Beta

অভিমত

সড়কের দায়িত্ব মৃত্যুদূতের হাতে

৩০ জুলাই ২০১৮, ১১:৩২ | আপডেট: ৩০ জুলাই ২০১৮, ১১:৪৭

যমদূত তাঁর ওপর অর্পিত মানুষের জীবনপ্রদীপ নির্বাপণের দায়িত্ব পালন করতে বিশ্বের কোথায় সবচেয়ে বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন? এককথায় উত্তর হবে, বাংলাদেশের উন্নয়নের মহীসোপানে থাকা সড়কপথটাই তাঁর আয়েশে কাজ করবার নিখুঁত জায়গা। দেশের মহাসড়ক থেকে প্রতিদিন অগণন মানুষের জানকবচ করবার এমন সহজ সুবিধা বিশ্বের আর কোথাও নেই। আর আমরাও কি দারুণভাবে নাকে সরষে তেল মেখে ঘুমাচ্ছি, সবই ঈশ্বরের ইচ্ছে বলে! মানুষ কি আসলেই এতটা নির্বিকার, ভাবলেশহীন, দায়িত্ববিবর্জিত হতে পারে আমার এই প্রাণের বাংলাদেশ ছাড়া? এখানে সবকিছুর দাম চড়া, সস্তা শুধু মানুষের অমৃত প্রাণ। কত অপঘাতে যে আমরা রোজ মরি,পঙ্গু হই, সড়ক দুর্ঘটনা ওই অপঘাতের বড় অনুষঙ্গ।

সাম্প্রতিককালে দেশের সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ে ব্যাপকভিত্তিক সরগরম আলোচনা হচ্ছে। দুই বাসের পাল্লাপাল্লির খেলায় পড়ে ঝুলে থাকা রাজীবের হাত কিংবা আহত যাত্রী পায়েলকে ব্রিজ থেকে ছুড়ে ফেলে খুন করবার ঘটনাগুলো যেকোনো বিবেকবান মানুষই তাঁর মগজের নিউরণ থেকে শতচেষ্টাতেও মুছতে পারবে না। সেই রেশ কাটতে না কাটতে আবার দুর্ঘটনা, আবার আহাজারি, আবার ক্রন্দন! রাস্তা, মোটরযান বা চালক্দের যাদের দেখভাল করবার কথা এসব কি তাদের হৃদয়ে খানিকটাও রেখাপাত করে না?   

এবার রাজধানীর বিমানবন্দর সড়কে র‍্যাডিসন হোটেলের সামনে জাবালে নূর পরিবহনের দুই বাসের ঠোকাঠুকির খামখেয়ালিতে পড়ে ওদেরই এক বাসের ধাক্কায় দুজন শিক্ষার্থী নিহত হলেন। এ ঘটনায় আহত হন আরো বেশ কয়েকজন। ঘটনার পর পরই উত্তেজিত জনতা বেশ কয়েকটি গাড়ি ভাঙচুর করে তাদের সাময়িক ক্রোধ প্রশমন করে। যে দুজন নিহত হয়েছেন তারা হলেন শহীদ রমিজ উদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট কলেজের দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী আবদুল করিম রাজীব ও একাদশ শ্রেণির দিয়া খাতুন মিম।

