Beta

অভিমত

আপনার কি ড্রাইভিং লাইসেন্স আছে?

০১ আগস্ট ২০১৮, ১৩:৩৯ | আপডেট: ০১ আগস্ট ২০১৮, ১৪:১১

ব্যক্তিগত ও গণপরিবহন চালকদের অনেকেরই লাইসেন্স নেই, থাকলেও সেই লাইসেন্স সঠিক প্রক্রিয়া মেনে নেওয়া হয়নি। আবার অনেকের লাইসেন্স ভুয়া। ফলে ঢাকার রাজপথে কিশোর শিক্ষার্থীরা গণপরিবহন থামিয়ে ড্রাইভারদের লাইসেন্স চেক করার যে দুঃসাহসী কাজটি করল, তাতে বরং রাষ্ট্রযন্ত্রেরই লজ্জিত হওয়ার কথা। কারণ এই কাজটি স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের নয়, বরং করার কথা ছিল আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর। দেশের কোনো প্রতিষ্ঠান যে ঠিকভাবে কাজ করে না, তা এই খুদে শিক্ষার্থীরা আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল।

আমাদের অবস্থা এই পর্যায়ে পৌঁছেছে যে এখন সবকিছুতেই খোদ প্রধানমন্ত্রীকে হস্তক্ষেপ করতে হয়। উচ্চ আদালতকে ভূমিকা রাখতে হয়। কখনো স্বপ্রণোদিত রুল, কখনো রিটের পরিপ্রেক্ষিতে আদেশ। ফুটপাতে মোটরসাইকেল চলবে কি চলবে না—এ রকম একটি অতি সাধারণ বিষয়েও হাইকোর্টকে রুল দিতে হয়।

সবশেষ রাজধানীতে  বাসচাপায় দুজন শিক্ষার্থীর মর্মান্তিক মৃত্যুর বিষয়ে পরিবহন শ্রমিক নেতা ও নৌমন্ত্রীর দায়িত্বহীন বক্তব্য নিয়ে গণমাধ্যম ও সোশ্যাল মিডিয়ায় তোলপাড় শুরু হলে, তার ক্ষমা চাওয়া এবং পদত্যাগের দাবি উঠলে সেখানেও প্রধানমন্ত্রীকে হস্তক্ষেপ করতে হয়। গণমাধ্যমের খবর বলছে, এই ইস্যুতে নৌমন্ত্রীর ওপর প্রধানমন্ত্রী ক্ষুব্ধ হয়েছেন। পরে খবরে দেখা গেল, নৌমন্ত্রী দুঃখ প্রকাশ করেছেন।

স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা তাদের সহপাঠীর মৃত্যুর প্রতিবাদে ক্লাসরুম ছেড়ে রাস্তায় নেমে আসে এবং রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় তারা এক অভিনব কাজ শুরু করে। তা হলো—তারা গণপরিবহন থামিকে ড্রাইভারদের লাইসেন্স চেক করে এবং যাদের লাইসেন্স ছিল, সেই গাড়িগুলো তারা ছেড়ে দেয়। কিন্তু যেসব বাসের চালকের লাইসেন্স পায়নি, সেগুলো ভাংচুর করে। অথচ চালকের লাইসেন্স এবং গাড়ির ফিটনেস পরীক্ষার দায়িত্ব রাষ্ট্রীয় সংস্থা বিআরটিএ এবং পুলিশের। তারা কি সেই কাজটি সঠিকভাবে করছে?

