Beta

চাটগাঁর কথা

বিবর্ণ হয়ে যাচ্ছে শহর

১০ মে ২০১৬, ১১:৫৩

নিজাম সিদ্দিকী

নগরের টাইগারপাস থেকে লালখান বাজার এলাকা। আবার টাইগারপাস হয়ে স্টেডিয়াম পর্যন্ত সিআরবি সড়ক। দুই পাশেই পাহাড়। গাছগাছালির সবুজ চাদরে মোড়া। আর সেই পাহাড়ের মাঝখানে সড়কপথ। পাড়ি দেয় ছোট-বড় বিভিন্ন গতির যান। মনোরম সে দৃশ্য। পড়ন্ত বিকেলে তা আরো বেশি উপভোগ্য হয়ে ওঠে। যতদূর জানি, প্রকৃতির এমন মিতালি দেশের অন্য কোনো শহরে চোখে পড়ে না।

কিন্তু সময়ের পালাবদলে দুই পাশের পাহাড় আজ ক্ষত-বিক্ষত। পাহাড়ের মাটি ক্ষয়ে যাচ্ছে। ভাঙন দেখা দিচ্ছে। এর মধ্যে কোনো কোনো স্থানে বসতিও গড়ে উঠেছে। রেইন ট্রিসহ পাহাড়ের গায়ে বেড়ে ওঠা গাছগুলোর ওপর বন শিকারিদের নজর পড়েছে। তারা পাহাড়ের বিভিন্ন উচ্চতায় কৌশলে শেকড় উপড়ে ফেলে রেখেছে। পরে সময়-সুযোগ বুঝে খণ্ড খণ্ড করে কেটে নিয়ে যাবে।

পরিবেশের ভারসাম্য বিনষ্ট হচ্ছে, সবুজ হারিয়ে যাচ্ছে চোখের সামনে। তবুও এ ব্যাপারে সংশ্লিষ্টদের কোনো বিকার নেই। এমনকি পত্রিকার পাতায় প্রতিবেদন ছাপা হয়েছে একাধিক। এর পরও সেই মৌনতা ভাঙেনি কর্তৃপক্ষের।

বিগত টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের সময়ে শহরের বিভিন্ন সড়কদ্বীপসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থানে বসানো নান্দনিক স্থাপনাগুলোতেও মরচে পড়েছে। কোনো কোনোটি আংশিক ভেঙে গেছে। ধুলো ময়লার আস্তরণ পড়েছে। এগুলোর নজরদারি, পরিচর্যার কোনো উদ্যোগ নেই কারো।

শহরের গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলোকে এফোঁড়-ওফোঁড় করে যখন তখন সার্জারি করছে বিভিন্ন কর্তৃপক্ষ। ফলে বিপাকে পড়ছে নগরবাসী। ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে পথচারী, যানবাহনগুলোকে। দেখা যায়, কিছুদিন আগে কার্পেটিং করা সড়ক খুঁড়ে কাজে নেমেছে ওয়াসা কর্তৃপক্ষ নয়তো টিঅ্যান্ডটি, নয় গ্যাস কোম্পানি। এতে কাদামাটিতে সয়লাব পুরো সড়ক। কাজ শেষেও তা আর সরানোর তৎপরতা দেখা যায় না। সড়কের সংস্কারের উদ্যোগও চোখে পড়ে না।

সম্প্রতি নগরের আগ্রাবাদ, চৌমুহনী, পাহাড়তলী প্রভৃতি এলাকায় বিশাল গর্ত খুঁড়ে পানির পাইপ বসানোর কাজ করছে চট্টগ্রাম ওয়াসা কর্তৃপক্ষ। অথচ এসব সড়কের কাজ শেষ হয়েছে বেশিদিন হয়নি। কারণ, এর আগেও তারা পুরো শহরময় এলোমেলোভাবে খোঁড়াখুঁড়ি করে জনজীবনকে অতিষ্ঠ করে তোলে। আমরা যদি ধরে নিই, সব কাজই হচ্ছে বৃহত্তর জনকল্যাণে, তাহলে পরিকল্পিতভাবে সব খোঁড়াখুঁড়ির কাজ সেরে একবারে রাস্তা সংস্কার করা হলে এমন বিপর্যস্ত অবস্থার সৃষ্টি হতো না। কিন্তু বিভিন্ন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে পারস্পরিক সমন্বয়হীনতার অভাবে তা হয় না বাস্তবে।

