ভালো থেকো ঋতুদা

মোটেও এ রকমটি নয়, শুধু জন্মদিন এসেছে বলে মনে পড়ল ঋতুদাকে। আসলে গত তিন সপ্তাহে সিনেমা হলে গিয়ে তিনটে বাংলা ছবি দেখে ফেলেছি। হল উপচে পড়ছিল দর্শকের ভিড়ে। চিজ পপকর্নের গন্ধে ম-ম। আর স্ক্রিনে একের পর এক বিজ্ঞাপন। তারপর এলো সিনেমা। সব কটি ছবিই, ঘরানায় থ্রিলার।
এক ঝটকায় প্রায় চার-পাঁচেক থ্রিলার ছবি মুক্তি পেয়ে গিয়েছে টলিউডে। কোনোটা বই থেকে তুলে আনা গোয়েন্দার গল্প, তো কোনোটা পরিচালকদের লেখা স্ক্রিপ্ট। কিছুদিন ধরে টলিউডে অদ্ভুত ট্রেন্ড। থ্রিলার ছবি বানানোর। যে পারছে, সেই একবার হাত ধুয়ে নিচ্ছেন এই থ্রিলার জলে। আমাকে ক্ষমা করবেন তাঁরা। কিন্তু কেন জানি না, সব থ্রিলার দেখেই বারবার মনে পড়ছে, এই দৃশ্যটা তো আগে দেখেছি! এই রকমভাবে পরিপাটি সাজানো দৃশ্য বাংলা ছবিতে বহু আগেই সামনে নিয়ে এসেছিলেন ঋতুপর্ণ ঘোষ!
একটা খুন, আর অনেকগুলো চরিত্র। তদন্ত শুরু করতেই পরপর সামনে আসতে থাকা আরো এক ডজন গল্প। খুনি কে? তখন তো একেবারে প্রেক্ষাপট। সামনে এসে দাঁড়ায় এক চরিত্রের সঙ্গে আরেক চরিত্রের ইকুয়েশন!
আগাথা ক্রিস্টির এক গল্প থেকেই নাকি অনুপ্রাণিত হয়ে ঋতুপর্ণ ঘোষ তৈরি করেছিলেন ‘শুভ মহরৎ’। এক নায়িকার হঠাৎ মৃত্যু। কিন্তু পরিচালক ঋতুপর্ণ ঘোষ, গল্পকে বাঁধলেন হিংসে, পরকীয়া, প্রেম, বিরহের সুতো দিয়ে। থ্রিলার হয়ে গেল, অদ্ভুত এক সম্পর্কের টানাপড়েনের গল্প! কিংবা ঋতুপর্ণের শেষ ছবি ‘সত্যান্বেষী’! ব্যেমকেশ বক্সীর ‘চোরাবালি’ গল্পের সঙ্গে ঋতুপর্ণ ঘোষ মিশিয়ে দিলেন অদ্ভুত এক চাওয়া-পাওয়ার গল্পকে। খুনের রহস্যের সঙ্গে শরীরী রহস্যের এক সমাধান!
দুটো ক্ষেত্রেই সমালোচনা হয়েছিল প্রচুর। কিন্তু ঋতুদার ক্রাফ্টম্যানশিপ নিয়ে টুঁ শব্দটি করতে পারেনি কেউ-ই। তাই হয়তো, বড় পর্দায় গল্প বলার জন্য এখনো পরিচালকরা গল্প বলা শুরু করলে, রেফারেন্স সেই ঋতুপর্ণ ঘোষই! তবে শুধু থ্রিলারই নয়। অন্য রকম গল্প বলতে গেলেই, কোথা থেকে জানি হাজির হয়ে আসে ঋতুপর্ণের ছাপ!
