Beta

বিয়ের আসরে খুনের আগেই হুমকি দিয়েছিল রকি

০১ আগস্ট ২০১৯, ২১:৫৭ | আপডেট: ০১ আগস্ট ২০১৯, ২২:০০

নিজস্ব সংবাদদাতা
বিয়ের আসরে কনের সৎবাবা তুলা মিয়াকে হত্যা ও কনের মাকে ছুরিকাঘাত করার ঘটনায় আটক সজীব আহমেদ রকি। ছবি : স্টার মেইল

বিয়ের আসরে কনের সৎবাবা তুলা মিয়াকে খুন করা সজীব আহমেদ রকি গতকাল বুধবার বিকেল থেকেই ঘোরাঘুরি করছিলেন রাজধানীর মগবাজারের দিলু রোড এলাকায়। শুধু তাই নয়, বুধবার রাতে তুলা মিয়ার বাড়িতে ঢুকে মেয়ে স্বপ্না ও তাঁকে হত্যার হুমকি দেন রকি।

এখানেই থেমে থাকেননি রকি। আজ বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ৮টার পর থেকে বিজিএমইএ ভবনের দক্ষিণ পাশের রাস্তা দিয়ে বারবার হাঁটছিলেন তিনি। হাঁটার সময় জোরে জোরে বলছিলেন, ‘আমার স্বপ্নাকে অন্য জায়গায় বিয়ে দিলে সংসার ভেঙে দেব।’

ঘাতক রকিকে এলাকায় ঘুরতে ও তার হুমকি দেওয়া অনেক শুনেছেন স্থানীয়রা লোকজন। আর এতে আতঙ্কিত হয়ে তুলা মিয়া এই ঘটনা হাতিরঝিল থানায় জানান দুপুর ১২টার দিকে। সাড়ে ১২টার দিকে থানা থেকে পুলিশও এসেছিল ঘটনাস্থলে। কিন্তু রকিকে পায়নি পুলিশ।

এসব ঘটনা আজ বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় এনটিভি অনলাইনকে জানান মো. ফরিদ। সজীব আহমেদ রকি যখন তুলা মিয়া ও তাঁর স্ত্রীকে ছুরিকাঘাত করতে থাকেন তখন তাঁদের প্রতিবেশী মো. ফরিদ রকির কাছ থেকে ছুরি কেড়ে নিয়ে তাকে নিবৃত্ত করেন। তুলা মিয়া নিহত হওয়ার ৩০ মিনিট আগেও দুজন এক সঙ্গে সিগারেট খেয়েছেন। রকি যাতে ঝামেলা করতে না পারে তখন সে ব্যাপারে কথাও হয় তাদের মধ্যে।

ঘটনার আগেই পুলিশকে জানানো হয়েছিল

মো. ফরিদ এনটিভি অনলাইনকে বলেন, রকি আজ সকালে আমাদের বাসার পাশে এসেও কয়েকজনকে জিজ্ঞেস করেছিল। গালি দিচ্ছিল স্বপ্না ও তার বাবা তুলা ভাইকে। সে সময় তুলা ভাই পুলিশে খবর দেয়। পুলিশ এসে ঘুরে যায়। কিন্তু রকিকে পায়নি। পরে পুলিশ তুলা মিয়াকে বলে যান, এদিকে এলেই তাকে বেঁধে রেখে আমাকে জানাবেন।

কী ঘটেছিল ঘটনাস্থলে

মো. ফরিদ বলেন, প্রিয়াঙ্কা শুটিং হাউজে স্বপ্নার বিয়ে হবে। মাত্র কয়েকজন নিয়ে আয়োজন। ছেলের পক্ষ থেকে তিনজন আর মেয়ের পক্ষ থেকে কয়েকজন থাকবে বলে কথা ছিল। রকি ঝামেলা করবে ভেবে শুটিং হাউজের গেটে তালা লাগিয়ে রেখেছিলেন তুলা ভাই। এরপর দুপুর দেড়টার একটু আগে গেটের ওপর দিয়ে লাফ দেয় রকি। তার হাতে একটা ছুরি। গেটের ভেতরে ঢুকেই নিচতলার একজনের কাছে রকি জানতে চায়, ‘আমার স্বপ্না কই?’ দুইতলায় উঠতে গেলে তুলা ভাই রকিকে আটকানোর চেষ্টা করেন। তখন ভাইকে ছুরি দিয়ে বুকে একটি ও তলপেটে দুইটি খোঁচা দেয় সে। এরপর ভাবি (ফিরোজা খাতুন) এগিয়ে গেলে তাঁর তলপেটে একটা খোঁচা দেয়। তখন আমি গিয়ে রকির কাছ থেকে ছুরি কেড়ে নেই। পরে কম হলেও ১০ মিনিট কোস্তাকুস্তি করে তাকে দঁড়ি দিয়ে বাঁধি। এপর পুলিশ এসে রকিকে নিয়ে যায়।

স্বপ্নার সঙ্গে কি আসলেই প্রেম ছিল রকির?

