Beta

‘বাংলাদেশে কখনো অবাধ, সুষ্ঠু নির্বাচন হবে না’

১১ ফেব্রুয়ারি ২০১৬, ২০:৩২ | আপডেট: ১১ ফেব্রুয়ারি ২০১৬, ২০:৫৪

অনলাইন ডেস্ক
কুলদীপ নায়ার

লড়াই করে স্বাধীনতা অর্জনকারী বাংলাদেশ তাঁর বৈশিষ্ট্য হারিয়েছে। যে বিপ্লবী চেতনা নিয়ে পশ্চিম পাকিস্তানের সঙ্গে লড়াই করে দেশটি স্বাধীন হয়েছিল, তার ছিটেফোঁটাও এখন আর নেই।

ভারতের প্রখ্যাত সাংবাদিক কুলদীপ নায়ার তাঁ সর্বশেষ লেখায় এ মন্তব্য করেছেন। আজ বৃহস্পতিবার ভারতীয় সংবাদপত্র স্টেটসম্যানে লিখিত নিবন্ধে তিনি আরো লিখেছেন, ‘প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কর্তৃত্বপরায়ণ হয়ে উঠছেন।’ তিনি আরো বলেন, ‘নয়াদিল্লিই হচ্ছে শেখ হাসিনার শক্তি, যারা তাঁর (শেখ হাসিনা) ওপর শতভাগ আস্থা রাখছে। বিএনপি সরাসরিই বলছে, এ রকম কর্তৃত্বপরায়ণ ভূমিকার কারণে শেখ হাসিনাই ভারতের ভাবমূর্তি নষ্ট করছেন।’

‘বাংলাদেশ কি লক্ষ্য হারিয়েছে?’ শিরোনামের ইংরেজি প্রবন্ধটি পাঠকদের জন্য হুবহু অনুবাদ করা হলো:

ঢাকায় এসে বুঝতে বেশি সময় লাগবে না, দেশটি তাঁর বৈশিষ্ট্য হারিয়েছে। বহুদূরের আর শোষণকারী পশ্চিম পাকিস্তানের কাছে থেকে যে বিপ্লবী উত্তাপ নিয়ে স্বাধীন হয়েছিল পূর্ব পাকিস্তানের মানুষ, এখন তার ছিটেফোঁটাও নেই। রাওয়ালপিন্ডির স্বার্থবাদীদের স্থান  এখন দখল করেছে দেশীয় কায়েমী স্বার্থবাদীরা।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কেমন কর্তৃত্বপরায়ণ হয়ে উঠেছেন! প্রথমত, বিএনপির প্রধান খালেদা জিয়ার জনপ্রিয়তা কমেছে। দ্বিতীয়ত, শেখ হাসিনা সেনাবাহিনীর সঙ্গে শান্তি বজায় রেখে চলেছেন, যারা তাঁর বাবা, বাংলাদেশের জনক শেখ মুজিবুর রহমানকে ক্ষমতাচ্যুত করেছিল।

সেনাবাহিনীর বেতন বাড়িয়েছেন হাসিনা। তার চেয়ে বেশি তিনি তাঁদের বুঝিয়েছেন, পেশাদার ও রাজনীতি থেকে দূরে থাকলেই তাঁরা (সেনাবাহিনী) শ্রদ্ধা অর্জন করবে। প্রকৃত অর্থেই সেনাবাহিনী এখন পেশাদার এবং ভরসা করার মতো বাহিনী হিসেবে বিবেচিত।

৪৫ বছর আগেই পশ্চিম পাকিস্তানের সশস্ত্রবাহিনীর বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিল (পূর্ব পাকিস্তানের) মানুষ। তাঁদের নিজেদের মুক্তিবাহিনী ছিল। বিশ্ববাসীর কাছে প্রমাণ করেছে, পরাধীনতার শৃঙ্খলে কোনো জাতিকে রাখা যায় না। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে বড় মাপের নেতা ছিলেন শেখ মুজিব। কায়েদে আজম মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ ছিলেন তাঁর নেতা। কিন্তু ঢাকায় এসে যখন জিন্নাহ বলেন উর্দু হবে জাতীয় ভাষা তখনই শেখ বিদ্রোহ করেন।

