজার লোক রয়েছে। তাদের সাথে বৈঠক করেছি। তারা সবাই খুশি।   

প্রশ্নোত্তর পর্ব

জাপান সফর প্রসঙ্গের একটি প্রশ্নের জবাবে শেখ হাসিনা বলেন, জাপানের সাথে সব সময় আমাদের একটি বন্ধুত্বপূর্ণ সর্ম্পক। ১৯৭৩ সালে বঙ্গবন্ধু জাপান সফর করেছিলেন, সে সময় থেকে আমাদের সাথে ভালো সর্ম্পক। রাজধানীর সোনারগাঁও হোটেল, যমুনা ব্রিজসহ অনেক কিছুই জাপান সরকার করেছে। জাপান সুন্দর একটি দেশ। বাংলাদেশ সম্পর্কে তাদের অনেক আগ্রহ রয়েছে। বাংলাদেশের উন্নয়নে জাপানের সাথে আলোচনা হয়েছে। মেট্রোরেলের যেসব কনসালটেন্ট এসেছিল, তন্মধ্যে পাঁচজন হলি আর্টিজান হামলায় মারা যায়। এটি একটি দুঃখজনক ঘটনা। এরপর আমরা জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে কঠোর তৎপরতা চালিয়েছি। কোনো তথ্য এলে তদন্ত করে আমরা সাথে সাথে ব্যবস্থা নিয়েছি। ঈদের জামাত নিয়ে আমি খুবই চিন্তিত ছিলাম, কোনো অঘটন ঘটে কিনা। আমাদের গোয়েন্দা বাহিনী, পুলিশ, র‍্যাব এবং সব বাহিনী তৎপর থাকায় এসব ঘটনা ঘটতে পারেনি। জনগণকে সঙ্গে নিয়ে আমরা এসব মোকাবিলা করছি। এ ছাড়া দেশ এগিয়ে যাচ্ছে। আমরা প্রথমে সেটাই চেষ্টা করে  যাচ্ছি। জনগণকে আমরা সম্পৃক্ত করতে পেরেছি। এটা আমাদের বড় সফলতা।  

চীন সফর নিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, জাপানের মতো চীনের সাথে বাংলাদেশের ভালো সম্পর্ক রয়েছে। চীনের পক্ষ থেকে দাওয়াত দিয়েছে। কিন্তু আমাদের পার্লামেন্ট থাকায় যেতে পারিনি। আমরা জুলাই মাসে যাব। খুব তাড়াতাড়ি যাওয়ার ইচ্ছে আছে। দাওয়াত অনেক আছে। বয়স হয়েছে। সব দেশ দাওয়াত দিলে, সব সফরে গেলে দেশে থাকব কখন? মিয়ানমার নিজেরা রোহিঙ্গাকে ফিরিয়ে নিতে চায় না। আমরা তো এত মানুষ ধরে রাখতে পারব না। সব দেশ থেকে চাপ প্রয়োগ করা হচ্ছে।

উন্নত দেশগুলোর শিশুখাতে বাজেট প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, নিউজিল্যান্ড বলেন আর ফিনল্যান্ড বলেন সবই উন্নত রাষ্ট্র। তাদের যে ভূখণ্ড আর আমাদের ভূখণ্ডতো এক না। আমরা এরপরও মাতৃ মৃত্যুহার কমিয়েছি। নারী ও শিশুদের জন্য বাজেট বাড়িয়েছি। দেশের ৫৪ হাজার বর্গ কিলোমিটার এলাকায় ১৬ কোটি মানুষ। এটা যদি ওই সব দেশকে দিই, তারা কি পরিচালনা করতে পারবে? আমরা প্রতিবন্ধী শিশুদের ভাতা দিচ্ছি, বয়স্ক ভাতা দিচ্ছি। আমরা চাকরির ব্যবস্থা করেছি। প্রতিটি স্কুলে ওয়াশরুমের ব্যবস্থা, টিফিনের ব্যবস্থা করেছি।

