Beta

আহারে ‘পোস্টারতন্ত্র’!

১৫ মার্চ ২০১৮, ১১:১২

সারওয়ার-উল-ইসলাম

আহারে পোস্টার। কত গুণ তার। কত ক্ষমতা তার। চার বাই দুই ফুটের একটি পোস্টারের এত মূল্য। 

যদি ছোটবেলা পোস্টারের এত গুণের কথা জানতাম, তা হলে কি আর কষ্ট করে পড়াশোনা করতাম। কত কষ্টই না করেছি এই পড়াশোনার জন্য। নিয়ম করে ইশকুলে যাও।

বিকেলে কোচিং করো। সন্ধ্যার আগে ঘরে ফিরে পড়তে বসা। রাত জেগে পড়া। পরীক্ষা, উহ্। কী দুঃসহ যন্ত্রণার সেই দিনগুলো। 

অবশেষে দেশের সর্বোচ্চ ডিগ্রি নিয়ে বেকার জীবন। চাকরির জন্য এর কাছে ওর কাছে ধরণা দেওয়া। এই কি লেখা ছিল কপালে নিখিলেস? অনেক কাঠখোর পুড়িয়ে বিধাতার মেহেরবানি, কোনোমতে চারটা ডালভাত খাওয়ার মতো চাকরি জুটল।

না, পাঠক এটা কোনো কবিতা না, জীবন ঘঁষে আগুনের তাপ দেওয়া। 

ঢাকা শহরসহ সারা দেশে যেন পোস্টার প্রদর্শনী চলছে। কোনো সংস্থা যেন প্রদর্শনীর ব্যবস্থা করেছেন। কে কত বড় আর বাহারি ঢংয়ের পোস্টার ছাপাতে পারে, সেই প্রতিযোগিতা চলছে। প্রিয় রাজনৈতিক দলের নেতার চেয়ে নিজের বড় ছবি ছেপে রাস্তার গুরুত্বপূর্ণ স্থানে টানানোর মহড়া যেন। 

দেশে যদি কোনো পর্যটক আসে, তার প্রথমে মনে হতে পারে এটা হয়তো পোস্টারতন্ত্রের দেশ। গণতন্ত্রের চেয়ে এ দেশে পোস্টারতন্ত্র বড়। গণতন্ত্রের জন্য এ দেশে নুর হোসেনরা বোকার মতো জীবন দিয়েছে। একটু কষ্ট করে পোস্টার ছেপে ধান্দাবাজি করলে জীবন বদলে যেত। এ জন্য পড়াশোনার দরকার পড়ে না। নাম লিখতে না জানলেও চলে। আর যদি সৌভাগ্যক্রমে ফাইভ ক্লাস পর্যন্ত পড়াটা থাকে তা হলে তো কোনো কথাই নেই, মাইক্রোফোনের সামনে দাঁড়িয়ে বক্তৃতা দেওয়া ছবি পোস্টারে ছাপতে পারলেই যথেষ্ট। অর্থযোগ আর ক্ষমতাযোগ হতে সময় লাগে না এখন। খামোখাই বাবার টাকা-পয়সা খরচ করে বিএ-এমএ পড়াশোনা করে সময় নষ্ট!

এবার আসি পোস্টারতন্ত্রে। মানুষকে ছোট করে দেখি না কখনোই। একজন রিকশাচালককে সম্মান দিই। তরকারি বিক্রেতাতেও। গলির মোড়ের টং দোকানে, যিনি বিড়ি-সিগারেট আর চা বিক্রি করেন তাকেও। এমনকি মায়ের বয়সী যে নারী গলির মোড়ে চিতই পিঠা আর ভাপা পিঠে বিক্রি করেন, তাকেও সম্মান দিই, কারণ তিনি কারো কাছে হাত পাতেননি, পঞ্চান্ন বা ষাট বছর বয়সে এসেও। 

কিন্তু যে পড়াশোনা করেনি, বাবা-মার বখাটে ছেলে। জীবনে এমন কোনো খারাপ কাজ নেই, যা করেনি। সেই ছেলেটি যখন পোস্টারতন্ত্রের কারণে লাখ লাখ টাকার মালিক বনে যায়, তাকে? তাকে এই সমাজ সমীহ করে চলে, ওই পোস্টারতন্ত্রের কারণে। কারণ থানা-পুলিশ-প্রশাসন জানে ওর যোগাযোগ অনেক ওপরে। এলাকায় বিশাল বিশাল পোস্টার-ব্যানারে ওর ছবি সাঁটানো আছে। থানার সামনে স্থানীয় জনপ্রতিনিধির ছবিসহ ওর পোস্টার আছে। দেশের বিশেষ বিশেষ দিনে সেই পোস্টার আর ব্যানার পরিবর্তন হয়। দলীয় প্রধানের ছবিসহ ওর ছবি ছাপা হয় সেই পোস্টারে। এমপি সাহেব ওকে তোয়াজ করে। সামনে নির্বাচন। ওকে প্রয়োজন।

এই হচ্ছে পোস্টারতন্ত্রের ভূমিকা। এই পোস্টারতন্ত্র চলছে এখন বাংলাদেশে। নেতানেত্রীরাও নীরব। কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। তাঁদের ছবি দিয়ে পোস্টার করছে কারা? তাঁদের ছবির নিচে কোন যোগ্যতাসম্পন্ন মানুষের ছবি যেতে পারে, সে কোন মাপের নেতা বা কর্মী, সেটা এখন বিবেচ্য বিষয় না। ২১ ফেব্রুয়ারি, ৭ মার্চ, ২৬ মার্চ, পয়লা বৈশাখ, এমনকি ঈদ-পূজা-পার্বণে চলছে পোস্টার ব্যানার প্রদর্শনী।

পোস্টারে আর ব্যানারে কারো ছবি ছাপা হওয়া মানে সেই বড় নেতা। এলাকায় তার বিশেষ মর্যাদা থাকবে। মানুষ তাকে দেখে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাবে। পোস্টারে ছবি ছাপা হওয়ার পরই আশা করে এলাকার ছোটরা সালাম-আদাব দেবে। খালি জায়গায় টং ঘর উঠিয়ে ভাড়া চালাবে। থানা-পুলিশকে তার লোকজন সপ্তাহে একবার গিয়ে টাকা দিয়ে আসবে। কোনো অসুবিধা করবে না পুলিশ। এলাকার বিভিন্ন কারখানায় গিয়ে চাঁদা তুলবে। প্রশাসনের লোকজনকে বুঝাবে পার্টি করতে হলে টাকা দরকার। স্থানীয় নেতাদের আশীর্বাদ পেতে সব ধরনের কাজ করবে সে। তাকে আর ঠেকায় কে?

এই যদি হয় পোস্টারতন্ত্রের কেরামতি, তা হলে বৃথাই মিছে পড়াশোনা, নীতিবাক্য শেখা, আদর্শলিপি শেখা। বলতে ইচ্ছে করে নিখিলেস, তুই একবার সুনীল বাবুকে নিয়ে এসে দেখে যা কোন পোস্টারতন্ত্রের দেশে বেঁচে আছি। এই কি মানবজনম?

লেখক : ছড়াকার ও সাংবাদিক।

Advertisement