পাকিস্তানে বসবাসকারী বাঙালিরা ছিল পশ্চিমা (পাকিস্তানের) আধিপত্যের অধীনে। তাঁরা বুঝতে পারেন নিজেদের পরিচয়ের মধ্যে ঢুকিয়ে দেওয়া হচ্ছে পাঞ্জাবি সংস্কৃতি। যখন তাঁরা তাঁদের সংস্কৃতিকে হত্যার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ শুরু করেন তখনই পশ্চিম পাকিস্তানের সেনাবাহিনী গুঁড়িয়ে দিতে থাকে।

এমনকি, শেখ মুজিব পূর্ব পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করার পর প্রধানমন্ত্রী হবেন এটা সহ্য করতে পারেননি তখনকার পশ্চিম পাকিস্তানের মূল শক্তি ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী জুলফিকার আলী ভুট্টো। পূর্ব পাকিস্তানের পতনের জন্য যদি কাউকে দায়ী করা হয় তাহলে তিনি হলেন ভুট্টো। তিনি এককভাবে ক্ষমতা হাতে রাখতে চেয়েছিলেন।

শেখ হাসিনার মূল বিরোধিতা আসে জামায়াতে ইসলামীর দিক থেকে, যারা এখনো ধর্মের কার্ড ব্যবহার করছে। জামায়াতকে দেখা হয় পাকিস্তানের প্রতি সহানুভূতিশীল হিসেবে। বাংলাদেশিদের বিরুদ্ধে পাকিস্তানিরা যে নৃশংসতা চালিয়েছিল সে বিষয়ে এখন পর্যন্ত জামায়াত পরোক্ষভাবে হলেও নিন্দা জানায়নি।

আমি মনে করেছিলাম জামায়াতে ইসলামীর বয়স্ক নেতাদের যাঁরা রাওয়ালপিন্ডির সঙ্গে ছিলেন, তাঁদের ফাঁসি দেওয়াতে মনোভাবে বিরাট কোনো পরিবর্তন আসবে। কিন্তু আমার বিস্ময়ের বিষয় হলো, আমি দেখলাম যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে অভিযুক্তদের ফাঁসি দেওয়াতে (বাংলাদেশের) জনগণ খুশি। পাকিস্তান একটি ইসলামিক দেশ এবং ইসলামিক উম্মার একটি অংশ। তাই হয়তো পাকিস্তানের ভূমিকার বিষয়ে নীরব জামায়াত।

একসময় বামদের একটি শক্তি হিসেবে দেখা হতো। তারা তাদের ক্যাডারসহ সেই আবেদন হারিয়েছে। পেশা আকর্ষণ করছে তরুণদের। ব্যবসায়ীরা রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তার করছেন। কারণ, সরকারের প্রতিটি ক্ষেত্রে রয়েছে ঘুষ ও দুর্নীতি। এই ধারা সারা বাংলাদেশে বিদ্যমান।

তবু মন্দের ভালো যে, জনগণ গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা পছন্দ করে। প্রতিবাদ ও বিক্ষোভের মাধ্যমে তারা তাদের বিশ্বাসের প্রকাশ ঘটায়। বেশি দিন আগের কথা নয়, জনগণের অসন্তোষ এক সময় রাজপথে বিক্ষোভে রূপ নিত। তাতে স্বাভাবিক কাজকর্ম ব্যাহত হতো। বিলম্বে হলেও এর প্রভাব পড়ত জনগণের ওপর। বাজারঘাটে দোকানপাট বন্ধ হয়ে যেত। কলকারখানা বন্ধ হয়ে যেত। এতে শুধু তাদেরই ক্ষতি হতো। তারা বুঝতে পেরেছে যে, তৈরি পোশাক উৎপাদনের পরিবেশ ধ্বংস করার মাধ্যমে দেশের অর্থনীতির উন্নতি হচ্ছে না।

