Beta

‘ভয়ংকর বিশু’ থেকে ডিপজলের ‘চাচ্চু’ হয়ে ওঠার গল্প

০৩ অক্টোবর ২০১৯, ১৮:৪০ | আপডেট: ০৩ অক্টোবর ২০১৯, ১৮:৪৬

অভিনেতা মনোয়ার হোসেন ডিপজল। ছবি : শামছুল হক রিপন

‘আহো ভাতিজা আহো, তোমার আশায় বইসা থাকতে থাকতে গানবাজনা কইরাও সময় কাটতাছে না’ বা ‘অই তুই আমার নাম নিলি ক্যান? অজু করছিস? বিশুর নাম নিলে অজু করতে হয়, জানস না?’ অথবা ‘সানডে মানডে ক্লোজ কইরা দে’—এমন অসংখ্য ‘শ্রেণিহীন’ সংলাপ আজও মানুষের মানুষের মুখে মুখে। যাঁর মুখ দিয়ে এসব সংলাপ বেরিয়েছিল, তিনি মনোয়ার হোসেন ডিপজল।

অবশ্য নায়ক হয়ে চলচ্চিত্রে অভিষেক হয়েছিল ডিপজলের। প্রথম প্রথম অভিনয় করতে বেশ লজ্জাই পেতেন। খলনায়ক হয়ে বুকে কাঁপনধরা ভাবমূর্তি দাঁড় করিয়েছিলেন। পরে ‘ভয়ংকর বিশু’র সেই ভয় কাটাতেই কী না হয়ে উঠলেন আদরের ‘চাচ্চু’। বৈচিত্র্যপূর্ণ সিনেজীবন তাঁর। সম্প্রতি এনটিভি অনলাইনের সঙ্গে সিনেজীবন থেকে ব্যক্তিজীবনের গল্প ভাগাভাগি করেছেন এ অভিনেতা।

চলচ্চিত্র দুনিয়ায় দীর্ঘদিনই অনুপস্থিত ডিপজল। জানালেন, শারীরিকভাবে অসুস্থ ছিলেন। তা ছাড়া চলচ্চিত্রের পরিবেশও নাকি ভালো ছিল না। দূরে থাকার সেটাও একটা কারণ। অবশ্য তাঁর ভাষায়, এখন পরিবেশ ভালো হয়েছে। এ মাসের মাঝামাঝি থেকে পুরোদমে কাজ শুরু করবেন।

পারিবারিক ডাকনাম ‘ডিপু’। ‘ডিপজল’ সিনে-নাম। বড় ভাই শাহাদাত হোসেন বাদশার হাত ধরে বিনোদন দুনিয়ায় আসা। ১৯৯৩ সালে মুক্তি পাওয়া ‘টাকার পাহাড়’ ছবি দিয়ে অভিষেক। এ ছবিতে নায়ক ছিলেন। পরে ‘ভয়ংকর বিশু’ ছবিতে খলনায়কের চরিত্রে অভিনয় করে খ্যাতি পান। ‘আম্মাজান’ ছবির ‘কালাম’ চরিত্রটি তো আজও বুকে কাঁপন ধরায়!

প্রথম ছবির অভিজ্ঞতা? লাজুক ভঙ্গিতে থেমে থেমে ডিপজল বললেন, ‘আসলে ওই সময় তো লজ্জাই পাইতাম বেশি। এটা বাস্তব। কারণ প্রথম প্রথম, ছবি সম্পর্কে অভিজ্ঞতা কম ছিল, নতুন হলে যা হয়। তবে মোটামুটি ভালোই কাজ করেছিলাম। কষ্ট বুঝতাম না। ওখানে এসেই প্রথম কষ্ট অনুভব করলাম—কষ্ট কী জিনিস। ফিল্ম ইজি জিনিস না। ফিল্ম কষ্টের জিনিস। এটা বাস্তব।’ 

‘ভাইয়ের শত্রু ভাই’ ছবিতে ডিপজলের চরিত্রের নাম ছিল ‘বিটলা বিশু’। পরে বিশু, বিটলা বিশু ছাপিয়ে ডিপজল নামটিই সমগ্র বাংলাদেশে ছড়াল। মুখে মুখে ফিরতে শুরু করল তাঁর সংলাপগুলো। তাঁর অনেক ছবিতে ‘অশ্লীলতা’র অভিযোগ ছিল চলচ্চিত্রবোদ্ধাদের। খোলা সংলাপে, খোলা কথার গানে, খোলামেলা পোশাকে সয়লাব চলচ্চিত্র। ডিপজল নামটিই একটি বিশেষ চরিত্রে রূপ নিল। কেমন উপভোগ করতেন খলনায়কের ভূমিকা?

ডিপজলের ভাষায়, ‘আমি আসলে কোনো অভিনয়ে কোথাও খলনায়ক, কোথাও হিরো কোথায় কী, এসব নিয়ে চিন্তাও করিনি। আমি বাস্তবে অভিনয়টা নিয়েই চিন্তাভাবনা করেছি। কোনটা খল, কোনটা ভিলেন, কোনটা সহজ-সরল—ওইটা না। কাজটারে আমি বেশি প্রাধান্য দিতাম। অভিনয়, অভিনয় জিনিসটা... হিরো হিসেবে না। ভিলেন হিসেবে না। আমি অভিনয়টাকে ব্যক্তিগতভাবে পছন্দ করেছিলাম এবং কোনটা ভিলেন, কোনটা হিরো—সেটা আমার জানার ইচ্ছা নাই। আমি কাজ কইরা যাইতে চাই, ভালো-মন্দ যেটাই হোক যেন দর্শকের মন জোগাতে পারি। এইটা আমার বড় কাজ ছিল।’

