Beta

চিত্রশিল্পীরা যখন চিত্রযোদ্ধা

২৪ ডিসেম্বর ২০১৮, ১৩:৩৯

আঁখি সিদ্দিকা

স্বাধীনতা যুদ্ধ নয়। মুক্তিযুদ্ধ। সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠার যুদ্ধ। অন্যের চাপিয়ে দেওয়া সংস্কৃতি থেকে অবমুক্তির যুদ্ধ। ভিয়েতনাম বা কিউবার মতো কেবল একটি ভূখণ্ডের স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধ হয়নি এই দেশে। ১৯৪৭-১৯৭১—২৪ বছরের পাকিস্তানি দুঃশাসনের সময়ে বৈষম্য ও বঞ্চনার বিরুদ্ধে বাংলাদেশের মানুষের অধিকার আদায় ও বাঙালি সংস্কৃতি রক্ষার লক্ষ্যে যে গণতান্ত্রিক আন্দোলনের সূচনা হয়েছিল, তারই চূড়ান্ত বিস্ফোরণ ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ।

একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ আমাদের ইতিহাসের এক অবিস্মরণীয় অধ্যায়। এই যুদ্ধের মধ্য দিয়ে এ ভূখণ্ডের অধিবাসীদের দীর্ঘদিনের লালিত রাষ্ট্রস্বপ্ন বাস্তবায়িত হয়েছিল। রক্ত আর অশ্রুতে, শোক আর শৌর্যে, বীরত্ব আর বেদনায়, প্রতিজ্ঞা আর প্রতিরোধে সে ছিল আমাদের এক অনন্য অভ্যুদয়। আমাদের নিরতিশয় গর্ব ও গৌরবের কাল। দেশের সর্বস্তরের জনগোষ্ঠীর সঙ্গে আমাদের শিল্পীসমাজ সেদিন দেশমাতৃকার মুক্তিব্রত উদযাপনে এগিয়ে এসেছিলেন। তাঁরা তাঁদের রংতুলিকে সেদিন পরিয়ে দিয়েছিলেন রণসজ্জা। শিল্পীদের কেউ কেউ আবার হাতে তুলে নিয়ে ছিলেন আগ্নেয়াস্ত্র। সরাসরি যুদ্ধ করেছিলেন শত্রুর বিরুদ্ধে।

তুলির একেকটি আঁচড় কাঁপন ধরিয়েছিল ইয়াহিয়ার মসনদে, এক একটি পোস্টার যেন বিস্ফোরক হয়ে হাজির হয়েছিল পাকিস্তানিদের সামনে। আর মনস্তাত্ত্বিকভাবেও প্রেরণা জুগিয়েছে বাংলার মুক্তিযোদ্ধাদের, সারা বিশ্ব জানতে পেরেছিল দেশের অবস্থা।

তবে একাত্তরের অনেক আগে থেকেই জাতিসত্তা ও রাষ্ট্রসত্তার অন্বেষণে এই ভূখণ্ডের অধিবাসীদের নবতর অভিযাত্রা শুরু হয়েছিল। মুক্তির সংগ্রাম তাই এক দীর্ঘ ধারাবাহিকতার গৌরবময় ঐতিহ্য ধারণ করে ধাপে ধাপে চূড়ান্ত পর্বে উপনীত হয়েছিল। ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হওয়ার অব্যবহিত পর এই রাষ্ট্রের গণবিরোধী প্রতারক চরিত্র এ দেশবাসীর কাছে উন্মোচিত হয়ে যায়। মোহাম্মদ আলি জিন্নাহর রাষ্ট্রভাষা-সংক্রান্ত বিতর্কিত বক্তব্য খুব সহজেই পাকিস্তানি ভাবাদর্শের প্রকৃত স্বরূপটিকে চিনিয়ে দেয়। উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার স্পর্ধিত ও স্বৈরাচারী ঘোষণা একটি সত্যকে উন্মোচিত করে, আর তা হলো পাকিস্তান বাঙালিদের জন্য আসেনি। ১৯৪৮ থেকে ১৯৫২ সাল পর্যন্ত দেশজুড়ে নানা মাত্রায় শাসকশক্তির বিরুদ্ধে আন্দোলন হয়েছিল। ১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি ভাষাশহীদদের পবিত্র শোনিতপাতে আমাদের সেই অভিযাত্রা মহিমান্বিত হয়ে ওঠে। তারপর পর্ব থেকে পর্বাস্তরে দীর্ঘ ধারাবাহিক সংগ্রামের পর আসে একাত্তর। একুশ থেকে একাত্তর। আত্মপরিচয়ের অন্বেষণে, স্বাধিকার প্রতিষ্ঠার একাগ্রতায় সে তো কেবলই ধাপে ধাপে এগিয়ে যাওয়ার উপাখ্যান। আর এই কালপর্বের প্রতিটি অধ্যায়েই আমাদের শিল্পীসমাজ স্বদেশের আহ্বানে সাড়া দিয়ে যথোচিত ভূমিকা পালন করেছেন। ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত তাঁদের সে সম্পৃক্তি আত্মনিবেদনের ঐকান্তিকতায় সমুজ্জ্বল।