এসব অভিযান নিয়মিতই চলে। বিশেষ করে সংসদ ভবনের উল্টো দিকে মানিক মিয়া এভিনিউ, বিজয় সরণিসহ বিভিন্ন জায়গায় ভ্রাম্যমাণ আদালতের তৎপরতা নিয়মিতই চোখে পড়ে। মামলা হয়, জরিমানা হয়। ট্রাফিক সার্জেন্টরাও নিয়মিত মামলা দেন। কিন্তু তাতে কাজের কাজ কি হয়? মূল অভিযোগ, এইসব অভিযান চলে বস্তুত পরিবহন চালক ও মালিকদের কাছ থেকে পয়সা নেওয়ার জন্য। এসব অভিযান মূলত ঘুষ-বাণিজ্য। যে চালককে আজ লাইসেন্স না থাকার দায়ে জরিমানা করা হলো, পরদিন সেই চালকই রাস্তায় নেমে যাচ্ছেন। যে গাড়িকে আজ ফিটনেস নেই বলে জরিমানা করা হলো, সেই গাড়ি কালই রাস্তায় নামছে। তাহলে এসব অভিযান আর জরিমানায় লাভ হচ্ছে কার? বিআরটিএ এবং পুলিশের? রাষ্ট্রীয় কোষাগারে কিছু পয়সা যাচ্ছে বটে। কিন্তু তাতে সড়কে প্রাণের অচপয় রোধ হচ্ছে কতটুকু?

সড়কে মৃত্যুর মিছিল প্রতিনিয়তই দীর্ঘ হয়। অস্বীকার করার উপায় নেই, এর অন্যতম প্রধান কারণ চালকের অদক্ষতা। একজন প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত এবং সঠিক উপায়ে লাইসেন্স প্রাপ্ত চালক বেপরোয়াভাবে গাড়ি  চালান না। তিনি ট্রাফিক আইন জানেন। কোন রাস্তায় কতটুকু গতি ওঠাতে হবে, কোনখানে ওভারটেকিং করা যাবে বা যাবে না, তা তিনি জানেন। কিন্তু যিনি হেলপার থেকে চালক হয়েছেন, যার প্রাতিষ্ঠানিক কোনো শিক্ষাদীক্ষা নেই, যিনি শুধু রাস্তায় গরু-ছাগল চেনেন—সেইসব লোকের হাতে যখন স্টিয়ারিং থাকে এবং যার কোনো বৈধ লাইসেন্স নেই, তিনি তো মানুষ হত্যার লাইসেন্স পাবেনই।

আমাদের গণপরিবহন ব্যবস্থায় যে নৈরাজ্য, যানবাহনের ফিটনেস আর লাইসেন্স দেওয়ার প্রক্রিয়ায় যে বিশাল দুই নম্বরি, তাতে সড়কে মৃত্যুর মহামারী থামানো কঠিন।

আবার লাইসেন্স আছে এবং দক্ষ চালকও অনেক সময় সড়কে মানুষ হত্যার কারণ হয়ে ওঠেন যখন, তাকে অন্য পরিবহনের সঙ্গে অসুস্থ প্রতিযোগিতায় নামতে হয়। যখন তাঁকে দিনে নির্দিষ্ট পরিমাণ আয় করতে হয় এবং মালিককে নির্দিষ্ট পরিমাণ অঙ্ক বুঝিয়ে দিতে হয়, তখন তিনি বেশি বেশি ট্রিপের আশায় অন্যকে ধাক্কা দিয়ে, অন্যের গ্লাস চুরমার করে ভেঙে দিয়ে, ফুটপাতে  মানুষের উপরে গাড়ি তুলে দিয়ে সবার আগে যেতে চাইবেন—এতে আর সন্দেহ কী?

তবে এবার বোধ হয় রাষ্ট্রের ঘুম কিছুটা ভেঙেছে। শিশু-কিশোর শিক্ষার্থীরা যখন রাস্তায় নেমে নিজের হাতে আইন তুলে নিল, যখন তারা বেপরোয়াভাবে গাড়ি ভাঙচুর করতে লাগল তখন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের তরফে একটি নির্দেশনা এসেছে যে, অপ্রাপ্তবয়স্ক ও ড্রাইভিং লাইসেন্সবিহীন অবৈধ গাড়িচালকদের বিরুদ্ধে অবিলম্বে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। এ জন্য বিআরটিএ এবং ডিএমপিকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

