ছোট ও বড় পর্দার ফেলুদারা

ফেলুদা—যাঁর পুরো নাম প্রদোষচন্দ্র মিত্র। ইংরেজি সাহিত্যে যখন রহস্যের জট খোলার দায়িত্ব অনেকটা একা হাতেই সামলাতে হয় শার্লক হোমসকে, তখন বাংলা সাহিত্যে এসে সে দায়িত্ব ভাগাভাগি করে নেয় ব্যোমকেশ, কিরিটির মতো বাঘা বাঘা গোয়েন্দা চরিত্র। তবে বাংলা সাহিত্যের অন্য গোয়েন্দা চরিত্রের চেয়ে একটু আলাদা এই প্রদোষচন্দ্র মিত্র ওরফে ফেলুদা। উপন্যাস হোক বা বড় পর্দা, সত্যজিৎ রায়ের অমর সৃষ্টি ফেলুদা বরাবরই আকৃষ্ট করেছে রহস্যপ্রেমীদের। চলুন, কোরা ডটকমের সৌজন্যে জেনে নিই ছোট ও বড়া পর্দার ফেলুদাদের সম্পর্কে, অর্থাৎ বিভিন্ন সময়ে যাঁরা ফেলুদার চরিত্রে অভিনয় করেছেন তাঁদের সম্পর্কে।
সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়
১৯৭৪ সালে ‘সোনার কেল্লা’র মাধ্যমে উপন্যাস থেকে বড় পর্দায় আবির্ভাব হয় ফেলুদার। সত্যজিৎ রায়ের পরিচালনায় ফেলুদার চরিত্রে অভিনয় করেন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়। ‘সোনার কেল্লা’ ছাড়াও ফেলুদা সিরিজের আরো একটি ছবিতে অভিনয় করেছেন তিনি। পাঁচ বছর বাদে ‘জয় বাবা ফেলুনাথ’ (১৯৭৯) দিয়ে আবারও পর্দায় আসেন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়। অসাধারণ অভিনয় দক্ষতা, দাঁড়ানোর ভঙ্গিমা ও সংলাপ বলার ধরনে তাঁকে ছাড়িয়ে যেতে পারেনি আর কেউ। তাঁর পরে ফেলুদার ব্যাটন হাতে পাওয়া সব্যসাচী চক্রবর্তী বহুবার বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ফেলুদা সিরিজের কোনো ছবিতে অভিনয় করার আগে ফেলুদার ধরন বোঝার জন্য তিনি অনেকবার ‘সোনার কেল্লা’ ও ‘জয় বাবা ফেলুনাথ’ ছবি দুটো দেখেছেন।
সব্যসাচী চক্রবর্তী
সবচেয়ে বেশিবার ফেলুদার চরিত্রে অভিনয় করেছেন সব্যসাচী চক্রবর্তী। শুধু ছবিতেই নয়, ফেলুদাকে নিয়ে নির্মিত টেলিফিল্ম, টিভি ধারাবাহিক, রেডিওর নাটকেও কণ্ঠ দিয়েছেন তিনি। সত্যজিৎ রায়ের ছেলে সন্দ্বীপ রায়ের পরিচালনায় ‘বোম্বাইয়ের বোম্বেটে’ (২০০৩), ‘কৈলাসে কেলেংকারি’ (২০০৭), ‘টিনটোরেটোর যিশু’ (২০০৮), ‘গোরস্থানে সাবধান’ (২০১০), ‘রয়েল বেঙ্গল রহস্য’ (২০১১), ‘ডবল ফেলুদা’র (২০১৬) মতো জনপ্রিয় সব ছবিতে ফেলুদার ভূমিকায় অভিনয় করেছেন তিনি। তরুণ প্রজন্মের কাছে ফেলুদাকে জনপ্রিয় করে তোলার দায়িত্বটা একা হাতেই পালন করেছেন তিনি। ২০১১ সালে ‘রয়েল বেঙ্গল রহস্য’-এর পর ফেলুদার ব্যাটন চলে যায় আবীর চট্টোপাধ্যায়ের কাছে। কিন্তু ২০১৬ সালে ফেলুদা চরিত্রের ৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে মুক্তি দেওয়া হয় ‘ডবল ফেলুদা’। সে ছবিতে ফেলুদা চরিত্রে আবারও ফেরেন সব্যসাচী চক্রবর্তী।
আবীর চট্টোপাধ্যায়
২০১৪ সালে সন্দ্বীপ রায়ের পরিচালনায় ‘বাদশাহী আংটি’ ছবিতে প্রথমবারের মতো ফেলুদা চরিত্রে অভিনয় করেন আবীর চট্টোপাধ্যায়। ফেলুদা সিরিজের এই একটি ছবিতেই অভিনয় করার সুযোগ হয়েছে তাঁর। ফেলুদা হিসেবে আবীরের অভিনয় প্রশংসিত হলেও ছাড়িয়ে যেতে পারেননি আগের দুই ফেলুদাকে। তবে তাঁর অভিনয় তাঁকে পাইয়ে দিয়েছে পর্দায় ব্যোমকেশ বক্সির চরিত্রে অভিনয় করার সুযোগ। গুজব রয়েছে এ কারণেই ফেলুদার মতো বড় ফ্র্যাঞ্চাইজি হারিয়েছেন তিনি।
শশী কাপুর
নামটা দেখে অবাক হওয়ার কিছু নেই। ফেলুদার বলিউড সংস্করণও রয়েছে। ফেলুদাকে নিয়ে একটি হিন্দি ধারাবাহিক নির্মাণ করেছিলেন সত্যজিৎ রায়। গত বছর পরলোকগমন করা শশী কাপুর ছিলেন যার কেন্দ্রীয় চরিত্রে। ‘যত কাণ্ড কাঠমান্ডুতে’ অবলম্বনে নির্মাণ করা হয়েছিল ধারাবাহিক ‘কিসসা কাঠমান্ডু কা’ (১৯৮৬)। তবে ফেলুদা হিসেবে দর্শকদের মনে দাগ কাটতে পারেননি তিনি।
পরমব্রত চট্টোপাধ্যায়
উপন্যাস, রেডিও, নাটক, টেলিফিল্ম, চলচ্চিত্র সবকিছুতেই বিচরণ ছিল ফেলুদার। ওয়েব সিরিজটাই বা বাদ থাকে কেন? শুধু বাংলাদেশের দর্শকদের জন্য ফেলুদার স্বত্ব বিক্রি করেছেন সন্দ্বীপ রায়। ওয়েব সিরিজে ফেলুদার ভূমিকায় অভিনয় করেছেন ‘টিনটোরের যিশু’ ছবিতে তোপসের ভূমিকায় অভিনয় করা পরমব্রত চট্টোপাধ্যায়। এখন পর্যন্ত ফেলুদাকে নিয়ে ওয়েব সিরিজ নির্মাণ হয়েছে তিনটি। ‘ঘুরঘুটিয়ার ঘটনা’, ‘শেয়ালদেবতা রহস্য’ ও ‘গোলোকধাম রহস্য’। তবে চলচ্চিত্রের ফেলুদা থেকে ওয়েব সিরিজের ফেলুদাকে উপস্থাপন করা হয়েছে আধুনিকভাবে। ফেলুদার হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে স্মার্টফোন ও ল্যাপটপ। বাদ দেওয়া হয়েছে জটায়ুকে।