Beta

কোন পরিস্থিতিতে অপরাধ করলে শাস্তি হবে না?

০৩ সেপ্টেম্বর ২০১৭, ২১:৫৭

হঠাৎ আপনি রাস্তায় কোনো ছিনতাইকারীর কবলে পড়লেন। আপনাকে সেই ছিনতাইকারী অস্ত্র দিয়ে আঘাত করার চেষ্টা করছে। আপনি সেই আঘাত থেকে বাঁচার জন্য, জীবনের নিরাপত্তার জন্য প্রয়োজনীয় প্রতিরোধ গড়তে অপরাধ করলেও আইনের দৃষ্টিতে অপরাধী হিসেবে বিবেচ্য হবেন না।

আইনে একেবারে সকল ক্ষেত্রে কোনো কিছু করলেই যে আপনি অপরাধী হয়ে যাবেন তার কোনো ভিত্তি নেই। এমন কিছু কিছু ক্ষেত্র রয়েছে যেখানে আপনি নিজের বা সম্পত্তির সুরক্ষা ও নিরাপত্তার জন্য কোনো অপরাধ করে থাকলেও আপনাকে এর জন্য শাস্তি পেতে হবে না।

কারণ আইন আপনাকে সেই অধিকার দিয়েছে। যে কোনো আসন্ন বিপদ এড়ানোর জন্য আপনিও কোনো প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারবেন নিজ বা অন্যের নিরাপত্তার ও সম্পত্তি রক্ষার জন্য।

এখন কীভাবে অপরাধ করলে আপনি অপরাধী হবেন না তাই নিয়ে আলোচনা করা হলো :

বাংলাদেশ দণ্ডবিধির ধারা ৯৬ থেকে ধারা ১০৬ পর্যন্ত এসব আত্মরক্ষার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

দণ্ডবিধির ৯৬ ধারা

দণ্ডবিধির ৯৬ ধারায় বলা আছে, ব্যক্তিগত প্রতিরক্ষার জন্য আপনি কোনো অধিকার প্রয়োগ করে থাকলে আপনার করা কোনো কাজই আইনে অপরাধ বলে গণ্য করা হবে না।

দণ্ডবিধির ৯৭ ধারা

দণ্ডবিধির  ৯৭ ধারাতে বলা আছে, মানুষের শরীরের জন্য ক্ষতিকর এমন যে কোনো অপরাধের বিরুদ্ধে নিজের ও অন্যের শরীর রক্ষার অধিকার আপনার আছে।

চুরি, দস্যুতা, অনিষ্ট সাধন বা অনধিকার প্রবেশের মাধ্যমে নিজের বা অপর ব্যক্তির স্থাবর কিংবা অস্থাবর সম্পত্তি রক্ষার জন্যও আপনি এই প্রতিরক্ষার অধিকার প্রয়োগ করতে পারবেন।

তবে সেই অধিকার আপনাকে দণ্ডবিধির ৯৯ ধারার বর্ণিত বিধিনিষেধ অনুযায়ী প্রয়োগ করতে হবে।

দণ্ডবিধির ৯৮ ধারা

দণ্ডবিধির ৯৮ ধারায় বলা আছে, মানসিক বিপর্যস্ত পরিস্থিতি, অক্ষমতা বা মাতাল হলে কিংবা পাগলামির কারণে কেউ কোনো অপরাধ করলে তার সেই কাজের জন্য তাকে অপরাধী করা যাবে না। কিন্তু ওই মানসিকভাবে অক্ষম, বিপর্যস্ত ব্যক্তি বা পাগলের হাত থেকে আপনার যুক্তিসঙ্গত প্রতিরক্ষার অধিকার থাকবে।

দণ্ডবিধির ৯৯ ধারা

দণ্ডবিধির ৯৯ ধারায় বলা হয়েছে, সরকারিভাবে ক্ষমতাপ্রাপ্ত ব্যক্তি অথবা তাঁর নির্দেশে অন্য কোনো ক্ষমতাপ্রাপ্ত ব্যক্তি সরল বিশ্বাসে যদি এমন কোনো কাজ করে যাতে করে অন্তত কারো মৃত্যু বা গুরুতর আঘাতের আশঙ্কা না থাকে তবে সেই ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ক্ষমতাপ্রাপ্ত ব্যক্তির বিরুদ্ধে আপনার ব্যক্তিগত প্রতিরক্ষার অধিকার থাকবে না।

যদিও সংশ্লিষ্ট ক্ষমতাপ্রাপ্ত ব্যক্তির কাজটি আইনের দৃষ্টিতে অযৌক্তিক হয়।

আর যদি আসন্ন বিপদ ঠেকাতে আপনার সরকারের আশ্রয় নেওয়ার সময় থাকে, তখনো আপনি আত্মরক্ষার অধিকার প্রয়োগ করতে পারবেন না।

এই অধিকার আপনি যতটুকু নিজের আত্মরক্ষার জন্য প্রয়োজন, কোনো অবস্থায় তার অতিরিক্ত প্রয়োগ করতে পারবেন না। যেমন আপনি চোরের চুরি ঠেকাতে গিয়ে তাঁকে খুন করে বসতে পারেন না। এমন কিছু করলে এর জন্য আপনাকে আইনে নির্ধারিত শাস্তি পেতে হবে।