বাংলাদেশের আধুনিক চিত্রকলার ইতিহাস ছয় দশকের অল্প অধিক সময়ের। পাকিস্তান-উত্তর সময়ে আমাদের শিল্পীসমাজ বহু দুস্তর পথ পাড়ি দিয়ে একাত্তরের লড়াইয়ে নিজেদের সম্পৃক্ত করেছিলেন। বস্তুত চিত্রকলার ব্যাপারটাই ছিল পাকিস্তানি মতাদর্শের বিরুদ্ধে একটি সদাজাগ্রত চেতনা। সে জন্যই পাকিস্তানি চিন্তাধারার ধারকবাহকরা সর্বদাই এর বিরোধিতা করেছে। এ দেশে চারুকলা কলেজ প্রতিষ্ঠায়ও তারা নানাভাবে বাধা দিয়েছে। কিন্তু শেষাবধি তারা জয়ী হতে পারেনি। নানা বাধাবিপত্তি এড়িয়ে অবশেষে ১৯৪৮ সালে জয়নুল আবেদিন ও তাঁর কলকাতার সহযোগী শিল্পী-বন্ধুদের উদ্যোগে ঢাকায় সরকারি চারুকলা ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা থেকে এর আনুষ্ঠানিকতা শুরু এবং বাঙালির জাতিসত্তা প্রতিষ্ঠা ও আত্মপরিচয় লাভের সংগ্রামে প্রতিষ্ঠানটি অসাধারণ ভূমিকা পালন করেছে।

উপমহাদেশের মুসলিম সমাজের প্রতিনিধিত্বকারী পাকিস্তান রাষ্ট্রের একেবারে শুরুতেই, বস্তুত মাত্র এক বছরের মধ্যে চারুকলা ইনস্টিটিউটের প্রতিষ্ঠা ছিল রীতিমতো একটি বিপ্লবী ঘটনা, তারপর আর দু-চার বছরের মধ্যেই এর পাশাপাশি (১৯৫০ সালে) সম্পূর্ণ ব্যক্তি-উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ঢাকা আর্ট গ্রুপ নামের শিল্পীদের একটি নিজস্ব সংগঠন। ইনস্টিটিউটের প্রাণপুরুষ ছিলেন জয়নুল আবেদিন, আর্ট গ্রুপের মূল উদ্যোক্তা কামরুল হাসান। দুটো সংস্থার পরিপূরক আয়োজন প্রথম থেকেই ঢাকার চারুশিল্প আন্দোলনকে অত্যন্ত অর্থবহ ও বেগবান করেছে সন্দেহ নেই। প্রতিবছর দলে দলে এই কলেজ থেকে শিল্পীরা বেরিয়ে এসেছেন, আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক অঙ্গনে যে নানাবিধ তৎপরতা চলছিল, তাঁরা তাতে এসে যোগ দিয়েছেন এবং ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, সাংস্কৃতিক সংগ্রামের প্রতিটি প্রবাহে নতুন স্রোত যুক্ত করে চিত্রশিল্পীরা তাকে আরো গতিময় করে তুলেছেন।

চারুকলা ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠার সময় এর মূল উদ্যোক্তা জয়নুল আবেদিন বিচক্ষণতার পরিচয় দিয়েছিলেন এর সঙ্গে ড. মুহম্মদ কুদরাত-এ-খুদার মতো শ্রদ্ধাভাজন বিজ্ঞানী ও শিক্ষাবিদ ও উদারমনা জ্যেষ্ঠ সরকারি কর্মকর্তা সলিমউল্লাহ ফাহমীর মতো মানুষের সমর্থন নিশ্চিত করে। একইভাবে ঢাকা আর্ট গ্রুপ প্রতিষ্ঠার সময় কামরুল হাসান শিল্পী জয়নুল আবেদিনসহ অভিভাবক ও সহযোগী হিসেবে পেয়েছিলেন সৈয়দ আলী আহসান, অজিত গুহ, আবদুল গণি হাজারি, সরদার জয়েনউদ্দিন, মুনীর চৌধুরী, সানাউল হক, সিকান্দার আবু জাফর, আবদুল আহাদ, সৈয়দ নুর উদ্দিন, খান সারওয়ার মুর্শিদ ও অন্যান্যের মতো প্রগতিশীল অধ্যাপক, কবি, লেখক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বদের। ঢাকা আর্ট গ্রুপ একটি ব্যাপকভিত্তিক আধুনিক শিল্প সংগঠন হিসেবে যাত্রা শুরু করে। এক বছরের মধ্যেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন ঢাকা হলে ৩৪ জন শিল্পীর ২৭৪টি ছবি নিয়ে ঢাকা আর্ট গ্রুপের প্রথম প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয় (জানুয়ারি ১৯৫১)। প্রদর্শনীটি উদ্বোধন করেছিলেন পূর্ব বাংলা (তখন এটাই ছিল প্রদেশের নাম) সরকারের উজিরে আলা জনাব নুরুল আমিন। এটি ছিল ঢাকার চিত্রকলা আন্দোলনের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা।

পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পেছনে মুসলিম জাতীয়তাবাদী চেতনার প্রবল প্রভাব থাকলেও বছর না ঘুরতেই তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের মানুষ বিকল্প পথ ধরতেই উদ্যোগী হয়েছিল। রাষ্ট্রভাষা হিসেবে তাদের মাতৃভাষা বাংলার ন্যায্য মর্যাদার দাবিই এ ক্ষেত্রে মূল প্রেরণা ও শক্তি হিসেবে কাজ করে। উদারপন্থী রাজনৈতিক নেতৃত্বের পাশাপাশি প্রগতিশীল বুদ্ধিজীবী ও ছাত্র-শিক্ষকরাই এতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠার দাবি গণআন্দোলনে রূপ পেতে থাকে এবং পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার মাত্র সাড়ে তিন বছরের মধ্যে বায়ান্নর একুশে ফেব্রুয়ারির মতো মর্মান্তিক ঐতিহাসিক ঘটনা ঘটে, ‘বাঙালি জাতীয়তাবাদী’ আন্দোলন প্রকৃত রূপ পেতে থাকে। এই আন্দোলনে ঘনিষ্ঠ সম্পৃক্ততা ছিল তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের শিল্পীদের নেতৃস্থানীয় বড় এক অংশের। সরকারি আর্ট ইনস্টিটিউটের প্রথম ব্যাচের ছাত্র, যেমন আমিনুল ইসলাম, বিজন চৌধুরী প্রমুখ গোড়া থেকেই বাম ধারার রাজনৈতিক চেতনার সঙ্গে একাত্ম, দ্বিতীয় ব্যাচের ছাত্র মুর্তজা বশীর, ইমদাদ হোসেন, রশিদ চৌধুরী প্রমুখ একই ভাবধারায় উদ্বুদ্ধ ছিলেন, তাঁদের অন্য সতীর্থরাও তেমনভাবে বামপন্থী না হলেও নিশ্চিতভাবে উদার প্রগতিবাদী চিন্তাচেতনার অনুসারী ছিলেন। চারুশিল্পকে জনগণের কাছাকাছি নিয়ে যাওয়ার জন্য ঢাকা আর্ট গ্রুপের দ্বিতীয় প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়েছিল (মার্চ ১৯৫২)।

বাংলা ভাষা তথা সংস্কৃতিভিত্তিক বাঙালি জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের পাশাপাশি চিত্রকলার আধুনিক বা (এক অর্থে) পাশ্চাত্য শিল্পধারার প্রতি আকৃষ্ট হয়েছিল বাংলাদেশের প্রথম শিল্পীসমাজ।

পঞ্চাশের দশকে পূর্ব পাকিস্তানের (তথা পাকিস্তানের) রাজনৈতিক মঞ্চে অতি দ্রুতলয়ে একাধিক দৃশ্যবদল ঘটেছে। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার অগ্রণী রাজনৈতিক দল ইসলামী ভাবধারার মুসলিম লীগের শোচনীয় পরাজয় ও গণতান্ত্রিক উদারনৈতিক যুক্তফ্রন্টের ক্ষমতা লাভ ও হারানো, মার্শাল ল ও সামরিক শাসনের প্রতিষ্ঠা—সবই এক দশকের মধ্যেই সংঘটিত হয়। এই পটভূমিতেই বাংলাদেশের চিত্রকলা আন্দোলন এগিয়ে যেতে থাকে। স্বভাবতই চিত্রকলার চারিত্র্য-বৈশিষ্ট্য নির্মাণে সমসাময়িক রাজনৈতিক-সামাজিক পরিবেশ-পরিস্থিতি যথেষ্ট প্রভাব রেখেছে। পঞ্চাশের দশকের শিল্প ও শিল্পীদের সম্পর্কে আলোচনা-পর্যালোচনায় দেশের সার্বিক অবস্থা বিবেচনা গুরুত্ববহ। একই সঙ্গে বৈশ্বিক রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও সামাজিক পরিবেশও প্রণিধানযোগ্য। কেননা প্রান্তিক অবস্থানে থাকলেও ঢাকা তথা পূর্ব পাকিস্তানেও আন্তর্জাতিক, বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য তথা ইউরোপের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ প্রভাব মোটেও উপেক্ষণীয় ছিল না। জাপান বা চীনসহ প্রাচ্যদেশীয় রাজনীতি ও সংস্কৃতির প্রভাব পঞ্চাশের দশক পর্যন্ত তেমন লক্ষণীয় হয়ে ওঠেনি।

পঞ্চাশের দশককে এ দেশের চিত্রকলার আধুনিক পর্বের ভিত্তি বলা হয় এবং তাতে পঞ্চাশ প্রজন্মের শিল্পীদের পাশাপাশি, এমনকি বলা সংগত হবে তাঁদের আগেই, পূর্ববর্তী প্রজন্মের শিল্পীদের ভূমিকা ও অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অনেক সময়ে আমরা বিষয়টি তেমনভাবে উল্লেখ করি না। উল্লেখ্য, আমার বর্তমান আলোচনাটি শুধু পঞ্চাশের দশকে সৃজিত ও প্রদর্শিত মুক্তিযুদ্ধের শিল্পকর্মের ওপর সীমিত রাখব।

