Beta

বিশ্বকাপ ক্রিকেট

ধরে দিবানে…

০২ জুলাই ২০১৯, ১০:৩৭ | আপডেট: ০২ জুলাই ২০১৯, ১০:৫০

প্রভাষ আমিন

কিছু তুলনামূলক পরিসংখ্যান দিয়ে শুরু করছি লেখাটি। একদিনের ব্যবধানে সাউদাম্পটনের রোজ বোলে দুটি ম্যাচ হয়েছে। দুটি ম্যাচেই কমন ছিল আফগানিস্তান। ২২ জুন আফগানিস্তানের বিপক্ষে আগে ব্যাট করে ভারত করেছিল ২২৪। ২৪ জুন একই পিচে বাংলাদেশ করেছিল ২৬২। ভারতের বিপক্ষে আফগানিস্তান ২১১ রানে অলআউট হয়েছিল ৪৯.৫ ওভারে। বাংলাদেশের বিপক্ষে অলআউট হয়েছে ৪৭ ওভারে ২০০ রানে। হাড্ডাহাড্ডি লড়াই শেষে হারতে হারতে ভারত জিতেছিল ১১ রানে। প্রায় একতরফা ম্যাচে বাংলাদেশ আরামসে জিতেছে ৬২ রানে। যেহেতু একই পিচে দুদিন আগে-পরে একই দলের বিপক্ষে খেলা হয়েছে, তাই এই তুলনামূলক পরিসংখ্যান আপনি আমলে নিতে পারেন, নাও নিতে পারেন। তুলনামূলক পরিসংখ্যানে বাংলাদেশ এগিয়ে। এই ভেবে আপনি আত্মতৃপ্তি পেতে পারেন। কিন্তু পরিসংখ্যান বা রেকর্ড বা র‌্যাংকিং দিয়ে মাঠের ফলাফল নির্ধারিত হয় না। যদি হতো, তাহলে আর টুর্নামেন্ট আয়োজন করার দরকার ছিল না। র‌্যাংকিংয়ে এক নম্বরে থাকা দলকে চ্যাম্পিয়ন বানিয়ে দিলেই হতো।

বিশ্বকাপের আগে সবাই ধরে নিয়েছিল, এবার স্বাগতিকরা হট ফেভারিট। বিশ্বকাপ আসর বসবে, শেষ হবে আর ইংল্যান্ড শিরোপা নিয়ে যাবে। কিন্তু সেই ইংল্যান্ডের সেমিফাইনালে যাওয়া এখনো অনিশ্চিত। শক্তির বিচারে নিচের দিকে থাকা পাকিস্তান চমকে দিয়েছে বিশ্বকাপকেই। তাই প্রতিটি ম্যাচ আলাদা। প্রতিটি ম্যাচেই লুকিয়ে আছে রহস্য, ক্রিকেটের পরতে পরতে অনিশ্চয়তা। আজ বাংলাদেশ-ভারতের ম্যাচটি একটি নতুন ম্যাচ। মানছি র‌্যাংকিং এবং এবারের বিশ্বকাপের পারফরম্যান্সে ভারত এগিয়ে। কিন্তু কাগুজে এগিয়ে থাকা বা পিছিয়ে থাকায় কিছু যায়-আসে না। মাঠে যেদিন যে ভালো খেলবে, জয় হবে তারই।

এবারের বিশ্বকাপে অপরাজিত থাকা ভারত দুদিন আগে এই এজবাস্টনেই ইংল্যান্ডের বিপক্ষে যেভাবে সম্মানজনক পরাজয় নিশ্চিত করল, তা দেখলেই বোঝা যাবে ক্রিকেটে প্রতিটি ম্যাচ আলাদা। ক্রিকেটের সবচেয়ে পুরোনো লড়াই ইংল্যান্ড-অস্ট্রেলিয়ার। তবে রাজনৈতিক কারণে দুই প্রতিবেশী ভারত-পাকিস্তানের লড়াইয়ে উত্তাপ ছিল সবচেয়ে বেশি। একসময় দুই দল সমানে সমান ছিল। কিন্তু ভারত অনেকদূর এগিয়ে গেছে। নিজেদের আনপ্রেডিক্টেবিলিটি দিয়ে মাঝেমধ্যে চমক সৃষ্টি করে বটে, তবে পাকিস্তান ক্রমশ নিচের দিকে নামছে। তবে ভারত-পাকিস্তান ম্যাচের উত্তেজনাটা ধীরে ধীরে বাংলাদেশ-ভারত ম্যাচে চলে এসেছে। এর অনেকগুলো কারণ আছে। প্রধান কারণ হলো ক্রিকেট নিয়ে দুই দেশের আবেগ-উত্তেজনা। সবাই জানে ক্রিকেট ক্রেজ ভারতে সবচেয়ে বেশি।

