Beta

ডেঙ্গুর এই পরিস্থিতির জন্য সরকার দায়ী : রিজভী

২১ জুলাই ২০১৯, ১৮:০৬

নিজস্ব প্রতিবেদক
আজ রোববার দুপুরে রাজধানীর নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য দেন বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী। ছবি : এনটিভি

ডেঙ্গু প্রতিরোধে সরকার ব্যর্থ বলেই তা মহামারী আকারে ছড়িয়ে পড়ছে বলে অভিযোগ করেছেন বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী। তিনি বলেন, ‘এটা মহামারী আকারে ছড়িয়ে পড়েছে সর্বত্র। এর জন্য গণবিরোধী সরকারই হচ্ছে একমাত্র রেসপনসিবল।’ মশা নিধনের ওষুধ ক্রয় ও প্রয়োগেও দুর্নীতির আশ্রয় নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করেন রিজভী।

আজ রোববার দুপুরে রাজধানীর নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এ অভিযোগ করেন রুহুল কবির রিজভী।

জনগণের প্রতি সরকারের কোনো দায়বদ্ধতা নেই উল্লেখ করে বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব বলেন, ‘এটার (ডেঙ্গু) জন্য যে পর্যাপ্ত প্রতিরোধ করা, এটার যে অ্যান্টিডট, এটার যে দরকার মানুষকে বাঁচানোর জন্য, এর কোনো পদক্ষেপ নেই। মানুষ মারা যাচ্ছে এটাতে এবং এটা মহামারী আকারে ছড়িয়ে পড়েছে সর্বত্র। সুতরাং গণবিরোধী সরকারই হচ্ছে একমাত্র রেসপনসিবল। কারণ, আমরা আগেও বলেছি, জনগণের প্রতি তাদের দায়িত্ব থাকে না। তাদের একমাত্র দায়িত্ব হচ্ছে, কীভাবে জনগণের টাকাটা নিজেদের পকেটে ভরা যায়। এই দায়িত্বটাই তারা অত্যন্ত সুচারুভাবে পালন করছে।’

দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদের সমালোচনা করে রিজভী বলেন, আপনারা জানেন, দেশে যখন দুর্নীতির মহামারি চলছে, তখন সরকারের রাঘব-বোয়ালদের দুর্নীতির ‘ইনডেমনিটি প্রতিষ্ঠান’ দুর্নীতি দমন কমিশন ও এর চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দুর্নীতি করতে উৎসাহ দিয়ে বলছেন, ‘সরল বিশ্বাসে দুর্নীতি করলে অপরাধ হবে না। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সরল বিশ্বাসে কৃতকর্ম কোনো অপরাধ নয়।’

এর আগে সাবেক শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কর্তাদের সহনীয় মাত্রায় ঘুষ খেতে বলেছিলেন। সাবেক শিক্ষামন্ত্রীর রিজভী বলেন, এই বক্তব্যে দেশের কোমলমতি শিক্ষার্থীদের তিনি কী নৈতিক বার্তা দিয়েছিলেন, সেই উত্তর তো এখনো পাওয়া যায়নি। যখন দেশে প্রশাসনিক স্তরে অতি উচ্চ মাত্রার দুর্নীতির সংস্কৃতি বিরাজমান, এক টেবিল থেকে আরেক টেবিলে ফাইল যেতেও টেবিলের নিচে আর্থিক লেনদেন করতে হয়, তখন মাঠ পর্যায়ের প্রশাসনের কাছে এই ‘উৎসাহ বার্তা’ দেওয়া হচ্ছে যে, ‘সরল বিশ্বাসে দুর্নীতি করলে কিছু হবে না।’ ফলে টেবিলের ওপর দিয়েই এখন ঘুষের লেনদেন চলবে, তাতে কোনো অসুবিধা নেই। দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স দেখানোর দায়িত্ব পাওয়া ব্যক্তি নিজেই যদি ‘সরল দুর্নীতির’ অভিনব বাণী জনগণকে শোনান, তাহলে দুর্নীতির জোয়ারে দেশ তো ভেসে যাবেই। এখন থেকে ‘সরল বিশ্বাসে দুর্নীতি’র সাফল্যের মৌতাতে বুঁদ হয়ে থাকবে সরকারি কর্মকর্তারা। পক্ষপাতদুষ্টতার গুরুতর অভিযোগে অভিযুক্ত দুদক চেয়ারম্যানের এ বক্তব্যটি অপশাসনেরই একটি বিপজ্জনক বার্তা।

