Beta

গোলানকে ইসরায়েলের ভূখণ্ড হিসেবে প্রত্যাখ্যান করল আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়

২৭ মার্চ ২০১৯, ১০:৫২

অনলাইন ডেস্ক
গোলান মালভূমিকে ইসরায়েলি ভূখণ্ড হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের স্বীকৃতির বিরুদ্ধে সিরিয়ার জনগণের বিক্ষোভ। ছবি : সংগৃহীত

সিরিয়ার গোলান মালভূমিকে ইসরায়েলি ভূখণ্ড হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র আনুষ্ঠানিকভাবে যে স্বীকৃতি দিয়েছে, তা প্রত্যাখ্যান করেছে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়।

গত সোমবার ওয়াশিংটনে ঘোষণাপত্রে স্বাক্ষর করে গোলানকে ইসরায়েলের ভূখণ্ড হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দেন মার্কিন প্রেডিসেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।

১৯৬৭ সালের আরব-ইসরায়েল যুদ্ধে সিরিয়ার কাছ থেকে দখল করা গোলান মালভূমিতে ইসরায়েলের সার্বভৌমত্বের স্বীকৃতিকে প্রত্যাখ্যান করেছে উপসাগরীয় দেশ সৌদি আরব, বাহরাইন, কাতার, কুয়েত ও ইরান।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের স্বীকৃতির পর জাতিসংঘের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, এ ইস্যুতে তাদের আগের অবস্থানের কোনো পরিবর্তন হয়নি।

ইউরোপীয় ইউনিয়নও ট্রাম্পের স্বীকৃতি প্রত্যাখ্যানের ঘোষণা দিয়েছে।

সংবাদমাধ্যম ওয়াশিংটন পোস্ট জানায়, জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের সদস্য ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্য ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য, জার্মানি, পোল্যান্ড ও বেলজিয়ামের রাষ্ট্রদূত এক যৌথ বিবৃতি দিয়েছে। ওই বিবৃতিতে তারা জানান, গোলান মালভূমিতে ইসয়ায়েলের সার্বভৌমত্ব অস্বীকার করে তারা, যেটি ১৯৬৭ সালে দখল করেছিল ইসরায়েল।

বিষয়টি নিয়ে জাতিসংঘে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন তুরস্কের প্রেসিডেন্ট। চীন, রাশিয়া, কানাডা ও লেবাননও ট্রাম্পের স্বীকৃতি প্রত্যাখ্যান করে বলেছে, গোলান মালভূমিতে ইসরায়েলি দখলদারিত্ব স্বীকার করে না তারা।

এদিকে গতকাল মঙ্গলবার যুক্তরাষ্ট্রের স্বীকৃতির বিরুদ্ধে বিক্ষোভ সমাবেশ করেছে সিরিয়ার জনগণ। বিভিন্ন দেশে প্ল্যাকার্ড, ফেস্টুন হাতে এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদে নেমেছে তারা।

এদিকে ডোনাল্ড ট্রাম্পের স্বীকৃতিকে ‘ঐতিহাসিক’ বলে মন্তব্য করেছেন ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু।

সংবাদমাধ্যম বিবিসি জানায়, ঘোষণাপত্রে স্বাক্ষরের সময় আগামী মাসে জাতীয় নির্বাচনের মুখোমুখি হতে যাওয়া ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের পাশে ছিলেন। এর মধ্য দিয়ে গোলান প্রশ্নে বিগত কয়েক দশক ধরে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান বদলে দিলেন ট্রাম্প।

এদিকে সিরিয়া এ ঘটনাকে দেশটির সার্বভৌমত্বের প্রতি ট্রাম্পের অবমাননা হিসেবে অভিহিত করেছে। সম্ভাব্য যে কোনো মূল্যেই গোলান মালভূমি পুনরুদ্ধার করা হবে বলে জানিয়েছে দেশটি।