কিন্তু আমি দাবি করছি, ক্রিকেট নিয়ে ক্রেজ বাংলাদেশেই বেশি। জনসংখ্যার আনুপাতিক হার হিসাব করলেই আপনিও মানবেন সেটা। ভারতের ১২০ কোটি মানুষ। তাই তাদের আওয়াজ বেশি, বাজার বড়। ক্রিকেট ক্রেজের শীর্ষ দুই দেশ বাংলাদেশ-ভারত লড়াইটা তাই অন্য মাত্রা পেয়েছে। একসময় শক্তির বিচারে বাংলাদেশ অনেকটাই পিছিয়ে ছিল। কিন্তু গত চার বছরে বাংলাদেশে অন্যরকম ক্রিকেট খেলছে। নিজেদের দিনে বাংলাদেশ হারিয়ে দিতে পারে যে কাউকে।

এবারের বিশ্বকাপ বাংলাদেশ শুরু করেছে দক্ষিণ আফ্রিকাকে হারিয়ে। ফেভারিট হিসেবে বিশ্বকাপে আসা দক্ষিণ আফ্রিকার স্বপ্নকে দুঃস্বপ্ন বানিয়ে দিয়েছে বাংলাদেশ। এমন ঘটনা আরো একবার ঘটিয়েছিল বাংলাদেশ। তখন অবশ্য বাংলাদেশ আজকের বাংলাদেশ ছিল না।

২০০৭ সালে ভারত বিশ্বকাপ জেতার স্বপ্ন নিয়ে ওয়েস্ট ইন্ডিজ গিয়েছিল। শচিন, গাঙ্গুলী, শেবাগ, দ্রাবিড়, যুবরাজ, ধোনি, জহির খান, হরভজনদের নিয়ে ভারতের টিমও ছিল দুর্দান্ত ফর্মে। বাংলাদেশের কাছে হেরে গিয়ে ভারতের বিশ্বকাপ স্বপ্ন রীতিমতো হরর মুভিতে পরিণত হয়। ক্রিকেটারদের বাড়িতে হামলা হয়েছিল। ২০০৭ সালের বিশ্বকাপে বাংলাদেশের কাছে পরাজয়টা ভারতীয়রা কখনোই ভুলতে পারেনি। খেলোয়াড়রা হয়তো ভুলে গেছেন, তবে সমর্থকরা পারেননি। বাংলাদেশের সঙ্গে খেলা হলে তাই ভারতীয়রা বাড়তি টেনশনে থাকে। বাংলাদেশ-ভারত ম্যাচে উত্তেজনার বারুদ ঠাসা হয় ২০১৫ বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে। প্রথমবার বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে খেলতে গিয়ে শক্তিশালী ভারতের মুখোমুখি হয় বাংলাদেশ। সেই ম্যাচটি বাংলাদেশ হেরে গিয়েছিল। হারতেই পারে। কিন্তু সেই ম্যাচে নির্লজ্জ আম্পায়ারিংয়ে বাংলাদেশকে হারিয়ে দেওয়া হয়েছিল বলে বিশ্বাস করেন অনেকে। মাঠের খেলায় হারলেও সেই ম্যাচে নৈতিক জয় পেয়েছিল বাংলাদেশ। আমি সেই ম্যাচটিকে বলি বাংলাদেশ ক্রিকেটের টার্নিং পয়েন্ট। ভারতের বিপক্ষে পাওয়া সেই নৈতিক জয় থেকেই বাংলাদেশের স্বপ্নযাত্রা শুরু হয়। সেই থেকে গত চার বছর অন্যরকম ক্রিকেট খেলছে বাংলাদেশ।

