পূজার ছুটিতে
চলুন যাই বাঁকুড়ার বিষ্ণুপুরে

চোখের সামনে লাল মাটির কাঁকুরে পথ, সঙ্গে রাস্তার দুই পাশে টুকরো টুকরো ইতিহাস আর ছিন্নমস্তার মন্দির। একদিন এখান থেকেই শুরু হয়েছিল বাংলা টপ্পা খেয়ালের পথচলা। এবার শীতের আগে পশ্চিমবঙ্গের সেই লোভনীয় পর্যটনস্থল বাঁকুড়া জেলার বিষ্ণুপুরে ঘুরে আসতে পারেন মাত্র এক সপ্তাহের ছুটি হাতে নিয়ে। গ্রীষ্মের দাবদাহে বাঁকুড়ার বিষ্ণুপুরের লাল মাটি যতই আগুন ঝরাক না কেন, এই সময়টা কিন্তু ভ্রমণার্থীরা বেছে নিতেই পারেন বিষ্ণুপুরকে।
বিষ্ণুপুরের ইতিহাস
চোদ্দ শতকে ২৯তম মল্লরাজ জগতমল্ল বাঁকুড়ার বিষ্ণুপুরে রাজধানী গড়েন ও বৈষ্ণবাচার্য শ্রীনিবাসের প্রেমে পড়ে বৈষ্ণব ধর্ম গ্রহণ করে মদনমোহন পূজার সূত্রপাত ঘটান। বীরত্ব আর মল্লযুদ্ধে দক্ষতার জন্য মল্ল শিরোপায় ভূষিত হয়েছিলেন রঘুনাথ। তখন থেকেই শকাব্দ, বঙ্গাব্দের মতো মল্লাব্দের সূচনা হয়েছিল। বীর মল্লরাজ রঘুনাথের হাতেই মল্লভূমের প্রতিষ্ঠা বলে স্বীকার করে নেওয়া হয়। শুধু বীরত্বের জন্যই নয়, তাঁর রাজত্বেই গড়ে উঠেছিল জগদ্বিখ্যাত লাল পোড়ামাটির অনবদ্য শৈল্পিক সৃষ্টি টেরাকোটার শ্যাম রায়, কালাচাঁদ মন্দির, জোড়বাংলা। পরবর্তীকালে বিষ্ণুপুর দুর্গ তৈরি করেন রাজা বীর সিংহ। রঘুনাথের আমলেই বিষ্ণুপুরের সংগীত খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে চারদিকে। বাংলা সাহিত্যের প্রাচীন প্রেমকাহিনী আছে এই রঘুনাথকে ঘিরে। জানা যায়, বরোদার পাঠান রহিম খাঁকে খুন করে সেখানকার সব লুট করা ধনরত্নের সঙ্গে রহিম খাঁর অসাধারণ রূপসী বেগম নর্তকী লালবাঈকে রঘুনাথ নিয়ে আসেন এই বিষ্ণুপুরে। নর্তকী লালবাঈয়ের রূপ-সৌন্দর্যে ভুলে রাজকাজও ভুলতে থাকেন রঘুনাথ। শুধু তাই নয়, লালবাঈয়ের মোহে ইসলাম ধর্মের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে তাঁর প্রজাদেরও ইসলাম ধর্মে ধর্মান্তর করাতে শুরু করেন রঘুনাথ। রঘুনাথের এই আচরণে ক্ষুব্ধ হন রঘুনাথের প্রথম স্ত্রী। একদিন তিনি স্বামী রঘুনাথকে হত্যা করেন এবং সেইসঙ্গে বিষ্ণুপুরের আটটি বাঁধের অন্যতম বাঁধ লালবাঁধের দীঘির পানিতে লালবাঈকে ডুবিয়ে মেরে ফেলে স্বামী রঘুনাথের সঙ্গে জ্বলন্ত চিতায় সতী হন পতিঘাতিনী রঘুনাথের স্ত্রী।
বিষ্ণুপুরে যা দেখবেন
