Beta

কিশোর উপন্যাস

তৃতীয় পরিচ্ছেদ

ঘুণে খাওয়া বাঁশি

২৫ জানুয়ারি ২০১৭, ১৭:৪৪ | আপডেট: ২৫ জানুয়ারি ২০১৭, ১৭:৫৮

আলম শাইন

জায়গির মাস্টারের পুরো নাম ইমরুল হাসান। দ্বাদশ শ্রেণির ছাত্র। ইমরুল যে  কলেজের ছাত্র সেটি রাজাপুকুরের পার্শ্ববর্তী কৃষ্ণপুর গ্রামে অবস্থিত। দারুণ এক মনোরম পরিবেশে কলেজের অবস্থান। চারপাশে চওড়া খাল, মধ্যখানে টিন-কাঠের তৈরি কলেজ ভবন। সামনে খেলার মাঠ লাগোয়া বিশাল জলাশয়। জলাশয়ের শেষপ্রান্তে ফসলের ক্ষেত। ক্ষেতের চারপাশটায় নারিকেল গাছের বেষ্টনী। কলেজে প্রবেশ পথের দু’ধারে শিমুল আর কৃষ্ণচূড়ার সারি। ফাল্গুনের মাঝামাঝিতে যখন গাছের মাথায় লাল টকটকে মোচাকৃতির শিমুল ফুলের সঙ্গে কৃষ্ণচূড়া মিশে একাকার হয়ে যায়, তখন দূর থেকে মনে হয় বুঝি কেউ মখমলের লাল চাদর ঝুলিয়ে রেখেছে। তার ওপর ঝরা ফুলগুলো যখন রাস্তায় গড়াগড়ি খায় তখন মনে হয় লালগালিচা বিছিয়ে কাউকে সাদর সম্ভাষণ জানাতে মস্ত আয়োজন করা হয়েছে। আবার চৈত্র-বৈশাখের ভিন্নরূপ। শিমুল ফল ফেটে ধবধবে সাদা তুলা যখন ধীরে ধীরে সাঁতরিয়ে নিচে নামতে থাকে তখন মনে হয় যেন রীতিমতো তুষার ঝড় বইছে। সেই এক মনোহারী দৃশ্যের অবতারণা ঘটে তখন কলেজ প্রাঙ্গণে। এমনই এক নান্দনিক পরিবেশে কলেজের অবস্থান।

হিজলতলা থেকে বেশ খানিকটা দূরে কলেজটি। প্রায় পাঁচ কিলোমিটার দূরত্ব। আবার হিজলতলা থেকে ইমরুল হাসানের বাড়িও কম দূরে নয়, প্রায় ছয়-সাত কিলোমিটার। অর্থাৎ মাঝামাঝি এলাকায় জায়গির নিয়েছে ইমরুল হাসান। তার নিজ গ্রামের নাম শাপলাপুর। মেঘনার কোলঘেঁষে কোনোমতে আঁকড়ে আছে গ্রামটি। বছর বছর নদী ভাঙনের তোড়ে গ্রামটি প্রায় বিলুপ্তির পথ ধরেছে। মাস্টারের বাড়িও বার তিনেক ভেঙেছে। বাড়িটি সরিয়ে নিতে নিতে মাস্টারের বাবার এখন পথে বসার উপক্রম হয়েছে। অথচ তার বাবার একসময় ভালো কায়কারবার ছিল, ছিল অগাধ সম্পত্তি, ছিলেন তিনি সরকারি চাকুরেও। মেঘনার করালগ্রাসে এখন তিনি নিঃস্ব। ছেলেকে পড়ানোর সাধ্যও এখন আর নেই। অথচ ছেলের পড়ার প্রতি ভীষণ আগ্রহ। নিজের প্রচেষ্টায় কলেজে ভর্তি হয়েছে সে। জায়গিরও খুঁজে নিয়েছে হিজলতলায় তালুকদার বাড়িতে।