নগরীতে বেশ কয়েকটি নাজুক বহুতল ভবনের অস্তিত্ব রয়েছে। কোনো কোনোটি আবার গণপূর্ত বিভাগ থেকে বসবাস অনুপযোগী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। কিন্তু এর পরও ভাঙা হয়নি। সাম্প্রতিক ভূমিকম্পে এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আরো কয়েকটি। চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ) চুয়েটের বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ নিয়ে এ ব্যাপারে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার কথা। এ ব্যাপারে দ্রুত পদক্ষেপ না নিলে পরে বড় ধরনের বিপর্যয়ের ঝুঁকি এড়ানো যাবে না।

একসময়ে যানজট বিবেচনায় রাজধানী শহর থেকে চট্টগ্রাম নগরীর সুনাম ছিল বেশ। কিন্তু সেই সুনামেও এখন চিড় ধরতে শুরু করেছে। বিশেষ করে বছর তিনেক ধরে এই দুর্নামের দায় কাঁধে নিতে হচ্ছে বন্দরনগরীকে। সকাল ৯টার পর থেকে যানজট পাখা মেলতে থাকে নগরের পতেঙ্গা-ইপিজেড, ফ্রি পোর্ট সড়ক, বারিক বিল্ডিং, আগ্রাবাদ, বাদামতলী, খুলশী, জিইসি মোড়, ২ নম্বর মোড়, মুরাদপুর, বহদ্দারহাট, অক্সিজেন সড়ক, নিউমার্কেট, লাভলেন, চকবাজার প্রভৃতি এলাকায়। একেকটি ম্যানুয়েল ট্রাফিক পয়েন্টে দীর্ঘক্ষণ আটকা পড়ে বিরক্ত হয়ে পড়েন যানবাহন যাত্রীরা। এই জট থেকে বেরিয়ে আসতে পারে না ফায়ার ব্রিগেডের অগ্নিনির্বাপণ যান ও অ্যাম্বুলেন্স। এমনকি নিয়ম অনুযায়ী সাধারণ যানগুলো এদের জন্য পথ ছেড়ে দেওয়ার বিধান থাকলেও তা মানা হয় না।

দিনের বেলায় শহরের রাস্তায় ঢুকে পড়ছে ট্রাক। আবার ব্যস্ত সড়কে ট্রাক দাঁড় করিয়ে কাগজপত্র পরীক্ষার নামে তৈরি হয় আরেক যানজট। বর্তমানে নগরবাসীকে সকাল-সন্ধ্যায় যানজটের তীব্র যন্ত্রণায় ছটফট করতে হচ্ছে জিইসি মোড় এলাকায়। এ সড়কে ফ্লাইওভার নির্মাণের কাজ চলায় এ করুণ অবস্থা। তা ছাড়া এখানে পাবলিক বাসগুলো নিজেদের ইচ্ছামতো জড়ো হয়ে থাকে একের পেছনে এক। যাত্রী তুলতে থাকে সড়ক মোড়ে। তাদের জটলা ভেঙে দেওয়ার তেমন তৎপরতাও চোখে পড়ে না।

প্রতিদিন বিকেলে তৈরি হয় ফ্রি পোর্ট থেকে আগ্রাবাদ, টাইগারপাস, জিইসি, মুরাদপুর, বহদ্দারহাটমুখী বাড়িফেরা অফিসযাত্রীদের দুর্ভোগ। সবাই বাসের জন্য মোড়ে মোড়ে দাঁড়িয়ে থাকে। কিন্তু রাস্তায় বাস নেই পর্যাপ্ত। দীর্ঘ সময় পরে একটি বাসের দেখা পেলে হুমড়ি খেয়ে পড়ে সবাই। এটা কৃত্রিম সংকট। কারণ, বিকেল সাড়ে ৩টা-৪টার পর থেকে এসব রুটের পাবলিক বাসগুলো বেশির ভাগ চলে যায় ইপিজেড এলাকায় গার্মেন্ট কর্মীদের বহনের জন্য। বিআরটিএর বিধি অনুযায়ী, এসব বাস রুট পরিবর্তন করতে পারবে না। নির্দিষ্ট রুটেই চলতে হবে। রুট পরিবর্তন করলে তাদের রুট পারমিট বাতিল হয়ে যাওয়ার কথা। কিন্তু বছরের পর বছর তারা অনিয়ম করেও পার পেয়ে যাচ্ছে। কোনো শাস্তি হচ্ছে না; বরং বেড়ে যাচ্ছে সাধারণ যাত্রীদের প্রতিদিনের দুর্ভোগ।

 

লেখক : সিনিয়র রিপোর্টার, দৈনিক পূর্বকোণ।

Advertisement