Beta

২০১৮

তাঁরা ছিলেন এখন নেই

২৯ ডিসেম্বর ২০১৮, ১২:২৫

পার্থ সনজয়

বছরজুড়ে চলে যাওয়ার মিছিল একটু একটু করে বড় হয়েছে। তাঁরা হারিয়ে গেছেন মহাকালে। যেন তরঙ্গ মিলায়ে যায় তরঙ্গ উঠে, কুসুম ঝরিয়া পড়ে কুসুম ফুটে। ২০১৮ সালে যে মুখগুলোর শূন্যতা কখনোই পূরণ হবার নয়, তাঁদের নিয়েই এই শ্রদ্ধার্ঘ্য।

শাম্মী আখতার

‘ঢাকা শহর আইসা আমার আশা ফুরাইছে’ কিংবা ‘আমি যেমন আছি তেমন রব বউ হব না রে’র মতো গানের শিল্পী শাম্মী আখতার ৬০ বছর বয়সে মারা যান ১৬ জানুয়ারি। দীর্ঘ ছয় বছর ধরে ক্যান্সারে ভুগছিলেন এই গুণী শিল্পী। আসল নাম শামীমা আখতার হলেও শাম্মী আখতার নামেই তিনি জনপ্রিয় ছিলেন।

শওকত আলী

প্রদোষে প্রাকৃতজনের লেখক শওকত আলী মারা যান ২৫ জানুয়ারি। ৮৩ বছর বয়সী শওকত আলীর লেখায় বারবার উঠে এসেছিল দেশভাগের মানবিক পরিণাম, উন্মূল জীবন এবং উপমহাদেশের সর্পিল ইতিহাসের কথা। তাঁর প্রথম উপন্যাস ‘পিঙ্গল আকাশ’।

ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিণী

মুক্তিযুদ্ধ শেষ হয়েছিল একাত্তরে। কিন্তু তাঁর যুদ্ধ এর পর থেকেই। তিনি মুক্তিযোদ্ধা ও ভাস্কর ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিণী। ৬ মার্চ ৭১ বছর বয়সে প্রকৃতির নিয়মে থেমে গেল অদম্য সংগ্রামী ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিণীর জীবনযুদ্ধ ও শিল্পের সাধনা।

কাকন বিবি

১০৩ বছর বয়সে ২১ মার্চ মারা যান নারী মুক্তিযোদ্ধা বীর প্রতীক কাকন বিবি ওরফে নূরজাহান। ১৯৭১ সালে তিন দিন বয়সী মেয়ে সখিনাকে রেখে যুদ্ধে চলে যান কাকন বিবি। জুনে পাকিস্তানি বাহিনীর কাছে ধরা পড়েন। বাঙ্কারে আটকে দিনের পর দিন তাকে নির্যাতন করে পাকিস্তানি সেনারা। ছাড়া পেয়ে সশস্ত্র যুদ্ধ করেন তিনি। একইসঙ্গে চালিয়ে যান গুপ্তচরের কাজ।

বেলাল চৌধুরী

ষাটের দশকের অন্যতম প্রধান কবি বেলাল চৌধুরী মারা যান ২৪ এপ্রিল ৮০ বছর বয়সে। বেলাল চৌধুরী ছিলেন একাধারে কবি, প্রাবন্ধিক, অনুবাদক ও সাংবাদিক।

মুস্তাফা নূরউল ইসলাম

বিশিষ্ট লেখক, গবেষক, ভাষাসৈনিক ও জাতীয় অধ্যাপক মুস্তাফা নূরউল ইসলাম মারা যান ৯ মে ৯১ বছর বয়সে। তিনি ছিলেন বাংলা ভাষা ও সহিত্যের একজন যশস্বী অধ্যাপক, মননশীল প্রাবন্ধিক এবং এ দেশের সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনে অতিপরিচিত ব্যক্তিত্ব।

তাজিন আহমেদ

ছোট পর্দার তারকা তাজিন আহমেদের অকাল প্রয়াণ ঘটে ২২ মে। মাত্র ৪৩ বছর বয়সে হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে মারা যান এই অভিনেত্রী।

হালিমা খাতুন

১৯৫২-এর ২১ ফেব্রুয়ারি পুলিশের বাধা উপেক্ষা করে যে কজন ছাত্রী রাজপথে নেমে এসেছিলেন তাঁদের অন্যতম হালিমা খাতুন। ৮৬ বছর বয়সে ৩ জুলাই না ফেরার দেশে যান এই ভাষাসংগ্রামী।

রাণী সরকার

ঢাকাই চলচ্চিত্রের সোনালি দিনের নন্দিত অভিনেত্রী রাণী সরকার মারা যান ৭ জুলাই। তিনি দীর্ঘদিন ধরে ফুসফুস ও বার্ধক্যজনিত সমস্যায় ভুগছিলেন। প্রায় ২৫০টিরও বেশি ছবিতে অভিনয় করেন রাণী সরকার। ১৯৬২ সালে চলচ্চিত্রকার এহতেশামুর রহমান পরিচালিত উর্দু চলচ্চিত্র চান্দাতে অভিনয়ের মধ্য দিয়ে চলচ্চিত্রে যাত্রা করা এই অভিনেত্রীর বাবার দেওয়া নাম ছিল মেরী।

গোলাম সারওয়ার

বাংলাদেশের সাংবাদিকতার অন্যতম বাতিঘর গোলাম সারওয়ার মারা যান ১৩ আগস্ট ৭৫ বছর বয়সে। তিনি একজন মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন।

