রোদের মধ্যেই ছাত্রলীগের পদবঞ্চিতদের অনশন চলছে

কেন্দ্রীয় কমিটি নিয়ে কয়েক দিন ধরে তীব্র দ্বন্দ্বের মধ্যে গতকাল গভীর রাতে মারধরের শিকার ছাত্রলীগের পদবঞ্চিত নেতারা হামলাকারীদের বিচার দাবিতে আজ দুপুর পর্যন্ত অনশন অব্যাহত রেখেছেন।
গতকাল শনিবার দিবাগত রাত ৩টা থেকে আজ রোববার দুপুর আড়াইটা পর্যন্ত কাঠফাটা রোদের মধ্যেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসির সামনে সন্ত্রাসবিরোধী শহীদ রাজু ভাস্কর্যের সামনে তাঁদের অনশন চালিয়ে যাচ্ছেন।
অনশনকারীদের নেতা তানবীর হাসান সৈকত বলেন, ‘আমরা এখানে অবস্থান কর্মসূচি পালন করছি। আমাদের ওপর হামলা, মারধর এবং নির্যাতনের বিচার চাই। বিচারের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আশ্বাস না পেলে আমরা অনশন চালিয়ে যাব।’
ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটি গঠনকে কেন্দ্র করে দ্বন্দ্বের জেরে গতকাল দিবাগত গভীর রাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে বর্তমান নেতৃত্বের সমর্থকদের হাতে বিক্ষোভকারী পদবঞ্চিত নেতারা মারধরের শিকার হয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। হামলায় ছয় নারীনেত্রীসহ অন্তত ১০ জন আহত হয়েছেন। আহতদের মধ্যে একজনকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
রাতে ও সকালে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভন ও সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানী সেখানে উপস্থিত ছিলেন। তাঁরা অনশন ভঙ্গ করার অনুরোধ করলেও পদবঞ্চিতরা তাতে সাড়া দেননি।
গত ১৩ মে ছাত্রলীগের পূর্ণাঙ্গ কেন্দ্রীয় কমিটি ঘোষণার পর থেকে অভিযোগ, আপত্তি, বিক্ষোভ জানিয়ে আসছিলেন পদবঞ্চিত ও প্রত্যাশিত পদ না পাওয়া নেতারা। ওই দিনই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর ক্যান্টিনে পদপ্রাপ্ত নেতাদের সমর্থকদের হাতে বঞ্চিতরা মারধরের শিকার হন। পদবঞ্চিতদের অভিযোগ, কমিটিতে অনেক অযোগ্য ও বিতর্কিতদের রাখা হয়েছে। এ নিয়ে উভয়পক্ষ সংবাদ সম্মেলনও করে। সর্বশেষ ছাত্রলীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের পক্ষ থেকে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে বিতর্কিতদের কমিটি থেকে বাদ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়। যদিও তা কার্যকর করা হয়নি।
এর মধ্যেই শনিবার দিবাগত রাত ১টার দিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসির ভেতরে কেন্দ্রীয় সভাপতি রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভন ও সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানীর সঙ্গে কথা বলতে যায় পদবঞ্চিত নেতাদের একটি প্রতিনিধিদল। সেখানে শোভন-রাব্বানীর সমর্থকরাও অবস্থান করছিলেন। সেখানে ১০ সদস্যের প্রতিনিধিদলের ওপর হামলার ঘটনা ঘটে বলে অভিযোগ করেছেন পদবঞ্চিতরা।
এরপরই পদবঞ্চিতরা ভিসি চত্বরে মানববন্ধন করেন। পরে তাঁরা টিএসসির সামনে রাজু ভাস্কর্যে এসে অনশন শুরু করেন।
গভীর রাতে হঠাৎ হামলা
