Beta

মানুষ কেন এমন করে?

২৯ জুলাই ২০১৯, ১২:২৩

গণপিটুনির ঘটনাগুলো যত আলোচনায় আসছে, ততই একদল মানুষ বলে চলেছেন, সমাজ রসাতলে গেছে, মূল্যবোধ বলে আর কিছু নেই বলেই এমনটা ঘটছে। কিন্তু বাস্তবটা কি তাই? গণপিটুনি আমাদের অনেক পুরোনো রোগ। বহু আগে থেকেই গণপিটুনি আমাদের মানুষের কাছে এক ‘গণবিনোদন’। তাই হঠাৎ করে মূল্যবোধ শেষ হয়ে গেছে—এ কথা বলার জো নেই।

অজপাড়াগাঁয়ে নয়, খোদ রাজধানীতে, গুলশানের কাছে বাড্ডায়, রেনু নামের এক অতি নিরীহ একজন নারীকে যেভাবে সম্মিলিতভাবে প্রকাশ্যে হত্যা করা হয়েছে, সেই লজ্জা ও গ্লানি অনেকের মন থেকে কখনো মুছে যাবে না। এর মাত্র কিছুদিন আগে বরগুনায় প্রকাশ্যে গণভাবে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে এক তরুণকে তাঁরই স্ত্রীর সামনে। তাঁর স্ত্রী লড়াই করেছে, কিন্তু কেউ এগিয়ে আসেনি। এমন অসংখ্য নিষ্ঠুরতার কাহিনী বলা যাবে, যেসব ঘটনা আলোচনায় এলেই আমরা আলোচনা করি সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয় নিয়ে।

কিন্তু সত্যিকার অর্থে বাংলার এই জমিনে হিংস্রতা নতুন কিছু নয়। তবুও একটি করে ঘটনা ঘটলে আমরা বলতে থাকি, বলার চেষ্টা করি যে সমাজের মধ্যে গভীরভাবে চিন্তন করার সময় এসেছে। ভাবতে চাই কেন এমন হয়? এবার যে দেশব্যাপী গণপ্রহারের ঘটনা ঘটেছে, এর মধ্য পরিকল্পিত উপাদান আছে। পদ্মা সেতুবিরোধী চক্রটি, যারা শুরু থেকে এই সেতুবিরোধী, তারা ছড়িয়ে দিয়েছে এই সেতুর জন্য কল্লা লাগবে এবং কল্লা কাটারা স্কুলের সামনে, হাটে-বাজারে ঘুরে বেড়াচ্ছে। এর একটি উদ্দেশ্য ছিল, মানুষকে সেতুর বিরুদ্ধে উসকে দেওয়া। 

নিতান্ত অশিক্ষা ও কুসংস্কারের বশবর্তী হয়ে ছেলেধরা সন্দেহে কোনো একজনকে পিটিয়ে মারা সভ্য সমাজে কেউ কল্পনাও করতে পারবে না। আমাদের এত এত অর্থনৈতিক উন্নয়নের পরও মানুষ কেন এমন কুসংস্কারে আচ্ছন্ন হয়ে এমন বর্বর আচরণ করে, সে এক বড় জিজ্ঞাসা। আমরা যে চিরাচরিত জীবনযাত্রা বা সমাজব্যবস্থাকে দায়ী করছি, তা আসলে ঠিক সে রকম নয়। সমস্যাগুলোকে এত সরলীকরণ করলে গলদ থেকে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। এই সমস্যাগুলোর সঙ্গে আমাদের সমাজের ভেতর ও বাইরের আর্থিক, সামাজিক, ধর্মীয় ও রাজনৈতিক নানা কারণ জড়িয়ে আছে।

কুসংস্কার জন্ম নেয় ধর্মীয় গোঁড়ামি থেকে। আর আমরা দেখছি সভ্যতার মহাসড়ক সামাজিক মাধ্যমে এ দেশের একশ্রেণির অসভ্য কীভাবে বিচরণ করছে। ফেসবুক আর ইউটিউবে সাম্প্রদায়িকতা ছড়াচ্ছে, নারীর বিরুদ্ধে বিদ্বেষ ছড়াচ্ছে। আমরা যখন সেইসব বিষোদগারকে নীরবে মেনে নিই, এই ভেবে যে এরা পরাক্রমশালী, এদের কিছু বলা যাবে না, তখন সমাজে জায়গা  করে কুসংস্কার আর কুসংস্কারকে ভর করে বেড়ে ওঠে হিংস্রতা।

