Beta

ইশতেহার

সেই পুরোনো কথার মিথ্যা আশ্বাস

২০ ডিসেম্বর ২০১৮, ১৩:১৫

৩০ ডিসেম্বর একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে ইশতেহার ঘোষণা করেছে বড় দুই জোট। দুই জোটের নেতৃস্থানীয় দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপি গণতন্ত্রকে মহিমান্বিত করার যতরকম আয়োজন আছে, তারও অধিক কিছু চর্চা করে দেশের মানুষের সীমাহীন সুখ ও সমৃদ্ধি এনে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। ক্ষমতায় গেলে বিরোধী জোট বা দলকে আস্থায় এনে দেশ শাসনের প্রতিশ্রুতিও এসেছে। তিন কোটি বেকারের দেশে সোয়া কোটি কর্মসংস্থান সৃজনের সোনার হরিণীয় প্রতিশ্রুতিও এসেছে। দিনবদলের এসব কাজির গরু টাইপ সনদ কতটা গোয়ালে আর কতটা কাগজে থাকে, তা আসল বিচারক জনগণ ছাড়া কেউ জানে না। প্রত্যেক দলই এমন কিছু চমক হাজির করছে, যা দেখেশুনে মনে হয়—আহারে কাকে রেখে কাকে যে ভোটটা দিই?

ইশতেহার উন্মোচনকালে আওয়ামী লীগ তার অতীত ভুলকে ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখতে বলেছে। অন্যদিকে খালেদা ও তারেকের সম্মান রক্ষায় ভোটারদের সমর্থন প্রত্যাশা করেছে বিএনপি। ক্ষমতায় গেলে যেকোনো বয়সীরা চাইলেই সরকারি চাকরিতে যোগ দিতে পারবে বলে জানিয়েছে ঐক্যফ্রন্ট। কিন্তু এসব কথা অতিকথার সারবত্তা কী বা এতে দেশ ও জনগণের কী ফায়দা হবে, তা কেউই জানে না। ওয়াদার বরখেলাপে কথাগুলো যে কথার কথা হয়েই থাকবে, তা নিশ্চিতই জানেন প্রতিশ্রুতিশীল রাজনীতিকরা। তবু তাদের কথার ট্রেন বয়ে চলে সমান্তরাল কী বাম কীই-বা ডানে, কী জোট কীই-বা ফ্রন্টে। আর আমরা আমজনতারা সেইসব কথার ফুলঝুরিতে আস্থা রেখে ফি বছরই ঠকতে শেখাকে ভালোবাসাটা দারুণ রপ্ত করে চলেছি।

বড় দুই দলের ইশতেহারেই আমরা বাহারি চমক পেয়েছি। আওয়ামী লীগের মেনিফেস্টোতে গণতন্ত্র, নির্বাচন ও কার্যকর সংসদ, আইনের শাসন ও মানবাধিকার সুরক্ষা, দক্ষ, সেবামুখী, জবাবদিহি ও সেবামূলক প্রশাসন, জনবান্ধব আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী গড়ে তোলা, দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ এবং সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদ, সাম্প্রদায়িকতা ও মাদক নির্মূল বিষয়ে নানা প্রস্তাবনার কথা তুলে ধরা হয়েছে। এছাড়া মেগা প্রজেক্ট, তরুণ ও যুবসমাজের উন্নয়ন এবং নারীর ক্ষমতায়ন বিষয়ে আলোকপাত করা হয়েছে। তিন কোটি বেকারের দেশে সোয়া কোটি চাকরি সংস্থানের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। এটা অবশ্যই অতি দিশাহীন বেকারদের জন্য অদ্ভুত এক প্রতিশ্রুতি। বাল্যবিবাহ শূন্যের কোঠায় নিয়ে এসে নারী ও পুরুষের সমানাধিকার নিশ্চিতের কথা বলা হয়েছে। অসাম্প্রদায়িক সমাজ গঠনের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু ওলামা লীগ কিংবা হেফাজতে ইসলামকে গুরুত্ব দেওয়ার পর কীভাবে বাল্যবিবাহ বন্ধ করা হবে আর কীভাবেই বা পুরুষতান্ত্রিকতার আর্গল ভেঙে নারীর অধিকার সমুন্নত করা যাবে, তা পরিষ্কার করা হয়নি। আওয়ামী লীগের ইশতেহারে প্রতিশ্রুত অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গঠনের কথা স্রেফ বাতুলতা মাত্র।

