Beta

অভিমত

শুধু নুসরাত নয়, মৃত্যু হবে আমাদেরও

১১ এপ্রিল ২০১৯, ১৩:৫৮

সমাজে ও রাষ্ট্রে কখনো কখনো কবরের নিস্তব্ধতা নেমে আসে। কোথাও কোনো শব্দ উচ্চারিত হয় না। ভয়ের অন্ধকারে নিমজ্জন ঘটে সবার। নুসরাতকে নিয়ে তেমন নিস্তব্ধতায় তলিয়ে গেছে সমাজ ও রাষ্ট্র। তলিয়ে গেছে, নাকি অন্ধকারে গা-ঢাকা দিয়েছে? সমাজ ও রাষ্ট্রের দ্বিধার জায়গাটি হচ্ছে নুসরাত মাদ্রাসার ছাত্রী। যার বিরুদ্ধে নুসরাতের অভিযোগ-প্রতিবাদ সে মাদ্রাসার শিক্ষক।

পুরো বিষয়টিতে ধর্মের ছায়া। সাধারণের ভাবনা হলো, ঘটনাটি মাদ্রাসার ছাত্রী, শিক্ষক নিয়ে, সুতরাং এ নিয়ে কথা বললে ফুঁসে উঠতে পারে মাদ্রাসার শিক্ষার্থী-শিক্ষকরা। হুঙ্কার আসতে পারে মৌলবাদীদের তরফ থেকে। রাজনৈতিক দলগুলোও এতে বিরক্ত হবে। সুতরাং নিজ মুখে আঙুল দিয়ে রাখাই ভালো। আসলে এই চোখে বিষয়টি দেখা যাবে না। শিক্ষক তিনি মাদ্রাসার হন, সাধারণ স্কুল-কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা গৃহশিক্ষকই হন না কেন, তার কাছ থেকে নেকড়ের আচরণ কোনো শিক্ষার্থী, অভিভাবক প্রত্যাশা করে না।

বছরের পর বছর আমরা ছাত্রীদের কাছ থেকে যৌন নিপীড়নের অভিযোগ শুনে আসছি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শুরু করে অজপাড়ার প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকের প্রতি এ অভিযোগ। কোনো কোনো অভিযোগের বিরুদ্ধে বিভাগীয় শাস্তি, সাময়িক বরখাস্তের খবর কানে এসেছে। কিন্তু তাতে শিক্ষকের দ্বারা যৌন নিপীড়নের মাত্রা কমেনি। মাদ্রাসার শিক্ষকদের দ্বারা ছাত্ররাও যৌন নিপীড়নের শিকার হয়েছে। প্রস্তাবে রাজি না হওয়ায় অভিযোগ উঠেছে ছাত্র হত্যার। ফেনীর নুসরাত যৌন নিপীড়নের শিকার হয়ে তার প্রতিবাদ করেছিল। ফলে তাকে আগুনে পুড়ে জীবন দিতে হলো।

এখানে নেকড়েদের চোখ রাঙানি আছে—প্রতিবাদের পরিণাম হবে এমনই। সমাজ এবং রাষ্ট্রকে এখানেই স্তব্ধতা ভেঙে সরব হতে হবে। বলতে হবে সব নিপীড়নের বিরুদ্ধে এবং প্রতিবাদের পক্ষে আছে সমাজ ও রাষ্ট্র। শুধু শোক জানিয়ে, সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে ক্ষোভ প্রকাশ করেই বসে থাকা যাবে না। প্রতিবাদে সরব হওয়ার পাশাপাশি কাজ করতে হবে একেবারে শিকড় থেকে। আমরা সকলেই জানি, সকল নৃশংসতা, বিকৃত চিন্তার আস্ফালনের মূলে শিক্ষা খাতের বিশৃঙ্খলা। দেশে এখনো বিচিত্র শিক্ষা পদ্ধতি বিরাজমান। এক শিক্ষা মাধ্যমের সঙ্গে অন্য শিক্ষা মাধ্যমের সামাজিক, ধর্মীয় বিরোধ তৈরি করে রাখা হয়েছে।

পৃথিবীর সব ধর্ম এবং ধর্মীয় কিতাব তৈরি হয়েছিল মানুষের মধ্যে শৃঙ্খলা আনার জন্য। ইহকালের জন্য আচরণবিধি তৈরিই ছিল মুখ্য উদ্দেশ্য। কিন্তু মানুষ ভেবে বসল শিক্ষা, ধর্ম, কিতাব পরকালের জন্য। এখানেই আমাদের মূর্খতা। সেই মূর্খতা নিত্য অন্ধকারের রংকে আরো কালো করে তুলছে। আমরা যতদিন সাংস্কৃতিক শিক্ষাকে সামনে নিয়ে না আসতে পারব, ততদিন অন্ধকারের এই রং কালো হতেই থাকবে। আমরা দেখতে পাচ্ছি প্রাথমিক থেকে উচ্চশিক্ষার সব বিষয়ে ধর্মীয় আবহ। পাঠদান পদ্ধতি ও বিদ্যায়তনের গঠন ও পরিচালনাতেও তাই।

বাংলা, আরবি, ইংরেজি মাধ্যমের শিক্ষার এ দিকটি একই সুরে বাজছে। এই সুর কল্যাণকর নয়। ধর্মীয় শিক্ষা তার নিজের গৌরব ও ঐতিহ্য নিয়েই থাকবে। কারো করুণার প্রয়োজন নেই। আমরা বরং নিজ নিজ স্বার্থে ধর্মকে ব্যবহার করছি। ধর্মকে ব্যবহার করতে গিয়ে মাদ্রাসা শিক্ষা ও সেখানকার শিক্ষার্থীদের মূলধারা থেকে দূরে রাখছি। সমাজ এখনো এমন ধারা নিয়ে বসে আছে যে, বাবা-মাহারা এতিমদের ঠিকানাই হচ্ছে মাদ্রাসা। এই মনোচিন্তা থেকেই আমরা তাদের বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি শিক্ষা থেকে দূরে রাখছি। যার ফায়দা নিচ্ছে নেকড়েরূপী কতিপয় শিক্ষক।

নুসরাতকে আগুনে পুড়িয়ে মারার চেষ্টা এবং পরবর্তী সময়ে তার মৃত্যুতে মাদ্রাসার শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের কাছ থেকে প্রতিবাদের ঝড় উঠবে বলে আশা করেছিলাম। কারণ সোনাগাজীর এক শিক্ষক পুরো মাদ্রাসা শিক্ষাকেই বিব্রত করেছে। ধর্ম, গোষ্ঠী স্বার্থের দেয়াল ভেঙে বের হওয়ার দিন চলে এসেছে। যদি এখনো দেয়াল ওঠার জন্য জমিন দিই, তবে দেখব একদিন দমবন্ধ হয়ে আমাদের সম্মিলিত মৃত্যু হবে, হবেই!

লেখক : বার্তাপ্রধান, সময় টিভি

Advertisement