শরীরের শোকগাথা
জুডিথ বাটলারের ‘সমকামভীতি’ ভাবনা

মানবসভ্যতা আর প্রগতির বেটনটা যে ছোট্ট ছড়িলাঠিটা
তাদের হাত থেকে আমাদের হাতে নেমে এসেছে
তারা খেয়াল করছেন, লক্ষ করছেন, ভাবতে চেষ্টা করছেন
এবং বুঝতে চেষ্টা করছেন রিলে রেসটা যে চলছে
তাদের বেটনটা কার হাত থেকে কার হাতে যায়।১
সমকামী অধিকার আইনটি যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্টে পাস হওয়ার খবরটি যেমনভাবে আমাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদী করে তোলে, তেমনই খোদ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে এমনকি বাংলাদেশে হোমোফোবিয়ার উৎকট প্রকাশ আমাদের মধ্যকার এক গভীরতর শঙ্কার পালে হাওয়া দেয়। মানবসভ্যতা কি আদৌ প্রগতির দিকে ধাবিত হচ্ছে, নাকি ধর্মের দোহাই দিয়ে পশ্চাৎপদ একটি রাজনৈতিক সংস্কৃতি পুঁজিবাদের সঙ্গে মিলেমিশে পৃথিবীব্যাপী ভয়ের সংস্কৃতি তৈরি করছে?
বিশেষ করে ভিন্ন চিন্তা, ভিন্নমত, ভিন্ন জীবনধারাকে গলা টিপে হত্যা করতে দুনিয়াব্যাপী হত্যাকারীরা সদা প্রস্তুত। যুক্তরাষ্ট্রে পাস হওয়া আইন নিয়ে বাংলাদেশে ঘটে যাওয়া প্রতিক্রিয়ার অংশ হিসেবে সমকামী আন্দোলনের অন্যতম পুরোধা জুডিথ বাটলারের ‘বেসাইড ওয়ানসেলফ : অন দ্য লিমিটস অব সেক্সুয়াল ডিফারেন্স’ নিয়ে আলোচনার প্রয়োজনীয়তা বোধ করেছি। শুরুতেই বলে রাখি, সমকামীদের এই বিজয় কোনো চূড়ান্ত বিজয় নয়, বরং দীর্ঘদিন ধরে চলে আশা অপমান, বঞ্চনা আর নিগ্রহের বিরুদ্ধে একটি প্রাতিষ্ঠানিক বিজয় মাত্র। এই আইন পাস হওয়ায় বিশ্বব্যাপী ঘটতে থাকা সমকামবিরোধী হিংস্রতার কোনো হেরফের হবে না, তবে তাদের অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম অনুপ্রেরণা অবশ্যই পাবে।
অনেকে সমকামীদের বিষয় আলোচনা করতে গিয়ে উদ্দেশ্যপূর্ণভাবে ধর্মের আশ্রয় নিচ্ছেন। ধর্মগ্রন্থে, বিশেষ করে আব্রাহামীয় ধর্মে উল্লেখ করা বিশেষ বাধা-নিষেধের কথা পুনরুল্লেখ করছেন। সমকামী অধিকার-আন্দোলনের ধারাটি কিন্তু ধর্মীয় আইনকে বুড়ো আঙ্গুল দেখায়নি, বরং বিস্তারিত যুক্তি-তর্ক আর বছরের পর বছর চলে আশা প্রতর্ক, প্রতি-প্রতর্কের নিরিখেই এই প্রাতিষ্ঠানিক বিজয়টি অর্জিত হয়েছে। এখানে নারীদের ভোটাধিকার আন্দোলনের বিষয়টি বিশেষভাবে উল্লেখ্য। পশ্চিমে নারী-ভোটাধিকার আন্দোলনটিও বিভিন্ন ঘাত-প্রতিঘাতের মাধ্যমে পরবর্তীকালে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়।
