উত্তমের উপমা

বাঙালি জাতির প্রতিভাবানদের মধ্যে কয়েকটি আশ্চর্য নাম আছে। এর একটি নাম রবীন্দ্রনাথ। রবি মানে সূর্য, আর রবীন্দ্রনাথকে ঘিরেই বাংলা শিল্পসাহিত্য জগতের বাকি সব গ্রহ আবর্তিত হয়েছে, হচ্ছে। এ নাম গিরিন্দ্র, সত্যেন্দ্র বা অন্য কিছু হয়নি। আশ্চর্যই, তাই না? তেমনি চলচ্চিত্রে অভিনয়শিল্পীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ প্রতিনিধির নামটি উত্তম, উত্তমকুমার, যদিও তাঁর নাম অরুণকুমার ছিল, সেই অরুণ মানেও কিন্তু সূর্য। এও এক আশ্চর্য মিল। তিনিও জ্বলজ্বল করছেন সূর্যের মতো বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে এবং বর্তমানে।
অনেক আগে সুধাংশু ঘোষের ‘ফানুসের উপমা’ নামে একটা ছোট উপন্যাস পড়েছিলাম- নভেলা আর কী। সেখানে এই উপমা কথাটার পর আরো কিছু যোগ করা কেন হলো না, ফানুস আসলে কিসের উপমা-এমন একটা প্রশ্ন জেগেছিল। বর্তমান রচনায় ‘উত্তমের উপমা’ পর্যন্ত শিরোনামে রাখা কারণ বাকিটা পাঠকের ঠোঁটে এসে যাবে, এসে যাবে স্বয়ংক্রিয়ভাবে- উত্তমের উপমা উত্তমই। কেন? কারণ বাঙালি মনের মণিকোঠায় তাঁর ঠাঁই। সেখান থেকে বাঙালি বেরিয়ে আসতে পারেনি। বেরিয়ে আসতে চায়ওনি। সেটি মূলত তার রোমান্টিক মেজাজ। আর উত্তমকুমার চলচ্চিত্রে এই মেজাজের শ্রেষ্ঠ রূপদানকারী।
শিল্পসাহিত্যের ক্ষেত্রে রোমান্টিক মেজাজ থেকে বেরিয়ে এলে বাঙালির যে খুব ভালো কিছু হবে- তাও বা জোর দিয়ে কে বলতে পারে? খুব সিরিয়াস সাহিত্যিকরা জনপ্রিয় সাহিত্য বা লোকমনোরঞ্জনকারী লেখালেখি তথা গল্প-উপন্যাস নিয়ে ঠাট্টা করেন, যে এর তথাকথিত আধুনিক নায়ককে একটু টোকা দিলেই শরৎচন্দ্রের সেন্টিমেন্টাল সেই নায়কটাই বের হয়ে আসবে।
উত্তমকুমার বাংলা সিনেমার জনপ্রিয় ধারার জনপ্রিয়তম নায়ক। ছিলেন। এখনো আছেন। অন্তত উত্তমকুমার মুগ্ধ প্রজন্মের লোকজন যতদিন জীবিত আছেন, বাংলা সিনেমার নায়ক বলতেই উত্তম কুমারকে সবার আগে ভাববেন। ৩ সেপ্টেম্বর তাঁর জন্মদিনও পালন করতে পারেন, তাঁর প্রতি একসময়ে মুগ্ধ কোনো কিশোরী-যুবতী এবং চিরদিনের জন্য মুগ্ধ হয়ে থাকা, যারা কেউ পৌঢ়, কেউ বৃদ্ধও হয়ে গেছেন, তারা, একান্তে পালনও করতে পারেন তাঁর জন্মদিন।