ইমরুল হাসান এ বাড়িতে এসেছে মাস চারেক আগে। ইতিমধ্যে বাড়ির কিছু নিয়মকানুন রপ্ত হয়েছে তার। ফুটনের ছয় মামার মধ্যে পাঁচজনের সঙ্গেই দারুণ ভাব জমিয়ে ফেলেছে পর্যন্ত। আর সবার ছোট অনু, সে তারই ছাত্র। শুধু তালেব আলী তালুকদারকে এখনো বুঝে উঠতে পারছে না মাস্টার। মানুষটি এই ভালো আবার ক্ষণিকেই মন্দরূপ ধারণ করেন। তালুকদারকে বশে আনা সত্যিই কঠিন একটি কাজ।

মাস্টারের প্রিয় ছাত্র ফুটন। খুব স্নেহ করে। সব সময় বালকের মায়াময় মুখের দিকে তাকিয়ে কি যেন খোঁজার চেষ্টা করে। বালক এ বাড়িতে যে ভালো নেই সেটা মাস্টারের বুঝতে কষ্ট হয়নি। চঞ্চল প্রকৃতির এ ছেলেটাকে তারা এটা-সেটা বলে দমিয়ে রেখে ওর প্রতিভাটাকে নষ্ট করে দিচ্ছে। ঘুণপোকা যেভাবে ধীরে ধীরে শক্ত-সামর্থ্য শুকনো কাঠ ঝাঁঝরা করে, ঠিক ওই কায়দায় ওর প্রতিভাকে ঝাঁঝরা করে দেওয়া হচ্ছে। তাদের চোখে লিখন যথেষ্ট ভদ্র, ফুটন বিপরীত চরিত্রের। প্রকৃতপক্ষে তা নয়, বালকদ্বয় একই ধাঁচের। পার্থক্য শুধু ফুটন চঞ্চল এবং অস্থিরমতির, অপরদিকে লিখন গোবেচারা টাইপ। এ হচ্ছে বালকের দোষ, যে দোষটি মানতে মাস্টারেরও কষ্ট হচ্ছে। মনে মনে ফুটনের বাবাকে ধিক্কার দেন মাস্টার। এতটুকু ছেলেকে মায়ের কাছে রাখতে দোষের কী, তা মাস্টারের কাছে বোধগম্য নয়। ছেলে এখানে থাকলে কি অমন উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত হবে, তা নিয়ে সন্দিহান রয়েছেন জায়গির মাস্টার। প্রতিভাবানরা যেকোনো স্থানেই প্রস্ফুটিত হয় মাস্টার সেটি ভালো করেই জানেন। বিষয়টি মাথায় এনে প্রিয় ছাত্রকে কাছে ডেকে তিনি মাঝেমধ্যে জিজ্ঞেস করতেন, ‘সোনার চাঁন আমার, কোন দুঃখে নানাবাড়ি আইছস?’   

 ‘বাবা কইছেন, তাই আইতে হইছে। স্যার বাবারে একটা চিটি লিইখা দেন আমারে জানি নানাবাড়ি থেইকা নিয়া যায়।’

বালকের কথা শুনে মাস্টারের চোখ ছলছল করত, জবাব না দিয়ে প্রসঙ্গ ঘুরিয়ে বলত,‘এই তুই আমারে একটা প্রজাপতি ধইরা দে তো।’

