Beta

স্মরণ

বাচ্চু চ্যালেঞ্জ নিতে জানত

১৮ অক্টোবর ২০১৮, ১৪:৫৭ | আপডেট: ১৮ অক্টোবর ২০১৮, ১৬:০৪

শহীদ মাহমুদ জঙ্গী
আইয়ুব বাচ্চুর সঙ্গে শহীদ মাহমুদ জঙ্গী। ছবি: সংগৃহীত

[বাংলা ব্যান্ড সঙ্গীতের কিংবদন্তিতুল্য শিল্পী আইয়ুব বাচ্চু মারা গেছেন আজ বৃহস্পতিবার। এ ঘটনার পর এনটিভি অনলাইনের অনুরোধে সাড়া দিয়ে একটি স্মৃতিচারণমূলক লেখা তৎক্ষণাৎ তৈরি করে দেন শহীদ মাহমুদ জঙ্গী। যারা আশি ও নব্বইয়ের দশকে ব্যান্ড সঙ্গীতের জোয়ার কাছ থেকে দেখেছে তারা জানেন শহীদ মাহমুদ জঙ্গী ব্যান্ড সঙ্গীতের দুনিয়ায় তুমুল জনপ্রিয় এক গীতিকার। শুধু তাই নয়, মনে করা হয় তিনি বাংলা ব্যান্ড সঙ্গীতের ইতিহাসের এক অমূল্য স্বাক্ষী। তিনি লিখেছেন শুধু এনটিভি অনলাইনের জন্য।– ফিচার এডিটর]

আশির দশক। বাচ্চু একেবারেই তরুণ। ওই বয়সেই গিটারে অনবদ্য। সোলসে বাজাত। সোলসের মূল সুরকার তখন নকীব খান। একসময় নকীব ঢাকা চলে আসে। এখন সুর করবে কে? বাচ্চুকে বলা হলো। বাচ্চুকে সবাই মিলে উৎসাহিত করলাম। গান দিলাম, সুর করার জন্য। বাচ্চু চ্যালেঞ্জটা নিল এবং খুব ভালোভাবে উৎরে গেল।

বাচ্চু তখন অল্পস্বল্প ইংরেজি গান করত, বাচ্চুকে বললাম , “তুমি বাংলা গান কর না কেন? নিয়মিত বাংলা গান করো, বাচ্চু বলেছিল, ‘আমি কি গাইতে পারব?’ আমি বলেছিলাম অবশ্যই পারবে এবং তাকে গাওয়ার জন্য ‘হারানো বিকেলের গল্প বলি’ গানটি লিখে দিলাম, বাচ্চু চ্যালেঞ্জটা নিল এবং সফল হলো।”

বিটিভিতে ব্যান্ড শো। প্রথম শ্রেণির সব ব্যান্ড গান করবে। তপন নাই। কে গাইবে? বাচ্চুকে গাইতে বলা হলো , বাচ্চুর প্রশ্ন, ‘পারব তো?' আবার সবাই  মিলে উৎসাহ দিলাম, এবারও বাচ্চু চ্যালেঞ্জটা নিল। আমার লেখা ‘একদিন ঘুম ভাঙ্গা শহরে’ গানটি ঘষামাজা করলাম। ব্লু নাইল হোটেলের সম্ভবত ২১ নম্বর রুমে, সন্ধ্যা থেকে বাচ্চু পার্থকে নিয়ে বসল, পার্থ তখন সোলসে কিবোর্ড বাজাত। সারারাত গানটির মিউজিক করল এবং সকালের দিকে মিউজিক আয়োজন শেষ করে, বিন্দু মাত্র না ঘুমিয়ে বিটিভিতে গিয়েছিল রেকর্ডিং করতে। সোলস ওই অনুষ্ঠানে ভালো অবস্থানে তো ছিলই, একই সাথে এই গানের মাধ্যমে ব্যান্ড গায়কীতে বাচ্চুর সফল উত্তরণ ঘটেছিল।

সোলস তখন তুঙ্গে, হোটেল ব্লু নাইলে সোলেসের সভা চলছে, একসময় বাচ্চু বেরিয়ে এলো, সিঁড়িতে দেখা, কিছুটা বিষণ্ণ, বলল, “ভাই , সোলস ছেড়ে দিলাম। 'এক দিন ঘুম ভাঙ্গা শহরে' গানটি সোলস থেকে চেয়ে নিলাম।” আমি তাকে জড়িয়ে ধরে কুন্দন রেস্তোরাঁয় বসালাম। আমাদের টেবিলে বন্ধু শহীদুল হক এসে যোগ দিল। বাচ্চুকে সান্ত্বনা দিয়ে বললাম, তুমি জেনুইন মিউজিশিয়ান তোমার চিন্তা কী? তুমি নতুন ব্যান্ড করো, বাচ্চুর সেই একই প্রশ্ন ‘আমি কি পারব ভাই?’ জবাবে বললাম অবশ্যই পারবে। আরো অনেক কথা হলো। বাচ্চু চ্যালেঞ্জ নিল এবং ফলাফল সবার জানা । এলআরবির প্রথম গানও ছিল ‘একদিন ঘুম ভাঙ্গা শহরে’।

বাচ্চু চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করত এবং সফল হতো। কীভাবে কীভাবে জানি তার চ্যালেঞ্জ গ্রহণের প্রতিটি বাঁকে কিছুটা হলেও জড়িত ছিলাম।

এই সেদিন এলআরবির ২৫ বছর পূর্তি উৎসবের সময় আমি আমেরিকায়, বাচ্চু ফোন করে বলল, আসতে হবে। অনুষ্ঠানের দিন দেশে এসেই এলআরবির অনুষ্ঠানে গেলাম। অনুষ্ঠানে সঙ্গীত জগতের তেমন কাউকে না দেখে বাচ্চুকে জিজ্ঞেস করলাম, কেউ আসে নাই কেন? তুমি বলো নাই?

বাচ্চু বলল, ‘একমাত্র আপনাকে বলেছি।’

প্রশ্ন করলাম, মিউজিক ইন্ডাস্ট্রির আর কাউকে বলো নাই কেন?

বাচ্চু জবাবে বলেছিল, ‘আপনি মুরুব্বি আপনার কথা আলাদা, কিন্তু অন্যরা প্রায় সবাই আমার সমসাময়িক, তাদের বলতে হবে কেন? তাদের এমনিতেই আসা উচিত।’

এই হচ্ছে বাচ্চু , আশা আর ভালোবাসা নিয়ে পথ চেয়ে থাকা একজন মানুষ। এই ভালোবাসা, এই আবেগ বাচ্চুর গানকে অবিনশ্বর করেছে।

লেখক : গীতিকার

ইউটিউবে এনটিভির জনপ্রিয় সব নাটক দেখুন। সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের চ্যানেলটি:

Advertisement