উত্তমকুমারের একসময়ের নাম ছিল অরুণকুমার চট্টোপাধ্যায়। ১৯৪৮ সালে নীতিন বসু পরিচালিত ‘দৃষ্টিদান’ সিনেমার মধ্য দিয়ে তাঁর চলচ্চিত্র-যাত্রা শুরু হয়। তবে এর আগে ১৯৪৭ সালে ‘মায়াডোর’ নামের একটি হিন্দি ছবিতে দিন পাঁচেক কাজ করেছিলেন। ছবিটি মুক্তি পায়নি। সেদিক থেকে ‘দৃষ্টিদান’ ছবিতে ওই (ছবির নায়ক অসিতবরণের ছোটবেলার চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন) অভিনয়কেই প্রথম হিসেবে ধরা যায়। তিনি মাত্র ৫৩ বছর বয়সে ১৯৮০ সালে মৃত্যুবরণ করেন। মাঝখানে রেখে যান ২১২টা ছবিতে অভিনয়ের ইতিহাস।
সত্যজিৎ রায় উত্তমকুমার সম্পর্কে বলেছিলেন, ‘ওঁর মতো অভিনেতার সঙ্গে আমি কাজ করেছি। আশ্চর্য অভিনয়ক্ষমতা। উত্তমের মতো কোনো নায়ক নেই, কেউ হবে না।’ বিমল মিত্রের মতে, উত্তমকুমার কেবল অভিনেতা নন, তিনি তাঁকে চরিত্রস্রষ্টা বলেও মনে করেন। আরেক লেখক সমরেশ বসু বলেছিলেন, বাংলাদেশের অদ্বিতীয় নায়ক উত্তমকুমার, সব থেকে বেশি প্রিয়-প্রিয়তম। একজন সর্বজনপ্রিয় রোমান্টিক হিরো সম্পর্কে এটাই হয়তো শেষ কথা নয়। পর্দার বুকে ফেড-ইন ফেড-আউটের বাইরে, সবার দৃষ্টির বাইরেও হয়তো একজন নায়ক আছে, যে নিজের কাছেও সর্বাংশে নায়ক। উত্তম হয়তো তাই। সেটাই শক্তি। সেখান থেকেই অদ্বিতীয়ের উদ্ভব।
সমরেশ বসুর এই মন্তব্যটা খেয়াল করা দরকার, আর তার সত্যতা এই যে, উত্তমকুমার কেবল চলচ্চিত্রের নায়ক নন, জীবনের শুরু থেকে সামাজিক দায় তিনি বোধ করতেন আর সে জন্যই ১৯৪৬ সালের দাঙ্গা প্রতিরোধ করতে গণমানুষের প্রতি ডাক দিয়েছিলেন-
হিন্দুস্তান মে কেয়া হ্যায় তুমারা
ও ব্রিটিশ বেচারা
আভি চলি যাও ইংল্যান্ড রাজা কর ব্যান্ড
মন্দির মসজিদ মে পূজা আরতি
মসজিদ মে শুনো আজান পুকার্তি
দিলকে দিল মিলাও হিন্দু মুসলমান
সারি হিন্দুস্তান মে আয়ি তুফান
গরিব কে দুখো কি হোগি আসান।
তিনি নিজে লিখে সুর দিয়ে এই গানটা বিভিন্ন জায়গায় গাইতেন। তাঁর অসম্প্রদায়িক চেতনারই বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে এই গানে। রবীন্দ্রনাথের মৃত্যু নিয়ে তিনি লিখেছেন, ‘এলো ১৯৪১ সাল। ঐতিহাসিক ৭ই আগস্ট। বাংলা ২২ শে শ্রাবণ ১৩৪৮। দিনটি ছিল রাখি পূর্ণিমা। সৌভ্রাতৃত্বের নিদর্শন স্বরূপ হাতে হাতে রাখিবন্ধনের দিন মিলনের দিন।’ ঠিক সেই দিনে চলে গেলেন রবীন্দ্রনাথ। উত্তম লিখেছেন, ‘বাংলা তথা ভারতের আকাশের ধ্রুবতারাটি যেন সহসা খসে গেল। আমরা আমাদের একান্ত আপনার কবিকে হারালাম। বাংলা সাহিত্য সংস্কৃতির ক্ষেত্রকে এক অসহায় অবস্থার মধ্যে রেখে বাংলা সাহিত্যের সিংহাসন থেকে চলে গেলেন কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।...খবরটা কানে আসতে আমি সেদিন যেন মুহূর্তে মূক হয়ে গেলাম। আমি ছুটে গিয়ে দাঁড়ালাম লক্ষ লক্ষ মানুষের শোক মিছিলে।’