অপরদিকে মেগা প্রজেক্টগুলোতে যেভাবে সময়সীমা ও অর্থব্যয় বাড়ানো হচ্ছে। তাতে এসব প্রজেক্ট যদি সময়মতো সম্পন্ন করা যেত, তাহলে বেঁচে যাওয়া অর্থ দিয়েই এসবের দ্বিগুণ প্রজেক্ট হাতে নেওয়া যেত। তখন বলা যেত, জনগণের করের টাকার যথার্থ ব্যবহার হয়েছে, যথেচ্ছাচার নয়। পদ্মা সেতু আমাদের অহংবোধ বাড়িয়ে দিয়েছে এরচেয়ে বড় কার্যকারিতা মেগা প্রজেক্ট থেকে জনগণ এখনো পায়নি। আওয়ামী লীগের ইশতেহারে গ্রামকে শহরে রূপান্তর করবার কথা বলা হয়েছে। আমরা সজ্ঞানে এর বিরোধিতা করি। গ্রামকে তার শিকড়ে প্রোথিত রেখে যদি উন্নয়ন করা তবে তাই যেন করা হয়। গ্রামে কলকারখানা নিয়ে গিয়ে আপামর জনসাধারণকে দূষণে জর্জরিত করবার কোনো মানে নেই।

ইশতেহার ঘোষণার পর আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘আমরা কথায় নয়, কাজে বিশ্বাস করি। আমাদের এবারের অঙ্গীকার, আমরা টেকসই বিনিয়োগ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন নিশ্চিত করব।’ এবং বরাবরের মতো জনগণের উন্নয়ন ছাড়া তাঁর ব্যক্তিগত চাওয়া পাওয়া বলে কিছু নেই বলে জানিয়েছেন। ১০ বছর আগেও তিনি এমনধারার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। বাস্তবতা হলো নিজের দলের বাড়াবাড়ি রকমের চাওয়া-পাওয়ার লাগাম টেনে ধরা যায়নি। দল-মত নির্বিশেষে সবার অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নও নিশ্চিত করা যায়নি। সুইস ব্যাংকে টাকা জমানো এবং মালয়েশিয়ায় দ্বিতীয় বাড়ি বানানো বাংলাদেশি কোটিপতি ঢের বেড়েছে। কিন্তু দিন এনে দিন খাওয়া বহু মানুষকে এখনো আধপেটা খেয়ে দিনগুজরান করতে হয়। ভিক্ষার হাত বাড়িয়ে রাখতে হয়।

গণতন্ত্র, আইনের শাসন, মানবাধিকার রক্ষা এবং দুর্নীতির প্রতি জিরো টলারেন্স বিষয়গুলো এখনো যতটা কাগজের শোভা ততটা বাস্তবানুগ নয়। এমন বাস্তবতায় আওয়ামী লীগ আবার সময় চেয়েছেন। জনগণ যদি মনে করেন আবার হয়ত সময় তিনি পাবেনও। কিন্তু তারপর... আর কতবার এভাবে সময় চাওয়া যেতে পারে?

অপরদিকে বিএনপি জ্বালানি খাত, স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা, আবাসন, পররাষ্ট্র, পরিবেশ, ক্ষুদ্র জাতিসত্তা ও সংখ্যালঘুদের জন্য ইশতেহারে বিভিন্ন সুবিধার কথা বলেছে। ইশতেহারের ভূমিকায় মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, নির্বাচনে জয়লাভ করলে ঐকমত্য, সবার অন্তর্ভুক্তি এবং প্রতিহিংসাহীনতা—এই মূলনীতির ভিত্তিতে বিএনপি রাষ্ট্র পরিচালনা করবে। শুধু এই একটি শব্দ প্রতিহিংসাহীনতা যদি সকলপক্ষে রক্ষিত হতো তবে দেশে এতদিনে সর্বজন প্রশংসিত টেকসই গণতন্ত্রের দেখা মিলত। এখনো আমাদের গণতন্ত্র সংকুচিত ও নিয়ন্ত্রিত। এই নিয়ন্ত্রণরেখা ভেদ করবার সক্ষমতা কি বিএনপির মেনিফেস্টোতে আছে। বিএনপি বরাবর বর্তমান পুলিশ বাহিনীর কড়া সমালোচক। সেই তারাই ঘোষণা দিয়েছে ক্ষমতা পাওয়ার অব্যবহিত পরেই পুলিশের এএসআই ও এসআইদের বেতনের গ্রেডেশন বাড়িয়ে দেবেন। কিন্তু তারা এটা বলে নাই যে, কীভাবে পুলিশের নৈতিকমান, দক্ষতা ও কর্তব্যনিষ্ঠা বাড়ানো যায়। তারা পাঁচ বছরে যুবকদের জন্য এককোটি নতুন কর্মসংস্থানের কথা বলেছে। কিন্তু কীভাবে কাজের পরিবেশ তৈরি করা হবে, তার কোনো দিকনির্দেশনা বিএনপি দিতে পারেনি।

সম্পত্তিতে নারীর অধিকার নিশ্চিতের কথা বললেও নারী ও পুরুষের সমানাধিকারের বিষয়ে কোনো প্রতিশ্রুতি বিএনপির মেনিফেস্টোতে নেই। মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মান মর্যাদা রক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার কথা বিএনপি স্পষ্ট করে বলেছে এটা প্রশংসনীয়। কিন্তু তাদের ক্ষমতার অংশীদার স্বাধীনতাবিরোধী জামায়াতে ইসলামী এসব সিদ্ধান্ত মানবে এমন গ্যারান্টি থাকবে কিনা তা কেউ জানে না।

বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া ও ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের ‘সম্মান’ ও ‘মর্যাদা’ প্রতিষ্ঠা এবং বিএনপির ঘরছাড়া নেতাকর্মীদের ঘরে ফেরার সুযোগ দিতে ভোট চেয়েছেন দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি বলেছেন, ‘আপনাদের একটি ভোট আমাদের নেত্রীর জীবনকে পুনরায় আলোয় উদ্ভাসিত করবে।’ বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এবং তাদের সমর্থকগোষ্ঠীর জন্য এই ইস্যুটি নিশ্চিতই বড় আবেগের জায়গা। আবেগ দিয়ে দেশ শাসন করা না যাক ভোটের বিতরণী পার হতে এটা একটা বড় অনুষঙ্গ। আদালত বিচার করে প্রমাণসাপেক্ষে কিন্তু জনগণই শেষ বিচারক। সেখানে আবেগ এক বড় অনুষঙ্গ। নানা চাপে কোণঠাসা বিএনপির জন্য আবেগও ভরাস্থল বটে।

দেশের শিক্ষাব্যবস্থা নানা অব্যবস্থাপনা ও ভুল পরিকল্পানায় তলানিতে পৌঁছে গেছে। বেশি বেশি জিপিএ ৫ এবং যেকোনো উপায়ে পাসনির্ভর এই শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নয়নকল্পে দুই বড়দলের মেনিফেস্টোতেই সুনির্দিষ্ট কোনো প্রস্তাবনা নেই। মানুষের সমঅধিকারের বিশ্বাসী, বর্ণবিদ্বেষহীন, অসাম্প্রদায়িক, উদারনৈতিক ও ন্যায়নিষ্ঠ মানবিক মানুষ গড়বার প্রণোদনা যদি শিক্ষাব্যবস্থায় না থাকে, তবে এদেশের মানুষকে যথার্থ গণতন্ত্রের পাঠ কোনোদিনই দেওয়া যাবে না। এই ব্যাপারে সকল পক্ষই নিশ্চুপ। তাহলে আদৌ কি আমরা গণতন্ত্রকে স্পর্শ করতে চাই?

পরিবর্তিত রাজনৈতিক বাস্তবতায় বিএনপি নিজেরা যেমন ইশতেহার দিয়েছে পাশাপাশি তাদের জোট ঐক্যফ্রন্টও ৩৫ দফা ইশতেহার দিয়েছে। সরকারি চাকরিতে বয়সসীমা উঠিয়ে দেওয়া ছাড়া তাদের ইশতেহার সময়ের প্রেক্ষিতে অনেকটাই মানানসই ও সাবলীল। চাকরিতে বয়সসীমা না থাকলে ক্ষমতায় গেলে ঐক্যফ্রন্ট প্রধান ড. কামাল হোসেন বা মাহমুদুর রহমান মান্নাও সরকারি ক্যাডার সার্ভিসের দাবিদার হতে পারবেন, যেটা চূড়ান্ত রকমের অবাস্তব। রাষ্ট্র পরিচালনায় পরাজিতদের মতামত ও অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা হবে। ডেপুটি স্পিকার হবে বিরোধী দল থেকে। তারা নির্বাচনকালীন সরকারের বিধান তৈরি করবে। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার কার্যক্রম চলমান রাখার পাশাপাশি তালিকা থেকে ভুয়া মুক্তিযোদ্ধাদের বাদ দেওয়া হবে। মতপ্রকাশের অবারিত স্বাধীনতা থাকবে, ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্ট বাতিল হবে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মতপ্রকাশে সরকারি বিধিনিষেধ থাকবে বলে জানিয়েছে ঐক্যফ্রন্ট। এসব অবশ্যই আশা-জাগানিয়া প্রতিশ্রুতি।

ক্ষমতার বাইরে থাকলে ডালা ভরে প্রতিশ্রুতি দেওয়াটা খুব সোজা। তা বাস্তবায়নের চাপ মাথায় থাকে না। কিন্তু ক্ষমতায় গেলে নিজেদের ক্ষমতার মসনদকে পাকাপোক্ত করতে পূর্বঘোষিত প্রতিশ্রুতির কথা আর কেউ মনে রাখে না। তখন বাজিয়ে যেতে হয় পুরোনো কথার চর্বিত চর্বণের ভাঙা রেকর্ড। তাতে আশাহত জনগণের প্রত্যাশার পাখিও আর ডানা মেলে না। তিমির পেরিয়ে দেশটারও কাঙ্ক্ষিত আলোর মুখ দেখা হয় না। তবু ইশতেহারে আমরা খুঁজি আশ্বাস।

লেখক : সংবাদকর্মী, মাছরাঙা টেলিভিশন।

Advertisement