মূলত তিনধর্মী পোড়ামাটির ভাস্কর্যে বিষ্ণুপুরের মন্দিরগুলো তৈরি—দেউল, চালা ও রত্ন। এখানকার টেরাকোটার মন্দির গাত্রের রামায়ণ, কৃষ্ণলীলার বিভিন্ন আখ্যান, ফুল, ফল, লতাপাতা, পশুপাখি শিকারের মোটিভ দিয়ে ঘেরা। এই অঞ্চলের মদনগোপাল, রাধামাধব, কালাচাঁদ, লালজি, রাধাশ্যাম মন্দিরগুলো ল্যাটেরাইট পাথর দিয়ে তৈরি। আর মদনমোহন, জোড়বাংলা, শ্যাম রায় ইটের তৈরি। মল্ল রাজাদের এসব অসামান্য কীর্তিতে শিল্পসংস্কৃতি ও সভ্যতার এক পীঠস্থান হয়ে ওঠে বাঁকুড়ার এই বিষ্ণুপুর। বিষ্ণুপুরের সংগীত ঘরানা আজও জগৎশ্রেষ্ঠ। যদুভট্ট থেকে শুরু করে জ্ঞান গোস্বামী, রাধিকাপ্রসাদ সমৃদ্ধ করেছেন বিষ্ণুপুরকে। বিষ্ণুপুরের ট্যুরিস্ট লজের পেছনে ১৭৪২ খ্রিস্টাব্দে এক লাখ ৮৫ হাজার টাকায় তৈরি ‘দলমাদল’ কামানটি কিংবদন্তি হয়ে আজও রয়েছে। কথিত আছে, কুলদেবতা মদনমোহন স্বয়ং এই কামান দেগে বর্গি হানা দমন করেছিলেন। বর্গির দল আর মর্দনকারী কামান। তাই কামানের নাম দেওয়া হয় ‘দলমর্দন’, যা কালে কালে অপভ্রংশ হতে হতে নাম হয়েছে ‘দলমাদল’। এর কিছু দূরেই রয়েছে ছিন্নমস্তার মন্দির। রয়েছে শ্রীরামকৃষ্ণ মিশন আশ্রয় এবং সর্বমঙ্গলা মন্দির।
কীভাবে যাবেন
শহর কলকাতা থেকে মাত্র ১৫০ কিলোমিটার দূরে লাল পোড়ামাটির স্বর্গরাজ্য এই বাঁকুড়ার বিষ্ণুপুর। কলকাতার ধর্মতলাসংলগ্ন শহীদ মিনার চত্বর থেকে প্রতিদিন ভোর ৬টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত ঘণ্টায় ঘণ্টায় বাস ছাড়ে বিষ্ণুপুরের পথে। সোয়া চার থেকে সাড়ে চার ঘণ্টার মধ্যেই পৌঁছে যাওয়া যায় বিষ্ণুপুরে। ভাড়া ১০০ থেকে ১৫০ রুপির মধ্যে।
এ ছাড়া ভোর ৬টায় হাওড়া স্টেশন থেকে হাওড়া-পুরুলিয়া এক্সপ্রেসে সকাল ১০টা থেকে সাড়ে ১০টার মধ্যে পৌঁছে যাওয়া যায় বিষ্ণুপুরের লাল মাটিতে।
কোথায় থাকবেন
ছোট থেকে মাঝারি বিভিন্ন হোটেলের ছড়াছড়ি বাঁকুড়ার বিষ্ণুপুর শহরজুড়ে। ভাড়া ৪০০ থেকে এক হাজার রুপির মধ্যে। এ ছাড়া কম খরচে থাকার জন্য রয়েছে পশ্চিমবঙ্গের ট্যুরিজমের লজ, যা কলকাতা থেকে যাওয়ার আগেই বুকিং করে যাওয়া ভালো। খাওয়া-দাওয়ার খরচ প্রায় কলকাতার মতোই। মাছ-ভাত দিয়ে ১০০ থেকে ১৫০ রুপির মধ্যেই পাওয়া যায় মোটামুটি রুচিসম্মত খাবার। বিষ্ণুপুর থেকে বিভিন্ন জায়গায় বেড়ানোর জন্য রয়েছে রিকশা, অটো, গাড়ি; যা খুব সহজেই পাওয়া যায়। কলকাতা থেকে জনপ্রতি হাজার তিনেক রুপি সঙ্গে নিয়ে অনায়াসেই এক বা দুই দিনের জন্য ঘুরে আসতে পারেন বাঁকুড়ার টেরাকোটার স্বর্গ বিষ্ণুপুরে।