পঞ্চাশ-পূর্ব প্রজন্মের আধুনিক ধারার শিল্পীদের মধ্যে অবশ্যই অগ্রগণ্য জয়নুল আবেদিন, কামরুল হাসান, সফিউদ্দীন আহমেদ, আনোয়ারুল হক এবং এস এম সুলতান। পঞ্চাশের দশকে আবির্ভূত গুরুত্বপূর্ণ শিল্পীদের সংখ্যা অবশ্যই প্রশংসনীয়। এঁদের মধ্যে মোহাম্মদ কিবরিয়া কলকাতা আর্ট কলেজের স্নাতক (১৯৫০)। তিনি ঢাকা আসেন ১৯৫১ সালের প্রথম দিকে। ঢাকার সরকারি আর্ট ইনস্টিটিউটের পঞ্চাশের দশকের ছাত্রদের মধ্যে ছিলেন প্রথম ব্যাচের আমিনুল ইসলাম, হামিদুর রাহমান (তৃতীয় বর্ষের ছাত্রাবস্থায় ১৯৫০ সালে ইউরোপ চলে যান), সৈয়দ শফিকুল হোসেন, বিজন চৌধুরী (পরে কলকাতা চলে যান) প্রমুখ, দ্বিতীয় ব্যাচের আবদুর রাজ্জাক, রশিদ চৌধুরী, মুর্তজা বশীর ও কাইয়মু চৌধুরী এবং পরবর্তী ব্যাচসমূহের দেবদাস চক্রবর্তী, সৈয়দ জাহাঙ্গীর, কাজী আবদুল বাসেত, নিতুন কুন্ডু প্রমুখ। এ ছাড়া অন্যান্যের মধ্যে ছিলেন ইমদাদ হোসেন, জুনাবুল ইসলাম, কাজী আবদুর রউফ, মুবিনুল আজিম, শাহতাব প্রমুখ।

শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন যুদ্ধের পুরো সময় দেশেই ছিলেন এবং শেষ পর্যায়ে বুদ্ধিজীবীদের হত্যার সময় আত্মগোপন করে আত্মরক্ষা করেন। এই শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থায়ও তার তুলি থেমে থাকেনি, এঁকে গেছেন একের পর এক চিত্র। শরণার্থী নামে আঁকা একটি চিত্রে আমরা দেখি ভীত-সন্ত্রস্ত মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে সীমান্তের উদ্দেশে চলে যাচ্ছে। অনাগত কালের মানুষ এই ছবি দেখে সহজেই অনুমান করে নিতে পারবে বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন হানাদার বাহিনীর অমানবিক নির্যাতন ও নৃশংস হত্যাযজ্ঞ বাংলার মানুষকে কতটুকু অসহায় করে তুলেছিল। মুক্তিযুদ্ধ নামক স্কেচে দেখা যায় রাইফেল হাতে চোখে মুখে বিজয়ের দৃঢ়প্রত্যয়ে ক্ষিপ্র পদক্ষেপে মুক্তিযোদ্ধরা এগিয়ে আসছে। বিজয়ে প্রেরণাদানকারী এই ছবিটিতে শোক ও ঘৃণার প্রতীক হিসেবে তিনি কালো মোটা ব্রাশে আঁকেন।

মুক্তিযুদ্ধের সময় শিল্পীদের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন পটুয়া কামরুল হাসান। শুধু একটি স্বাধীন রাষ্ট্রীয় কাঠামো প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে বাঙালির সত্যিকার মুক্তি অর্জন সম্ভব, এটা তিনি অনুধাবন করতে পেরেছিলেন। আর তাই '৭১-এর মার্চে স্বৈরাচারী শাসক ইয়াহিয়া যখন নিরস্ত্র বাঙালির ওপর হিটলারি কায়দায় গণহত্যা শুরু করল, তখন তিনি উত্তপ্ত বেদনা আর ক্ষোভে জ্বলে উঠে কামরুল হাসান ইয়াহিয়ার এই জানোয়ারটা আবার আক্রমণ করতে পারে, শিরোনামে সদৃশ প্রতিকৃতি দিয়ে ১০টি পোস্টার আঁকেন। পোস্টারগুলো শহীদ মিনারে জনসাধারণের জন্য প্রদর্শন করা হয়। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়ে গেলে কামরুল হাসান পশ্চিমবঙ্গে চলে যান এবং নবগঠিত মুজিবনগর সরকারের তথ্য ও প্রচার বিভাগের প্রধানের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এ সময় তিনি ইয়াহিয়ার প্রতিকৃতি দিয়ে একটি বিখ্যাত ব্যঙ্গচিত্র অঙ্কন করেন 'এই জানোয়ারদের হত্যা করতে হবে' শিরোনামে।

এখানে দানব আকারে দেখানো হয় ইয়াহিয়াকে, যা প্রকৃত অর্থে পুরো হানাদার বাহিনীর নগ্ন চরিত্রের পরিচয় বহন করে। এই চিত্রটি দিয়ে পোস্টার ছাপিয়ে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। এ পোস্টার চিত্রটি পাকিস্তানি বর্বর সেনাবাহিনী এবং তাদের এদেশীয় দোসরদের বিরুদ্ধে জনসাধারণের মধ্যে ঘৃণা আর বিদ্রোহের উদ্রেক বাড়িয়ে দেয় বহুগুণে। এ ছাড়া তখন তিনি এ ধরনের আরো কিছু পোস্টার অঙ্কন করেছিলেন। তার এ রকম একটি পোস্টারে দেখা যায় উপরিভাগে স্লোগান লেখা রয়েছে—রক্তের ঋণ রক্তে শুধবে, দেশকে এবার মুক্ত করব। এ ছাড়া—এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম, রক্ত যখন দিয়েছি রক্ত আরো দেবো, ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোলো, মুক্তিবাহিনী/ আপনার পাশেই/ আছে—বাংলাদেশ সরকারের তথ্য ও প্রচার দপ্তর থেকে প্রচার করা হয়, যা প্রচণ্ডভাবে নাড়িয়ে দেয় বাংলার মুক্তিযোদ্ধাদের। পোস্টার ছাড়াও কামরুল হাসান যুদ্ধের সময় কালো কালির দ্বারা মুক্তিযোদ্ধা রমণী শীর্ষক চিত্রকর্ম করেন। এতে তিনি বন্দুক হাতে বাঙালি নারীর সাহসিকতাকে প্রকাশ করেছেন। এক হাতে কলসি অপর হাতে বন্দুক নিয়ে নারী প্রয়োজনে কতটা ঝুঁকি নিতে পারে, তা তিনি দেখাতে গিয়ে বাঙালি নারীদের যুদ্ধে অংশ নেওয়ার প্রতি উৎসাহিত করেছেন।