দণ্ডবিধির ১০০ ধারা

দণ্ডবিধির ১০০ ধারায় বলা আছে, কোন কোন ক্ষেত্রে আপনি আত্মরক্ষা করতে গিয়ে অন্য কারো মৃত্যু পর্যন্ত ঘটাতে পারেন। আর এগুলো হলো নিজের নিশ্চিত মৃত্যু ঠেকাতে, মারাত্মক আঘাত থেকে যেখানে পরবর্তী সময়ে আপনার মৃত্যু হতে পারে এমন, ধর্ষণ থেকে বাঁচতে, অস্বাভাবিক কাম লালসার হাত থেকে রক্ষা পেতে, অপহরণের হাত থেকে রক্ষা পেতে এবং কেউ যদি এমনভাবে আপনাকে আটক করতে পারে বলে মনে হয়, যেখান থেকে আপনি সরকারি কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে আর কোনো সাহায্য নিতে পারবেন না তখন।

দণ্ডবিধির ১০১ ধারা

দণ্ডবিধির ১০১ ধারায় বলা আছে, সম্পূর্ণ ইচ্ছাকৃতভাবে আক্রমণকারীর মৃত্যু ঘটানো যাবে না যতক্ষণ না পর্যন্ত অন্য কোনোভাবে আত্মরক্ষা করা যায়।

দণ্ডবিধির ১০২ ধারা

দণ্ডবিধির ১০২ ধারা অনুযায়ী এই অধিকার অব্যাহত থাকবে যতক্ষণ পর্যন্ত আপনার দেহ বিপন্ন হওয়ার আশঙ্কা থাকবে। আশঙ্কা কেটে যাওয়ার পর ওই অধিকার আর আপনি পাবেন না।

দণ্ডবিধির ১০৩ ধারা

দণ্ডবিধির ১০৩ ধারায় বলা আছে, কখন আপনি সম্পত্তি রক্ষা করতে গিয়ে কারো মৃত্যু ঘটাতে বা অন্য কোনো ক্ষতি করতে পারেন। সে ক্ষেত্রে আপনাকে অবশ্যই দণ্ডবিধির ৯৯ ধারার বর্ণিত বিধিনিষেধের কথা মনে রেখে তা করতে হবে।

দণ্ডবিধির ১০৪ ধারা

দণ্ডবিধির ১০৪ ধারায় বলা আছে চুরি, ক্ষতি বা অনধিকার প্রবেশ যদি উল্লিখিত ওপরের মতো ভয়ংকর না হয় তবে আত্মরক্ষার অধিকার প্রয়োগের ক্ষেত্রে ৯৯ ধারায় বর্ণিত বিধিনিষেধ অনুযায়ী দুষ্কৃতকারীর অন্য কোনো ক্ষতি করা গেলেও অন্তত কারো মৃত্যু ঘটানো যাবে না।

দণ্ডবিধির ১০৫ ধারা

দণ্ডবিধির ১০৫ ধারায় আছে, কখন কারো সম্পত্তি রক্ষার ক্ষেত্রে এই অধিকারের শুরু হয় এবং কতক্ষণ পর্যন্ত এই অধিকার অব্যাহত থাকবে।

যেমন সংশ্লিষ্ট সম্পত্তির ক্ষেত্রে ক্ষতির আশঙ্কা দেখা দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রতিরক্ষার অধিকার শুরু হবে। চুরির ক্ষেত্রে চোর পালিয়ে না যাওয়া পর্যন্ত বা সরকারি কর্তৃপক্ষের সাহায্য লাভ না করা পর্যন্ত অথবা ওই সম্পত্তি উদ্ধার না করা পর্যন্ত আপনার প্রতিরক্ষার অধিকার থাকবে। দস্যুতার ক্ষেত্রে কোনো ব্যক্তির মৃত্যু বা আঘাত করা বা অবৈধ অবরোধের চেষ্টা অব্যাহত থাকা পর্যন্ত প্রতিরক্ষার অধিকার থাকবে। অনধিকার প্রবেশ বা অনিষ্ট সাধনের ক্ষেত্রে এর চেষ্টা অব্যাহত থাকা পর্যন্ত আর রাতের বেলা চুরির ক্ষেত্রে যতক্ষণ পর্যন্ত ঘরে কারো অনধিকার প্রবেশ অব্যাহত থাকবে, আপনার ব্যক্তিগত প্রতিরক্ষার অধিকার ততক্ষণ পর্যন্ত থাকবে। চোর চুরি করে চলে যাওয়ার পর আর আপনার ওই অধিকার থাকবে না।

দণ্ডবিধির ১০৬ ধারা

দণ্ডবিধির ১০৬ ধারায় বলা আছে, আপনার মৃত্যু হতে পারে এমন কোনো আক্রমণে আত্মরক্ষা করতে গিয়ে যদি কোনো নিরপরাধ মানুষেরও ক্ষতি হওয়ার ঝুঁকি থাকে, তাহলেও আপনি এমন ঝুঁকি নিয়ে আত্মরক্ষার অধিকার প্রয়োগ করতে পারবেন। যেমন আপনি নিজেকে বাঁচাতে কোনো কোনো উচ্ছৃঙ্খল জনতার ওপর গুলি চালাতে পারেন।

যদি ওই জনতার ভেতরে থাকা কোনো শিশুও যদি আহত বা নিহত হয়, তবে তার জন্য আপনি দায়ী হবেন না।

লেখক : আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট

Advertisement