একই দিন সড়ক দুর্ঘটনা রোধে যানবাহনের ফিটনেস যাচাই করতে একটি বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠনের নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট। অন্তত ১৫ সদস্যের ওই কমিটি গঠন করে আগামী তিন মাসের মধ্যে একটি সার্ভে রিপোর্ট আদালতে দাখিল করতেও বলা হয়েছে। এ ছাড়া যানবাহনের ফিটনেসের নিশ্চয়তা ও মনিটরিংয়ে বিবাদীদের নিষ্ক্রিয়তা কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না এবং ফিটনেসবিহীন গাড়ি চলাচল বন্ধ করতে কেন নির্দেশ দেওয়া হবে না, রুলে তা জানতে চান হাইকোর্ট।

স্মরণ করা যেতে পারে, ২০১৫ সালেও সারা দেশে ফিটনেসবিহীন যানবাহন চলাচল বন্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বিআরটিএ চেয়ারম্যানকে নির্দেশ দিয়েছিলেন আদালত। সেই নির্দেশ যে বাস্তবায়ন হয়নি, তার প্রমাণ তিন বছর পরে এসে উচ্চ আদালতকে মোটামুটি একই রকম নির্দেশ দিতে হলো। আগামী তিন বছর পরে আদালতকে যদি এই একই নির্দেশ বা রুল জারি করতে হয়, তাতেও বিস্ময়ের কিছু থাকবে না।

রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় লেগুনা নামে যেসব যানবাহন চলে, তার অধিকাংশের চালক অপ্রাপ্তবয়স্ক এবং ধরে নেওয়াই সংগত যে, তাদের কোনো ড্রাইভিং লাইসেন্স নেই। এসব যানবাহনের কোনো ফিটনেসও নেই। কিন্তু সারা ঢাকা শহর এরা দাপিয়ে বেড়ায়। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের নির্দেশনার পরে কাল থেকে কি এসব লেগুনার স্টিয়ারিংয়ে সব দক্ষ চালক বসে যাবেন কিংবা এসব যানবাহন চলাচল বন্ধ হয়ে যাবে? এমনটি ভাবার কোনো কারণ নেই। বরং পুলিশি তৎপরতা বাড়বে এবং তারা পুলিশকে যে মাসোয়ারাটা দেয়, সেটার পরিমাণ বাড়বে।

ড্রাইভিং লাইসেন্স দেয় যে বিআরটিএ—প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের নির্দেশনার পরে কাল থেকে কি সেখানে সব কর্মকর্তা-কর্মচারী ঘুষ খাওয়া এবং দুই নম্বরি বন্ধ করে দেবেন? সবার ড্রাইভিং লাইসেন্স—তাতে তিনি সাংবাদিক, অমুকের আত্মীয়, তমুকের শ্যালক, অমুক দলের তমুক নেতা যাই হোন না কেন, বিআরটিএ সঠিক নিয়ম মেনে লাইসেন্স দেওয়া শুরু করবে?

আজ থেকে বিআরটিএ যে যানবাহন ফিটনেস পরীক্ষা করছে, সেটা কতটুকু নির্ভরযোগ্য হবে? ফিটনেসবিহীন যানবাহনগুলো কি গ্যারেজে ঢুকে যাবে? ঢুকলে ভালো। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। বরং যখনই সড়কে নৈরাজ্যের প্রতিবাদে মানুষ রাস্তায় নামে বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা বাড়ে, তখন গণপরিবহন মালিক-শ্রমিকরাও অভিনব কায়দায় মানুষকে জিম্মি করে রাস্তায় যানবাহন বের করেন না। ফলে হাজার হাজার মানুষ যানবাহন সংকটে অবর্ণনীয় দুর্ভোগে পড়ে। অর্থাৎ তারা নিয়ম মানবে না, অন্যায় করবে, অদক্ষ চালক আর অমানবিক শ্রমিকদের হাতে গাড়ি ছেড়ে দিয়ে মানুষ হত্যার লাইসেন্স দিয়ে দেবে, আর এসবের প্রতিবাদ হলে তারাই আবার মানুষকে জিম্মি করবে।