কামরুল হাসান ছাড়াও এ সময় আরো অনেকেই মুক্তিযুদ্ধের পোস্টার এঁকে বাংলার মুক্তিযোদ্ধাদের প্রেরণা জুগিয়েছেন। এদের মধ্যে দেবদাস চক্রবর্তীর 'বাংলার হিন্দু/ বাংলার খ্রিস্টান/ বাংলার বৌদ্ধ/ বাংলার মুসলমান/ আমরা সবাই/ বাঙালি', প্রাণেশ মণ্ডলের 'বাংলার/ মায়েরা মেয়েরা/ সকলেই মুক্তিযোদ্ধা', নিতুন কুন্ডুর 'সদা জাগ্রত/ বাংলার/ মুক্তিবাহিনী' উল্লেখযোগ্য। প্রাণেশ মণ্ডল যুদ্ধ চলাকালীন পোস্টার ছাড়া অনেক চিত্রকর্মও করেছেন। এগুলোর মধ্যে 'শরণার্থী', 'সবুজ জমিতে এলোপাতাড়ি গুলি', 'স্কেচ-১', 'স্কেচ-২' উল্লেখযোগ্য।

বরণ্য শিল্পী আমিনুল ইসলাম মুক্তিযুদ্ধের অগণিত শহীদ নর-নারীর নির্মম হত্যাকাণ্ড নিয়ে 'গণহত্যা' শিরোনামে একটি বড় তৈলচিত্র করেন। যাতে দেখা যায় অসংখ্য নর-নারীর কঙ্কাল স্তূপাকৃতি হয়ে পড়ে আছে। উপরের দিকে সবুজ বাংলার শ্যামল পটভূমি দেখে মনে হয় শহীদদের স্মরণে বাংলাদেশ বিলাপ করছে।

মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন ভারতে অবস্থানরত শিল্পী মুস্তফা মনোয়ারের কিছু দুর্লভ কাজ আমরা পাই, যেমন ১৯৭১ -এ দেশ পত্রিকায় শারদীয় সংখ্যায় প্রকাশিত কথাশিল্পী শওকত ওসমানের মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক উপন্যাস 'জাহান্নাম হতে বিদায়'-এর জন্য বেশ কিছু স্কেচ করেছিলেন, যা ছিল খুবই অসাধারণ। এই স্কেচগুলোতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর নৃশংসতা, নারী নির্যাতন, সাধারণ মানুষের ভীতি প্রকটভাবে প্রতিফলিত হয়েছে।

বাংলাদেশের প্রথিতযশা শিল্পী কাইয়ুম চৌধুরী স্বাধীনতা সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধের স্মরণে অনেক ছবি এঁকেছেন। এর মধ্যে বেশ কিছু ছবি যুদ্ধ চলাকালীন আঁকা। যা সমকালীন চিত্রকলা হিসেবে ভারতে প্রদর্শিত হয়েছিল ১৯৭৩ সালে। এগুলো হলো 'শহীদ, বাংলাদেশ ৭১, গণহত্যা-৭১'।

মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন অপেক্ষাকৃত তরুণ শিল্পী রফিকুন নবী ঢাকায় অবরুদ্ধ ছিলেন। যুদ্ধের নয় মাস আতঙ্ক ও উৎকণ্ঠার মধ্য দিয়ে বিজয়ের আকাঙ্ক্ষা করেছেন প্রতিটি মুহূর্তে। এই ভাবনা থেকেই আঁকেন 'বিজয়' নামের চিত্রটি। ১৯৭১ সালের আগস্টে এই চিত্রটির কাজ শুরু করেন আর শেষ করেন একই সালের ১৬ ডিসেম্বরে, অর্থাৎ মহান বিজয় দিবসে। এই ছবিটিতে বিজয়ের মাহাত্ম্য বোঝাতে প্রতীক হিসেবে হাতির ফিগার ব্যবহার করেন।

