Beta

কার্ল মার্কসের আবিষ্কার

০৬ মে ২০১৮, ১২:০১ | আপডেট: ০৬ মে ২০১৮, ১৩:২০

এ বছর—এই ইংরেজি ২০১৮ সালে—কার্ল মার্কসের জন্মের দুইশ বছর পূর্ণ হইতেছে। তাঁহার বিষয়ে যত কথা বলা যায় ইহার মধ্যে তাহার প্রায় সবই বলা হইয়া গিয়াছে। এতদিন পর—এই এখন—নতুন আর কোন কথাটি বলা যায়? যেদিন মার্কস মারা গেলেন তাহার তিন দিনের মাথায়—মোতাবেক ১৭ মার্চ ১৮৮৩ সালে—লন্ডনের হাইগেট গোরস্তানে তাঁহার সমাধির পাশে দাঁড়াইয়া দীর্ঘদিনের বন্ধু ফ্রেডরিক এঙ্গেলস বলিয়াছিলেন, ‘যুগ যুগ ধরিয়া তাঁহার নাম কীর্তিত হইতে থাকিবে, আর কীর্তিত হইবে তাঁহার সাধনা।’

এঙ্গেলসের এই ভবিষ্যদ্বাণী বৃথা যায় নাই। আজ দুইশ বছর পরও আমরা তাঁহার নাম লইতেছি। সারা দুনিয়া লইতেছে। ফরাশি ইতিহাস ব্যবসায়ী ফেরনাঁ ব্রোদেল (১৯০২-১৯৮৫) মার্কসের মৃত্যুর প্রায় একশ বছর পর পরলোকগমন করিয়াছেন। ইঁহাকে আর যাহাই বলিবেন বলিতে পারেন, ভুলেও মার্কস-ব্যবসায়ী বলিতে পারিবেন না। আর ইঁহার মতেও উনিশ শতকিয়া এয়ুরোপ মহাদেশে শ্রেষ্ঠ সমাজ সংস্কারক মহাত্মাদের মধ্যে—বিশেষ যাঁহারা ১৭৬০ সাল হইতে ১৮২৫ সালের অবসরে জন্মিয়াছিলেন তাঁহাদের মধ্যে—কার্ল মার্কসের নামই সর্বাগ্রগণ্য। ইঁহাদের মধ্যে তিনি উল্লেখ করিয়াছেন অঁরি সাঁ সিমোঁ (১৭৬০), রবার্ট ওয়েন (১৭৭১), শার্ল ফুরিয়ে (১৭৭২), এতিয়েন কাবে (১৭৭৮), ওগুস্ত কোঁত (১৭৯৮), পিয়ের জোসেফ প্রুধোঁ (১৮০৯), ভিক্তর কঁসিদেরাঁ (১৮০৮) এবং লুই ব্লাঁ (১৮১১)। বয়সে ইঁহারা সকলেই কার্ল মার্কসের বড়। বন্ধনীমধ্যে উল্লেখ করা সালগুলি তাঁহাদের স্ব স্ব জন্মের বছর। কার্ল মার্কসের জন্ম ১৮১৮ সালে আর ফ্রেডরিক এঙ্গেলস ও ফার্দিনান্দ লাসালের জন্ম যথাক্রমে ১৮২০ ও ১৮২৫ সালে। ব্রোদেল উল্লেখ করিতে ভোলেন নাই যে শেষের এই তিনজন ছিলেন জাতিতে জার্মান। এয়ুরোপ মহাদেশে শ্রমিক শ্রেণির আন্দোলনকে ইঁহারাই সমাজের পেছনের সারি হইতে টানিয়া সামনের দিকে লইয়া আসিয়াছিলেন।