২০১৬ সালের ২৪ এপ্রিল সমকালের এক রিপোর্টে বলা হয়, চট্টগ্রামে এক লাখের কাছাকাছি ড্রাইভিং লাইসেন্সই জাল! অদক্ষ চালকরা এসব ভুয়া লাইসেন্স বানিয়ে গাড়ি চালাচ্ছেন। বিআরটিএর অসাধু কিছু কর্মচারীসহ একাধিক চক্র জাল লাইসেন্স তৈরি ও বিক্রির সঙ্গে জড়িত। ট্রাফিক পুলিশকে ম্যানেজ করে নির্বিঘ্নে গাড়ি চালাচ্ছেন লাইসেন্সবিহীন চালকরা। ২০১৫ সালের আগস্টে প্রায় ১৯ লাখ ‘ভুয়া ড্রাইভিং লাইসেন্স’ জব্দের নির্দেশ দেন হাইকোর্ট। যেসব চালক এসব ভুয়া লাইসেন্স ধারণ ও ব্যবহার করছেন তাদের বিরুদ্ধেও যথাযথ আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেওয়া হয়।

বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির তথ্য অনুযায়ী, যেসব চালকের বৈধ ড্রাইভিং লাইসেন্স রয়েছে, তাদের একটা বড় অংশকে দেওয়া হয়েছে যথাযথ পরীক্ষা ছাড়া। বড় অঙ্কের টাকার বিনিময়ে এসব লাইসেন্স দেওয়া হয়।

বিআরটিএর বার্ষিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ৫২ হাজার ৬৭০ জন পেশাজীবী গাড়িচালককে স্বল্পমেয়াদি প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। সেইসঙ্গে স্মার্ট কার্ড ড্রাইভিং লাইসেন্সের বদলে এখন অত্যাধুনিক পলিকার্বোনেট ডুয়াল ইন্টারফেজ স্মার্ট কার্ড ড্রাইভিং লাইসেন্স দেওয়া হচ্ছে। ফলে জাল বা নকল করার প্রবণতা কমেছে। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে এই অত্যাধুনিক ড্রাইভিং লাইসেন্স দেওয়া হয়েছে তিন লাখ ৭৭ হাজার ৮০২টি।

এত কিছুর পরও সড়কে প্রাণহানি তো ঠেকানো যাচ্ছে না। এখন কোমলমতি শিশুরাও রাস্তায় নেমে গেছে। ফলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরের তৎপরতা হয়তো বাড়বে। কিন্তু কদিন বাদে যখন আবার নতুন ইস্যু চলে আসবে, তখন সড়কে শৃঙ্খলা ফেরানোর এইসব উদ্যোগ পুনরায় ধামাচাপা পড়বে। কারণ রাষ্ট্র তখন নতুন ইস্যু নিয়ে ব্যস্ত হবে। তত দিনে সহপাঠীর মৃত্যুশোক কাটিয়ে উঠবে শিক্ষার্থীরা।

বস্তুত বছরের পর বছর ধরে দেশের পরিবহন খাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের রাষ্ট্রের শীর্ষ পযায়ে থেকে পৃষ্ঠপোষকতা দেওয়া এবং বিআরটিএ ও পুলিশের ঘুষ-বাণিজ্যের কারণে এই খাতে কোনো শৃঙ্খলা আসে না। গাড়ির ফিটনেস আর ড্রাইভিং লাইসেন্সের নামে যেসব অন্যায় কাজ চলে আসছে, সেগুলো আগে বন্ধ করা না গেলে কিছুদিন পরপর সড়কে হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে মানুষ রাস্তায় নামবে, ভাঙচুর চালাবে, কর্তৃপক্ষ বেশি বেকায়দায় পড়লে দায়ীদের গ্রেপ্তারও করবে—কিন্তু তাতে সড়কের নৈরাজ্য বন্ধ হবে না।

লেখক : সাংবাদিক

ইউটিউবে এনটিভির জনপ্রিয় সব নাটক দেখুন। সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের চ্যানেলটি:

Advertisement