লক্ষণীয়, এই ধরনের অসামাজিক ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির কাজে যারা লিপ্ত হচ্ছে, তাদের বেশির ভাগের বয়স কুড়ি-পঁচিশের মধ্যে। এই সমাজের ছেলেমেয়েদের সামনে আধুনিক শিক্ষার অবারিত সুযোগ থাকার পরও কেন এমন হলো? মূল্যবোধের প্রসঙ্গটা প্রাসঙ্গিক হয়, যখন আমরা পরিবারে প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিবেচনা করব। একসময় যেভাবে শৈশব থেকে পারিবারিক ও সামাজিকভাবে ছেলেমেয়েরা প্রশিক্ষিত হতো, নিজেদের একটা স্বীকৃত সামাজিক মূল্যবোধের শরিক করে নিত, সেটা ক্রমবিলীয়মান। আমাদের ছেলেমেয়েরা পড়ছে, বড় বড়, দামি দামি স্কুল, কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়েই পড়ছে; কিন্তু বেড়ে উঠছে শিক্ষাহীন, মূল্যবোধহীন এক অক্ষমতা নিয়ে। নতুন আর পুরোনোর মধ্যে যে শিক্ষা, সেটা আমরা দিতে পারিনি বলেই ঢাকা, চট্টগ্রামসহ বড় শহরে গড়ে ওঠে কিশোরদের গ্যাং কালচার।

একটু দেরিতে হলেও পুলিশের দৃঢ় নিয়ন্ত্রণ ঘটনা যেভাবে শুরু হয়েছিল, তাতে রাশ টানতে সক্ষম হয়েছে। তবে গণপ্রহারের বিভিন্ন সংবাদে জনমানসে বিভীষিকা, ক্ষোভ এবং ভয়ের পরিবেশের ছাপ এখনো স্পষ্ট। সমাজে আইন আছে, আইন প্রয়োগকারী কর্তৃপক্ষও আছে, তবুও পরিস্থিতি দেখলে মনে হয় সমাজ চলছে খানিক স্বয়ংক্রিয়ভাবে, খানিক অভ্যাসে, খানিকটা অমানবিকতায়। গণপিটুনি যেভাবে ঘটাতে শুরু করেছিল, তা ভয়ংকর। এটি নৈরাজ্য এবং নৈরাজ্য এক ধরনের গৃহযুদ্ধ। তাকে বলপ্রয়োগ করেই থামাতে হয়। একদিক হলো দৃঢ় প্রশাসনিক কর্তৃত্ব, অন্যদিক হলো সমাজকে আলোকিত করার পথ প্রশস্ত করা।

সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পথে কীভাবে মানুষকে পরিবর্তিত করা যায়, কীভাবে অবৈজ্ঞানিক ও কুসংস্কারের ভাবনা থেকে সরিয়ে আনা যায়, সে পথে এগোনো। আর এ জন্য সামাজিক রূপান্তরের অভিমুখী প্রশাসনিক দৃঢ়তা চাই, যা আসবে রাজনৈতিক নেতৃত্বের হাত ধরে। নিপীড়ন, হিংস্রতা ও কুসংস্কারের এই ব্যাপক উপস্থিতিতে শুধু প্রশাসনিক দৃঢ়তায় কতটা বন্ধ হবে বলা শক্ত। ন্যায়বিচার ব্যবস্থা অথবা আইনের শাসন চাই। আর সেটা করতে গেলে ঠিক রাজনীতিটা চাই। সত্যটা হলো, আমাদের পুরোনো আলো নিভে গেছে, কিন্তু নতুন আলো জ্বালাতে পারিনি। সেটা পারতে হবে আলোকিত রাজনীতি দিয়ে।

লেখক : প্রধান সম্পাদক, জিটিভি ও সারাবাংলা

Advertisement