১৯৭১ সালে শিল্পী স্বপন চৌধুরী তখন বয়সে তরুণ। রংতুলিতে, পেনসিলে এঁকেছেন সেই সময়ের রক্তাক্ত যুদ্ধের দৃশ্যাবলি। গান করেছেন সংগ্রামী শিল্পীদের সঙ্গে। ছবিগুলো আঁকার পেছনের গল্প তুলে ধরে শিল্পী স্বপন চৌধুরী বলেন, 'একাত্তরের এপ্রিল থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত আঁকা ছবিতে বাঙালির মুক্তিসংগ্রামকে তুলে ধরার চেষ্টা করেছি আমি। মুক্তিযুদ্ধ আমাকে ছবি আঁকার সাহস দিয়েছে। ভাবনার স্বাধীনতার সীমানা বিস্তৃত করে দিয়েছে। আমি যুদ্ধকে ছবিতে এনেছি। ছবিগুলো যখন দেখি, আনন্দ পাই, দুঃখ লাগে, গৌরব বোধ করি।

আমাদের মুক্তিসংগ্রাম এক দীর্ঘ ধারাবাহিকতার গৌরবময় ঐতিহ্য ধারণ করে ধাপে ধাপে চূড়ান্ত পর্বে উপনীত হয়েছিল। এ দেশের শিল্পীসমাজ এই আন্দোলনের সঙ্গে পূর্বাপর গভীর অঙ্গীকার ও ঐকান্তিক দেশপ্রেমে নিজেদের যুক্ত করেছিলেন। ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হওয়ার অব্যবহিত পর এই রাষ্ট্রের গণবিরোধী প্রতারক চরিত্র এ দেশবাসীর কাছে উন্মোচিত হয়ে যায়। মোহাম্মদ আলি জিন্নাহর রাষ্ট্রভাষা-সংক্রান্ত বিতর্কিত বক্তব্য খুব সহজেই পাকিস্তানি ভাবাদর্শের প্রকৃত স্বরূপটিকে চিনিয়ে দেয়। উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার স্পর্ধিত ও স্বৈরাচারী ঘোষণা একটি সত্যকে উন্মোচিত করে, আর তা হলো, পাকিস্তান বাঙালিদের জন্য আসেনি। পাকিস্তানি রাষ্ট্রশক্তি যে বাঙালি জাতিসত্তার শত্রুপক্ষ, সেই সত্যটি সমাজের অন্যান্য অংশের মতো শিল্পীসমাজও গভীরভাবে উপলব্ধি করে। ধীরে ধীরে সমাজের সর্বস্তরে এই উপলব্ধি গভীরভাবে ছড়িয়ে পড়ে।

১৯৪৮ থেকে ১৯৫২ সাল পর্যন্ত দেশজুড়ে নানা মাত্রায় শাসকশক্তির বিরুদ্ধে আন্দোলন হয়েছিল। এ আন্দোলনের প্রতিটি ধাপেই শিল্পীরা অংশগ্রহণ করেন। শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন, কামরুল হাসান বাঙালি জাতিসত্তার জাগরণের এই আন্দোলনে নেতৃত্ব দিতে এগিয়ে আসেন। বিশেষ করে শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন এতে অগ্রণী ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছিলেন। একটি বিষয় তিনি গভীরভাবে উপলব্ধি করেছিলেন, বাঙালির জাতিসত্তার প্রকৃত পরিচয় নিহিত রয়েছে তার লোকজ জীবনধারার মধ্যে। সুতরাং বাঙালিকে আত্মপরিচয় যদি খুঁজে পেতে হয়, তাহলে লোকশিল্পকলার মধ্য দিয়েই তার অনুসন্ধান করতে হবে। জয়নুল আবেদিন তাঁর অসাধারণ দূরদৃষ্টি দিয়ে বুঝতে পেরেছিলেন, পাকিস্তানবাদের বিরুদ্ধে আমাদের মূল লড়াইয়ের রসদ নিহিত আছে লোকজ জীবনধারায়। সেখান থেকেই তিনি চিত্রকরদের শক্তি আহরণ করার আহ্বান জানিয়েছিলেন।

দেশভাগের আগে তেতাল্লিশের দুর্ভিক্ষের চিত্রমালা অঙ্কনের উজ্জ্বল উত্তরাধিকারকে বহন করে তিনি এ দেশের চিত্রকলার আন্দোলনে নতুন রণকৌশল গ্রহণ করেছিলেন। তাঁর নেতৃত্বে সেদিন একঝাঁক শিল্পী বেরিয়ে এসেছিলেন। তাঁদের কাছে চিত্রাঙ্কন শুধু শিল্পচর্চা ছিল না; বরং তাঁরা তাঁদের কাজকে দেশমুক্তির ব্রত হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। জয়নুল আবেদিন চিত্রকলার আন্দোলন আর জাতিসত্তার আন্দোলনকে একই সূত্রে গেঁথে দিয়েছিলেন। তারই চূড়ান্ত রূপ আমরা দেখতে পাই একাত্তরে অসহযোগ আন্দোলন চলাকালে চারুশিল্পী সংসদ আয়োজিত স্বা ধী ন তা—এই চারটি অক্ষরকে বুকে নিয়ে শিল্পীদের মিছিলের মধ্যে। স্বাধীনতা শব্দটির চারটি অক্ষর সেদিন কী অসাধারণ উজ্জ্বলতায় বাংলাদেশের মুক্তির আকাঙ্ক্ষাকে মূর্ত করে তুলেছিল! ঢাকার রাজপথে সেদিন চার অক্ষরের এই প্রদর্শনী এক যুগান্তকারী ঘোষণা এনে হাজির করেছিল। এই মিছিলের ধারণা দিয়েছিলেন শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন। শুধু তাই নয়, সেই মিছিলে নেতৃত্বদানের অসমসাহসী দায়িত্বও পালন করেছিলেন তিনি।

