ডাকসু নির্বাচন

পুনঃতফসিল দিলে ছাত্রলীগের বিরুদ্ধে বৃহত্তর জোট!

১৩ মার্চ ২০১৯, ২০:৫২ | আপডেট: ১৩ মার্চ ২০১৯, ২০:৫৯

মাসুদ রায়হান পলাশ
ডাকসু নির্বাচন বাতিল করে পুনর্নির্বাচনের জন্য পুনঃতফসিলের দাবিতে নির্বাচন বর্জনকারী পাঁচটি প্যানেলের সদস্যরা আজ বুধবার দুপুরে ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ মিছিল বের করেন। ছবি : স্টার মেইল

ডাকসু নির্বাচন বাতিল করে পুনর্নির্বাচনের জন্য পুনঃতফসিলের দাবিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে তিনদিনের মধ্যে আল্টিমেটাম দিয়েছে নির্বাচন বর্জনকারী পাঁচটি প্যানেলের সদস্যরা। এজন্য আজ বুধবার দুপুরে বিক্ষোভ মিছিল করেছে তারা। পরে উপাচার্যের কার্যালয়ের সামনে বিক্ষোভ করে উপাচার্যকে স্মরকলিপি দেন। ডাকসুর নবনির্বাচিত সহ-সভাপতি (ভিপি) নুরুল হক নুরও এ বিক্ষোভে যোগ দিয়েছেন।

আন্দোলনের মুখে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন যদি পুনরায় নির্বাচনের ঘোষণা দেয় তাহলে কোন প্রক্রিয়ায় নির্বাচন হবে? আবারো ১১ মার্চের মতো ভোট হবে? এই প্রশ্ন এখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের।

বিজয় একাত্তর হলের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক শিক্ষার্থী বলেন, পুরো বিশ্ববিদ্যলয়ে ক্ষমতাসীন দল হিসেবে ছাত্রলীগের দাপট প্রচুর। বিশ্ববিদ্যালয়ে তারা চাইলে সব কিছু করতে পারে। মেয়েদের হলে ছাত্রলীগের প্রভাব একটু কম থাকলেও ছেলেদের হলে একচ্ছত্র আধিপত্য। শিবির-ছাত্রদল তকমা দিয়ে মামলার ফাঁদে ফেলে হল থেকে বের করে দেওয়াসহ বিভিন্নভাবে হয়রানি করা হয়। এই পরিস্থিতির ভেতর দিয়ে ২৮ বছর পর ডাকসু নির্বাচন সম্পন্ন হয়ে গেল। ভোট কারচুপির অভিযোগে ছাত্রলীগ বাদে ১১ মার্চ দুপুর ১টার আগে সব সংগঠন ভোট বর্জন করল। ভিপি পদ হারানোয় কারচুপির অভিযোগে ছাত্রলীগও প্রহসনের নির্বাচন বলে ঘোষণা দেয় এবং বিক্ষোভ করে। দেশ-বিদেশে নির্বাচন নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আস্থার সংকটে পড়েছে। এটা আমাদের জন্য লজ্জার। এই সংস্কৃতি পুরো জাতি জন্য ভয়ংকর। এখান থেকে বের হওয়া দরকার।

জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হলের শিক্ষার্থী মজনুর রহমান বলেন, এই যখন পরিস্থিতি তখন শিক্ষকদের প্রতিও আর তেমন আস্থা নেই সাধারণ শিক্ষার্থীদের। যে শিক্ষক চুরির কাজে লিপ্ত থাকে তার প্রতি কতটা সম্মান আর থাকবে? যাই হোক, এই অবস্থায় ছাত্র সংগঠনগুলোর চাপের মুখে যদি পুনরায় নির্বাচন দিতে বাধ্য হয় প্রশাসন তখন কী হবে? আবারো নির্বাচনের নামে প্রহসন? নাকি সত্যি সত্যিই ভোট, ভোটের মতো ভোট।