কোথায় লেখা আছে মানুষ খুন করলে বেহেস্তে যাবে

ওআইসির সম্মেলনে রোহিঙ্গা ইস্যু নিয়ে দেশগুলো কি আশ্বাস দিয়েছে কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমাদের  সমস্যাগুলো আমরা আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করতে পারি। তাহলে এই যে আত্মঘাতী সংঘাত আর রক্ত এটা হয় না। দেখা যাচ্ছে, মুসলমানরা মুসলমানদেরই হত্যা করছে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, শেষ বিচার করবেন আল্লাহ রাব্বুল আল-আমিন। কে ভালো মুসলমান, আর কে ভালো মুসলমান নয়। কে সঠিক, কে সঠিক না বা কে ভালো কাজ করছে, কে করছে না। এটার বিচার করার দায়িত্ব কিন্তু আল্লাহ আমাদের দেন নাই। আপনারা পবিত্র কোরআনের সবগুলো সুরা পড়েন, দেখবেন সব জায়গায় আল্লাহ বলেছেন, শেষ বিচার তিনি করবেন।

শেখ হাসিনা বলেন, শেষ বিচার করার ক্ষমতা তো আল্লাহ রাব্বুল আল-আমিনের। আর নিরীহ মানুষ মারলেই একবারে বেহেশতে চলে যাবে, এটা তো কোনো দিন হয় না। এটা কোথাও লেখা নেই। মানুষকে মারার ক্ষমতা ওই লোককে কে দিয়েছে? কেউ দেয়নি। আল্লাহ তো সেই বিচারের দায়িত্ব কাউকে দেয়নি। শেষ বিচারের সম্পূর্ণ দায়িত্ব আল্লাহর হাতে। আল্লাহর ওপর ভরসা কেন রাখতে পারছেন না? আমরা যেটা শুনি নানা ধরনের কথা। মানুষ হাঁটতে হাঁটতে বলে এই যে দুই কদম, বেহেশতের কাছে পৌঁছালাম। বেহেশতে কে পৌঁছাইছে? যারা মানুষ খুন করেছে একজনও কি পৌঁছাতে পেরেছে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, এখন সোশ্যাল মিডিয়াতে তো এত ম্যাসেজ পাঠায়, এত নিউজ দেয়, এত আইটেম দেয়। কেউ কি বেহেশত থেকে একটাও আইটেম পাঠিয়েছে? বা কোনো ম্যাসেজ পাঠিয়েছে মানুষ খুন করে বেহেশতে বসে আরামে আঙ্গুর ফল খাচ্ছি? পেয়েছে কেউ? এক সময় ধারণা করা হতো আমাদের দেশের শুধু কওমি মাদ্রাসার ছেলেরাই সন্ত্রাস করে। এখন আমরা কি দেখি ইংরেজি মিডিয়ামে পড়া, উচ্চবিত্ত, জীবনে চাওয়া পাওয়ার কিছু বাকি নেই, বাপ-মা সব দিয়ে দিয়েছে। হঠাৎ তাদের মনে হলো বেহেশতে যেতে হবে। আরে বেহেশতে যদি যেতে হয় আল্লাহ-রসুলের নাম নেও, নামাজ পড়ো, মানুষকে সাহায্য করো। তোমার ধনসম্পদ দরিদ্রদের বণ্টন করো। আল্লাহ তোমাকে এমনিতেই বেহেশতে টেনে নিবে।