এ ছাড়া একটি জাতির মুক্তিযুদ্ধ আসলে সর্বাত্মক যুদ্ধ। সেই যুদ্ধে প্রয়োজন হয় নানা কিছুর। প্রয়োজন হয় অর্থের, কাপড়ের, ওষুধের। শিল্পীদের অনেকে মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য অর্থ-কাপড় ওষুধ জোগাড় করেছেন। সেগুলো নানাভাবে তাদের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন। এ কাজে যে শিল্পীরা জড়িত ছিলেন, তাঁরা হলেন আনোয়ার হোসেন, আবদুল মান্নান, রেজাউল করিম, সৈয়দ আবদুল্লাহ খালিদ, মোখসেদ আলী ফরিদ, মোহাম্মদ ইউনুস প্রমুখ। আবার মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে বিশ্ববাসীর সমর্থন অর্জন এবং তহবিল সংগ্রহের জন্য ছবি এঁকে কেউ কেউ দেশের বাইরে প্রদর্শনী করেছেন।

সেপ্টেম্বর, ১৯৭১। প্রচণ্ড যুদ্ধ চলছে। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের পশ্চিমবঙ্গে অবস্থানরত বাঙালি শিল্পীরা দেশ, জাতি, ও সমাজের প্রতি নিজেদের দায়বদ্ধতার প্রমাণ দেন কলকাতার বিড়লা একাডেমিতে একটি দলীয় প্রদর্শনীর মাধ্যমে। ১৩ সেপ্টেম্বর, ১৯৭১ সালে শেষ হওয়া এই প্রদর্শনীটি ছিল একটি সময়োপযোগী, গুরুত্বপূর্ণ এবং ঐতিহাসিক প্রদর্শনী। কলকাতাকেন্দ্রিক সাহিত্যিক, শিল্পী, বুদ্ধিজীবীরা বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামকে সাহায্য ও সহযোগিতার জন্য বাংলাদেশ সহায়ক শিল্পী-সাহিত্যিক-বুদ্ধিজীবী সমিতি গঠন করে এই প্রদর্শনীর আয়োজন করেন যেখানে ১৭ জন শিল্পীর ৬৬টি চিত্রকর্ম স্থান পেয়েছিল। দু'ভাঁজের হলুদাভ কাগজে ইংরেজি ভাষায় ছাপা ক্যাটালগের শিরোনাম ছিল—বাংলাদেশের শিল্পীদের চিত্র ও অঙ্কন (ড্রইং অ্যান্ড পেইন্টিং) প্রদর্শনী। ফিগারেটিভ ও বাস্তবধর্মী এই কাজগুলোতে স্বদেশ বন্দনা ও মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন হানাদার বাহিনী ও এ দেশের সহযোগীদের নির্মম পাশবিকতা, গণহত্যা, ধর্ষণ এবং এর বিরুদ্ধে প্রতিরোধের চিত্র প্রতীয়মান হয়। ঐতিহাসিক এই প্রদর্শনী দেখেই বিশ্ববাসী বাংলার দুরবস্থা আঁচ করতে পেরেছিল।

প্রদর্শনীতে অংশগ্রহণকারী শিল্পীদের নাম ও শিল্পকর্ম হলো :

আবুল বারক আলভী— মা ও শিশু।
গোলাম মোহাম্মদ— সূর্য বিলোপ।
অঞ্জন বনিক— রক্তাক্ত বাংলাদেশ।
বরুণ মজুমদার— বাংলাদেশ।
বীরেন সোম— কান্না, দুঃস্বপ্ন, স্কেচ-১, স্কেচ-২।
চন্দ্র শেখর দে— নিষ্পাপ শিকার, চঞ্চল পাখি, স্কেচ-১, স্কেচ-২।
বিজয় সেন— জেনোসাইড, স্কেচ-১, স্কেচ-২।
দেবদাস চক্রবর্তী— ক্রুশবিদ্ধ মানবতা, স্বাধীনতার সৈনিক।
হাসি চক্রবর্তী— বাংলাদেশ-১, বাংলাদেশ-২, বাংলাদেশ-৩, বাংলাদেশ-৪, বাংলাদেশ-৫।
মুস্তফা মনোয়ার— একী ভবন, গর্বিতা মা, নারী এবং পশু, বাংলাদেশ-১, বাংলাদেশ-২, বাংলাদেশ-৩, স্মৃতি, ভূমি।
নাসির বিশ্বাস— ধর্ষণ।
নিতুন কুন্ডু— বাংলাদেশ'৭১, সাহায্যের জন্য কান্না।
প্রাণেশ মণ্ডল— শরণার্থী, সবুজ সোনালী জমিতে এলোপাতাড়ি, গুলি, স্কেচ-১, স্কেচ-২।
কামরুল হাসান— কম্পোজিশন-১, কম্পোজিশন-২, বাংলাদেশ- গণহত্যার আগে, বাংলাদেশ গণহত্যার পরে, এপ্রিলের পূর্ণ চাঁদ।
কাজী গিয়াস উদ্দিন— শরণার্থী-১, শরণার্থী-২, শরণার্থী-৩, শরণার্থী-৪, শরণার্থী-৫, দুর্যোগ।
রঞ্জিত নিয়োগী— ভয় এবং মৃত্যু, কালো দিগন্ত, মানবতা অবমাননা, উদিত সূর্য আমাদের, স্বাধীনতার জন্য।
স্বপন চৌধুরী— বাংলাদেশ- ১, বাংলাদেশ- ২, বাংলাদেশ-৩, স্কেচ-১, স্কেচ- ২, স্কেচ-৩, স্কেচ- ৪, স্কেচ-৫, স্কেচ- ৬, স্কেচ-৭, স্কেচ- ৮, স্কেচ-৯, স্কেচ- ১০।

