Beta

ডাকসু নির্বাচন : ভোট হলে সিলেকশন না হোক!

০৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ১০:৪৭ | আপডেট: ০৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ১১:২৩

মাসুদ রায়হান পলাশ

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) ও হল সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে অনুষ্ঠিত হওয়া সিন্ডিকেট সভার মিটিংয়ে সিদ্ধান্ত হয়, হলে ভোটকেন্দ্র স্থাপন করবে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। তারপর থেকে ছাত্রলীগ বাদে ক্যাম্পাসে অবস্থানরত বেশির ভাগ ছাত্র সংগঠন সোচ্চার ডাকসু নির্বাচনের ভোটগ্রহণ হলের বদলে একাডেমিক ভবনে করার দাবিতে।

তবে শুধু হলে ভোটকেন্দ্র স্থাপন নয়, ক্যাম্পাসে সহাবস্থান, সবার জন্য সমান সুযোগ সৃষ্টি করা, প্রশাসনের যথাযথ ভূমিকা পালনসহ বেশ কয়েকটি দাবিতে বিভিন্ন ছাত্র সংগঠন সোচ্চার। এসব বিষয় নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের হস্তক্ষেপও কামনা করছে তারা। দাবি না মানলে সবাই মিলে একত্রিত হয়ে আন্দোলনে যাওয়ার কথাও ভেবেছে সংগঠনগুলো।

এদিকে আজ সোমবার সকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য (ভিসি) আখতারুজ্জামান বরাবর ‘হলের বাইরে ভোটকেন্দ্র স্থাপন’ করার দাবিতে স্মারকলিপি দেবে কোটা সংস্কার আন্দোলনকারীদের সংগঠন বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদ। সংগঠনের আহ্বায়ক হাসান আল মামুন এসব কথা জানিয়েছেন।

হাসান আল মামুন বলেন, ‘আমরা আজ সকালে ভিসি বরাবর স্মারকলিপি দেব আমাদের সংগঠনের পক্ষ থেকে। আমাদের দাবি হলের বাইরে ভোটকেন্দ্র স্থাপন করতে হবে। নির্বাচন যদি হয়ই তবে ভালো করে হোক। আমরা চাই একটি ভালো নির্বাচন। বিশ্ববিদ্যালয় যেন কলঙ্কিত না হয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে। আমাদের দাবি মানা না হলে ভবিষ্যতে আমরা কঠোর আন্দোলনে যাব। আমরা কোনো রকম প্রহসন মেনে নেব না।’

মামুন বলেন, ‘হলের ভেতরে ভোট হলে ছাত্রলীগ প্রভাব বিস্তার করবে, কারচুপির সযোগ থাকবে, অনাবাসিক শিক্ষার্থীরা নির্ভয়ে ভোট দিতে পারবে না। আবাসিক শিক্ষার্থীরাও ভয়ে থাকবে বলে আমরা মনে করছি। সুতরাং হলে ভোটগ্রহণ হলে ভোট সুষ্ঠু হবে না। এসব কারণ দেখিয়ে আমরা হলের বাইরে ভোটকেন্দ্র স্থাপন করার দাবি জানিয়ে স্মারকলিপি দিচ্ছি আজ।’

ডাকসু নির্বাচন নিয়ে বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনের দাবির সঙ্গে বেশির ভাগ সাধারণ শিক্ষার্থী একমত পোষণ করছে বলে অন্তত ৩০ জন শিক্ষার্থীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে। এ ছাড়া সাধারণ শিক্ষার্থীরা যাকে খুশি তাকে নির্ভয়ে ভোট দিতে চায়। ডাকসু নির্বাচনে সুষ্ঠু রাজনীতির চর্চা হোক বলেও তাদের প্রত্যাশা।

বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন শিক্ষার্থীদের এসব দাবি শেষ পর্যন্ত যদি মেনে না নিয়ে নির্বাচন সম্পন্ন করার লক্ষ্যে সামনের দিকে এগিয়ে যায় তখন কী হবে। এই প্রশ্ন করা হয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ১২ জন শিক্ষার্থীকে। তাদের ভেতরে ইতিহাস বিভাগের নজরুল ইসলাম ও রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের হাসিবুল ইসলাম একই কথা বলেন।