শিক্ষকের আদেশ বালকের কানে পৌঁছতেই দৌড়ে ফুলবাগানে প্রবেশ করে বড়সড় একটা প্রজাপতি ধরে আনত। মাস্টার আবার বলত,‘ফুটন, একটা ছড়া শুনা তো’। ছাত্র তখন বই থেকে ছড়া না বলে নিজে নিজে ছড়া বানিয়ে বলার চেষ্টা করত। সুন্দর সুন্দর ছবি এঁকে মাস্টারকে তাক লাগিয়ে দিত। আবার গান শুনিয়ে মাস্টারকে মোহিত করত। আর এ কাজগুলো খুব সহজেই করতে পারত বালক। বালকের আনুগত্যে এবং মুখে মুখে ছড়া বানিয়ে বলার দক্ষতা দেখে মাস্টার আরো আকৃষ্ট হয়ে পড়ত। এখানেই বালকদ্বয়ের মধ্যে পার্থক্য খুঁজে পেত মাস্টার। যেটি লিখনকে দিয়ে সম্ভব নয় সেটি ফুটন করে দিতে পারত অনায়াসে। যা এ বাড়ির মানুষের কাছে পছন্দ নয়। তাদের মতে, ছোটরা থাকবে ছোটদের মতো। হৈ-চৈ, হট্টগোল, লম্ফজম্ফ গান গাওয়া ছোটদের মানায় না। পাঁচ নম্বর মামি প্রায়ই মামার কানভারি করে, ‘লিখনের মাথা খাইব এই পোলায়, মাথা খাইব বাড়ির অন্য পোলাপানেরও। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব অরে নিজ বাড়ি পাঠাইয়া দেওন ভালা।’

এ ধরনের অভিযোগ প্রায়ই করেন মামি। বড়-মেজো-সেজো কিংবা তার পরের জন অর্থাৎ চতুর্থ মামা-মামিরা এসব নিয়ে খুব একটা থাকে না।

একদিনের ঘটনায় হাকিম মামা অর্থাৎ পাঁচ নম্বর মামা খুব ক্ষিপ্ত হয়েছে ভাগ্নের ওপর। সেদিন বাঁশের চোঙা মুখে লাগিয়ে মাইকিং করছিল বালক। ‘একটি বিশেষ ঘোষণা, একটি বিশেষ ঘোষণা’। এই পর্যন্ত বলে বালক আঁটকে গেছে। পরবর্তী লাইন মনে আসছে না ওর। বাজারে এক লোক কদিন আগে মাইকিং করেছিল। স্কুল থেকে আসার পথে বালক শুনেছে লোকটিকে মাইকে কিছু বলতে। তবে কি সব যেন বলছে, সেসব কথার দুই-একটি শব্দও মনে আসছে না এখন, কিন্তু মুখে যে বাঁশের চোঙা ঠেঁসে ধরে রেখেছে? এমতাবস্থায় কি বলা যেতে পারে? কিছুই মাথায় ঢুকছে না বালকের। ঠিক ওই মুহূর্তে মাস্টার প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিতে (মূত্রত্যাগের উদ্দেশ্যে) রাস্তার পাশে অবস্থান নিয়েছে। ছাত্রের নজরে পড়েছে দৃশ্যটি। সঙ্গে সঙ্গে ছাত্র বইয়ের ভাষায় চেঁচিয়ে বলতে লাগল, ‘একটি বিশেষ ঘোষণা, একটি বিশেষ ঘোষণা, খোলা জায়গায় কেহ মলমূত্র ত্যাগ করিবেন না, এটি স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর’। ঘোষণাপত্র শুনে মাস্টার থমকে দাঁড়িয়েছে। হেসে সে অন্যত্র চলে গেছে। বিষয়টি লক্ষ করেছে হাকিম মামা। সে তেড়ে এলো ভাগ্নের দিকে। ‘বেয়াদব, বেয়াদব থাপরাইয়া দিমু তোরে’ এই সব বলে গালাগাল দিল।

মামার গালাগাল শুনে জায়গির মাস্টার বলল, “ছোট মানুষ, এত শাসানের দরকার নাই। অরে আমি এইডা পড়াইছি ‘যেখানে সেখানে মলমূত্র ত্যাগ করবে না’। ছাত্র যে ভালা মত লেখাপড়া শিখছে তার প্রমাণ পাইয়া গেছি আমি, আফনে ওরে বকাবকি কইরেন না।”

‘হের লাইগা মাস্টারের লগেই ইতরামি’!