এবারের বিশ্বকাপে ভারতও দারুণ ক্রিকেট খেলছিল। রোববারের আগ পর্যন্ত ভারত ছিল একমাত্র অপরাজিত দল। রোববার ভারত-ইংল্যান্ড খেলা দেখেছি মিশ্র অনুভূতি নিয়ে। বাংলাদেশের স্বার্থে চেয়েছিলাম ইংল্যান্ড হারুক। কিন্তু ভারতের মধ্যে জেতার কোনো চেষ্টাই দেখিনি। ৩৩৮ তাড়া করতে যেমন স্টার্ট দরকার ছিল, তা তো হয়ইনি; বরং ইনিংসজুড়েই ছিল সম্মানজনক পরাজয় নিশ্চিত করার চেষ্টা। ইংলিশ ব্যাটসম্যানরা যেখানে ১৩টি ছক্কা মেরেছে, সেখানে ভারতের একমাত্র ছক্কাটি মেরেছেন ধোনি। এর আগের ম্যাচে আফগানিস্তান উড়তে থাকা ভারতকে নাগালে নিয়ে এসেছিল, ইংল্যান্ড তাকে মাটিতে নামিয়ে আনে। পরপর দুই ম্যাচে ভারতকে ধুঁকতে দেখাটা ছিল দারুণ আনন্দদায়ক। এখানেই আমার আশাবাদের শিকড়। ভারত যে অজেয় নয়, তা প্রমাণিত হয়ে গেছে।

আজ ভারতের আত্মবিশ্বাসের শেকড় ধরে টান দেবে বাংলাদেশ। কিন্তু শুধু আবেগ দিয়ে, দেশপ্রেম দিয়ে ভারতের মতো শক্তিশালী প্রতিপক্ষকে কাবু করা সম্ভব নয়। কিন্তু সেমিফাইনালের স্বপ্ন বাঁচিয়ে রাখতে হলে বাংলাদেশকে জিততে হবেই। আর এই কঠিন কাজটি সম্ভব করতে নিজেদের সেরা খেলাটা খেলতে হবে আমাদের। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচটি বাদ দিলে এবারের বিশ্বকাপে বাংলাদেশের পারফরম্যান্স নিয়ে আমি সন্তুষ্ট। বাংলাদেশের ব্যাটিং এবারের বিশ্বকাপেরই অন্যতম সেরা। আগে ব্যাট করে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে, পরে ব্যাট করে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ৩০০ প্লাস রান করেছে। তারপরও আমি মনে করি, বাংলাদেশের ব্যাটিং এখনো তার সেরাটা দিতে পারেনি। তামিমের পুরোটা দেখেনি বিশ্ব। সৌম্য তার ঝড়কে আরো বড় করার সামর্থ্য রাখেন। গত বিশ্বকাপে পরপর দুটি সেঞ্চুরি করা মাহমুদুল্লাহ লড়াই করছেন ইনজুরির সঙ্গে। ব্যাটিং নিয়ে ভয় নেই। কিছুটা শঙ্কা বোলিং নিয়ে।

এবারের বিশ্বকাপে বাংলাদেশের একজন স্ট্রাইক বোলারের ঘাটতি রয়েছে। তবে নিজের প্রথম সিরিজে একাই ভারতকে ধসিয়ে দেওয়া মুস্তাফিজ এখনো জ্বলে উঠতে পারেননি। তবে এবার বাংলাদেশকে একাই টেনে নিচ্ছেন সাকিব আল হাসান। তাঁর অতিমানবীয় অলরাউন্ড পারফরম্যান্স অবাক বিস্ময়ে দেখছে গোটা বিশ্ব। সাকিবের এই অন্য গ্রহের ক্রিকেট খেলার পেছনে অনেকে আইপিএলের অবদান দেখেন। না, সেখানে তিনি কিছু করার সুযোগ পাননি। সানরাইজার্স হায়দরাবাদ দিনের পর দিন তাঁকে বসিয়ে রেখেছে। এই উপেক্ষাই সাকিবকে তাতিয়ে দিয়ে থাকবে। এই সময়টা তিনি দিনের পর দিন নিবিড় অনুশীলন করেছেন। নিজেকে আরো ফিট করেছেন। সাকিব যদি আইপএলের জবাব বিশ্বকাপে দিতে চান, তাহলে পুড়ে মরতে পারে ভারত। তবে একটা কথা বারবার বলছি, বোলিংয়ের ঘাটতি ফিল্ডিংয়ে পুষিয়ে দেওয়া সম্ভব। কিন্তু ওয়েস্ট ইন্ডিজের সঙ্গে ম্যাচটি ছাড়া বাকি সব ম্যাচেই ফিল্ডিং খারাপ ছিল। ব্যাটিং নিয়ে সমস্যা নেই। বোলিং রাতারাতি পাল্টানো যাবে না। কিন্তু চাইলেই ফিল্ডিং ভালো করা সম্ভব। আবেগ, মনোযোগ, ভালোবাসা দিয়েই ফিল্ডিং বদলে দেওয়া সম্ভব। আর মাঠে ভালো ফিল্ডিং করলে পুরো দল চাঙ্গা হয়ে যায়। ভারতের বিপক্ষে জয়টা কঠিন কিন্তু অসম্ভব নয়।

ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের পার্থক্যটা অভিজ্ঞতায়। ২০০৭ সালের যে ম্যাচের কথা বলা হচ্ছে, ভারতের ড্রেসিংরুমে সে ম্যাচের স্মৃতি আছে একজনের, এম এস ধোনি। এবার যার পারফরম্যান্স নিয়ে সমালোচনার শেষ নেই। আর বাংলাদেশ দলের চারজন সেই জয়ের সুখস্মৃতি স্মরণ করতে পারবেন—তামিম, সাকিব, মুশফিক ও মাশরাফি। প্রথম তিনজনই ফিফটি করেছিলেন। তবে ম্যান অব দ্য ম্যাচ মাশরাফি ৪ উইকেট নিয়েছিলেন ৩৮ রানে। মাষশরাফির সেই ধার আর নেই এবার। তবু আগের ছয় ম্যাচে মাত্র একটি উইকেট নেওয়ার গ্লানি ঘোচাতে চাইবেন পুরোনো প্রতিপক্ষকে পেলে। আগেই বলেছি, অতীত আর স্মৃতি রোমন্থন করে ম্যাচ জেতা যায় না। তবে ভারতকে সামনে পেলে বাংলাদেশ অন্যরকম উজ্জীবিত হয়।

২০০৭ সালের ম্যাচের আগে মাশরাফির বলা একটি অনানুষ্ঠানিক উক্তি বাংলাদেশ ক্রিকেট রূপকথার অংশ হয়ে আছে। ভারতের ম্যাচের আগে তিনি নড়াইলের আঞ্চলিক উচ্চারণে বলেছিলেন, ধরে দিবানে। ভারতের সঙ্গে ম্যাচ হলেই আমার সেই কথাটি মনে হয়। বিশ্বকাপের ডু অর ডাই ম্যাচে ভারতকে ধরে দিতেই হবে। ধরে দেওয়ার সূত্রটা সহজ। এজবাস্টনে যে পিচে পরশু ভারত-ইংল্যান্ড ম্যাচ হয়েছে, সেখানে হবে আজকের ম্যাচ। ভারতীয় বোলারদের ১৩টি ছক্কা মেরেছে ইংলিশ ব্যাটসম্যানরা। এটা মাথায় রাখতে পারে তামিম, সৌম্য, লিটন আর মোসাদ্দেকরা।

বুমরাহকে একটু দেখেশুনে খেলতে হবে। বাকিদের ছাতু বানানো সম্ভব। টসে জিতলেই ম্যাচ অর্ধেক জেতা হয়ে যাবে। আগে ব্যাট করো, রানের পাহাড় বানাও, প্রতিপক্ষকে চাপে রাখো। আবারও বলছি, ভারত শক্তিশালী কিন্তু অজেয় নয়। তাদের হারানো কঠিন কিন্তু অসম্ভব নয়। খালি নিজেদের উজাড় করে দিতে হবে। শতভাগের চেয়েও বেশি দিতে হবে। বিশ্বকাপে বাংলাদেশের কাছে অনেকের অনেক রকম প্রত্যাশা। কেউ চান সেমিফাইনাল, কেউ মনে করেন সেমিফাইনালে গেলে ফাইনাল নয় কেন, শিরোপা নয় কেন। আমার চাওয়া আরো বেশি। আমি এক বিশ্বকাপে দুটি শিরোপার আনন্দ চাই। ভারতকে হারালে বিশ্বকাপের একটি শিরোপা জয়ের আনন্দ পাব। ৫ জুন দ্বিতীয় শিরোপা জিততে চাই পাকিস্তানকে হারিয়ে। আর কিচ্ছু চাই না।

লেখক : সাংবাদিক ও কলাম লেখক।

Advertisement