Beta

মেলাভরা ক্রেতা, খুশি নন বিক্রেতা!

০৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ১৬:৫৮ | আপডেট: ০৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ১৭:১৪

মাসুদ রায়হান পলাশ
ঢাকা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যমেলার শেষ মুহূর্তে ক্রেতা-দর্শনার্থীদের ভিড়। ছবি : ফোকাস বাংলা

ঢাকা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যমেলা প্রায় শেষের পথে। শেষ দিকে মেলায় উপচে পড়ছে মানুষ। কিন্তু তাতেও খুশি নন বিক্রেতারা। তাদের মতে, মেলায় বেশির ভাগ মানুষ কেনাকাটা করতে নয়,  কেবল ঘুরে বেড়াতে আসে। গত বছরের চেয়ে এবার মেলায় বিক্রিবাট্টা কম বলে হতাশা ব্যক্ত করতে দেখা যায় অনেক বিক্রেতাকে।

গতকাল সোমবার দুপুর থেকে রাত পর্যন্ত মেলা ঘুরে দেখা যায়, বিভিন্ন স্টলে কেনাকাটা করছে মানুষজন। সন্তানদের নিয়ে মেলা চত্বরে ঘুরে বেড়াচ্ছেন মা-বাবা। কেউ খাওয়া-দাওয়া করছেন রেস্তোরাঁয় বসে। অনেকেই শিশুদের নিয়ে নাগরদোলায় উঠেছেন। কেউ বা ফ্যামিলি রাইড নৌকা, ট্রেন এসবে চড়েছেন। তবে কেউ কেউ যে কেবল ঘুরতেই এসেছেন সেটা মিথ্যা নয়।

সকাল ১০টা থেকেই মানুষজন মেলায় আসতে শুরু করে। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়ে মানুষের ভিড়। তবে ছুটির দিনের মতো গতকাল মেলায় উপচে পড়া ভিড় ছিল না।

মেলায় ঘুরতে ঘুরতে বেশ কিছু স্টলের সামনে মানব-পুতুলের দেখা পাওয়া যায়। বাচ্চারা তাদের সঙ্গে ছবি তুলছে। পরে কোনো কোনো মা-বাবা ঢুকে যাচ্ছেন স্টলের ভেতর।

এ রকমই একটি স্টল ‘অরিজিনাল হংকং ফ্যাশন জুয়েলার্স’। স্টলের সামনে মানব-পুতুলের সঙ্গে ভীষণ আনন্দে ছবি তুলছে শিশুরা। স্টলের ভেতর থেকে মাইকিং করা হচ্ছে, ‘চলে আসুন, আজকের অফার মাথা নষ্ট করা অফার। আজকের অফার ফাটাফাটি অফার। একটি ইয়ার রিং ২৫০ টাকা, দুটি রিং ৩৫০ টাকা।’

ঘোষণা শুনে রমিলা তুসি নামে এক নারী দুটি কানের দুল কিনলেন। অনুভূতি জানতে চাইলে বললেন, ‘এই দুলের দাম মেলার বাইরে খুব বেশি হলে ৩০০ টাকা। কিন্তু মেলায় এসে তো কিনতে মন চায়। তাই কিনলাম। আরো অনেক কিছু কিনব। কিন্তু মেলায় জিনিসপত্রের দাম অনেক বেশি।’

ঘুরতে ঘুরতে ফ্যামিলি রাইড অংশে কথা হয় এক তরুণ যুগলের। মেলায় আসার ব্যাপারে জানতে চাইলে যুগলের একজন নাজমুল হুদা বলেন, ‘ঘুরতে এসেছি। কিছু পছন্দ হলে কিনব। প্রেমিকাকে সঙ্গে নিয়ে এলে কিছু না কিছু তো দিতেই হয়।’

পাশেই প্লাস্টিকের মোটরসাইকেল রাইডে ছিল শিশু ইফাদ। পাশে দাঁড়িয়ে মা রাহিমা বেগম ছবি তুলছিলেন ছেলের। মেলায় কী কিনলেন জানতে চাইলে বলেন, ‘ছেলেকে নিয়ে মজা করছি। ছেলের জন্য একটি জামা কিনেছি। আমার জন্য একটি ইন্ডিয়ান সালোয়ার কামিজ।’

এদিকে কেমন বেচাকেনা হচ্ছে, অন্তত ২০টি স্টলে জিজ্ঞাসা করলে অধিকাংশ বিক্রেতাই জানান, গতবারের তুলনায় মেলায় বেচাকেনা কম। এবার বেশির ভাগ দোকানদারের ক্ষতি হয়ে যাবে।