‘আহ : আফনে ওইভাবে নেন কেন, ওরে উৎসাহ দেন সত্যকথা কওনের জইন্য।’

মামার মাইন্ডে লেগেছে বিষয়টা। মাস্টার কী না উল্টো ভাগ্নের পক্ষে সাফাই গাইছে। ‘বেয়াদব বেয়াদব...’ বলতে বলতে অন্দরে চলে গেল সে। মাস্টারকে নিয়েও দু-চার কথা বলল। মাস্টার এ বাড়িতে টিকতে পারবে না বলেও মন্তব্য করল।

বালকদ্বয়কে জায়গির মাস্টার খুব স্নেহ করে। অল্প সময়ে মধ্যেই বেশ আপন করে নিয়েছে ছাত্রদের। বাড়ির অন্যসব ছাত্ররা অপেক্ষাকৃত ছোট বিধায় এ দুই ছাত্রের সঙ্গে তার ভাব জমে উঠেছে। তবে অনুকে খুব একটা ভালো নজরে দেখে না মাস্টার। অনুও মাস্টারকে এড়িয়ে চলে। সুযোগ পেলে কিছুটা দুর্ব্যবহারও করে। নিয়ম করে পড়াশোনাও করে না। ফলে শিক্ষক দুই ছাত্রকে নিয়েই মেতে থাকে। লেখাপড়ার ফাঁকে ফাঁকে খেলাধুলায় উৎসাহিত করে। নিজেও ওদের সঙ্গে বিভিন্ন ধরনের খেলায় অংশগ্রহণ করে। ক’দিন আগে মাস্টার নিজ হাতে ঘুড়ি-নাটাই বানিয়ে দিয়েছে ছাত্রদের। ছাত্ররা খুশি, ভীষণ খুশি। এমন শিক্ষক-ই যে চাই ওদের। সে ওদের লেখাপড়ারও মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছে পর্যন্ত। খেলার সঙ্গে পড়ালেখার একটা সম্পর্ক তৈরি করে দিয়েছে। এখন ছাত্ররা বেশ উৎসাহ-উদ্দীপনার সঙ্গে পড়াশোনায় মনোনিবেশ করছে। অথচ তালেব আলী তালুকদার মাস্টার বিদায়ের ঘণ্টা বাজিয়ে রেখেছে।

জায়গির মাস্টারকে খুব পছন্দ হয়েছে বালকের। ওই কথা নানাভাইয়ের সামনে বলা যাচ্ছে না, বলা যাচ্ছে না মামাদের সামনেও। বাড়ির সবাই আসলেই কেমন জানি, ছোটদের বুঝতেই চায় না কেউ-ই।

তালেব আলী তালুকদারের বড় সংসার, পরিবারে অনেক সদস্য। ছয় ছেলে, চার মেয়ে। তন্মধ্যে আবার পাঁচ ছেলে বিবাহিত। তার ওপর প্রত্যেকেরই রয়েছে সন্তানাদি, সেই বিশাল সংসারে কি না ফুটনের বাস। এখানে কে খেয়েছে, কে খায়নি এসব দেখার সুযোগ নেই কারোই। মাস্টারের ক্ষেত্রেও তদ্রুপ ঘটেছে অনেকদিন। বেচারিকে বেশির ভাগ সময় দুপুরে না খেয়ে কাটাতে হয়েছে। সকাল ৭টার মধ্যে মুড়ি-মুড়কি, ৯-১০টার মধ্যে ভাত আবার রাত ৮-৯টার মধ্যে ভাত দেওয়া হতো মাস্টারকে। অর্থাৎ দুপুর থেকে রাত অবধি উপবাস থাকতে হতো। তার পরও জায়গিরটি ছাড়তে রাজি হয়নি মাস্টার। তালুকদার বাড়ি থেকে কলেজ যেমনি কাছে, তেমনি নিজ বাড়ি থেকে তালুকদার বাড়ি কাছে বিধায় ইমরুল হাসানের কাছে এটি বেশ পছন্দের জায়গির। তা ছাড়া সামনে তার আইএ ফাইনাল পরীক্ষা। এমতাবস্থায় জায়গির পরিবর্তন এবং নতুন জায়গির খুঁজে নেওয়া সত্যিই কঠিন। বিষয়টি না ভেবেই তালেব আলী তালুকদার মাস্টারকে তাড়ানোর চেষ্টা করছে। তার অপরাধ ফুলপরীর অস্তিত্বকে অবিশ্বাস করা!