আর নজরুলের মৃত্যু সংবাদে একইভাবে তিনি বোধ করেছেন, যদিও সালটা তাঁর হয়তো স্মৃতিতে কাজ করেনি, ‘...আমাদের প্রাণের কবি, বিদ্রোহী কবি নজরুল ইসলামের মৃত্যু সংবাদ আমাকে চরম ব্যথিত করেছিল।’
ওপরের এসব কথা বলতে হচ্ছে এ জন্য যে উত্তমকুমার বাঙালি সংস্কৃতির যা-কিছু শ্রেষ্ঠ, তার সঙ্গে তাঁর নিবিড় যোগ ছিল, এবং সেগুলি নিজের ভেতরে গ্রহণ করেই আসলে তিনি হয়ে উঠেছিলেন উত্তমকুমার। আদতে যেকোনো ক্ষেত্রে কাজ করতে গেলে এই গুণটাই সবার আগে থাকা লাগে। উত্তমের তা-ই ছিল।
উত্তমকুমার বিপুল পরিমাণে কাজ করেছেন। কারণ তাঁর কাজ করার ক্ষমতা বিপুল ছিল। কত কত সিনেমার নাম করবেন পাঠক? সাড়ে চুয়াত্তর, ওরা থাকে ওধারে, সদানন্দের মেলা, শাপমোচন, কঙ্কাবতীর ঘাট, সবার ওপরে, সাগরিকা, সাহেব বিবি গোলাম, শিল্পী, পৃথিবী আমারে চায়, হারানো সুর, পথে হলো দেরী, থানা থেকে আসছি, নায়ক, গৃহদাহ, চিড়িয়াখানা, মেমসাহেব, বনপলাশীর পদাবলী, অমানুষ, দেবদাস ইত্যাদি ছবি। অসংখ্য ছবির বহু সংলাপ উত্তমকুমার যেভাবে যে-অভিব্যক্তিতে বলেছেন, সেটা কেবল তিনিই পারেন। চলচ্চিত্রকার তপন সিংহের কথায়, ‘আমার নিজের মনে হয়েছে উত্তমকুমারের অভিনয় যে কোনো দেশের একজন শ্রেষ্ঠ অভিনেতার অভিনয়ের সঙ্গে তুলনা করা চলে। উত্তমকুমারের খুব বড় গুণ হলে অধ্যবসায়। যতক্ষণ কাজ করেন, কাজের চিন্তাতেই বিভোর হয়ে থাকেন। অনেকেই প্রতিভা নিয়ে জন্মায়, কিন্তু অধ্যবসায়ের অভাবে প্রতিভা ম্লান হয়ে যায়। উত্তমকুমারের মধ্যে দুটোই আছে। সেই জন্যই বোধহয় উত্তমকুমার অম্লান।’
সত্যিই তাই, প্রতিভা ও অধ্যবসায়-এই দুই গুণ আদতে যেকোনো শিল্পীর উৎকর্ষ লাভ করার জন্য প্রধান দুটো শর্ত। তাঁকে যখন আমরা স্মরণ করি, তখন এই তাঁর এই দুটো গুণের কথা যদি আমরা স্মরণ করতে ভুলে যাই, তাহলে তো তাঁকে স্মরণ করা বা না করায় কোনো তফাত ঘটে না। আরেকটি ব্যাপার, উত্তম নিজেকে বুঝতে চেষ্টা করেছেন, নিজের ক্ষমতা এবং দুর্বলতাগুলোর নিজস্ব নিরিখ তাঁর ছিল। এই আত্মতদন্তের দিকে নিজেকে নিয়ে যেতে না পারলেও শিল্পসাহিত্য অঙ্গনে টিকে থাকা কঠিন। আর সেটি তাঁর আত্মজীবনীতে টের পাওয়া যায়। ব্যর্থতায় ভেঙে পড়ার কথা আছে, যেমন লিখেছেন, ‘নিজের কাছেই আমি নিজে প্রশ্ন করি, কেন আমার এই ভাগ্যবিড়ম্বনা? কেন আমার এই ব্যর্থতা! কার অভিশাপ নিয়ে আমার এই অভিযান!... হাতে দু-একখানা ছবি আছে বটে, তবে বিন্দু মাত্র উৎসাহ নেই। অভিনয়ের