Beta

কেসিসি নির্বাচন

বন্দরে নৌকা, জাতীয় নির্বাচনে ঢেউ

১৬ মে ২০১৮, ১১:৩৬ | আপডেট: ১৭ মে ২০১৮, ০৮:৫৯

মনিরুল ইসলাম মিন্টু

তালুকদার আবদুল খালেক। নিঃসন্দেহে একজন পরীক্ষিত নেতা। এ জয় তাঁর প্রাপ্যই ছিল। ছাত্ররাজনীতি থেকে শুরু করে ওয়ার্ড কাউন্সিলর, এরপর ধাপে ধাপে আজকের এই পর্যায়ে। চারবারের সংসদ সদস্য এবং একবার প্রতিমন্ত্রী। এর আগেও তিনি খুলনার সফল মেয়র।

আপাতদৃষ্টিতে এই নির্বাচন সুষ্ঠু হয়েছে। কারণ, বড় কোনো গোলযোগের খবর গণমাধ্যমে আসেনি। মাত্র তিনটি কেন্দ্রে ভোট স্থগিত হয়েছে। ২৮৬ কেন্দ্রের ঘোষিত ফল অনুযায়ী, আওয়ামী লীগের তালুকদার আবদুল খালেক পেয়েছেন এক লাখ ৭৬ হাজার ৯০২ ভোট। অন্যদিকে বিএনপির নজরুল ইসলাম মঞ্জু ধানের শীষ প্রতীকে পেয়েছেন এক লাখ আট হাজার ৯৫৬ ভোট। ব্যবধানও কম নয়, ৬৭ হাজার ৯৪৬ ভোট। তবে ভোটারদের ভয়ভীতি প্রদর্শন, জাল ভোট দেওয়া থেকে শুরু করে বিএনপির প্রার্থীর এজেন্টদের বের করে দেওয়ার মতো ঘটনাগুলো শুধু এই নির্বাচনকেই প্রশ্নবিদ্ধ করল না, গত কয়েকটি নির্বাচন সুষ্ঠু করেছেন এমন দাবি করা কমিশনের নিরপেক্ষতা এবং সক্ষমতাকে নতুন করে প্রশ্নবিদ্ধ করল। 

এখানে হয়তো নির্বাচন কমিশনের শতভাগ চেষ্টা ছিল সুষ্ঠু ভোট করার, কিন্তু তারা পারেনি। তারা ব্যর্থ কেন? অবশ্য কমিশনের দাবি ভোট সুষ্ঠু হয়েছে। কেউ কেউ হয়তো বলবেন, দু-চারটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা। আর ভোটের ব্যবধানও তো কম নয়। স্থানীয় সরকার নির্বাচনে সরকার পরিবর্তন হয় না বটে, তবে দেশে যে একটি সংকট চলছে, তা উত্তরণের একটি সিঁড়ি হিসেবে বিবচেনা করা হচ্ছিল এই সিটি করপোরেশন নির্বাচনকে, তবে তা গতকাল একটু হোঁচট খেল নিশ্চয়! 

দেশে ভয়ভীতির নির্বাচনের যে সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে, তাকে হয়তো আরো সমৃদ্ধ করবে এই নির্বাচন। নির্বাচনের সংবাদ সংগ্রহকালে একটি বিষয় সত্যিই আমাকে হতাশ করেছে, সেটি হলো আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অসহায় ভূমিকা। ২৮৯টি কেন্দ্রের নয়, তবে মোটাদাগে বলতে গেল সরকারি দলের নেতাকর্মীদের অবৈধভাবে কেন্দ্রে প্রবেশ কিংবা বের হতে বাধা দেয়নি তারা। শুধু যে মেয়র প্রার্থীর সমর্থকরা এসব কাজ করেছে, তা নয়; কাউন্সিলর প্রার্থীর সমর্থকরা বেশির ভাগ জায়গায় ভয়ভীতির পরিস্থিতি সৃষ্টি করে। 

আরেকটা ঘটনার কথা না বললেই নয়। দুপুর তখন ১টা বাজে। জাল ভোট পড়ছে কয়েকটি কেন্দ্রে এমন সংবাদের ভিত্তিতে খুলনা রূপসা থেকে লবণচরার দিকে যাব। স্থানীয় এক সাংবাদিকের সঙ্গে ছিলাম মোটরসাইকেলে। স্থানীয় মানুষ তাই ঝুঁকি নিলেন না। আমাকে বারবার অনুরোধ করলেন, সামনে এগোলে ঝামেলা হতে পারে। অগত্যা আমাকে বিকল্প চিন্তা করতে হলো। একজন রিকশা করে যাচ্ছেন, তাঁকে অনুরোধ করলাম সঙ্গে নেওয়ার জন্য। অল্প সময়ের পরিচয়ে জানা গেল, তিনি বিএনপি সমর্থক, কিন্তু ভোট দিতে যাননি ঝামেলা এড়ানোর জন্য।   