ব্রোদেল বলিয়াছেন, আপনকার সহকর্মীদের মধ্যে মার্কসের প্রতিদ্বন্দ্বী হইবার যোগ্যতা রাখিতেন একমাত্র ফার্দিনান্দ লাসাল। ১৮৬৪ সালে এক দ্বন্দ্বযুদ্ধে তিনি যদি হঠাৎ নিহত না হইতেন তো কার্ল মার্কসের নামাংকিত রাজনৈতিক আন্দোলনটির জয়জয়কার এখন যতটা নিশ্চিত হইয়াছে ততটা হইত কিনা বলা মুশকিল। তবে শেষ পর্যন্ত ইতিহাস ব্যবসায়ী ব্রোদেলও স্বীকার করিতে বাধ্য হইয়াছেন, মার্কসের রাজনৈতিক সাফল্যের আসল রহস্য তাঁহার লেখা দাস কাপিটাল বা পুঁজি (১৮৬৭) গ্রন্থের বিশ্লেষণশক্তির যথার্থতায় নিহিত। কি সেই শক্তি? সমাধিপার্শ্বের বক্তৃতার এক জায়গায় ফ্রেডরিক এঙ্গেলস দাবি করিয়াছিলেন কার্ল মার্কস যাহা আবিষ্কার করিয়াছেন তাহা চার্লস ডারউয়িনের আবিষ্কারের সমতুল্য। তিনি বলিয়াছিলেন, ‘ডারউয়িন যেমন সপ্রাণ প্রকৃতিজগতের বিকাশের বিধি আবিষ্কার করিয়াছিলেন, মার্কসও তেমনি মানুষের ইতিহাস বিকাশের বিধি আবিষ্কার করিয়াছেন।’

মানবজাতির ইতিহাস বিকাশের বিধি বা নিয়ম বলিতে কি বুঝাইতেছে? এঙ্গেলস বলিয়াছেন, এই বিধি বা নিয়ম আর কিছু নহে—একটি সরল সত্য মাত্র। সত্যটি এই যে অন্য কোন কাজে হাত দিবার আগে মনুষ্যসন্তানকে খানাপিনা করিতে, মাথাগোঁজার একটা ঠাঁই খুঁজিতে আর পিন্ধনের মতো এক টুকরা কাপড়ের ব্যবস্থা করিতেই হয়। এটুকুর ব্যবস্থা হইলেই না তাহারা রাষ্ট্রনীতি, শিল্পকলা, ধর্মকর্ম ইত্যাদির পিছনে সময় দিতে পারে। এতদিন পর্যন্ত সাকার ভাবধারার বাড় অতি বেশি বাড়িবার কারণে এই সরল সত্যটা পায়ের তলায় চাপা পড়িয়া ছিল। তাই এই সত্যের প্রকৃষ্ট অর্থ দাঁড়াইতেছে এই রকম: কোন বিশেষ জাতি বিশেষ কোন যুগে প্রতিদিনকার জীবনযাপনের নগদ প্রয়োজনে যেটুকু উৎপাদনের ব্যবস্থা করিতে পারে অর্থাৎ যে পরিমাণ অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জন করিতে পারে তাহার ভিত্তিতেই সেই জাতির পক্ষে রাষ্ট্র পদবাচ্য অনুষ্ঠান-প্রতিষ্ঠান বা আইন-কানুনের গোড়াপত্তন করা কিংবা শিল্পকলা আর—এমনকি—ধর্মকর্ম সংক্রান্ত ভাবধারা প্রভৃতি গড়িয়া তোলা সম্ভব। এই ভিত্তির নিরিখেই মাত্র তাহার উপর গড়িয়া ওঠা ধ্যান-ধারণার ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করিতে হইবে—এতদিন ধরিয়া যাহা চলিতেছিল—অর্থাৎ ধ্যান-ধারণার ভিত্তিতে অর্থনৈতিক বিকাশের ব্যাখ্যা—সেই রকম উল্টাপাল্টা ব্যাখ্যা আর চলিবে না।