শেখ হাসিনা বলেন, আমরা মুসলমানরা আত্মঘাতী সংঘাত করে যাচ্ছি। একে অপরকে আমরা খুন করছি। আর রণক্ষেত্র হচ্ছে সমস্ত মুসলিম দেশ। মুসলিম দেশগুলোর মধ্যেই খুনাখুনি হচ্ছে। লাভবান কে হচ্ছে? অস্ত্র যারা তৈরি করছে তারা, অস্ত্র যারা সরবরাহ করছে তারা, অস্ত্র যারা দিচ্ছে তারা। আপনারা আমার ওআইসি বক্তৃতা  পড়বেন। সেখানেও পাবেন। যারা অস্ত্র তৈরি করছে, অস্ত্র বিক্রি করছে, অস্ত্র সরবরাহ করছে, শুধুই তারাই লাভবান হচ্ছে। আর রণক্ষেত্র হচ্ছে প্রত্যেকটা মুসলিম দেশ। মুসলমান মুসলমানের রক্ত নিচ্ছে। এটা ওআইসিকে বন্ধ করতে হবে। এ দাবিটা আমি সব সময় রাখি। আমি রেখে যাচ্ছিও, আমি রেখে যাব। আমি জানি এতে অনেক সমস্যা হবে, তারপরেও। যেটা বাস্তব যেটা সত্য সেটাই। একমাত্র আল্লাহ রাব্বুল আলামিন ছাড়া কারো কাছে আমি মাথানত করি না, করব না।

আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো চায় না, রোহিঙ্গারা নিজ দেশে ফেরত যাক

রোহিঙ্গা ও আন্তর্জাতিক ইস্যুতে এক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো চায় না, রোহিঙ্গারা নিজ দেশে ফেরত যাক। বিশ্বের যে দেশেই যাই সেখানেই দেখি সবাই চায়, রোহিঙ্গারা নিজ দেশে ফেরত যাক। সমস্যাটা হচ্ছে, আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো যারা কক্সবাজারে গিয়ে বিলাসবহুল জীবনযাপন করে, তারাই চায় না রোহিঙ্গারা নিজ দেশে ফেরত যাক। কেননা রোহিঙ্গারা ফেরত না গেলেই তাদের সুবিধা।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা কক্সাবাজার থেকে রোহিঙ্গাদের ভাষানচরে স্থানান্তরের জন্য সব ধরনের ব্যবস্থা করেছি। অথচ রোহিঙ্গারা বিক্ষোভ করল। তারা ভাষানচরে যেতে চায় না। এটা কারা করছে? ওই সংস্থাগুলোই করছে।

রোহিঙ্গাদের ফেরত নেওয়ার বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সব দেশই চায় রোহিঙ্গারা তাদের নিজ দেশে ফেরত যাক। সমস্যা হলো মিয়ানমার তাদের নিতে চায় না। তাদের সঙ্গে আমাদের চুক্তি হয়েছে, আলোচনা হয়েছে। কিন্তু মিয়ানমার তাদের নিচ্ছে না।

মরলেও বিমানেই ভ্রমণ করব, পিছপা হব না

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, আমি যখনই বিমানকে লাভজনক করতে যাই, তখনই একটা ঝামেলা হয়। এত দিন যারা লুটপাট করে খেয়েছে, তারা চায় না বিমান সঠিকভাবে চলুক। এ কারণেই আমি যখন বিমানে উঠি, কখনো নাটবল্টু থাকে না, কখনো জ্বালানি সমস্যা হয়। কখনো পাইলটের পাসপোর্ট থাকে না।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমাকে অনেকেই বিমানে উঠতে নিষেধ করেন। আমি তাদের বলে দিয়েছি, যত সমস্যাই হোক আমি বিমানেই ভ্রমণ করব। যদি মৃত্যু হয়, দেশের বিমানেই হোক। অন্তত এটা তো বলতে পারব, নিজ দেশের বিমানে মৃত্যু হয়েছে।

পাইলটের পাসপোর্ট না থাকা প্রসঙ্গে শেখ হাসিনা বলেছেন, মানুষের ভুল-ভ্রান্তি হতে পারে। কিন্তু আমি যখনি জানতে পারি, তখন আমাদের দেশের ইমিগ্রেশনের যারা দায়িত্বে ছিল তারা কেন চেক করেনি খোঁজ নিতে বলি। আমি বলেছি যত ভিভিআইপি হোক, নামের পাশে যত ভি যুক্ত হোক, প্রত্যেককে ভালোভাবে ঠিকমতো ভিসা-পাসপোর্ট আছে কি না, তা চেক করতে। আমরা এখন দেশের বিমানকে উন্নত করার চেষ্টা করে যাচ্ছি এবং নতুন রুটে বিমান পরিচালনার চিন্তা করছি। নতুন নতুন বিমান কিনে দিয়েছি।