রোকেয়া হলের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী রুম্পা আক্তার বলেন, এখন যদি পুনরায় নির্বাচন হয় তাহলে প্রক্রিয়া কী হবে? আবারো হলেই ভোটগ্রহণ নাকি একাডেমিক ভবনে? আবারো অস্বচ্ছ ব্যালট বাক্সে কিংবা পোলিং এজেন্ট ছাড়াই ভোটগ্রহণ? আবারো রাতে ব্যালট বক্স ভরে রাখা। ছাত্রলীগকে জিতিয়ে দেওয়ার চেষ্টা? প্রার্থীদের মারধর? গুঞ্জন শুনি এবার নাকি বৃহত্তর ঐক্যের কথা ভাবছে ছাত্রসংগঠনগুলো। সেটা হলে কোন প্রক্রিয়ায়? কারা কারা থাকবে? নাকি নতুন করে আবারো ভোটগ্রহণ করতে গিয়ে বাকি সম্মানটুকুও রাস্তায় রেখে আসবে বিশ্ববিদ্যালয়?

এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে কোটা সংস্কার আন্দোলনকারীদের সংগঠন বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের আহ্বায়ক হাসান আল মামুনের সঙ্গে কথা হয় এই প্রতিবেদকের। তিনি বলেন, আমরা একটি বৃহত্তর ঐক্যের দিকে যেতে পারি। ছাত্রলীগ বাদে অন্য সব সরকার বিরোধী ছাত্র সংগঠনগুলোর সঙ্গে আলাপ-আলোচনা হচ্ছে। এরপর নির্বাচন হলে ভালোভাবেই হতে হবে। সেই নির্বাচনে কোনো রকম কারচুপি সহ্য করা হবে না। ছাত্রলীগকে রুখতে আমরা সব সংগঠন মিলে আন্দোলনে নামব। যদি আমাদের চিন্তা সফল হয়। বিষয়গুলো প্রথমিক ধাপে আছে, দেখা যাক কী হয়।

হাসান আল মামুন বলেন, কোনো কোনো সংগঠন আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করেছে। আমরাও কথা বলছি। সবার সঙ্গে বসে আন্দোলন-সংগ্রাম, দাবি দাওয়াসহ প্রার্থীদের পদ-পদবির ব্যাপারগুলো নিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারব আমরা।

কোটা সংস্কার আন্দোলনের এই নেতা বলেন, মূল কথা হলো আন্দোলনের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে বাধ্য করাতে হবে নতুন করে নির্বাচন দিতে। এটা কোনো নির্বাচন হয়নি। এটা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলঙ্কিত অধ্যায়। আর সে কারণেই ঐক্য দরকার। তবে ঐক্য হলে সব দলগুলো মিলে হবে। না হলে হবে না। এখন মূলত দরকার এক সঙ্গে থেকে আন্দোলন সংগ্রাম। পরের সব পথ সোজা হয়ে যাবে।

হাসান আল মামুন বলেন, একটু দেখেন, হলে ছাত্রলীগের একক দাপট। তারপরও আমরা ভিপি পেলাম। এটা আসলে তারা হাজার চেষ্টা করেও আটকাতে পারেনি। মোট ভোটের বিশাল বড় অঙ্কটাই আমাদের সমর্থক। কারণ তারা জানে কারা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য কাজ করে। সেজন্য হলেও আমরা ভোট পেয়েছি।

বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের আহ্বায়ক বলেন, যাইহোক, পুনরায় শিক্ষার্থীরা তাদের ভোটের অধিকার যদি ফিরিয়ে আনতে পারে এবং পুনঃতফসিল ঘোষণা করা হয়, তখন ভোটের মাঠের প্রার্থীদের নিয়ে চিন্তা করব আমরা। আমরা সহসভাপতি (ভিপি) পদ রেখে অন্য দুটি পদ (জিএস ও এজিএস) ছেড়ে দেব। এরপরের পদগুলো সবাই মিলে বসে ঠিক করতে হবে। তবে নির্বাচন হলে আমাদের সব দাবি মানতে হবে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে।