জুডিথ বাটলার আরেকটি বিশেষ কারণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ তাত্ত্বিক বর্তমান বিশ্বের। সাম্রাজ্যবাদী ওয়ার অন টেরর আর ইসলাম-ভীতির (ইসলামোফোবিয়া) যে পরিবেশ পশ্চিমে বিরাজ করছে, তার বিরুদ্ধে তিনি অত্যন্ত উচ্চকিত। বাটলার বুশ প্রশাসনের নীতির কঠোর সমালোচক ছিলেন। ‘সন্ত্রাসী’ হিসেবে চিহ্নিত মুসলিমদের বুশ প্রশাসন মানসিক বিকারগ্রস্ত প্রমাণের জোর প্রচেষ্টা চালিয়েছে। অনেকটা ফুকো আচ্ছন্ন বাটলার মনে করেছেন জ্ঞানালোকপ্রাপ্তির সময়কালে ইউরোপে মানসিক রোগীদের বিরুদ্ধে যে রকম প্রকাশ্য বিদ্বেষের অংশ হিসেবে মানসিক হাসপাতাল প্রথা চালু হয়েছে, ৯/১১-পরবর্তী বিশ্বে র্যাডিক্যাল মুসলিমদের বিপক্ষে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকরা প্রকাশ্য বিদ্বেষের অংশ হিসেবে শোধনাগারের প্রস্তাব করে। Precarious Life: The Powers of Mourning and Violence গ্রন্থে বাটলার বলেছেন, ‘সন্ত্রাসী’ আর মানসিক বিকারগ্রস্তের মধ্যে সাদৃশ্য দেখানোর সরকারি চিন্তা-ধারাকে প্রোটো-ফুকোলদ্যীয় দৃষ্টিকোণ থেকে দেখার আহ্বান করেছেন : “[সাম্রাজ্যবাদী নিও-লিবারেল দৃষ্টিকোণ থেকে] সন্ত্রাসীরা মানসিক বিকারগ্রস্তের মতো, কারণ তাদের চিন্তার জগৎ দুর্বোধ্য, তারা যুক্তিবিরোধী, তারা ‘সভ্যতা’বিরোধী”২। তিনি আরো বলছেন, “আমরা যদি ‘সভ্যতা’ শব্দটি পশ্চিমা নির্মাণের দিক থেকে চিন্তা করি, যে নির্মাণ প্রকল্পটি যুক্তিবাদের কতিপয় সংজ্ঞার বৈধতা দেয়, আর ধরে নিই, সেই সংজ্ঞায়িত বৈধতাগুলো পশ্চিমা সভ্যতার কষ্টিপাথর, আমাদের আবার চিন্তা করতে হয়, শুধু মুসলিম সন্ত্রাসীদের কর্মকাণ্ডকেই যুক্তিবাদের বিরুদ্ধ ধরা হচ্ছে, নাকি যে কোনো অথবা সকল প্রকার ইসলামী চিন্তা আর কর্মকাণ্ডকে মানসিক বিকারের সমতুল্য ধরা হচ্ছে, কারণ পশ্চিমের যুক্তির (reason) জগতের বাইরে তার অবস্থান।” মুসলমানদের ঢালাওভাবে পাশ্চাত্য পরিপন্থী অথবা যুক্তির বাইরে প্রমাণের বিরুদ্ধে বাটলারের দৃঢ় অবস্থানের পরিচয় আমরা এইখানে পাই।
একইভাবে বাটলার অবস্থান নেন সমকাম-ভীতির বিরুদ্ধে। ইসলামবিরোধী সাম্রাজ্যবাদী রাজনীতি আর সমকামবিরোধী বুর্জোয়া চিন্তা-জগতের মধ্যে এক অদ্ভুত মিল রয়েছে, উত্তর-কাঠামোবাদী অবস্থান থেকে বাটলার এই মিলের ঠিকুজী খোঁজার কাজে বেশকিছু সময় ধরে নিয়োজিত আছেন।