আমাদের দেশের মানুষ বিমানে উঠার জন্য পাগল। অথচ বিমানে অনেক সময় সিট খালি থাকে। অথচ মানুষ সিট পায় না। কৃত্রিম সংকট দেখিয়ে এসব কারসাজি করা হয়। আমি খোঁজ নিয়ে এসব দমন করছি। পরে তাদের বিরুদ্ধে আমরা ব্যবস্থা নিয়েছি। তাদের রাগ ক্ষোভ থাকতে পারে। যখনি বিদেশে যাই তখনি একটা ঘটনা ঘটে যায়।

বিমানের চোরাচালান বন্ধ করেছি। সোনার বার উদ্ধার করা হয় কয়দিন পরপর, যদিও এতে আমাদের রিজার্ভ বাড়ছে। তারপরও আমি এসব বন্ধ করেছি। তারা তো এখন চুপ করে বসে থাকেনি। তার পরও আমি কিন্তু পিছপা হব না। বলছিলেন প্রধানমন্ত্রী।

শেখ হাসিনা বলেন, দীর্ঘদিন যারা বিমানটাকে নিয়ে খেলত, এখন তাদের আঁতে ঘা লেগেছে। তারা এ অঘটনগুলো ঘটাচ্ছে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, কক্সবাজার বিমানবন্দরকে একটি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর হিসেবে গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সৌদি সরকার এ বিমানবন্দর সংস্কারে অর্থায়ন করবে। এখানে আন্তর্জাতিক রুটের বিমানগুলো প্রয়োজনীয় জ্বালানি সংগ্রহ করতে পারবে। একই সঙ্গে ইচ্ছে করলে তারা কক্সবাজার পর্যটন এলাকাও ঘুরে দেখতে পারবে।

দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে ভারত, চীন ও রাশিয়া সবাই রোহিঙ্গা ইস্যুতে মিয়ানমারকে সমর্থন দিচ্ছে। আমরা এ ক্ষেত্রে কতটুকু প্রভাব রাখতে পারব এমন প্রশ্নের জবাবে শেখ হাসিনা বলেন, এরা মিয়ানমারের নাগরিক, তাদের ফিরে যাওয়া উচিত। এটা সব রাষ্ট্রই বলেছে। সবাই যদি এদের (মিয়ানমারের) বিরুদ্ধে লাগে তাহলে এদের মানাবে কে? সমস্যা হলো বিভিন্ন আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থাগুলো রয়েছে, শরণার্থীদের নিয়ে কাজ করে। এরা কখনো চাই না এ ধরনের শরণার্থীগুলো দেশে ফিরে যাক। আমার যে চুক্তি করলাম ফিরে যাওয়ার জন্য হঠাৎ রোহিঙ্গারা আন্দোলন করে বসল, তারা যাবে না। তাদের এ আন্দোলনে কারা উসকানি দিল? এটা ছাড়াও তাদের মধ্যে ভয়ও রয়েছে, তাদের ওপর অত্যাচার হতে পারে। এরপরও কিছু লোক তো এখনো বসবাস করছে। কিন্তু এরপরও সংস্থাগুলো চায় না রোহিঙ্গারা দেশে ফিরে যাক। তাদের ধারণা, বিশাল অঙ্কের টাকাপয়সা আসে। এ ছাড়া তাদের কিছু লোকের চাকরি-বাকরি থাকবে না। তাছাড়া কেন হবে? এরপরও আমরা চেষ্টা চালাচ্ছি। কিন্তু মিয়ানমার কিছুতেই চায় না রোহিঙ্গারা ফিরে যাক।

