Beta

কাপ যুদ্ধ

সাউথগেটের ইংল্যান্ডও পেরোল ষোলো নম্বর গেট

০৪ জুলাই ২০১৮, ১২:৪৩

বিশ্বকাপ শুরুর আগে গণমাধ্যমে একটা দল বরাবর চ্যাম্পিয়ন! কিন্তু কাপ জিতেছে তারা মাত্র একবার। তাও ৫২ বছর আগে। নিজের দেশে। সেই জয়ের গায়েও আছে কিছু প্রশ্নের দাগ। এবার রাশিয়ায় সেই দেশটা শেষ দল হিসেবে কোয়ার্টার ফাইনালে পৌঁছাল। জর্ডান পিকফোর্ড নামের এক তরুণের গ্লাভস পরা দুটো হাত ইংলিশদের তুলে দিল শেষ আটে। কলম্বিয়ার বিপক্ষে পেনাল্টি শুটআউটে গোটা দুয়েক দুর্দান্ত সেভ করলেন পিকফোর্ড। তাঁর হাত ধরেই রাশিয়া বিশ্বকাপের ষোলো নম্বর গেট পেরিয়ে আট নম্বর গেটে ঢুকে পড়ল সাউথগেটের ইংল্যান্ড।

৫২ বছর পর বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন ইংল্যান্ডের। কিন্তু সেই স্বপ্ন আর বাস্তবের মাঝখানে এখনো অনেকটা দূরত্ব। সেই দূরত্ব ঘোচাতে হলে জিততে হবে আরো তিনটা ম্যাচ। তবে পুতিনের দেশে কাপ জয়ের স্বপ্ন ইংলিশরা দেখতেই পারেন। রাশিয়ায় ভাগ্য বদল হলেও হতে পারে ইংল্যান্ডের।  বিশ্বকাপের ইতিহাসে ইংল্যান্ড কখনো টাইব্রেকারে গড়ানো ম্যাচ জিততে পারেনি। এবার পারল। কলম্বিয়ার বিপক্ষে শেষ ষোলোতে জিতল পেনাল্টি শুটআউটে। অনেকে ইংলিশদের ভাগ্য পরিবর্তনের ইঙ্গিত পাচ্ছেন এখানে। রাশিয়ায় কি তাহলে কোনো ইংলিশরা রূপকথা লেখা হতে যাচ্ছে এবার!

ইংল্যান্ড এবার বিশ্বকাপ জিতলে সেটা তো রূপকথাই হবে। কিন্তু তার আগে রাশিয়া কিন্তু অনেক উপকথার জন্ম দিয়েছে। কোয়ার্টার ফাইনাল শুরুর আগে কোনো বিশ্বকাপে কি এভাবে নক্ষত্র পতন ঘটেছে? এভাবে গ্রুপ পর্ব, নকআউট পর্ব থেকে চ্যাম্পিয়নদের বিদায় মিছিল কি দেখেছে কোনো বিশ্বকাপ? এবারের বিশ্বকাপ কিন্তু কোয়ার্টার ফাইনাল শুরুর আগেই দেখেছে বহু আশাহত মানুষের চোখের জল! তারকা-মহাতারকার বিদায়। এখন আরো দ্রুতপায়ে এগিয়ে যাবে সেই বিদায় মিছিল।

তারকা-মহাতারকার আগেভাগে বিদায়ে এক ইংলিশ ফরোয়ার্ড কিন্তু খুব দ্রুত পায়ে এগিয়ে যাচ্ছেন গোল্ডেন বুটের দিকে। রাশিয়া থেকে বিশ্বকাপ নিয়ে ফেরার দৌড়ে ইংল্যান্ডকে কে কতটা এগিয়ে রাখতে পারছেন জানি না। তবে ইংলিশ অধিনায়ক কিন্তু ‘গোল্ডেন বুট’ জয়ের দৌড়ে অনেক এগিয়ে। কোয়ার্টর ফাইনালের আগেই হ্যারি কেনের নামের পাশে ছয় গোল। তাও আবার মাত্র চার ম্যাচে! তবে হ্যাঁ, হ্যারি কেনকে এখন মজা করে অনেকে বলতে শুরু করেছেন ‘পেনাল্টি কেন’! তাঁর ছয় গোলের চারটিই তিনি করেছেন পেনাল্টি থেকে। মেসি-রোনালদো-লুকা মডরিচের মতো তারকারা এবারের বিশ্বকাপে পেনাল্টি মিস করেছেন। হ্যারি কেন কিন্তু পেনাল্টি থেকে গোল করেই চলেছেন। ‘ম্যারাডোনর বিশ্বকাপ’ খ্যাত ’৮৬-তে গোল্ডেন বুট জিতেছিলেন ইংল্যান্ডের গ্যারি লিনেকার। তার পর আর কোনো ইংলিশ ফরোয়ার্ড ছুঁয়ে দেখতে পারেননি গোল্ডেন বুট। হ্যারি কেন কিন্তু ঝড়ের গতিতেই এগিয়ে যাচ্ছেন সোনালি রঙের সেই জুতোর দিকে। হ্যারি কেনের মধ্যে খুঁজে পাচ্ছেন অনেকে জার্মান সাবেক তারকা ইয়র্গেন ক্লিন্সম্যান আর  ইংল্যান্ডের সাবেক স্ট্রাইকার গ্যারি লিনেকারের ছবি।