এঙ্গেলসের এই দাবি নিছক তাঁহার মনগড়া কথা নহে। মার্কস তাঁহার ‘পুঁজি’ গ্রন্থের প্রথম সংস্করণের মুখবন্ধযোগে একই কথাই লিখিয়াছিলেন—‘শেষ পর্যন্ত এই গ্রন্থের উদ্দেশ্য একটাই—এ যুগের সমাজ ব্যবস্থা কোন অর্থনৈতিক বিধি বা নিয়ম অনুসারে বিকশিত হইতেছে তাহা আবিষ্কার করা।’

এঙ্গেলসের মতে, এই আবিষ্কারটাই কার্ল মার্কসের একমাত্র আবিষ্কার ছিল না। সমাধিপার্শ্বের বক্তৃতায় তিনি আরো যোগ করিতেছিলেন, বর্তমান যুগের পুঁজিভিত্তিক উৎপাদন প্রণালী আর সেই প্রণালী হইতে যে বুর্জোয়া শ্রেণি জন্মিয়াছে তাহারা যে বিশেষ বিধি বা নিয়ম অনুযায়ী চলিতেছেন সেই বিধিটিও মার্কসই আবিষ্কার করিয়াছেন। মার্কস আবিষ্কার করিয়াছেন যে উৎপাদন প্রক্রিয়ায় যুক্ত হইয়া শ্রমিক শ্রেণি যে পরিমাণ নতুন মূল্যের সৃষ্টি করে তাহার একাংশই মাত্র তাহারা মজুরি বাবদ পাইতেছেন, বাকি বা উদ্বৃত্ত অংশটুকু পুঁজির মালিকগণ ভোগ করিয়া থাকেন। ফ্রেডরিক এঙ্গেলস নির্দেশ করিয়াছেন, এই উদ্বৃত্তমূল্যের বিধি বা নিয়মটা কার্ল মার্কসের দুই নম্বর আবিষ্কার। এই আবিষ্কারকে এযুগের বুর্জোয়া অর্থনীতিবিদগণ নতুন নামে ডাকিতেছেন। তাঁহারা ইহার নাম রাখিয়াছেন ‘পুঁজিগঠন’ বা ক্যাপিটাল ফর্মেশন।

এই আবিষ্কারের ফলে এতদিন যাবত যে সমস্যার সমাধান লইয়া একাধারে বুর্জোয়া অর্থনীতি ব্যবসায়ী এবং অন্যদিকে সমাজতন্ত্রবাদী সমালোচকগণ অন্ধকারে পথ হাতড়াইতেছিলেন তাহা অকস্মাৎ সহজবোধ্য হইয়া উঠিল। এই সমস্যার নাম এতদিন ছিল শ্রমিক সমস্যা। এক্ষণে উহার নতুন নাম দাঁড়াইল বুর্জোয়া সমস্যা—অর্থাৎ সমাজ হইতে কিভাবে বুর্জোয়া শ্রেণির শাসন উঠাইয়া দেওয়া যায়।

একটা জীবনের পক্ষে এই মাপের দুইটা আবিষ্কারই কি যথেষ্ট নয়? আর এহেন একটা আবিষ্কারের মতন আবিষ্কার যে মানুষটি করিতে পারেন তাহাকেই নির্দ্বিধায় সুখী মানুষ বলা যাইতে পারে। জ্ঞানের যে ক্ষেত্রেই মার্কস হাত দিয়াছিলেন সেখানেই—এমনকি গণিতশাস্ত্রেও—তিনি নিজস্ব একটা কিছু আবিষ্কার করিতে সক্ষম হইয়াছিলেন। তাঁহার জ্ঞানানুসন্ধানের ক্ষেত্রও খুব একটা কম ছিল না—ছিল অনেকগুলি—আর কোন ক্ষেত্রেই নিছক ভাসাভাসা অনুসন্ধান করিয়া বা দায় সারিয়া তিনি কর্তব্যকর্ম সমাপন করেন নাই।