দেখুন ভিডিওতে :

সংলাপ মুখে মুখে ফেরা প্রসঙ্গে ডিপজল বলেন, ‘যদি মন থেকে কোনো কাজ করেন, ব্যক্তিগতভাবে মন থেকে... যে আমি এই কাজটা করতে আসছি, এই কাজটা আমি মন থেকে করব। মন থেকে যে যেটাই করে সেটা অবশ্যই ভালো হওয়ার কথা। আমি যখন যে কাজই করেছি, মন থেকে করার চেষ্টা করেছি। এইজন্য ভিলেন, হিরো... আমি তিন টার্ম হিরো... প্রথমে আমি হিরো ছিলাম, এরপর ভিলেন, আবার এখন হিরো করছি। তাতে, যদি আপনি মন থেকে কাজ করেন, দর্শকের মন জোগাতে বেশিক্ষণ লাগবে না। আর যদি মন থেকে কাজ না করেন, তবে দর্শকও দূরে সেকেন্ডে সেকেন্ডে চলে যাবে। কাছে যেতে পারবে না।’

খলনায়কের ভূমিকায় থাকা ডিপজলের ছবিগুলোতে ‘গালিগালাজ’ থাকার অভিযোগ রয়েছে। সেগুলো উচ্চারণ করেছেন তিনিও। এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে জনপ্রিয় এ অভিনেতা বলেন, ‘গালাগালি... একটা হইলো... আপনি ইংলিশ ছবি দেখেন, গালাগালি ছিল। হিন্দি ছবি দেখেন, গালাগালি ছিল। ভিলেন মানেই একটু ব্যতিক্রম, ভিলেন মানে... করতে হইলে একটু গালাগালি, অশ্লীল থাকে। বাট ওই অশ্লীল না... হ্যাঁ, অশ্লীল আমার যেগুলো, আমি ব্যক্তিগতভাবে যেগুলো করেছিলাম... আমার মনে হয় না খারাপ কোনোকিছু। ওইটা যদি কাউন্টার হিসেবে ধরেন, মনে হয় যে খারাপ লাগবে না।’

তবে কথিত সেই অশ্লীল যুগের অবসানেও ভূমিকা রেখেছিলেন ডিপজল। বলেন, “অশ্লীল ছবি যেটা আগে একসময় ছিল বাংলাদেশে... আমি যখন আবার নতুন করে স্টার্ট করি—‘আম্মাজান’, ‘কোটি টাকার কাবিন’, ‘পিতার আসন’, ‘দাদীমা’, ‘চাচ্চু’... আমি ভালোর বাজার ফিরিয়ে এনেছিলাম। এখন আবার বাজার নেই বললেই চলে।” তবে একটি ভালো সিনেমা নির্মাণ করছেন ডিপজল। ‘সৌভাগ্য’ ছবিতে তাঁর সঙ্গে জুটি বেঁধেছেন চিত্রনায়িকা মৌসুমী। তিনি এ ছবিটি দেখার জন্য সিনেপ্রেমীদের অনুরোধ জানান।

দেশে ডিপজলের প্রিয় খলনায়ক মিশা সওদাগর। আর দেশের বাইরে ভারতের বর্ষীয়ান অভিনেতা নানা পাটেকার।

চলচ্চিত্রে ডিপজলকে দুই রূপে দেখেছেন দর্শক—একটি ভয়ংকর, অন্যটি হৃদয়বান। ব্যক্তিজীবনে কেমন ডিপজল, সেই উত্তরও দিলেন। হেসে বললেন, ‘ব্যক্তিজীবনে আমি ডিপজল... কারো সাথে আমি কোনোদিন গালাগালিও করি নাই, কারো সাথে আমার ঝগড়াও হয় নাই। আমি ডিপজল ভিন্ন, অন্য দশজন থেকে ভিন্ন, মন-মানসিকতা ভিন্ন; আর ঝগড়া করব... বাইরে চলারও অভ্যাস নাই, বাহিরে কোনো হোটেল-রেস্টুরেন্টে যাইয়া খাইয়া হৈহুল্লোড় কোনোদিন করি নাই আর করার মন-মানসিকতাও হয় নাই।’

অভিনয়ের বাইরে সামাজিক কর্মকাণ্ডের জন্যও বেশ নামডাক আছে ডিপজলের। তবু বিনয়ের সঙ্গে বললেন, এখন তেমন কর্মকাণ্ড নেই। মসজিদ-মাদ্রাসা-এতিমখানায় সহযোগিতা করে যাচ্ছেন। যতদিন বেঁচে থাকবেন তাঁর সাহায্যের হাত অবারিত থাকবে, এই প্রতিশ্রুতি দিলেন জনপ্রিয় এ অভিনেতা।

বাংলা ছবির দর্শকের প্রতি ডিপজলের অনুরোধ, তাঁরা যেন বাংলাদেশের সিনেমা দেখেন। আক্ষেপ করে তিনি বলেন, মানুষ এখন হিন্দি চলচ্চিত্রের দিকে ঝুঁকেছেন। তাঁর অনুরোধ, ‘বাংলা ছবি দেখেন। বাংলা ভালোবাসেন। বাংলাকে নিয়ে থাকেন। বাংলা আমাদের মাতৃভাষা। এর পাশে যদি থাকেন, ইনশাআল্লাহ ভালো কিছু পাবেন।’

Advertisement