আমরা কি টের পাই রাজীব ও মিমের পরিবারে কতটা শোক নেমে এসেছে। একজন মানুষের জন্ম থেকে বেড়ে ওঠা পর্যন্ত কত সুখের গল্প, কত বিস্ময়কর স্মৃতি, এক নিমেষে এক দুর্ঘটনায় সব শেষ করে দেওয়া হলো। এখানকার সড়কমন্ত্রী বা এই নির্বিকার রাষ্ট্রের তরফে কোনো সান্ত্বনাবাণীও থাকে না এসব ভুক্তভোগী পরিবারের প্রতি। যদিও সান্ত্বনা বা হাজার ক্ষতিপূরণেও হারিয়ে ফেলা আদরের সন্তান বা প্রিয় স্বজনের পরিপূরক হবে না কখনই। সব দোষ চালকের ওপর চাপিয়ে দিয়ে আমরা সোশ্যাল অ্যাক্টিভিস্ট, নেটিজেন, মিডিয়াকর্মী, সমাজচিন্তক বা নীতিনির্ধারকরা কয়েক ঘণ্টার মধ্যে দুর্ঘটনার কারুণ্যগাঁথার বিষয়টি বেমালুম ভুলে বসে থাকব। কোথাও কোনো প্রতিবাদ, দ্রোহ বা বিপ্লব কিচ্ছু হবে না। কেউ আলাপ করবে না, কীভাবে সড়ক ব্যবস্থাপনার ভয়ংকর অধঃপতন থেকে বাংলাদেশকে এবং এ দেশের নিরীহ মানুষকে রেহাই দেওয়া যায়।

বাংলাদেশে রোজ দুর্ঘটনায় মানুষ প্রাণ হারাচ্ছে এবং মারাত্মক আহত হয়ে পঙ্গুত্ব বরণ করছে। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় বা বুয়েটের দুর্ঘটনা গবেষণা প্রতিষ্ঠান এআরআই-এর ২০১৭ সালের হিসেব বলছে, গত দশ বছরে বাংলাদেশে ২৯ হাজার ৪৩২টি সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছে প্রায় ২৬ হাজার ৬৮৬ জন। এ সময় আহত হয়েছেন অপর সাড়ে ২১ হাজার জন। দুর্ঘটনা বেশিরভাগই ঘটনাস্থলেই মারা যান। যাঁরা মারাত্মক আহত হন, তাঁদের সময়মতো চিকিৎসালয়ে না নিতে পারা কিংবা ডাক্তারদের শিডিউল না মেলায় যথাসময়ে চিকিৎসা শুরু করতে না পারায় মারা যান অনেকেই। অপচিকিৎসায় পঙ্গুত্ববরণকারীদের সংখ্যাও কম নয়।

বরাবর এসব দুর্ঘটনার জন্য প্রায় এককভাবে চালকদের দায়ী করা হয়। মালিকের লোভ, ফিটনেসবিহীন গাড়ি, বিআরটিএর লাগামছাড়া দুর্নীতি, সড়ক নির্মাণকারীদের স্বার্থগন্ধযুক্ত গাফিলতি এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থার অসাধু সদস্যের ভুলও যে এসব দুর্ঘটনার জন্য সমভাবে দায়ী এসব কথা কেউ বলেন না। যে প্রকৌশলী ভুলভাল ডিজাইনে বাঁক রেখে রাস্তা বানান তাদের জবাবদিহি করতে হয় না, যেই মালিক নিজের লোভের জন্য ফিটনেসবিহীন গাড়ি রাস্তায় চালান এবং চালক ও তাদের সহকারীদের বিনা বিশ্রামে ২৪ ঘণ্টা ডিউটি করান সেসব মালিকদের কোনো বিচার হয় না। সব দোষ গিয়ে পড়ে ঘুরেফিরে ওই নন্দঘোষ চালকের ওপর। অথচ ওই চালকটি স্বাক্ষরজ্ঞানসম্পন্ন না হলেও কেবল রাস্তার গরু-ছাগল চিনতে পারলেই তাদের আমরা লাইসেন্স সরবরাহ করতে পেরেছি। একটি গাড়িতে সমাজের সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে গণ্যমান্য জ্ঞানীগুণীরা যাতায়াত করেন। যাদের চিন্তায় দেশ এগিয়ে যেতে পারে, এমন মানুষ রোজ ভ্রমণ করেন। সমাজের সেই প্রয়োজনীয় মানুষকেই কি না একজন অযোগ্য চালক, একটি ত্রুটিপূর্ণ গাড়ি কিংবা বাজে সড়ক খুব সহজেই মৃত্যুদূতের কাছে পৌঁছে দিতে পারে।