প্রিয় শিক্ষক চলে যাবে,  এটি বালকদ্বয়ের কাছে অবিশ্বাস্য ঠেকেছে। তার মতো এমন ভালো মানুষ আর দ্বিতীয়টি ছাত্রদের নজরে পড়ছে না। অথচ তাকে বিদায় নিতে হচ্ছে দ-একদিনের মধ্যেই।

নাতিরা তালুকদারের কাছে দাবি রাখতে চায় ওদের শিক্ষককে বিদায় না দিতে। ঠিক করেছে দুজন-ই কথাটা বলবে দাদা কিংবা নানাকে। সেই সুযোগটিও খুঁজছে। বারকয়েক সুযোগ পেলেও সাহস হয়নি নাতিদের আকুতিটা জানাতে।

দিন-দুপুরে ভাত ঘুমের প্রস্তুতি নিয়েছে তালেব আলী তালুকদার। কিছুক্ষণ এপাশ-ওপাশ করলেও প্রচণ্ড গরমে চোখেরপাতা জড়ো করতে পারেনি সে। ঝড়ের আভাস টের পাওয়া যাচ্ছে। আকাশটা গুমোট, স্থবির গাছের পাতাগুলো। ঝিরঝিরে হাওয়ায় কামরাঙা গাছের পাতায় কম্পনের সৃষ্টি হলেও সেই হাওয়া কারোর দেহ ঠান্ডা করার মতো যথেষ্ট নয়। চালের টিনগুলো উত্তপ্ত হয়ে ঘরের তাপমাত্রা বাড়িয়ে দিয়েছে অনেকখানি। তালুকদারের শরীর থেকে দরদর করে ঘাম ঝরছে। গামছা দিয়ে ঘাম মুছেও শেষ করতে পারছে না। বলা যায় অস্থির হয়ে উঠেছে সে। নাতিরা বারান্দায় দাঁড়িয়ে লক্ষ করেছে বিষয়টা। তালুকদারকে হাপিত্যেশ হয়ে তালপাখা ঘুরাতে দেখে ওরা কাছে এসে বসেছে। নাতিরা কাছে এসে বসতেই সে জিজ্ঞেস করল,‘কিরে কি চাস তোরা, আইসক্রিমওয়ালা আইছে বুঝি?’

 ‘না নানাভাই, আইসক্রিমওয়ালা আহে নাই, তোমারে পাংখা দিয়া বাতাস করতে আইছি।’

‘তোরা ছোড মানুষ, কী আর বাতাস করবি, যা এহন খেলতে যা।’

 ‘নানাভাই, আমরা বাতাস করি তুমি আমাগরে পরীর কিচ্ছা হুনাও।’

তালুকদার সামান্য রেগে গিয়ে বললেন,‘পরীর কিচ্ছা হুনতে আইছস? আমার কাছে ক্যান! তোগ মাস্টাররে গিয়া ক পরীর কিচ্ছা হুনাইতে। ব্যাডা শিক্ষিত হইছে ঠিক না?’