নজরুল ইসলাম বলেন, ‘দেখুন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডাকসু নির্বাচন কিন্তু সারা দেশের গণ্ডিতে না। এটা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে আবহে হবে। ধরে নেন, বিশ্ববিদ্যালয় সবার দাবি উপেক্ষা করে হলে ভোটকেন্দ্র স্থাপন করল। ক্যাম্পাসে সহাবস্থান নিশ্চিত করতে পারল না। এতে বিভিন্ন ছাত্র সংগঠন আন্দোলনে গেল। ছাত্রলীগ আন্দোলন থামাতে গেলে ঝামেলা হবে। কোটা আন্দোলনকারীসহ বাম জোটের নেতারা কিন্তু মাঠ ছেড়ে দেবে না। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কিন্তু ক্যাম্পাসের ভেতরে এসে বেশি লাভবান হবে না, বলা চলে লাভবান হতে পারবে না। ঝামেলা যদি মাত্রাতিরিক্ত হয় প্রথমত বিশ্ববিদ্যালয়ের দুর্নাম হবে। সম্মানে লাগবে। এটা পুরো বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা কীভাবে নেবেন, সেটা একটা ব্যাপার।’

নজরুল আরো বলেন, ‘যদি খারাপ পরিস্থিতি সৃষ্টি হয় তখন নির্বাচন শেষ পর্যন্ত হবে কি না, তা নিয়েও শঙ্কা আছে। এ ছাড়া কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ এবং কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের অনেকে চায় না নির্বাচন হোক। কারণ বয়সে ছোট কোনো  মুখ যদি ভিপি নির্বাচিত হয়ে যায় তখন বড়দের রাজনীতি করা কঠিন হয়ে যাবে। এ ছাড়া ছাত্রলীগের নেতাদেরও সঠিক প্রস্তুতি আছে কি নেই, সেটা একটা প্রশ্ন! সুতরাং নির্বাচন হবে কি না হবে, তা নিয়ে সন্দেহ আছে যথেষ্ট। শেষমেশ নির্বাচন হলে নির্বাচনের মতোই হোক। না হলে না হোক।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হলে থাকেন মেহেদী হাসান। তিনি হলে ভোটের বিষয়ে বলেন, ‘হলে ভোট হলে অনেকেই ঝামেলা এড়াতে বিভিন্ন অজুহাতে হল ত্যাগ করতে পারেন। আমি নিজেও হলে থাকব কি না সেটা এখুনি বলতে পারছি না। তবে আমি ঝামেলা পছন্দ করি না। মা-বাবার অনেক ইচ্ছে আমি একদিন অনেক বড় হব। তারা যেকোনো ধরনের ঝামেলা এড়িয়ে চলতে বলেন। তবে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন নির্বাচনের পরিবেশ রাখবে বলে আমরা বিশ্বাস করি। আর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভোট কারচুপি হলে সাধারণ শিক্ষার্থীরা তা মেনে নেবে বলে মনে হয় না।’

ডাকসু নির্বাচন আসলেই কী হবে- এমন বিষয় নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের জ্যেষ্ঠ একজন নেতার সঙ্গে কথা হয়। কথা প্রসঙ্গে জানতে চাইলে নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘আমার কেন জানি মনে হয় নির্বাচন হবে না। নির্বাচন নিয়ে ছাত্রলীগের ভেতরেই মতানৈক্য আছে। কারা প্রার্থী হবে সেটা একটা ব্যাপার। নির্বাচন সুষ্ঠু হবে কি না হবে, সুষ্ঠু হলে ছাত্রলীগের জনপ্রিয়তা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে। নির্বাচন যদি শেষ পর্যন্ত হয়ই তখন কিছু ব্যাপার কিন্তু ক্ষমতাসীনরা অবশ্যই মাথায় রাখবে। যেমন যদি ভোটে ছাত্রলীগ জিততে না পারে তাহলে সেটা পুরো আওয়ামী লীগকে কতটা ক্ষতি করবে, সেটা আবার সরকার কতটা চাইবে। আর যদি ক্ষমতাসীনরা মনেই করে জনপ্রিয়তা দিয়েই জিততে পারবে তাহলে তো ভালো কথা। কিন্তু আমার কেন জানি মনে হয়, নির্বাচন হবে না।’

এদিকে ভোটকেন্দ্র একাডেমিক ভবনে করাসহ পাঁচটি দাবি জানিয়ে গতকাল রোববার দুপুরে উপাচার্যকে স্মারকলিপি দিয়েছে বামপন্থী ছাত্রসংগঠনগুলোর মোর্চা প্রগতিশীল ছাত্রজোট। এসব বিষয়ে জানতে চাইলে ছাত্র ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক লিটন নন্দী বলেন, ‘হলের বাইরে ভোটকেন্দ্র স্থাপনসহ আরো পাঁচটি দাবিতে ভিসিকে স্মারকলিপি দিয়েছি। দাবি না মানা হলে আমরা আন্দোলনে যাব আগামীতে। আন্দোলন নিয়ে আমরা কথা বলছি। নির্বাচন সুষ্ঠু না হলে আমরা তো মেনে নেব না। কয়েকটি সংগঠন আমাদের দাবির সাথে একমত। দেখা যাক আগামীতে কী ঘটে।’

Advertisement