রমা চৌধুরী

‘একাত্তরের জননী’সহ ১৮ গ্রন্থের লেখক, মুক্তিযুদ্ধে নির্যাতনের শিকার নারী রমা চৌধুরী মারা যান ৭৯ বছর বয়সে ৩ সেপ্টেম্বর। একাত্তরে তিনি তাঁর সন্তানকেও হারিয়েছিলেন।

আইয়ূব বাচ্চু

রুপালি গিটার ফেলে ১৮ অক্টোবর গিটারের জাদুকর আইয়ূব বাচ্চু উড়াল দিলেন আকাশে মাত্র ৫৬ বছর বয়সে। সারাদেশ তখন শারদীয় উৎসবে মাতোয়ারা। সকালেই দেশবাসী স্তব্ধ হলো এই প্রয়াণ খবরে। আইয়ূব বাচ্চু বাংলাদেশের ব্যান্ড সংগীতের অন্যতম কাণ্ডারি ছিলেন।

তারামন বিবি

দীর্ঘদিন ধরে ফুসফুসের সংক্রমণ, শ্বাসকষ্ট আর ডায়েবেটিসে ভুগে বিজয়ের মাসের একদিন আগে ৩০ নভেম্বর শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন রণাঙ্গনের মুক্তিযোদ্ধা বীরপ্রতীক তারামন বিবি। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৬২ বছর।

আনোয়ার হোসেন

তিনি একজন মুক্তিযোদ্ধা, একজন ফটোগ্রাফার, একজন সিনেমাটোগ্রাফার। একজন আর্কিটেক্ট। ঈর্ষণীয় এই ক্যামেরা কুশলী আনোয়ার হোসেন ৭০ বছর বয়সে মারা যান ১ ডিসেম্বর।

আমজাদ হোসেন

১৪ ডিসেম্বর ৭৬ বছর বয়সে থেমে গেল কিংবদন্তি চলচ্চিত্রকার আমজাদ হোসেনের সৃষ্টিশীল পথচলা। ব্যাংককে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান এই নির্মাতা, গীতিকার, চিত্রনাট্যকার, অভিনয়শিল্পী ও লেখক। আমজাদ হোসেন দীর্ঘ বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ারে ‘ভাত দে’, ‘গোলাপী এখন ট্রেনে’, ‘সুন্দরী’, ‘দুই পয়সার আলতা’, ‘জন্ম থেকে জ্বলছি’র মতো কালজয়ী অনেক সিনেমা নির্মাণ করেছেন। ‘গোলাপী এখন ট্রেনে’ ও ‘ভাত দে’ চলচ্চিত্রের জন্য শ্রেষ্ঠ পরিচালক হিসেবে পেয়েছেন জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার। নিজেকে ‘রিয়েল ফিল্ম মেকার’ হিসেবে পরিচয় দিতে পছন্দ করতেন বরেণ্য এই নির্মাতা।

সাইদুল আনাম টুটুল

অভিনয়শিল্পী এবং ছোট ও বড় পর্দার বরেণ্য নির্মাতা ও চিত্র সম্পাদক সাইদুল আনাম টুটুল মারা যান ১৮ ডিসেম্বর ৬৮ বছর বয়সে।

বছরজুড়ে এ ছাড়া আমরা হারিয়েছি আরো অনেককে। ১১ জানুয়ারি চলে যান বাংলা চলচ্চিত্রের শক্তিমান ও জনপ্রিয় অভিনেতা সিরাজ হায়দার। ১৮ জানুয়ারি মারা যান বাংলাদেশ মহাকাশ গবেষণা ও দূর অনুধাবন প্রতিষ্ঠান স্পারসোর সাবেক চেয়ারম্যান ও পদার্থবিজ্ঞানী অধ্যাপক আবু আবদুল্লাহ জিয়াউদ্দীন আহমেদ। ‘চোখ যে মনের কথা বলে’র মতো অসংখ্য গানের গীতিকার কাজী আজিজ আহমেদ মারা যান ৩০ জানুয়ারি । ৫ ফেব্রুয়ারি ৯২ বছর বয়সে মারা যান ভাষাসৈনিক গাজী শহীদুল্লাহ। ১৯ ফ্রেব্রুয়ারি অকাল প্রয়াণ ঘটে সংগীতশিল্পী সাবা তানির। বরেণ্য সুরকার ও সংগীত পরিচালক আলী আকবর রুপু ২২ ফেব্রুয়ারি চলে যান না ফেরার দেশে। সাবেক মন্ত্রী ও বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য শামসুল ইসলাম মারা যান ২৬ এপ্রিল ৮৭ বছর বয়সে।

ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস পত্রিকার সম্পাদক মোয়াজ্জেম হোসেন মারা যান ১ আগস্ট। ৬৬ বছর বয়সে ৬ আগস্ট মারা যান  মুক্তিযোদ্ধা ও লেখক মেজর(অব.) কামরুল হাসান ভূঁইয়া। সাবেক তথ্যমন্ত্রী ও বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য তরিকুল ইসলাম মারা যান ৪ নভেম্বর ৭২ বছর বয়সে। ৯৪ বছর বয়সে ১৫ ডিসেম্বর মারা যান ভাষাসৈনিক ও মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক বিমল রায় চৌধুরী। ২০ ডিসেম্বর মারা যান মিডিয়া ব্যক্তিত্ব সরকার ফিরোজ। ২২ ডিসেম্বর ৮৭ বছর বয়সে মারা যান জাতীয় প্রতীকের নকশাকার মোহাম্মাদ ইদ্রিস।

লেখক : সংবাদিক

ইউটিউবে এনটিভির জনপ্রিয় সব নাটক দেখুন। সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের চ্যানেলটি:

Advertisement