তবে বলে রাখা উচিত, ইসলামী আন্দোলন আর সমকামী অধিকারের আন্দোলনের রাজনীতির মানচিত্রটি বেশ জটিল। ইসলামবিরোধী সাম্রাজ্যবাদী রাজনীতি পুঁজিবাদের সমর্থক সৌদি সরকার তথা সুন্নি মৌলবাদী চিন্তাকে বেশ জোরেশোরে সমর্থন দিয়েছে, আর দিয়ে যাচ্ছে। পুঁজিবাদপন্থী মধ্যপ্রাচ্যের সত্তরের দশকের শুরু থেকেই তাদের ইসলাম প্রকল্পকে অপরাপর মুসলিমপ্রধান রাষ্ট্রে রপ্তানির চেষ্টা করেছে, আর পশ্চিমা সরকারগুলো এই প্রক্রিয়ায় পূর্ণ সমর্থন দিয়েছে, কারণ ওয়াহাবি-মতবাদের ইসলাম পশ্চিমের প্রাচ্যবাদী (Orientalist) কাঠামোর পুরোদস্তর সমর্থক। বাটলারের চিন্তাসূত্র ধরে বলতে হয়, পশ্চিমের মূল টার্গেট অপশ্চিমীয় গণতন্ত্র, তাই তার মূল টার্গেট শিয়া রাজনৈতিক ইসলাম। কারণ শিয়া ইসলামের গণতান্ত্রিক কেন্দ্রস্থলটি সে আগেভাগেই শনাক্ত করতে পেরেছে, ইরানে একের পর এক গণতান্ত্রিক নির্বাচনগুলো তার প্রমাণ। আর একে পশ্চিমা সভ্যতার জন্য হুমকিস্বরূপ বলে চিহ্নিত করে তার বৈশ্বিক রাজনীতি পরিচালনা করেছে। তেমনই সমকামী আন্দোলনের পুঁজিবাদী অংশকে হাত করেই, শৃঙ্খলিত করে, তবেই সমকামবিরোধী ডিসকোর্সের পথচলা।
শৃঙ্খলিত করার বিষয়টি উঠে এসেছে ‘বেসাইড ওয়ানসেলফ : অন দ্য লিমিটস অব সেক্সুয়াল ডিফারেন্স’ প্রবন্ধটিতে। সমকামিতার প্রকল্পটি, বাটলার প্রবন্ধটিতে বলছেন, শোকাবহ জীবনের পরিচায়ক। শোকের বার্তাটি প্রবন্ধটির মূল উপজীব্য কারণ বাটলার মনে করেন, ভিন্ন সেক্সুয়াল ওরিয়েন্টেশনের মানুষ সর্বদাই সন্ত্রাসের শিকার : ‘বলা বাহুল্য, আমাদের রাজনৈতিক পরিচয় আমাদের শরীরের সামাজিক নিরাপত্তাহীনতার পরিচয় বহন করে, আমরা একই সঙ্গে আমাদের পরিচয়ের আজ্ঞাবহ আর শারীরিক নিগ্রহের পরিচয় বহনকারী।’৩ শরীরের ওপরই সংগঠিত হয় নিগ্রহ, আবার এই শরীরই সেক্সুয়াল ডিফারেন্সের পরিচয় বহন করে। সমকামীরা হয়ে ওঠেন ‘রাজনৈতিক সম্প্রদায়’।
‘অপর’ অথবা ভিন্ন জেন্ডারের শরীর আবার সংগ্রামেরও প্রতীক। শরীর যখন স্বাতন্ত্র্য প্রকাশের চেষ্টা চালায়, তখনই সে রাষ্ট্রের নজরদারির মধ্যে আসে। বাটলারের বয়ান থেকে ধরে নেওয়া যায় রাষ্ট্রের নজরদারির মধ্যে থেকে রাষ্ট্র যন্ত্র থেকে সমর্থন আদায় করে নেওয়ার ব্যাপারটি সহজসাধ্য ছিল না মোটেই। এই সমর্থন আসলে দীর্ঘ সংগ্রামের ফসল। বাটলার লিখছেন, উদাহরণস্বরূপ, আমরা রাষ্ট্রকে বলি তার আইন আমাদের শরীর থেকে দূরে রাখতে, আমরা শারীরিক সেলফ-ডিফেন্সের ব্যাপারটাও চিন্তা করি, আর রাজনৈতিক শুভত্বের সঙ্গে শারীরিক সততার ব্যাপারটা মিলিয়ে দেখি’৪। নিগ্রহের পূর্বাশঙ্কা আর অধিকার-চর্চার সীমাবদ্ধতা ‘অপর’ জেন্ডারের শারীরিক সম্ভাবনাকে রুদ্ধ করে রাখে।