ফরিদ বলেন, ‘শুনেছি, খুব ছোট বেলায় দিলু রোডের জাহাঙ্গীর সাহেবের বাসায় থাকতো রকি ও স্বপ্নার পরিবার। সেখানে ওরা এক সঙ্গে পড়াশুনা করত। তখন থেকেই তাদের প্রেম ছিল বলে শুনেছি। রকি স্বপ্নাকে বিয়ে করতে চাইলে দুজনের পরিবারের কেউ রাজি হয়নি। তারপর থেকেই তাদের সম্পর্ক নষ্ট হয়ে যায়।’

ঘটনাস্থলে গিয়ে তুলা মিয়ার অন্তত ২০ জন প্রতিবেশীর সঙ্গে কথা বলে এনটিভি অনলাইন। তাদের ভেতরে অধিকাংশই তাদের দুজনের প্রেমের কথা শুনেছে। এদের ভেতরে রাফিয়া আক্তার বলেন, ‘এখান থেকে দেড় বছর আগেও তারা সব সময় এক সাথে ঘুরতো। এই ঘটনা স্বপ্নার মাও জানত। আমি নিজেই এই লেকপাড়ে বহুবার দেখেছি।’

রকির কারণে স্বপ্নার আগের বিয়েও ভেঙে যায়

তুলা মিয়ার মৃত্যুর পরও স্বপ্নার বিয়ে সম্পন্ন হয়েছে। কনের  উকিল বাবা হয়েছেন মো. দিদারুল আলম। তিনি বলেন, ‘নয় মাস আগে খালাতো ভাইয়ের সঙ্গে স্বপ্নার বিয়ে হয়। বিয়ের পর স্বামীর সঙ্গে স্বপ্না মিরপুরে থাকত। কিন্তু রকি এই বিয়ের পর ফেসবুকে নানা কথা লিখত। ওই জামাইকেও জ্বালাতন করত, মেরে ফেলার হুমকি দিত। এসব কারণে ওই জামাই স্বপ্নাকে ডিভোর্স দেন।’

স্বপ্নার কারণেই জেল খেটেছিল রকি

মো. দিদারুল আলম ও মো. ফরিদ জানান, ওই বিয়ে ভেঙে যাওয়ার পর তুলা মিয়া থানায় অভিযোগ জানান। তারপর হাতিঝিল থানা বিষয়টি মিটিয়ে দিতে সবাইকে থানায় ডেকেছিল। কিন্তু থানায় বসেই রকি ওসিকে বলেন, ‘আমি স্বপ্নাকে ছাড়া কাউকে বিয়ে করব না। তাঁকে অন্য জায়গায় বিয়ে দিলে আমি সংসার ভেঙে দেব।’ সে সময় পুলিশ রকিকে গ্রেপ্তার করে এক মাস জেলে রাখে।

সৎবাবা খুন, মা হাসপাতালে, কনে গেলেন সিলেট

মো. দিদারুল আলম বলেন, ‘স্থানীয় ওয়ার্ড কাউন্সিলর মুক্তার সরদার ও হাতিরঝিল থানার ওসি ঘটনাস্থলে আসেন। তারপর বিকেল ৩টার দিকে বিয়ে পড়ানোর জন্য ইব্রাহিম কাজীকে ডেকে আনা হয়। তখন বিয়ে করতে আসা বরকে এসব ঘটনা জানান কাউন্সিলর। এরপরও বর বিয়ে করতে রাজি হন। এরপর তাঁদের বিয়ে সম্পন্ন হয়। বিয়ের কিছু সময় পর কনেকে নিয়ে বরপক্ষ সিলেটে চলে যায়। যদিও স্বপ্না যেতে চাননি আজ।’

স্বপ্নার মা ফিরোজা খাতুন বর্তমানে হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন।

অস্বীকার করে ওসি যা বললেন

ছুরিকাঘাতে হত্যার আগে হুমকির বিষয়টি জানেন না বলে দাবি করেছেন হাতিরঝিল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবদুর রশিদ। তিনি বলেন, ‘বিষয়টি আমার জানা নেই। ডিউটি অফিসারকে জানিয়েছিল কিনা আমি জানি না। তবে ঘটনাস্থলে গিয়ে আমরা রকিকে আটক করেছি।’

আবদুর রশিদ বলেন, এই ঘটনায় মেয়ের বাবা নিহত হয়েছেন আর মা হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন। কনের পরিবারের লোকজন থানায় আসবে। তারা আসার পর মামলা করবে। আটকের পর রকি আমাকে বলেছেন, ‘ওই মেয়ের সঙ্গে তার সম্পর্ক ছিল। তাই মেয়ের বিয়ের বিষয়টি সে মেনে নিতে পারেনি। তারপর সে ছুরি নিয়ে মেয়ের বাবাকে ছুরি মারে।’

Advertisement