Beta

স্মরণ

পৃথুলা রশিদ : আমাদের ‘ওয়ান্ডার ওম্যান’

১৪ মার্চ ২০১৮, ১৬:২৮ | আপডেট: ১৪ মার্চ ২০১৮, ১৬:৫০

ফাইয়াদ বিন খালিদ

৫ সেপ্টেম্বর ১৯৮৬। জার্মানির ফ্রাঙ্কফুর্ট থেকে আকাশে ডানা মেলে রওনা করেছে প্যান অ্যামের বিশাল বোয়িং বিমান, গন্তব্য মুম্বাই। মাঝ আকাশে যখন ফ্লাইট ৭৩, হঠাৎই চার ব্যক্তি মুখোশে মুখ ঢেকে বন্দুকের ভয় দেখিয়ে জিম্মি করল বিমানে থাকা ৩৭৯ যাত্রীকে। জঙ্গিদের তরফ থেকে ঘোষণা এলো আমেরিকান নাগরিকদের বাছাই করে তাদের হাতে তুলে দিলেই মিলবে মুক্তি। উৎকণ্ঠা আর শঙ্কায় ভর করে বোয়িং ৭৪৭-১২১ মাঝ আকাশে উড়তেই থাকল।

১২ মার্চ  ২০১৮। হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে নেপালের উদ্দেশে রওনা হয়েছে ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সের একটি যাত্রীবাহী বিমান। ফ্লাইট বিএস২১১ ল্যান্ড করার প্রস্তুতি  নিচ্ছিল  কাঠমান্ডুর ত্রিভুবন বিমানবন্দরের ২০ নম্বর রানওয়েতে। কিন্তু বিমানবন্দরের কন্ট্রোল রুম থেকে জানা গেল, ওই রানওয়েতে ট্রাফিক রয়েছে, নামতে হবে অন্য কোনো রানওয়েতে। দিশেহারা পাইলট সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগেই পাশের ফুটবল মাঠে আছড়ে পড়ল বোমবার্ডিয়ার ড্যাশ ৮ কিউ৪০০ বিমানটি। মুহূর্তেই আগুনের লেলিহান শিখায় ছেয়ে গেল উড়োজাহাজটির এ মাথা থেকে ও মাথা।

প্যান অ্যামের বিমান সেবিকা নীরজা ব্যানোট। দাম্পত্য জীবনটা খুব একটা সুখী হয়নি তাঁর। তাই তো মন দিয়েছেন বিমানে। মাত্র ২৩ বছর বয়সেই নিয়মিত উড়ছেন আকাশপথে। কিন্তু এতবড় বিপদে আগে কখনই পড়েননি নীরজা। ভারতীয় তরুণীর তখন চাওয়া একটাই, যে করেই হোক বাঁচাতে হবে নিরীহ যাত্রীদের। শেষমেশ বাঁচিয়েছেন ৩৫৯ জনের প্রাণ। কিন্তু নিজের প্রাণপাখিটা উড়ে গেল দেহখাঁচা ছেড়ে, তাঁর সঙ্গে প্রাণ হারিয়েছেন আরো ২০ জন। আহতের সংখ্যাটাও কম নয়, গুনে গুনে একশজন। বিমানটা আর মুম্বাই যায়নি সেদিন। সব যাত্রীকে নিয়ে লাহোরেই অবতরণ করে  বোয়িং ৭৪৭-১২১। 

নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকটা শেষ করা পৃথুলা রশিদের ছিল আকাশে ওড়ার আকাশচুম্বী স্বপ্ন। ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সের প্রথম নারী পাইলট হিসেবে যোগদান করে সে স্বপ্নে দিয়েছিলেন নতুন মাত্রা। কো-পাইলট হিসেবে মঙ্গলবার পৃথুলাও ছিলেন বিমানে।

আগুনটা তখন ছড়িয়ে পড়ছে পুরো উড়োজাহাজটায়। পৃথুলা চাইলেই পারতেন বিমান থেকে বেরিয়ে নিজের প্রাণটা বাঁচাতে। কিন্তু তা করবেন কেন তিনি? এতগুলো জীবনে তাঁর সামনে শেষ হয়ে যাবে? না পুরো বিমানের সবাইকে বাঁচাতে পারেননি তিনি। ১০ নেপালিকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে আরো জীবন বাঁচানোর চেষ্টায় ছিলেন পৃথুলা। যেন চলচ্চিত্রের খোলস ছেড়ে ত্রিভুবন বিমানবন্দরে হাজির হয়েছেন ওয়ান্ডার ওম্যান।

বাংলাদেশি তরুণীর আত্মত্যাগে ওই ১০ নেপালি মৃত্যুকূপ থেকে ফিরেছেন সুস্থভাবেই। তবে শেষতক পৃথুলাই পারলেন না বাঁচতে।

ভারত নীরজাকে আজও স্মরণ করে। বলিউডে চলচ্চিত্রও বেরোয় কর্তব্যপরায়ণ এই রমণীকে নিয়ে। অথচ নীরজা কিন্তু অমনটা ভেবে জীবনটা দেননি সেদিন। পৃথুলাকে নিয়ে যখন এই লেখাটা এগোচ্ছে, তারও কোনো উদ্দেশ্য ছিল না সবার ফেসবুক টাইমলাইনে কিংবা গাদা গাদা প্রবন্ধের মূল চরিত্র হওয়ার।

তবুও লিখতে হয় এই বৈমানিকের কথা। বীরদের বীরত্বগাথা স্বর্ণাক্ষরে টাঙিয়ে রাখতে হয় ইতিহাসের দেয়ালে দেয়ালে। ‘ওয়ান্ডার ওম্যান’ চলচ্চিত্রের কাল্পনিক চরিত্র যখন বাস্তবে আবির্ভূত হন, তখন বিস্ময়ের সঙ্গে ধন্যবাদটাও দিতে হয়।

ধন্যবাদ পৃথুলা, ধন্যবাদ ‘ডটার অব বাংলাদেশ’!         

Advertisement