বাটলার সমকামী অধিকার আন্দোলনকে বৃহৎ পরিসরে দেখার চেষ্টা চালিয়েছেন : ‘এটি [স্বাধীনতার অধিকার] সত্য লেসবিয়ান, গ্যে, আর উভকামীদের যৌন স্বাধীনতা প্রসঙ্গে, যেমনটাই সত্য ট্র্যান্সসেক্সুয়াল আর ট্র্যান্সজেন্ডারদের স্বাধিকারের বেলায়। এটি একইভাবে প্রযোজ্য উভলিঙ্গের আধিকারিকদের বেলায় যারা সব ধরনের মেডিক্যাল, সারজিক্যাল আর সাইকিয়াট্রিক হস্তক্ষেপ থেকে মুক্ত থাকতে চায়, যেমন প্রযোজ্য বর্ণবাদী আক্রমণের, শারীরিক আর মৌখিক উভয় প্রকার আক্রমণ, হাত থেকে রক্ষা পাবার দাবিদারদের প্রসঙ্গে’৫। বলা যেতে পারে, সব ধরনের নিগ্রহের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের কণ্ঠস্বর শোনা যাচ্ছে বাটলারের ‘বেসাইড ওয়ানসেলফ : অন দ্য লিমিটস অব সেক্সুয়াল ডিফারেন্স’ প্রবন্ধটিতে। যৌনতার যে ভিন্নরূপ জগতব্যাপী বিরাজ করছে, হেটেরোসেক্সুয়াল যৌনতার আধিপত্যের কাছে যা যৎসামান্য, তাকেও বুর্জোয়া সংস্কৃতি সন্দেহের চোখে দেখছে, কারণ প্রোটেসটানট ওয়ার্ক এথিক তথা বুর্জোয়া বাস্তুবাদের সঙ্গে সমকামিতাকে সাংঘর্ষিক প্রমাণে পুঁজিবাদী বিশ্বের তৎপরতা লক্ষণীয়। যৌন পার্থক্য নিয়ে আপত্তির উৎপত্তিস্থলও এটি।
তাই বাটলার প্রবন্ধটিতে আধিপত্যবাদী যৌন ডিসকোর্সের (হেটেরোসেক্সুয়াল বিবাহ, নর-নারী যৌন সম্পর্ককে একমাত্র বৈধ যৌনসম্পর্ক হিসেবে দেখা) ত্রাস উৎপাদনকারী হিংস্রতা বন্ধের আহ্বান জানিয়েছেন : ‘হিংস্রতা সবচাইতে ভয়ংকর কাঠামো, ভয়ের সংস্কৃতিকে উসকে দেওয়া হিংস্রতা ভয়ংকরভাবে ব্যক্তিমানুষের কাছে আরেক ব্যক্তি মানুষকে অসহায় করে তোলে, এই প্রক্রিয়ায় আমরা অন্য গোষ্ঠীর ইচ্ছার দাসে পরিণত হই, জীবন হয়ে পড়ে বিপন্ন, অপরের অনুগ্রহধন্য’৬। বাটলারের প্রবন্ধটি তাই বৈশ্বিক সমকামভীতির বিরুদ্ধে জিহাদ ঘোষণা করে, যেই জিহাদে তিনি মিলিয়ে দেন অন্য অথবা অপরাপর নিগৃহীত জনগোষ্ঠীকে, হতে পারে তারা পুরুষতান্ত্রিক সমাজের নিগৃহীত নারী, অবৈধ অভিবাসী, অথবা র্যাডিক্যাল ইসলামের সমর্থক অথবা নিজেদের যৌন-স্বাতন্ত্র্যের জন্য লড়তে থাকা সমকামী, উভকামী, উভলিঙ্গের আধিকারিক, ট্র্যান্সজেন্ডার অথবা ট্র্যান্সসেক্সুয়াল।
তথ্যসূত্র
১. কবির সুমনের পঙক্তিমালা
২. Butler, Judith. Precarious Life: The Powers of Mourning and Violence (London: Verso, 2006).
৩. --. Undoing Gender. New York: Routledge, 2004. Print.
৪. Ibid.
৫. Ibid.
৬. Ibid.