সেদিনের বক্তৃতায় এঙ্গেলস যে কোন কারণেই হউক আর একটি আবিষ্কারের কথা বলিতে ভুলিয়া গিয়াছিলেন। মার্কস নিজেই সেই আবিষ্কারের কথা বলিয়া গিয়াছিলেন—এঙ্গেলসেরও তাহাতে দ্বিমত ছিল না। জগদ্বিখ্যাত ‘কমিউনিস্ট পার্টির ইশতেহার’ কার্ল মার্কস ও ফ্রেডরিক এঙ্গেলস দুইজনেরই কীর্তি—তবু এই ইশতেহারের মূল ধ্যান-ধারণার কৃতিত্ব এঙ্গেলসও একা কার্ল মার্কসকেই দিয়াছিলেন। এই প্রধান ধারণাটির নাম—সকলেই জানেন—‘শ্রেণি সংগ্রাম’। মার্কস বলিয়াছেন, শ্রেণি সংগ্রাম কথাটি বা তাহার অন্তর্গত অর্থটি তাঁহাদের নিজেদের মৌলিক আবিষ্কার নহে। তাঁহাদের এক যুগ আগে ফরাশিদেশের কয়েকজন ইতিহাস ব্যবসায়ী এই ধারণাটির উদগাতা। এই বুর্জোয়া ইতিহাস ব্যবসায়ীদের মধ্যে ওগুস্তিন থিয়েরি প্রমুখ কেহ কেহ ছিলেন সাঁ সিমোঁর শিষ্য।

মার্কস দাবি করিয়াছেন, শ্রেণি সংগ্রামের মধ্যস্থতায় পশ্চিম এয়ুরোপের ইংলন্ড, ফরাশি প্রভৃতি দেশে বুর্জোয়া শ্রেণি রাষ্ট্রক্ষমতা লাভ করিয়াছে। মার্কস দেখাইতে চাহিয়াছিলেন, বুর্জোয়া শ্রেণির ক্ষমতা যে পথে আসিয়াছে একদিন সেই পথেই তাহার বিনাশ ঘটিবে। অর্থাৎ শ্রেণি সংগ্রামেই তাহার অবসান হইবে। ইংলন্ড ও ফরাশি প্রভৃতি দেশের নতুন শাসক শ্রেণি—সংক্ষেপে যাহাদের নাম বুর্জোয়া শ্রেণি—একদিন শ্রমিক শ্রেণির হাতে পরাস্ত হইবেন। এই নতুন বিপ্লবী শ্রেণির লক্ষ্য হইতেছে সমাজ ব্যবস্থার দুষ্টক্ষতস্বরূপ যে শ্রেণি সংগ্রাম জারি রহিয়াছে তাহার অবসান ঘটানো। মার্কস নিবেদন করিয়াছিলেন একদিন শ্রমিক শ্রেণির রাজ কায়েম হইবে—এই ধারণাটিই তাঁহার নিজের পক্ষে শেষ আবিষ্কার। ইংরেজিতে এই ধারণার তর্জমা হইয়াছে—ডিক্টেটরশিপ অব দি প্রলেতারিয়েত বা শ্রমিক শ্রেণির একান্ত শাসন।