ঋতুপর্ণের ছাপ মানে? একসঙ্গে বক্স অফিসে হাজির হয়েছিল একদিকে শেক্সপিয়রের টলিউড সংস্করণ, আর অন্যদিকে শীর্ষেন্দুর গোয়েন্দার এক সিকোয়েল ছবি! তবে গল্প আলাদা। আর গত সপ্তাহেই একটা খুন ও তিন চরিত্রে ‘কানেকশন’ নিয়ে এক সাংবাদিক বন্ধুর পরিচালক হওয়ার পর দ্বিতীয় ছবি! তিনটি ছবির পরিচালক আলাদা, গল্পও আলাদা, প্রেক্ষাপট আলাদা। অভিনেতা, প্রযোজক আলাদা। কিন্তু দেখতে বসে, তিন ছবিতে ঋতুপর্ণ ঘোষের প্রবল টান চোখে পড়ল! জানি না হয়তো ব্লাইন্ড ফ্যান হওয়ার জন্যই। যাই হোক পরিচালকেরা ক্ষমা করবেন আমাকে।
শীর্ষেন্দুর গোয়েন্দা ছবিতে, রহস্য থেকে বেরিয়ে গিয়ে এক পুরুষকে পাওয়ার তীব্র ইচ্ছে, তিন মহিলা চরিত্র। আর একটা খুন। গল্প এগোতেই খুন একেবারে প্রচ্ছন্ন অবস্থায়। প্রকটে অন্যকিছুই। এই স্টাইল তো একেবারেই ঋতুপর্ণ ঘরানার। বলা ভালো চিত্রনাট্যের মধ্যে গল্প ভেতর থেকে টেনে বার করে আনা এক অনুঘটকেই রয়াসনের সবচেয়ে গুরুত্ব দেওয়া। উদাহরণ দিতেই পারি শেক্সপিয়রের ‘হ্যামলেট’-এর আদলে বানানো, নতুন বাংলা ছবির। রবিঠাকুরের ‘চিত্রাঙ্গদা’কে সমকামী প্রেম ও রূপান্তরকামী এক মানুষের ইচ্ছের ওপর দাঁড় করিয়ে ছিলেন ঋতুপর্ণ ঘোষ! এটাই ছিল তাঁর ইমপ্রোভাইজেশন! ‘হ্যামলেট’ বাংলার পরিচালক চেষ্টাটা খানিকটা করলেন তাই। বাংলা সিনেমার অবক্ষয়ের সঙ্গে হ্যামলেটকে মিলিয়ে দেওয়ার প্রচেষ্টা। কিন্তু সেই ঋতুপর্ণ ঘোষের ক্রাফ্ট থেকে ধার নিয়ে! এমনকি, আবহ টেনে এনে, ছবির গল্পে আলো-আঁধারি তৈরি করে, সংলাপের মারপ্যাঁচ একই ক্রাফ্ট!
আজ ৩১ আগস্ট, পরিচালক ঋতুপর্ণ ঘোষের জন্মদিন। বেঁচে থাকলে তাঁর বয়স হতো ৫৫ বছর। শুধু তাঁর ছবির নয়, মানুষ ঋতুপর্ণ ঘোষের ব্লাইন্ড ফ্যান এই লেখক। তাই হয়তো সাহস করেছি, এরকম লেখা লেখার। ভুল হতেই পারে। কিন্তু বাংলা ছবিকে নতুন ক্রাফ্টম্যানশিপ ধার দেওয়ার মালিকানা, ঋতুপর্ণ ঘোষকে না দিয়ে অন্য কাউকে দিলে, ভারি অন্যায় হবে।
সেই পর্দার ফাঁক দিয়ে একচিলতে রোদ। বিছানার চাদরে পরিপাটির দাগ। পাশে রাখা পুরোনো আমলের কাঠের টেবিলে বিলেতি ফুলদানি। হয়তো, ঠিক পাশের ঘরে মেকআপ নিতে ব্যস্ত নায়িকা। ব্যস্ত আর্ট ডিরেক্টর শেষ কাজটুকু বুঝে নিত। নিঁখুত হওয়ার এক লড়াই। তীব্র অস্বস্তিতে ভোগা। কিন্তু এই ছবি এখন পুরোটাই ঝাপসা। হয়তো রয়ে গিয়েছে শুধুই রেফারেন্সে। তাই তো বাংলা ছবি (বিদেশের নাচ-গান, মারপিট ব্যতীত) দেখতে বসলে, বার বারই রেফারেন্সের খাতায় ভেসে ওঠে একটাই নাম ঋতুপর্ণ ঘোষ! হয়তো আমি অন্ধ ভক্ত! ক্ষমা করবেন অন্য পরিচালকরা।