যা হোক, তালুকদার আবদুল খালেকের এই বিজয় বিশ্লেষণের দাবি রাখে। নানা সমস্যা এই খুলনা নগরীতে। উন্নয়নের প্রয়োজনে মানুষ যেমন সবার বিকল্প হিসেবে তালুকদারকে চেয়েছেন, তেমন বিএনপিও তাদের সাংগঠনিক দক্ষতা দেখাতে ব্যর্থ হয়েছে। ২০১৩ সালে পাঁচটি সিটি করপোরেশনেই বিএনপি জয়লাভ করে। কিন্তু তাদের মেয়রদের দায়িত্ব পালনকালে সাড়ে চার বছরে অনেকটা সময় জেলে কাটাতে হয়েছে অথবা তাঁদের স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় বরখাস্ত করেছে। এ ক্ষেত্রে সরকারের সঙ্গে যুক্ত হয়ে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই তারা ব্যর্থ। ফলে কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন হয়নি। সেই হতাশা ছিল খুলনার মানুষদেরও। আগামীর রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, অর্থাৎ ক্ষমতাসীন দল না থাকলে উন্নয়ন হয় না এমন একটি উদাহরণ বাংলাদেশে প্রতিষ্ঠিত। বিএনপির জনসমর্থন থাকলেও এক ধরনের হতাশা তৈরি হয়েছে দলটির প্রতি। এবার নতুন ভোটার ছিল ৫২ হাজার। হয়তো সেই তরুণ প্রজন্মকে বিএনপি আকৃষ্ট করতে পারেনি। 

বিএনপির আটজন কাউন্সিলর ছিলেন, যাঁরা নানা কারণে দলের প্রতি অসন্তুষ্ট ছিলেন, তাঁরা প্রচার-প্রচারণার শুরুতেই তালুকদার খালেককে সমর্থন দেন। স্থানীয় সাংবাদিকদেরও নজর কাড়তে পেরেছিলেন তালুকদার খালেক। ভোট গ্রহণের শুরুতেই যখন নজরুল ইসলাম মঞ্জু  ৩০টি কেন্দ্রের এজেন্ট বের করে দেওয়ার অভিযোগ করেন, তা ঢালাও অভিযোগের অংশ মনে হলেও এর সত্যতার প্রমাণ মেলে। কেন্দ্রগুলোতে ঘুরে বিএনপির এজেন্টদের পাওয়া যায়নি। সকালে ভোটকেন্দ্রগুলোতে যে ভোটার উপস্থিতি ছিল, সাম্প্রতিক নির্বাচনগুলোতে তা দেখা যায়নি। সকাল থেকে নানা ধরনের গুজব ছিল। কিন্তু বেলা ১১টার পর থেকেই যেন পরিস্থিতি বদলে যেতে শুরু করে। 

এ নির্বাচন আওয়ামী লীগ হয়তো তাদের দলীয় বিজয় হিসেবে দাবি করে  সরকারের জনপ্রিয়তার প্রমাণ হিসেবে জাহির করার চেষ্টা করবে। আমি আগেই বলেছি, ব্যক্তি তালুকদার খালেক খুলনাবাসীর কাছে অনেক জনপ্রিয়। তবে ব্যক্তি খালেকের জনপ্রিয়তার সঙ্গে ভোটারদের ভয়ভীতি  প্রদর্শন, জাল ভোট, নৌকা প্রতীক এবং বিএনপির প্রতি মানুষের আস্থাহীনতাও যুক্ত করতে হবে।

গাজীপুর সিটি নির্বাচন স্থগিত হওয়ায় জনমনে একটা বিরূপ ধারণা তৈরি হয়েছিল। অবশ্য আগামী ২৬ জুন নির্বাচনের পরবর্তী তারিখ ঘোষণা করা হয়েছে। সেখানে যেন খুলনার মতো ঘটনা, সেটা যত ছোটই হোক, না ঘটে, সেদিকে লক্ষ রাখতে হবে। 

লেখক : সংবাদকর্মী

ইউটিউবে এনটিভির জনপ্রিয় সব নাটক দেখুন। সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের চ্যানেলটি:

Advertisement