এঙ্গেলস তাঁহার ১৭ মার্চের বক্তৃতায় বলিতেছিলেন, সকল কথার গোড়ার কথা—মার্কস ছিলেন একজন বিপ্লব ব্যবসায়ী—প্রচলিত ভাষায় বলিতে ‘পেশাদার বিপ্লবী’। তাঁহার ধ্যানজ্ঞান ছিল একটাই—ছলে বলে কিংবা কৌশলে পুঁজিমালিক সমাজের উচ্ছেদসাধন আর সেই উচ্ছেদসাধনের কাজে তাহার সঙ্গে যে সকল রাষ্ট্র জাতীয় প্রতিষ্ঠানের কল্যাণে এই ধরণের সমাজ গাড়িয়া বসিয়াছে তাহাদের উচ্ছেদসাধনে সর্বাত্মক শরিক হওয়াই তাঁহার জীবনের ধ্রুবতারা হইয়াছিল। তিনি শরিক হইতে চাহিয়াছিলেন বর্তমান যুগের প্রলেতারিয়েত বা সর্বহারা শ্রমিক শ্রেণির মুক্তিসংগ্রামে। শ্রমিক শ্রেণি যে শ্রমিক শ্রেণি—বুর্জোয়া শ্রেণি যে তাহাদের শোষণ করিতেছে এই সত্য খোদ শ্রমিকদের মাথায় তিনিই প্রথম ভালোভাবে ঢুকাইয়াছিলেন। শ্রমিকদিগকে তিনি বলিয়া দিয়াছিলেন মুক্তিলাভ করিতে হইলে তাহাদের কি কি জিনিশের দরকার হইবে, বা কোন কোন শর্ত পূরণ করিতে হইবে। এককথায় লড়াই করার মেজাজটা তাঁহার অস্থিমজ্জায় গাঁথা ছিল।

এহেন মানুষের পক্ষে বুর্জোয়া শ্রেণির ঘৃণা না কুড়াইয়া বাঁচিয়া থাকা কি সম্ভব? মার্কস ছিলেন—এঙ্গেলস জানাইতেছেন—তাঁহার কালের সবচেয়ে বেশি ঘৃণাপ্রাপ্ত এবং সবচেয়ে বেশি কুৎসার শিকার ব্যক্তি। রাজতন্ত্রপন্থী আর প্রজাতন্ত্রপন্থী দুই ধরনের সরকারই তাঁহাকে স্ব স্ব দেশ হইতে বাহির করিয়া দিয়াছিলেন। তাঁহার বিরুদ্ধে অপবাদ রটনার দৌঁড়ে বুর্জোয়া শ্রেণির প্রতিনিধিরা নিজেদের মধ্যে প্রতিযোগিতায় নামিয়াছিলেন। এই একটি ক্ষেত্রে কে যে সংরক্ষণশীল দলের আর কে যে অতি-গণতন্ত্রী দলের সেই ভেদাভেদ করা যাইত না।

মার্কস আপন মনে আপনার কাজ করিয়া গিয়াছেন। একান্ত বাধ্য না হইলে তিনি এই সকল কুৎসার কোন জবাবও দিতেন না। উদাহরণস্বরূপ ‘পুঁজি’ প্রথম খণ্ডের মুখবন্ধ লিখিতে বসিয়া তিনি লিখিয়াছিলেন, যে কোন বৈজ্ঞানিক গবেষণার ফলাফল যাহাদের বিরুদ্ধে যায় তাহারা যে সেই গবেষণার মুণ্ডুপাত করিবেন তাহাতে অবাক হইবার কিছু নাই। কিন্তু অর্থশাস্ত্রের বিষয়টা একটু আলাদা। যে সমস্ত বিষয় লইয়া অর্থশাস্ত্রের কারবার তাহাদের প্রকৃতিটা একটু আলাদা গোছের। এইসব বিষয় ব্যক্তিগত সম্পত্তির বা স্বার্থের সহিত জড়িত বিধায় অর্থশাস্ত্র গবেষকের বিরুদ্ধে গড়িয়া উঠা যুদ্ধক্ষেত্রের শত্রুব্যূহে দেখা যায় মানবজাতির বক্ষে পৃথিবীর যত চরম ধ্বংসাত্মক, পরম হীন আর অসুস্থ আবেগ আছে সবই এক জায়গায় আসিয়া সমবেত হইয়াছে। এদের নাম ব্যক্তিগত সম্পত্তির অসুর-অসুরি।

