Beta

নতুন বছরে নতুন সরকারের সমীকরণ

০১ জানুয়ারি ২০১৯, ১৩:১৩

ড. সুলতান মাহমুদ রানা

নানা সমীকরণের মধ্য দিয়ে একটি বছর শেষ হয়ে শুরু হলো নতুন একটি বছর। ২০১৮ সালের শুরু থেকে শেষ এবং ২০১৯ সালের শুরুটা মূলত বাংলাদেশের নির্বাচনী রাজনীতিকে প্রতিনিধিত্ব করেছে এবং করছে। নতুন বছরের শুরুতেই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে টানা তৃতীয়বারের মতো নতুন সরকার গঠিত হবে। কে বা কারা স্থান পাচ্ছেন নতুন মন্ত্রিপরিষদে, এসব প্রশ্ন জনগণের মনে জাগতে শুরু করেছে। এমনকি অনেকের মনেই প্রশ্ন আসছে, আগের মন্ত্রিসভার সদস্যরাই কি নতুন মন্ত্রিসভার সদস্য হতে যাচ্ছে, নাকি নতুনভাবে নতুন সদস্যদের দ্বারা মন্ত্রিসভা গঠিত হবে। নতুন বছরে সাধারণ জনগণের মনে এ প্রশ্নটিও এসেছে যে, নতুন সরকার কি মহাবিজয়ের মর্যাদা রাখতে পারবে? কাঙ্ক্ষিত জনপ্রত্যাশা পূরণ করতে পারবে?

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে এটি চতুর্থবারের সরকার হতে যাচ্ছে। গণতান্ত্রিক ধারা বজায় রেখে নানা প্রতিকূলতার মাঝেও অনুষ্ঠিত একাদশ সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে নজিরবিহীন এই সংখ্যাগরিষ্ঠ দল তথা সরকারের কাছে জাতির প্রত্যাশা স্বাভাবিকভাবেই বেশি। বিগত সরকারের উন্নয়নের ধারায় পুনরায় জনগণের ম্যান্ডেট পেয়েছে আওয়ামী লীগ। নতুন বছরে নতুন সরকারকে একটি বিষয় মাথায় রাখতে হবে যে, জনগণই তাদের ক্ষমতার মূল উৎস। জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন হলে সেই সরকারের স্থায়িত্ব লাভ করে না। বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বাধীন গত ১০ বছরে সরকারের সময়ে জনগণের প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির যোগফলেই আরো একটি সরকারের যাত্রায় দেশের আপামর জনসাধারণের আলোকিত হওয়ার সুযোগ রয়েছে। কারণ, গত ১০ বছরের সরকারের উন্নয়নের মাত্রার দিকে লক্ষ করলে এর সফলতার দিকটিই বেশি চোখে পড়ে। ব্যর্থতা যে নেই, তা নয়। সফলতা থাকলে, ব্যর্থতা থাকবে এটিই ন্যায্য। তবে সুখের বিষয় হলো এই, বিগত সময়ের ভুলত্রুটি শুধরে দেওয়ার সময় এসেছে। প্রধানমন্ত্রী ইতোপূর্বেও সব ভুল শোধরানোর মনোভাব ইতিমধ্যেই ব্যক্ত করেছেন। ইশতেহার ঘোষণার সময় প্রধানমন্ত্রী বিগত সময়ে তাঁর ভুলত্রুটির বিষয়ে দেশবাসীর কাছে ক্ষমাও প্রার্থনা করেছেন। এমনকি এর মাধ্যমে তিনি বাংলাদেশের রাজনীতিতে ইতিবাচক ধারা সৃষ্টির আরো একটি নজির তৈরি করেছেন। ২০১৯ সালে বাংলাদেশে নতুন সরকারের যাত্রাটি ভুলত্রুটিকে মাথায় রেখে সুস্থ রাজনীতির চর্চার প্রসঙ্গটির ন্যায্যতা রয়েছে। বলা যায়, এটা সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা।

নির্বাচিত নতুন গণতান্ত্রিক সরকারের কাছে নতুন বছরে জনগণের সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা হলো সুশাসন প্রতিষ্ঠা। এই সুশাসন শব্দটির অর্থ ব্যাপক। এটিকে সহজ করে বললে বোঝায়, জনগণ সরকারের কাছে চায় স্বাধীনতা, সহযোগিতা ও শান্তি-শৃঙ্খলার মধ্যে বাঁচার ন্যূনতম অধিকার এবং নির্বিঘ্নে চলাফেরার ও কাজকর্মের সুযোগ এবং নিজেদের মেধা-মননশীলতা ও যোগ্যতাকে কাজে লাগিয়ে আত্মপ্রকাশ ও বিকাশের নিশ্চয়তা।

নানা বাধা-বিপত্তি অতিক্রম করে নির্বাচিত হয়েছে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ তথা মহাজোট। কাজেই জনপ্রত্যাশার মাপকাঠিও এসব বাধা-বিপত্তির ঊর্ধ্বে। যদিও ব্যাপক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়া সরকার জনগণের কাঙ্ক্ষিত প্রত্যাশা পূরণ করতে হিমশিম খেয়ে যায়। তবুও সরকারের যাত্রাকে অক্ষুণ্ণ রাখতে নির্বাচনী ইশতেহারে বর্ণিত প্রতিশ্রুতি রক্ষায় তৎপর থাকার বিকল্প নেই। ক্ষমতার পালাবদলের বাস্তবতাকে স্মরণ করে সরকারকে দেশে অপরাধ ও লুটপাটের সংস্কৃতির পরিবর্তে সুশাসন প্রতিষ্ঠায় উদ্যোগী থাকতে হবে। সংকীর্ণ দলীয় আনুগত্যের বিবেচনার ঊর্ধ্বে উঠে যোগ্যতা ও দক্ষতার দিকে নজর রাখার বিকল্প নেই। একই সঙ্গে দেশের সকল নাগরিকের সরকারে অংশগ্রহণের প্রক্রিয়াকে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। সৎ, যোগ্য নেতৃত্বকে মন্ত্রিসভায় আনা দরকার। বিতর্কিতদের মন্ত্রিসভায় না এনে একটি জবাবদিহিমূলক শাসনব্যবস্থার সূত্রপাতের প্রত্যাশা সাধারণ মানুষের। জনগণ আশা করে, সরকার চাটুকার ও দখলদারদের প্রশ্রয় দেবে না। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও প্রশাসনকে অবশ্যই দলনিরপেক্ষ ও পেশাদারি মানসিকতা নিয়ে কাজ করার সুযোগ দিতে হবে। নিয়োগ, বদলি, পদোন্নতি সবকিছু যোগ্যতা, মেধা, দক্ষতা ও অভিজ্ঞতার ওপর ভিত্তি করে হতে হবে, দলীয় কোনো অনুগত্যের ভিত্তিতে নয়। সব ন্যায় ও ন্যায্য মাপকাঠি হাতে নিয়ে নতুন বছরে নতুন সরকারের যাত্রা শুভ হোক—এটিই আমাদের প্রত্যাশা।

লেখক : সহযোগী অধ্যাপক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।

Advertisement