ব্যাপারে আর যে একটা স্বতন্ত্র উৎসাহ ছিল আকাঙ্ক্ষা ছিল, আশা ছিল- সব কেমন যেন থেমে গেছে। আমি ব্যর্থ শিল্পী হিসেবে নিজেকে শুধু মাঝে মাঝে ধিক্কার দিই। তেমনি আছে সাফল্যে নতুন করে প্রাণ পাওয়ার কথা- আমি আগামী দিনের প্রতীক্ষায় রইলাম। মনে মনে সাধনা করে চললাম। পূজা করে চললাম অভিনয়শিল্পের। অর্ঘ্য সাজালাম আগামী দিনের দর্শকদের জন্য।’ আছে নানা সংকটকালীন অবস্থায় দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভোগার কথাও।
উত্তমের ছবিগুলো তো বটেই, তাঁর আত্মজীবনী ‘আমার আমি’ও বাঙালির আরেকটি সম্পদ। কারণ একজন মানুষ, তিনি যদি আবার হয়ে ওঠেন উত্তমকুমার, তাহলে সেই যাত্রাপথের কাহিনীর বিশেষ মূল্য তৈরি হয়ে যায়ই। উত্তমকুমার সম্পর্কে বাংলা চলচিত্রের আরেক অভিনেত্রী সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায়ের মন্তব্য ছিল, ‘উত্তমকুমারের সিন্সিয়ারিটি অভাবনীয়। সব কিছুতেই। অভিনয় তো বটেই। খারাপ ভালো সব বিষয়ে উনি সমান সিন্সিয়ার। আর মজা হচ্ছে, যখন যা করেন, সেই মুহূর্তে অন্য কিছু মনে রাখেন না। আগের এবং পরের ব্যাপারটা অনায়াসেই ভুলে থাকতে পারেন। তাই যখনই তিনি যা করেন সেটাই রিমার্কেবল হয়ে দাঁড়ায়। এটাই বোধ হয় উত্তম-বৈশিষ্ট্য।’ আর এ বৈশিষ্ট্যের জন্যই উত্তমকুমার- উত্তমকুমার।
এখান থেকেই সবচেয়ে বড় যে বিষয়টি আমাদের লক্ষ্য করার বিষয় তা হলো, যিনি বিপুল ক্ষমতা ও শক্তির অধিকারী প্রতিভাবান, তার কাজের পরিমাণ বিপুল হলে তেমন কোনো ক্ষতি হয় না। অনেকেই বলেন প্রতিভা ছিল, কিন্তু নষ্ট হয়ে গেছে। কিন্তু যে-প্রতিভা নষ্টই হয়ে যায়, সেটি কোনো প্রতিভাই নয়। প্রতিভার কাজ প্রতিভাত হওয়ায়, জ্বলজ্বল করায়। তিনি কোনো সময় ভাবেন না- ‘এই সস্তা ছবিতে অভিনয় করলে বা এই সস্তা ধরনের বাজারে সাহিত্য করলে নষ্ট হয়ে যাব, চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহ করলে নষ্ট হয়ে যাব, আমাকে সব সময় সিরিয়াস হতে হবে, সব সময় আমাকে সাংঘাতিক কিছু করতে হবে।’ বলা বাহুল্য এই ‘সব সময় সাংঘাতিক কিছু করতে হবে, মৌলিক কিছু করতে হবে’ এই প্রবণতা ওই প্রতিভার আগুন জ্বলে ওঠার ক্ষেত্রে বরফ-জলের কাজ করে। আর শীতলতা দিয়ে তো কিছু হয় না, জটিলতা বাড়ানো ছাড়া। প্রতিভার জন্য একটা উষ্ণপ্রাণ চাই। বাংলা চলচ্চিত্রে উত্তমকুমার সেই চির-উষ্ণপ্রাণের এক উৎস। সেই উৎসে যে আগুন, তার শিখাও কখনো নিভে যাওয়ার নয়।
লেখক : কর্মকর্তা, বাংলা একাডেমি