তালেব আলী তালুকদারের রাগমিশ্রিত অভিমানী সুর নাতিদের কিছুটা উজ্জীবিত করেছে। সুযোগ বুঝে লিখন বলল,‘দাদাভাই, স্যারে কইছেন তুমি নাকি পরী দেখছ, ওইডাই হুনাও আইজ।’

 ‘কী কইছে মাস্টার’!

 ‘কইছে তুমি নাকি রাইতে পরী দেখছ, আমাগরে ওই ঘটনা হুনাও দাদাভাই।’

 ‘হাচাই কইছে?’

 ‘হ নানাভাই, স্যারে কইছে তুমি নাকি নিজ চোক্ষে পরী দেখছ। আবার কইছে, তুমি নাকি মেলা সাহসী মানুষ। গেরামে নাকি তোমার মতো আর সাহসী মানুষ নাই।’

ব্যস্ হয়েছে, নাতিদের কথা শুনে তালুকদার মুহূর্তেই মোমের মতো গলে গেল। মাস্টারের প্রতি তার যে রাগ-ক্ষোভ ছিল তা নিমেষেই উধাও হয়ে গেল। শোয়া থেকে উঠে বসল সে। নাতিদের উদ্দেশে বলল,‘কেমুন লেহাপড়া করায় মাস্টার?’

 ‘অনেক ভালা পড়ায় স্যারে’। ফুটন বলল।

নাতির জবাবে সন্তোষ্ট হয়ে সে বলল,‘ভালা পড়াইলে মাস্টার থাইকা যাক, মাস্টাররে এই খবরটা জানাইয়া দে তোরা।’ 

প্রিয় শিক্ষক থেকে যাচ্ছে বাড়িতে, এরচেয়ে ভালো খবর আর কী হতে পারে! ফুটন ভীষণ খুশি। ওর প্রিয় একজন মানুষ ইমরুল স্যার। খুব আপন মনে হয় তাকে, এমনকি মামাদের চেয়েও বেশি। ভুলভ্রান্তি হলেও কখনো রাগ করে না সে। আর বেত্রাঘাতের তো প্রশ্নই আসে না। সব সময় হাসি মুখে কথা বলে। শুধু ছোট মামা সামনে এলে তার মুখটা ভারি হয়ে ওঠে। নানাভাইকেও সহ্য করতে পারে না তেমন একটা। মুখে কখনো কিছু না বললেও ভাবেসাবে বুঝে যায় বালক সব কিছুই।

মাস্টারকে খুশির খবরটি দিতে ছাত্ররা তড়িগড়ি করে কাছারিতে ছুটে এসেছে। কাছারিতে ঢুকেই দেখতে পেয়েছে মাস্টার সাহেব কী যেন লিখছে। ছাত্রদের দেখে সে খাতাটা অহেতুক লুকানোর চেষ্টা করছে। কিন্তু লুকাতে পারেনি পুরোপুরি, ছাত্ররা দেখে ফেলেছে খাতাটা। আসলে ব্যাপারটি হচ্ছে, লেখা হয়েছে অমন একটা পাতার মধ্যে পুনরায় কিছু লিখছে সে। অর্থাৎ দুই লাইনের ভেতরের ফাঁকা জায়গায় আবার কিছু লিখছে। কৃচ্ছ্রতাসাধনের উদ্দেশ্যেই মূলত কাজটি করছে মাস্টার। বিষয়টি ছাত্রদের দৃষ্টিগোচর হতেই সে একটু লজ্জিত হলো। এই নিয়ে ছাত্রদের মধ্যে কৌতূহল নেই। ওরা শিক্ষককে সুসংবাদটি জানাতে এসেছে মাত্র। ছাত্রদের অসময়ে হন্তদন্ত হয়ে ছুটে আসতে দেখে জায়গির মাস্টার কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘কিরে তোগ তো এই সময় আহনের কথা না, কি জইন্য আইছস ক?’