গণমাধ্যমে মনের কথা লিখতে পারছেন না এক সম্পাদক। আপনার কোনো বিধি-নিষেধ আছে কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, যদি তাঁর ওপর বিধি-নিষেধ থাকতো তাহলে কি তিনি ওইটুকু বলার সাহস পেতেন? যদি সত্যি কোনো চাপ থাকত তাহলে তারা কি এসব বলার সাহস পেত? তবে হ্যা ওই সম্পাদক কোনো গণতান্ত্রিক সরকার থাকলে পরম আয়েশি লেখা লিখতে পারেন না। বরং মিলিটারি সরকার বা অগণতান্ত্রিক সরকার ক্ষমতায় থাকলে তারা পরম আয়েশি লেখা লিখতে পারে। আমরা কোনো সংস্থাকে নির্দেশ দিইনি যে নিউজ সেন্সর করার জন্য। উনার যা খুশি উনি লিখতে পারে। আমি কখনো উনাদের সহযোগিতা পাইনি। আমি মনে করি, আমার বিবেক যখন বলে আমি সঠিক করছি, সঠিকভাবে চলছি সেটাই হচ্ছে সবচেয়ে বড়। কে কি লিখলো বা ভালো বললো না মন্দ বললো সেটা দেখার বিষয় না। আমি জনগণের জন্য কাজ করি, জনগণকে ভালোবাসি। দেশ এগিয়ে যাচ্ছে, দেশ উন্নত হচ্ছে। এটার সুফল সবাই পাচ্ছে। যারা স্বাধীনতার বিরোধিতা করছে তাদের ভালো লাগবে না। দেশ এগিয়ে যাচ্ছে, সারা বিশ্বের কাছে বাংলাদেশ একটা দৃষ্টান্ত।     

প্রধানমন্ত্রী গত ২৮ মে ত্রিদেশীয় সফরের প্রথম গন্তব্য জাপানের রাজধানী টোকিও যান। জাপানে চার দিন অবস্থানকালে শেখ হাসিনা ও জাপানের প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবে আড়াই বিলিয়ন ডলারের দ্বিপক্ষীয় চুক্তিসহ ৪০টি ওডিএ চুক্তি স্বাক্ষর করেন। এ ছাড়া প্রধানমন্ত্রী ‘ফিউচার ফর এশিয়া’ বিষয়ক নিক্কেই সম্মেলনেও যোগ দেন। ওই সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন। সফরে তিনি জাপানের ব্যবসায়ী নেতাদের সঙ্গেও গোলটেবিল বৈঠক করেন। শেখ হাসিনা হলি আর্টিজান হামলায় হতাহতদের পরিবার এবং জাইকার প্রেসিডেন্ট শিনিচি কিতাওকার সঙ্গে পৃথক বৈঠক করেন।

জাপান সফর শেষে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সৌদি আরবে যান। তিন দিনের সফরকালে তিনি সৌদি বাদশাহর আমন্ত্রণে মক্কায় অনুষ্ঠিত ১৪তম ওআইসি শীর্ষ সম্মেলনে যোগ দেন। এ ছাড়া তিনি মক্কায় পবিত্র ওমরাহ পালন এবং মদিনায় প্রিয় নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর রওজা জিয়ারত করেন।

সবশেষ শেখ হাসিনা ফিনল্যান্ড সফর করেন। ফিনল্যান্ডে অবস্থানকালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ৪ জুন ফিনিস প্রেসিডেন্ট সাউলি নিনিস্তোর সঙ্গে এক বৈঠকে মিলিত হন এবং ৫ জুন অল ইউরোপিয়ান আওয়ামী লীগ ও ফিনল্যান্ড আওয়ামী লীগ তাঁর সম্মানে আয়োজিত এক সংবর্ধনায় যোগ দেন। পাঁচ দিনের সরকারি সফর শেষে কাতার এয়ারলাইনসের একটি বিমান ফিনল্যান্ড সময় শুক্রবার সন্ধ্যা ৬টায় প্রধানমন্ত্রী ও তাঁর সফর সঙ্গীদের নিয়ে কাতারের রাজধানী দোহার উদ্দেশে হেলসিঙ্কি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ত্যাগ করে। দোহায় যাত্রা বিরতির পর প্রধানমন্ত্রী বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের একটি ভিভিআইপি ফ্লাইটে শনিবার ভোরে ঢাকার উদ্দেশে যাত্রা করেন।

Advertisement