ইতিহাসের সাক্ষী এই প্রদর্শনীটি প্রথমে কলকাতায় এবং পরে দিল্লিতে অনুষ্ঠিত হয়।

শুধু যুদ্ধ চলাকালীন মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে চিত্রকলা হয়নি, সত্তরের দশকে আবির্ভূত অনেক শিল্পীরই ছবি আঁকার প্রধান প্রেরণা ছিল মুক্তিযুদ্ধ। তবে তাঁদের কারো কারো কাজের মধ্যে মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক শিল্প সৃজন হয়তো ওই দশকেই তেমনটি হয়নি; বরং হয়েছে পরবর্তী দশকে। তবে যেকোনো আন্দোলনে চিত্রকলা বা রেখাও যে প্রতিবাদের অনেক বড় হাতিয়ার হতে পারে এবং অবদান রাখতে পারে বিজয়ে তারই প্রমাণ করে আমাদের মুক্তিযুদ্ধ।

শিল্পীদের মধ্যে মুক্তিযুদ্ধে সরাসরি যোদ্ধা হিসেবে অথবা নানাভাবে প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ করেছেন এমন শিল্পীর সংখ্যাও কম নয়। এদের মধ্যে আবুল বারক আলভী, স্বপন চৌধুরী, শাহাবুদ্দিন প্রমুখ উল্লেখযোগ্য।

সমসাময়িক জাতীয় আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক পরিবেশ-পরিস্থিতি নিয়ে যথেষ্ট চিন্তাশীল ছিলেন, বৈশ্বিক শিল্পধারা সম্পর্কে তাঁদের অনিঃশেষ আগ্রহ ছিল। বিষয় নির্ধারণে অবশ্য তাঁদের মধ্যে কেউ কেউ নিসর্গ ও নগর অথবা জীবননির্ভর থেকেছেন, পুরোমাত্রায় বিমূর্ত শিল্পকর্ম পঞ্চাশের দশকের শিল্পীরা সেই দশকেই করেছেন, এমন দৃষ্টান্ত খুব কম। তাঁদের কারো কারো মধ্যে বিশুদ্ধ বিমূর্ততা এসেছে শক্তিশালীভাবে পঞ্চাশ-পরবর্তী সময়ে। পঞ্চাশের দশকের চিত্রকলা ও ভাস্কর্য মূলতই আধা-বিমূর্ত বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত ছিল।

শিল্প-সমালোচকরাও ছিলেন তাঁদের সহচর। বাংলাদেশের (অর্থাৎ পঞ্চাশের দশকের পূর্ব পাকিস্তানের) শিল্পীদের বেশ কয়েকজনের সঙ্গে (পশ্চিম) পাকিস্তানের শিল্পবোদ্ধা ও শিল্প-পৃষ্ঠপোষকদের চমৎকার সখ্যও ছিল সেই দশকের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। ঢাকার শিল্পীদের মধ্যে হামিদুর রাহমান, মুর্তজা বশীর, সৈয়দ জাহাঙ্গীর প্রমুখ করাচি, লাহোর কিংবা পিন্ডিতে একক প্রদর্শনী করেছেন, স্বল্প বা দীর্ঘ মেয়াদে অবস্থানও করেছেন, সেখানকার প্রগতিশীল সেক্যুলার বন্ধুদের সাহচর্য লাভ করেছেন। মুবিনুল আজিমের মতো কেউ কেউ সে-দেশে স্থায়ী হয়ে গিয়েছিলেন।

বাংলাদেশের পঞ্চাশের দশকের এবং পূর্ববর্তী প্রজন্মের শিল্পীদের প্রধান ব্যক্তিগত বৈশিষ্ট্য তাঁদের অত্যন্ত উদার, প্রগতিশীল, সেক্যুলার ও গণতান্ত্রিক মনমানসিকতা। বাঙালি জাতীয়তাবাদের আদর্শেও ছিলেন তাঁরা অঙ্গীকারবদ্ধ। শিল্পীদের এসব বৈশিষ্ট্যই নির্মাণ করেছিল পঞ্চাশের চিত্রকলা ও ভাস্কর্যের চরিত্র। একটি অনগ্রসর, দারিদ্র্যপীড়িত সমাজ, যা আবার এক পর্যায়ে দীর্ঘ সামরিক শাসনের অধীন হলো, এ রকম পরিবেশে তৎকালীন (পঞ্চাশের দশকের) পূর্ব পাকিস্তানের তথা আমাদের বাংলাদেশের শিল্পীদের সৃজনকর্ম এ দেশের সাংস্কৃতিক সমৃদ্ধিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।

Advertisement