ব্লেজার বিক্রিকারী এক স্টলমালিক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘আমি গতবারের মতো এবারও ব্যবসা করেছি। তবে এবার প্রত্যাশা ছিল বেশি। সেই অনুযায়ী আসলেই বিক্রি হয়নি। আরো ভালো হওয়া উচিত ছিল। দোকান অনেক বড়, ভাড়া বেশি।’

মেলায় বিক্রির পরিমাণ সম্পর্কে নোঙ্গর অ্যান্ড মোস্তাকিন কাবাব হাউজের এক খাবার প্রস্তুতকারকের কাছে জানতে চাইলে বলেন, ‘এবার আসলেই বিক্রি কম। পুরো মাসে ৩০ লাখ টাকা শুধু দোকান ভাড়া। এদিকে ক্রেতাও খুব বেশি না। লাভ করতে গেলে বেশি দাম রাখতে হবে। শেষমেশ মূলধন বাঁচবে কি না জানি না।’

শ্বশুর বাড়ির পিঠা নামের পিঠাঘরে অনেককেই দাঁড়িয়ে পিঠা কিনতে দেখা যায়। দোকানি মামুনও অন্য বিক্রেতাদের মতো একই ভঙ্গিতে বলেন, ‘খুব বেশি বিক্রি নেই। তবে একেবারে খারাপ না।’

অন্যদিকে দোকানের সামনেই মাহবুব আলী নামের এক ক্রেতা পিঠার দাম বেশি বলে জানান। তিনি বলেন, ‘পিঠার দাম একটু বেশি হলেও ভালোই লাগছে।’

অন্যদিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করার মতো একটি স্টল হলো ‘বাংলাদেশ জেল কারাপণ্য’। কয়েদিদের বানানো বিভিন্ন জিনিসপত্র মেলায় বিক্রি করছে তারা। ৫০ শতাংশ লাভ দিয়ে কয়েদিদের কাছ থেকে এসব পণ্য কিনে নেয় জেল কর্তৃপক্ষ। কয়েদিরা এ টাকা পরিবারের জন্যও পাঠাতে পারে।

বেতের চেয়ার, ডালা, নকশিকাঁথাসহ প্রায় ২০০ রকমের পণ্য বিক্রি হচ্ছে এ স্টলে। কারা পুলিশের সদস্যরা বিক্রি করছেন এসব পণ্য।

কেমন বিক্রি হচ্ছে জানতে চাইলে দোকানের দায়িত্বে থাকা কারাপুলিশ সদস্য অন্য বিক্রেতাদের থেকে ভিন্ন তথ্য দিলেন। তিনি বলেন, ‘গতবারের চেয়ে এবার অনেক বেশি বিক্রি আমাদের। আগামীবার আরো বেশি হবে বলে মনে করছি। আমরা আগামীতে আরো বেশি বেশি জিনিসপত্র তৈরির চেষ্টা করব কয়েদিদের দ্বারা। যাতে লাভের টাকা দিয়ে জেল থেকে বের হয়েও ওরা কিছু একটা করে খেতে পারে।’

এদিকে এবার মেলায় বিক্রি কম, বেশির ভাগ স্টলমালিকের এমন দাবির ব্যাপারে জানতে চাইলে নাম প্রকাশ না করার শর্তে রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, ‘ওদের বেচাকেনা কোনোভাবেই কম হচ্ছে না। ব্যবসায়ীরা কখনো বেশি বিক্রির কথা স্বীকার করবে না। গতবার মেলায় যাদের স্টল ছিল তারা বলেছিলেন বেশি বিক্রি হয়নি। কিন্তু এখন তারা বলছেন, গতবার ব্যবসা ভালো ছিল। এটা আসলে তাদের ব্যবসায়িক পলিসি। প্রতিবারই তাদের বিক্রি হয় না বলে। অথচ মেলার শুরুর আগে স্টল বরাদ্দ পেতে হুমড়ি খেয়ে পড়ে।’

গতবারের চেয়ে এবার বিক্রি বরং বেশি দাবি করে ওই কর্মকর্তা বলেন, ‘তবে সবার তো আর সমান ব্যবসা হয় না প্রতিবার। সপ্তাহের ছুটির দিন শুক্র-শনিবার খুব বেশি ভিড় থাকে মেলায়। সব দিন তো সমান ব্যবসা হবে না। গত শুক্রবার মেলায় দাঁড়ানোর স্থান ছিল না। হরদমে বেচাকেনা করেছে বিক্রেতারা।’

এদিকে মেলায় আসা পণ্য ও খাবারের দাম অতিরিক্ত বাড়িয়ে ক্রেতাদের যেন ঠকানো না হয় সে ব্যাপারে সার্বক্ষণিক নজরদারি করছে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের দল। গতকাল পর্যন্ত বিভিন্ন স্টলকে প্রায় সাড়ে চার লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে।

Advertisement