পদবঞ্চিতদের অংশে নেতৃত্ব দেওয়া তানবীর হাসান সৈকত বলেন, ‘আমাদের সঙ্গে কথা বলার জন্য কেন্দ্রীয় সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক টিএসসিতে ডেকেছিলেন। আমরা সেখানে গেলে তাঁরা বের হয়ে চলে যান। তাঁরা পরে দলবল নিয়ে আসেন। আমরা বলেছি, আপনারা আমাদের সঙ্গে কথা বলেন। দলবল কেন নিয়ে এসেছেন? কথা চলার একপর্যায়ে ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক ও ডাকসুর জিএস গোলাম রাব্বানী ছাত্রলীগ নেত্রী লিপিকে বেয়াদব বলেন। তখন আমরা এর প্রতিবাদ করি। তখনই তাঁর কর্মীরা এসে মারামারি শুরু করেন। মেয়েদের গায়েও হাত তুলেছেন।’
বিক্ষুব্ধ অংশের নেত্রী শ্রাবণী শায়লা বলেন, ‘আমাদের ওপর হামলার বিচার চাই। নেত্রী (আওয়ামী লীগ সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা) ছাড়া কাউকে বিশ্বাস করি না। কমিটিতে যারা অভিযুক্ত, তাদের বিষয়ে কথা বলতে আমরা এসেছিলাম। কিন্তু তাঁরা তাঁদের দলবল নিয়ে এলেন। কথাবার্তার একপর্যায়ে তাঁরা আমাদের মারধর শুরু করেন। আমাদের নারী নেত্রীদের রাব্বানী নিজের হাতে মারধর করেছেন। এর বিচার চাই।’
শ্রাবণী শায়লা দাবি করেন, মারধরের শিকার হয়েছেন নতুন কমিটির সংস্কৃতিবিষয়ক উপসম্পাদক নিপু ইসলাম তন্বী, তিলোত্তমা শিকদার, বাংলাদেশ-কুয়েত মৈত্রী হল শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি ফরিদা পারভীন ও সাধারণ সম্পাদক শ্রাবণী শায়লা, শামসুন নাহার হল শাখার সাধারণ সম্পাদক জিয়াসমিন শান্তা, সাবেক কেন্দ্রীয় আন্তর্জাতিকবিষয়ক উপসম্পাদক এমদাদ হোসেন সোহাগ, সাবেক কেন্দ্রীয় সহসম্পাদক আজমীর শেখ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সাবেক উপপ্রচার সম্পাদক শেখ আবদুল্লাহসহ ১০ জন।
ছাত্রলীগের এই নেত্রী আরো দাবি করেন, পদবঞ্চিতদের মধ্যে ঢাবি শাখার সাবেক উপপ্রচার সম্পাদক শেখ আবদুল্লাহ গুরুতর আহত হন। তাঁর ঘাড়ের হাড় ভেঙে যায়। পরে তাঁকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
তবে ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানী মারধরের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, ‘লিপি আমাদের নেতাদের নিয়ে সমালোচনামূলক কথা বলেছেন। তাঁর আচরণ ভিন্ন ধরনের ছিল, যেটা মোটেও সহ্য করার নয়। তবে তাঁকে মারিনি। সেখানে পদপ্রাপ্ত ও পদবঞ্চিতদের মধ্যে ঝামেলা হয়েছে। আমি আর শোভন তাঁদের সরিয়ে দিয়েছি।’
একপর্যায়ে পদবঞ্চিতদের অনশন ভঙ্গ করার অনুরোধ করেন শোভন ও রাব্বানী। তাঁদের চলে যাওয়ার অনুরোধ করেন। এ সময় ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদকের পদ থেকে পদত্যাগের ঘোষণাও দেন রাব্বানী। তবে পদবঞ্চিতরা প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ ছাড়া কর্মসূচি অব্যাহত রাখার ঘোষণা দিয়েছেন।
পদবঞ্চিতদের দাবির মধ্যে রয়েছে কমিটিতে বিতর্কিতদের বাদ দিতে হবে, নারীনেত্রী ও অন্যদের ওপর হামলাকারীদের বহিষ্কার করতে হবে এবং লিপি আক্তারকে মারধরের ঘটনায় গোলাম রাব্বানীকে ক্ষমা চাইতে হবে।