৫২ বছর পর ইংল্যান্ড যে আবার বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্নে বুঁদ হয়ে পড়ছে, তার পেছনে অনেকগুলো কারণের একটা বড় কারণ তাদের অধিনায়ক হ্যারি কেনের দুর্দান্ত ফর্ম। তারুণ্যনির্ভর এই ইংল্যান্ড দলকে ভালোভাবে গুছিয়ে নিয়েছেন ম্যানেজার গ্যারেথ সাউথগেট। আক্রমণভাগের নেতৃত্বটা নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছেন অধিনায়ক হ্যারি কেন। সব মিলিয়ে ইংলিশ মিডিয়া কিন্তু আওয়াজ তুলেছে; হ্যারি কেনঝড়ে সুইডিশদের উড়িয়ে দিয়ে সেমিফাইনালে যাবে ইংল্যান্ড। সুইডিশরা আবার নকআউটে এসে নিজের মাঠে ছাড়া টানা দুটো ম্যাচ জিততে পারেনি। তাই কোয়ার্টার ফাইনালে ইংল্যান্ড ফেভারিট, এই আওয়াজ তোলার পেছনে রসদ জোগাছে সুইডিশদের ইতিহাস। ইংলিশদের নাকি অন্যদের চেয়ে আবেগ একটু কম। আদিখ্যেতাও কম। কিন্তু ফুটবল এবং বিশ্বকাপ এলে তাদের মুখ থেকেও খসে পড়ে আবেগ লুকিয়ে রাখা মুখোশটা। ওরা বুঝিয়ে দেন পোশাকের আড়ালে সব মানুষই নগ্ন। সবাই ভাসেন আবেগের স্রোতে।

আর বিশ্বকাপ? সেটা তো শুধু ফুটবল নামের একটা খেলা নয়। শুধু একটা টুর্নামেন্ট নয়। এ হলো আবেগের সমুদ্র। যেখানে সবাই ভাসে। যা নাড়িয়ে দিয়ে যায় সারা বিশ্বকে। এই বিশ্বকাপ সবাইকে  গেঁথে ফেলে এক সুতায়। সেটা বাংলাদেশ থেকে ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা সব জায়গায়। বিশ্বকাপ মাতিয়ে রাখে কারওয়ান বাজারের রেললাইনের কোনো বস্তি থেকে গুলশান-বারিধারার কোনো অভিজাত বাড়ির ড্রয়িংরুমকে। মাগুরার কোনো বাড়ির উঠোন থেকে বিশ্বকাপের যে ঝড় ওঠে, সেটা টের পাওয়া যায় বসুন্ধরার কোনো দামি অ্যাপার্টমেন্টের ১০ তলায় বসেও। এটাই হচ্ছে আসল বিশ্বকাপ। এই কাপ নিয়ে ইংলিশ মিডিয়া মাতামাতি করলে তাদের দোষ দিয়ে লাভ কি!

কিন্তু ইংল্যান্ড বিশ্বকাপ জিততে পারে, এটা বিশ্বাস করতে কষ্ট হয়, রাত জেগে ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগ দেখা এ দেশের তরুণদেরও! হ্যারি কেন যতই প্রতিপক্ষের গোলমুখে ঝড় তুলুন না কেন, ‘ফাইনাল গেট’ পেরিয়ে যাবে সাউথগেটের দল, আপাতত ভাবা যাচ্ছে না। ব্রাজিল, উরুগুয়ে নামের দুটো দল কিন্তু এখনো আছে। যারা ইংল্যান্ডের আগে বিশ্বকাপ জিতেছে। একাধিকবার জিতেছে। আছে ফ্রান্সে মতো দল, যারা ইংলিশদের পরে বিশ্বকাপ জিতলেও প্লাতিনি-জিদানের মতো ফুটবলার জন্ম দিয়েছে। ফুটবল নিয়ে তাদের জাত্যাভিমানও কম না। অতএব, কাপ জয়ের জন্য বাকি তিনটা গেট পেরিয়ে যাওয়া সাউথগেটের ইংল্যান্ডের জন্য কঠিন, কঠিন ও কঠিন কাজ।

লেখক : সিনিয়র স্পোর্টস জার্নালিস্ট ও কলামিস্ট।

ইউটিউবে এনটিভির জনপ্রিয় সব নাটক দেখুন। সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের চ্যানেলটি:

Advertisement