এই পোড়াদেশে আইনও যথার্থভাবে প্রয়োগ করা মুশকিল। সবাই যার যার স্বার্থের দ্বন্দ্বে ব্যস্ত। এখানে মানবিকতা, সুকর্ম বা সুচিন্তার জন্য কোনো প্রশংসা মেলে না। কেবল বৈধ অথবা অবৈধ উপায়ে অর্জিত অর্থই মানুষের গুণকীর্তনের জন্য যথেষ্ট। আমরা ইতোপূর্বে দেখেছি মানিকগঞ্জে সড়ক দুর্ঘটনায় চলচ্চিত্রকার তারেক মাসুদ ও সাংবাদিক মিশুক মুনীরসহ পাঁচজন নিহত হওয়ার ঘটনায় ২০১৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে বাসচালক জামির হোসেনকে উচ্চ আদালত কর্তৃক যাবজ্জীবন কারাদণ্ডাদেশ দেওয়ার প্রতিবাদে ১০ জেলার শ্রমিক ফেডারেশনের কর্মীরা মহাসড়ক কয়েক দিনব্যাপী বন্ধ করে রাখে। এমন পরিস্থিতিতে পরিবহন মালিক, সড়ক প্রকৌশলী বা দুর্নীতিবাজ বিআরটিএ কর্মীদের বিরুদ্ধেও যদি শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয় তারাও সাধারণ মানুষকে ধর্মঘটের শাস্তি দেবেন। অপচিকিৎসা-সংক্রান্ত জটিলতায় প্রায়শ আমরা সরকারি ডাক্তারদেরও কর্মবিরতি পালন করে রোগীদের মারাত্মক বিপাকে ফেলতে দেখি। সকল পেশাজীবী এবং সাধারণ জনমানুষের সচেতনতা বৃদ্ধি করে বিবেকবোধ যদি জাগানো না যায় কোনো আইন, নীতি আর শাস্তিমূলক ব্যবস্থার ভয় দেখিয়েও কিছু লাভ হবে না।

এশিয়ায় খারাপ রাস্তার দিক দিয়ে আমরা প্রথম। সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানির দিক দিয়ে আমরা বিশ্বে ১৩তম। এসব পরিসংখ্যান থেকে আমরা যদি উনিশ-বিশও হই তাতে কি? এই দেশে যানবাহনের ওভারস্পিড চলবে, ওভারটেকিং চলবে, যানবাহন ও রাস্তার ত্রুটিও থাকবে, মদ্যপান করেও বড়লোকের ছেলে অথবা প্রান্তিক ট্রাকচালকরা গাড়ি চালাবেন। সেইসঙ্গে পাল্লা দিয়ে চলবে সরকারি নীতিনির্ধারণী তরফে পরিকল্পনাহীনতা এবং সমন্বয়হীনতা। থাকবে তদারকির অভাব ও চরম গাফিলতি।

অতএব, আমরা রোজ কাঁদব। ব্যথায় কুঁকড়ে উঠব। প্রাণের সন্তান বা প্রিয় স্বজনেরা অসময়ে অপঘাতে আমাদের কাছ থেকে না ফেরার দেশে চলে যাবেন। বিচ্ছেদব্যথার ট্র্যাজেডি বয়ে বেড়াব জীবনভর। পঙ্গুত্বের অভিশাপ বরণ করে তিল তিল করে অনুভব করতে থাকব এইদেশে জন্ম নেওয়ার নিদারুণ সাধ। কারণ আমরা মৃত্যুদূতের হাতেই সমর্পণ করে রেখেছি দেশের সড়ক যোগাযোগ!

লেখক : সংবাদকর্মী, মাছরাঙা টেলিভিশন।

ইউটিউবে এনটিভির জনপ্রিয় সব নাটক দেখুন। সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের চ্যানেলটি:

Advertisement