এই শিল্পটি রাজস্ব ও বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের একমাত্র বড় উৎস। চালিকাশক্তি হলো সম্পদ, যা গুটিকয় হাতে জমা থাকে। তারা শুধু ব্যবসায়ই নির্দেশনা দেয়, তা নয়। একই সঙ্গে রাজনীতিতেও নির্দেশনা দেয়। অনেক শিল্পপতি রাজনৈতিক দল ও ব্যক্তিবিশেষকে পার্লামেন্টে যাওয়ার জন্য অর্থ দিয়ে থাকেন, যাতে তাঁরা রাজনীতিতে তাদের প্রভাব বজায় রাখতে পারেন। সরকারের গৃহীত কর্মসূচিতে তাঁরা প্রভাব ধরে রাখতে পারেন।

তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোর মতো বাংলাদেশে মিডিয়ার স্বাধীনতা শুধু নামমাত্রই। সম্পাদকদের স্বাধীনতা আছে এতটুকুই, যতটুকু তাঁদের মালিকরা তাঁদের দেন। সংবাদপত্র সেনাবাহিনী সংক্রান্ত প্রতিবেদন করার ব্যাপারে খুব সতর্ক। এটা স্বীকৃত হয়ে গেছে, সেনাবাহিনীর সমালোচনা করে  সংবাদ করা আর দেশের স্বার্থের ক্ষতি করা একই ব্যাপার।  

আদর্শগতভাবে, অর্থনৈতিকভাবে ও সামাজিকভাবে বাংলাদেশ কোন পথে ধাবিত হচ্ছে এ প্রশ্নটি আমি অনেকজনকে করেছিলাম। রাজনীতির সঙ্গে ঘনিষ্ঠ একজন শিক্ষাবিদ আমাকে বললেন, বাংলাদেশ তার পথ হারিয়েছে এবং তিনি জানেন না কোন পথে ধাবিত হচ্ছে দেশ।

নয়াদিল্লিই হচ্ছে শেখ হাসিনার শক্তি, যা তাঁর (শেখ হাসিনা) ওপর শতভাগ আস্থা রাখছে। বিএনপি সরাসরিই বলছে, এ রকম কর্তৃত্বপরায়ণ ভূমিকার কারণে শেখ হাসিনাই ভারতের ভাবমূর্তি নষ্ট করছেন। তিনি কোনো সমালোচনা সহ্য করেন না।

বাংলাদেশে কখনো অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন হবে বলে মনে হয় না। তা সত্ত্বেও যদি নির্বাচন হয়, তাহলে আগেভাগেই বলে দেওয়া যায় যে, শেখ হাসিনা পরাজিত হবেন না। জামায়াতের সঙ্গে আঁটঘাট বাঁধার কারণে বেগম খালেদা জিয়াও নিজের জনপ্রিয়তা বাড়াতে পারেননি। প্রকৃত অর্থে তিনি শাস্তির মুখোমুখি, যা তিনি এড়াতে পারবেন বলে মনে হয় না।

যা হোক একটি বিষয় নিশ্চিত যে, যখনই নির্বাচন হোক খালেদা জিয়া এবার তা বর্জন করবেন না। বিএনপি বুঝতে পেরেছে যে, জাতীয় সংসদে যদি তাদের সামান্য সংখ্যক সদস্যও থাকেন তাহলে তাঁরা জনগণের কাছে শেখ হাসিনার ভুলভ্রান্তিগুলো তুলে ধরতে পারবেন। দেশের স্বার্থ এখন যেভাবে দেখা হয়, আগে কখনো সেভাবে দেখা হয়নি। কারণ, এখন হাসিনা ও খালেদা দুজনের বিষয়েই মানুষের মোহমুক্তি ঘটেছে। তবে এ দুই বেগমই (শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়া) বাংলাদেশের জন্য অনিবার্য পরিণতি। তাতে জনগণের কাছে তারা যতটাই অজনপ্রিয় হোন না কেন।

কুলদীপ নায়ার :  ভারতের বর্ষীয়ান সাংবাদিক, কলামিস্ট, মানবাধিকারকর্মী ও লেখক।

ইউটিউবে এনটিভির জনপ্রিয় সব নাটক দেখুন। সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের চ্যানেলটি:

Advertisement