হাসান আল মামুন বলেন, পুনরায় নির্বাচন হলে একাডেমিক ভবনে অবশ্যই ভোটগ্রহণ হতে হবে। পোলিং এজেন্ট থাকতে দিতে হবে কেন্দ্রের ভেতরে। প্রয়োজনে ২৪ ঘণ্টা থাকবে তারা। স্বচ্ছ ব্যালট বাক্সে ভোটগ্রহণ করতে হবে। ব্যালট বাক্স সবার সামনে খুলে দেখিয়ে ভোট গ্রহণ শুরু করতে হবে। কেন্দ্রের ভেতরে মোবাইল নিয়ে যাওয়া যাবে না। কারণ, ছাত্রলীগ হলের অধিকাংশ শিক্ষার্থীদেরকে ভোটকক্ষ থেকে ছবি তুলে নিয়ে যেতে বলেছে ১১ মার্চ।

প্রগতিশীল ছাত্রঐক্যের ভিপি প্রার্থী ও ছাত্র ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক লিটন নন্দী বলেন, দেখুন, মতাদর্শগত পার্থক্য থাকলেও ছাত্রলীগ বাদে অন্য সব সংগঠন কিন্তু সুষ্ঠু ভোটই চেয়েছিল। তার মানে আমরা সবাই সুষ্ঠু ভোটের পক্ষে। ভোট সুষ্ঠু হয়নি। তাই আমরা মাঠেও আন্দোলন করছি এক সাথে। একটি ভোটের সংস্কৃতি ফিরিয়ে আনতে আমরা বদ্ধপরিকর। দেখা যাক, সামনে কী হয়। পুনরায় নির্বাচন হলে এবং পরিবেশ যদি সেই রকম হয় তখন চিন্তা করে দেখা যাবে।

এই ব্যাপারে ছাত্রদলের ভিপি প্রার্থী মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, আমরা সবাই তো সুষ্ঠু ভোটের পক্ষে। তাই আগে সুষ্ঠু ভোটের জন্য পুনরায় নির্বাচনের দাবি জানিয়ে আন্দোলন করছি। আন্দোলনকে আরো বেগবান করতে আমরা সব ছাত্র সংগঠনের কাছে যাব, তাদেরকে প্রস্তাব দেব। একসঙ্গে আন্দোলনে যাওয়ার ইচ্ছে আমাদের আছে। এরই মধ্যে একসঙ্গে আন্দোলনের ব্যাপারে কারো কারো সঙ্গে কথাবার্তা হয়েছে। ফাইনাল কিছু হয়নি। তবে আন্দোলন যদি আমরা সফল করতে পারি এবং পুনরায় নির্বাচন দিতে চায় ঢাবি প্রশাসন তখন কিন্তু জোটগতভাবে নির্বাচনের জন্য আলোচনা চালিয়ে যেতে পারি সবার সঙ্গে।

তবে স্বাধিকার স্বতন্ত্র পরিষদের জিএস পদপ্রার্থী এ. আর. এম. আসিফুর রহমান ত্বাসীন বলেন, ‘আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি একসঙ্গে আন্দোলনে যাওয়ার। করছিও তাই। কিন্তু সাড়া মিলছে না খুব একটা। কারণ হলগুলো থেকে সাধারণ শিক্ষার্থীরা আন্দোলনে আসতে ভয় পায়। তবু আমরা চেষ্টা করছি দেখা যাক কী হয়। তবে আমাদের আন্দোলন যদি সফল হয় তবে সবাই মিলে জোটবদ্ধভাবে নির্বাচনের কথা ভাবব। এই ছাড়া পথও নেই। কারণ বড় শক্তি না নিয়ে পুনরায় ভোটে গিয়ে খুব একটা লাভ হবে না।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতির সভাপতি আসিফ জানান, নির্বাচনের দিন ছাত্রলীগ হলের ভোট কেন্দ্রের সামনে নিজেদের কর্মীদের জড়ো করে বড় লাইন তৈরি করে রেখেছিল। একবার ভোট দেওয়ার পর আবারো লাইনে দাঁড়িয়েছিল তারা। সেজন্য অনেকেই ভোট দিতে পারেনি। বড় লাইন দেখে হলের বাইরের ভোটাররা ভোট না দিয়ে চলে গেছেন। এসব রুখতেও আমাদের বড় ঐক্য দরকার।