কিন্তু ঘোষণাপর্বে উপস্থিত সাংবাদিকদের নেতানিয়াহু জানিয়েছেন, তারা কোনোভাবেই গোলান বেহাত হতে দেবেন না। ট্রাম্পের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘এমন সময় আপনার এ ঘোষণা এলো, যখন অন্য যেকোনো সময়ের চেয়ে ইসরায়েলের নিরাপত্তার জন্য এটি বেশি দরকার ছিল।’

‘ইসরায়েল আত্মরক্ষার এক যুদ্ধের মধ্য দিয়ে গোলান জয় করে। এখানে রয়েছে ইহুদিদের হাজার বছরের শেকড়।’

এদিকে ট্রাম্প গোলান প্রশ্নে ইসরায়েলের এ স্বীকৃতি অনুমোদন করলেও, অন্য কোনো দেশ এ ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্রকে অনুসরণ করার সম্ভাবনা প্রায় ক্ষীণ।

সিরিয়ার রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম সানা দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বরাত দিয়ে জানায়, ‘এটি আন্তর্জাতিক মহলের জন্য এক লজ্জাজনক ঘটনা।’

সিরিয়ার চলমান সংঘাতে দেশটির প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদকে সমর্থন করা রাশিয়া এ ঘটনার ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়ায় সতর্ক করেছে যে, এটি মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলকে নতুন করে উত্তেজনাকর পরিস্থিতির দিকে নিয়ে যেতে পারে।’

অন্যদিকে সিরিয়ার বিরোধীপক্ষকে সমর্থনকারী তুরস্ক জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের ‘অসম্ভব’ এ ঘোষণা মেনে নেওয়া যায় না। এর বিরুদ্ধে জাতিসংঘে অভিযোগ জানানোর কথা জানায় তারা।

১৯৬৭ সালে ছয় দিনের এক যুদ্ধে গোলান ছিনিয়ে নেওয়ার পর ১৯৮১ সালে কোনো ধরনের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি ছাড়াই ইসরায়েল একপাক্ষিকভাবে গোলানকে নিজেদের ভূমি হিসেবে দখল করে নেয়।

ইসরায়েলের দখল করা গোলাম মালভূমিতে প্রায় ৩০টি বসতির মাধ্যমে ২০ হাজারের বেশি ইহুদি বসবাস করছে। এ ছাড়া এখানে প্রায় ২০ হাজার সিরীয় বসবাস করে যাদের অধিকাংশই দ্রুজ সম্প্রদায়ের।

কৌশলগতভাবে সিরিয়া-ইসরায়েল উভয়ের কাছেই গোলান মালভূমি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সিরিয়ার রাজধানী দামেস্ক থেকে মাত্র ৬০ কিলোমিটার পুবে এর অবস্থান। গোলানের উঁচু স্থান থেকে সহজেই দামেস্কের ওপর নজর রাখা যায়, যা সিরিয়ার জন্য হুমকি স্বরূপ।

এ ছাড়া গোলান মালভূমি পানি সরবরাহের অন্যতম একটি উৎস। এখান থেকেই ইসরায়েলে ব্যবহৃত মিঠাপানির তিন ভাগের প্রায় এক ভাগ জোগান দেওয়া হয়। এটি একটি ঊর্বর ভূমি। তাই চাষাবাদের জন্যও বিশেষ উপযোগী।

যেকোনো মূল্যে সিরিয়া গোলান সমস্যা সমাধানে সচেষ্ট ছিল। ২০০৩ সালে সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদ নদী চুক্তির উদ্যোগ নিলেও তা ভেস্তে যায়। ২০০৮ সালে তুরস্কের মধ্যস্থতায় শান্তি আলোচনা আবার শুরু হয়। কিন্তু ২০০৯ সালে বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হলে শান্তি আলোচনা বন্ধ হয়ে যায়। ২০১১ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা শান্তি আলোচনার উদ্যোগ নিলেও সিরিয়ায় গৃহযুদ্ধ শুরু হওয়াতে এ উদ্যোগও ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়।

Advertisement