শত্রুতার প্রকৃতিটা কেমন তাহা দেখাইবার উদ্দেশ্যে মার্কস লিখিয়াছিলেন, ‘উদাহরণস্বরূপ বলা যাউক, আপনি যদি ইংরেজ জাতির সর্বজনস্বীকৃত চার্চ বা ধর্মসংঘের ৩৯টি বিধির মধ্যে ৩৮টি বিধি বাতিল করিবার দাবিও তোলেন তাহা তাহারা সহজে ক্ষমা করিতে রাজি হইবেন, তবে যদি তাহাদের আয়ের ৩৯ ভাগ হইতে ১ ভাগও কমাইতে চাহেন অত সহজে ক্ষমা করিতে রাজি হইবেন না। কারণ—মার্কস বলিতেছেন—আজিকালি সম্পত্তি প্রথার সমালোচনার সহিত তুলনা করিলে দেখিবেন নাস্তিকতাও লঘু অপরাধ বৈ নহে।

১৮৪৮ সালে কার্ল মার্কস যখন ‘কমিউনিস্ট পার্টির ইশতেহার’ রচনা করিতেছিলেন তখনও এয়ুরোপ মহাদেশে শ্রমিক শ্রেণি পুরাপুরি গড়িয়া উঠে নাই। ফরাশি একাডেমি প্রণীত ফরাশি ভাষার অভিধানে ‘প্রলেতারিয়েত’ শব্দটি প্রথম ঢুকিবার অনুমতি পাইয়াছিল মাত্র ১৮২৮ সালে—মানে মার্কসের জন্মের মাত্র দশ বছর পর আর ইশতেহারের বিশ বছর আগে। বুর্জোয়া শ্রেণি খুব সহজে এই শব্দটি উচ্চারণ করিতে চাহেন নাই। তাহারা ইহার পরিবর্তে ‘জনতা’ শব্দটি ব্যবহার করিতে শুরু করেন। ইংরেজিতে একবচনে ‘ম্যাস’ আর বহুবচনে ‘ম্যাসেস’ শব্দের ব্যবহার ১৮৩০ সালের পর খুব বাড়িয়া যায়। নাপোলেয়ঁ বোনাপার্তের ভ্রাতুষ্পুত্র লুই নাপোলেয়ঁ বলিয়াছিলেন, ‘এখন বর্ণভেদ লোপ পাইয়াছে, আর জনতার শাসন কায়েম হইয়াছে।’

এঙ্গেলসের যে বক্তৃতা হইতে আজ আমরা এতগুলি কথা ধার করিয়াছি সেই বক্তৃতায় তিনি মার্কসের পরিচয় দিয়াছিলেন এইভাবে: মার্কসের মৃত্যুতে দুইটি শক্তির প্রচণ্ড ক্ষতির হইয়াছে—প্রথম শক্তির নাম এয়ুরোপ ও আমেরিকার প্রলেতারিয়েত বা শ্রমিক শ্রেণি। আর দ্বিতীয় যে শক্তির ক্ষতি হইয়াছে তাহার নাম ইতিহাস শাস্ত্র। সত্য সত্যই মার্কস প্রণীত বিজ্ঞানের নাম ইতিহাস শাস্ত্র। দুঃখের মধ্যে, বর্তমান কালের অনেক মার্কস ব্যবসায়ী এই সত্যটা আমলই করেন নাই।

দোহাই

১. Frederick Engels, ‘Speech at the Graveside of Karl Marx,’ in Progress Publishers, ed., Marx and Engels in the Eyes of Their Contemporaries, 3rd printing (Moscow: Progress Publishers, 1982), pp. 7-9.

২. Karl Marx, ‘Preface to the First Edition,’ Capital, vol. I, trans., Samuel Moore and Edward Aveling, ed., Frederick Engels (Moscow: Progress Publishers, 1977).

৩. Fernand Braudel, A History of Civilizations, trans. Richard Mayne (New York: Penguin Books, 1993).

ইউটিউবে এনটিভির জনপ্রিয় সব নাটক দেখুন। সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের চ্যানেলটি:

Advertisement