মাস্টারের ধারণা ছাত্ররা তার সঙ্গে খেলাধুলা করতে এসেছে। তাই সামান্য বিরক্ত হয়ে ছাত্রদের জবাবের প্রতীক্ষায় না থেকে পুনরায় বলল,‘তোরা এহন চইলা যা, পরে আমি ডাইকা আনমু।’

ছাত্রদের পেট ফেটে যাচ্ছে খুশির সংবাদটি বের করতে। আর মাস্টার কি না বলছে পরে আসতে। ফুটন কথাটা পেটে চেপে রাখতে পারেনি আর। দ্রুত শ্বাস-প্রশ্বাস নিতে নিতে বলল,‘স্যার মেলা ভালা খবর আছে।’

মাস্টার খাতার দিকে তাকিয়ে মনে মনে কিছু একটা পড়ছে। খাতার দিকে মনোনিবেশ করেই সে ছাত্রদের উদ্দেশ্যে বলল,‘কি এমন ভালা খবর দিতে চাস তোরা, হুনি!’

ফুটন ঝটফট জবাব দিল,‘স্যার, নানাভাই কইছে আফনারে এই বাড়িতে থাইকা যাইতে।’

কথাটা শুনে মাস্টার মোটেই খুশি হতে পারেনি। সে মুখটাকে মলিন করে ছাত্রদের দিকে তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ। তারপর ধীরে ধীরে বই-খাতা গুছাতে গুছাতে বলল,‘তোরা আমার লাইগা সুপারিশ করছস তাই না?’ আমি এ বাড়ি ছাইর‌্যা চইলা যামু আইজকার মইদ্দ্যেই। কারণ ছাত্রদের সুপারিশে মাস্টার কোনো জায়গিরে থাকতে পারে না, থাকাডা ঠিক না। এখনো এসব বুঝার বয়স হয় নাই তোগ, যখন বড় হইবি তখন বুঝবি আমি ক্যান চইলা গেলাম।’

কথা শেষ করে জায়গির মাস্টার ফুটনের দিকে তাকিয়ে ইশারায় কাছে ডাকল। ততক্ষণে লিখন কাছারি ছেড়ে চলে গেছে। বালক তার প্রিয় শিক্ষকের কাছে এসে গা ঘেঁষে দাঁড়াল। শিক্ষক ওর মাথায় হাত রেখে বলল,‘ফুটন, তুই পারলে এই বাড়ি থেইকা চইলা যাইস। এহানে থাকলে তোর লেখাপড়া হইব না, প্রতিভাটা নষ্ট হইয়া যাইব। আমি তোরে দোয়া দিলাম। দেহিস তোরে একদিন মানুষ এক নামে চিনব। বড় হইলে স্যারের এই কথাটা মনে করিস বাবা।’

শিক্ষকের ভবিষ্যদ্বাণী ছাত্রের মাথায় ঢুকেনি। ফ্যালফ্যাল করে সে তার প্রিয় মানুষটির মুখে দিকে তাকিয়ে রইল। জায়গির স্যার ওর সম্পর্কে কি বলেছে সেটি মুখ্য নয়, কারণ ওই সবের সারমর্ম বুঝার বয়স হয়নি তখনো বালকের। বরং স্যার চলে যাচ্ছে এই কথাটা শুনেই ওর মাথায় বিনামেঘে বজ্রপাত ঘটল। কী বলছে স্যার এসব! যেখানে সে খুশি হবে সেখানে ঠিক উল্টো সিদ্ধান্ত নিল। তাহলে কি ওদের উপস্থাপনায় বড় ধরনের কোনো ত্রুটি রয়েছে? না, বালকের মাথায় কিছুই ঢুকেনি। অনেক চেষ্টা করেও জায়গির মাস্টারের সেই উক্তির সারমর্ম উদ্ধার করতে সক্ষম হয়নি বালক।

ইউটিউবে এনটিভির জনপ্রিয় সব নাটক দেখুন। সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের চ্যানেলটি:

Advertisement