বিএনপির এই নেতা আরো বলেন, অপরাধ বিজ্ঞান বলছে, অপরাধীরা অপরাধ করে বটে, কিন্তু মনের অজান্তেই একটি প্রমাণ রেখে যায়। অপরাধের তেমনই একটি চিহ্ন রেখে দিলেন দুদক চেয়ারম্যান। খোদ দুদক কর্মকর্তাদেরই যখন দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়ার প্রমাণ বেরিয়েছে, তখন সরকারি কর্মকর্তাদের দুর্নীতির পক্ষে দুদক প্রধানের সাফাই গাওয়া ছাড়া তো আর অন্য কোনো বিকল্প থাকে না। চারদিকে যখন দুর্নীতিবাজদের উল্লাস, যখন শত শত কোটি টাকার দুর্নীতি চলছে অবাধে, তখন দুর্নীতিই যে এই দুর্নীতিবাজ সরকারের ভূষণ, দুদক চেয়ারম্যানের কথায় সেটি আনুষ্ঠানিকভাবে প্রমাণিত হয়েছে। দুদক চেয়ারম্যান গতকাল নিজেই স্বীকার করেছেন, মন্ত্রী-এমপিসহ রাঘব বোয়ালরা ধরা-ছোঁয়ার বাইরে। তারা ৭০ ভাগ দুর্নীতির মামলা দিচ্ছেন পুঁটিমাছের বিরুদ্ধে। মূলত, দুর্নীতি দমনের নামে মুখোশ পরা এই দুদক বিরোধী দল দমনে নিষ্ঠুর প্রতিশোধের খেলায় ব্যস্ত।

রুহুল কবির রিজভী বলেন, জনপ্রশাসনের কর্মকর্তারা দুর্নীতিকে এখন আর দুর্নীতি মনে করছেন না। এ কারণেই দেখা যায়, দেশে জাতীয় নির্বাচন হওয়ার কথা ছিল ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর। কিন্তু ওই নির্বাচনটি ‘সরল বিশ্বাসী’ প্রশাসনের ‘সরল’ কর্মকর্তারা ২৯ ডিসেম্বর দিবাগত মধ্যরাতেই সেরে দিয়ে দেশের ভোটারদের পরিণত করেছেন ‘সাব-হিউম্যানে’। এই ঘোরতর অন্যায় ও পাপের জন্য তাদের কোনো গ্লানি নেই।

রিজভী আরো বলেন, প্রশাসনের এই ‘সরল বিশ্বাসী’ কর্মকর্তাদের কারণে দেশের ব্যাংকিং খাতে এখন চলছে চরম নৈরাজ্য। ২০০৯ সালে খেলাপি ঋণ ছিল ২২ হাজার ৪৮১ কোটি টাকা। ২০১৮ সালে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়ায় এক লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা। ১০ বছরে খেলাপি ঋণ বেড়েছে এক লাখ সাত হাজার ৫১৯ কোটি টাকা। সরকারি কর্মকর্তাদের ‘সরল বিশ্বাসে দুর্নীতি’র কারণে গত এক দশকে এই সরকারের আমলে দেশ থেকে পাচার হয়েছে ছয় লাখ কোটি টাকার বেশি।’

বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব আরো বলেন, সরকারি কর্মকর্তাদের ‘সরল বিশ্বাসে দুর্নীতি’র কারণে নিচতলা থেকে দোতলায় একেকটি বালিশ তোলার খরচ পড়েছে সাড়ে ৭০০ টাকা। সরকারি কর্মকর্তাদের ‘সরল বিশ্বাসে’ দুর্নীতির কারণে ২০১৬ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ ফান্ডের ৮১০ কোটি টাকা পাচার হয়ে গেলেও কারো কোনো বিকার নেই।

রিজভী বলেন, দেশের উত্তরাঞ্চল-মধ্যাঞ্চলে এখন বন্যায় সর্বস্বহারা মানুষের হাহাকার চলছে। উজান থেকে নেমে আসা ঢলে বন্যা পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। নতুন করে আরো পাঁচটি জেলায় পানি প্রবেশ করেছে। শুকনো আশ্রয় ও খাবারের সন্ধানে ছুটছে বানভাসি মানুষ। কোথাও ত্রাণের গাড়ি কিংবা নৌকার সংবাদ শুনলেই ছুটে যাচ্ছে তারা। উত্তরাঞ্চলের সঙ্গে চারদিন ট্রেন যোগাযোগ বন্ধ রয়েছে। বন্যার পানিতে ডুবে তিন জেলায় ১০ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে জামালপুরে ৪, শেরপুরে ৪, গাইবান্ধায় ২ জন রয়েছে। সহায়-সম্পদ ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে ছুটছে বন্যার্তরা। অনেকেই পরিবারসহ ডিঙি নৌকায় আশ্রয় নিয়েছে। প্রায় দুই সপ্তাহ ধরে ছোট ছোট নৌকায় পরিবার-পরিজন নিয়ে অনাহারে-অর্ধাহারে চলছে অনেকের জীবন। ত্রাণের অভাবে যখন করুণ অবস্থা, তখন সরকারের মন্ত্রী-এমপিরা ঢাকায় বসে গলাবাজি করছেন। প্রত্যন্ত অঞ্চলগুলোতে ত্রাণ পৌঁছেনি এখনো। দুর্ভাগ্যজনকভাবে সরকারের যে উদ্যোগ প্রয়োজন, সেটা আমরা লক্ষ্য করছি না। সরকারের চরম উদাসীনতা প্রমাণ করে, জনগণের প্রতি তাদের কোনো দায়বদ্ধতা নেই, তারা জনবিদ্বেষী। সরকারের দায়িত্ব, বন্যা কবলিত মানুষকে রক্ষা করা। যেটা সরকার করছে না।

রিজভী বলেন, ‘আমরা বিএনপির পক্ষ থেকে যতটা সম্ভব বন্যা দুর্গতদের পাশে দাঁড়াচ্ছি। এই লক্ষ্যে দলের জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকুকে আহ্বায়ক করে ২১ সদস্যবিশিষ্ট একটি আহ্বায়ক কমিটি গঠন করা হয়েছে। তাঁরা বন্যা দুর্গতদের পাশে দাঁড়ানোর জন্য দলের নেতাকর্মীদের সঙ্গে নিয়ে ব্যাপক প্রস্তুতি গ্রহণ করেছেন।’

বিএনপির এই নেতা অভিযোগ করে বলেন, গতকাল বিএনপির চট্টগ্রাম বিভাগীয় সমাবেশ সাফল্যমণ্ডিত করার জন্য প্রস্তুতি গ্রহণকালে গত পরশু ফেনী থেকে ফেনী জেলা বিএনপির প্রচার সম্পাদক গাজী হাবিব উল্লাহ মানিক, জেলা যুবদলের সভাপতি জাকির হোসেন জসিম, জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি সাইদুর রহমান জুয়েল, সদর উপজেলা যুবদলের আহ্বায়ক আতিকুর রহমান মামুন, দাগনভূঁইয়া উপজেলা যুবদলের সভাপতি হাসানুজ্জামান শাহাদাৎ, ফেনী পৌর যুবদলের সমন্বয়ক জাহিদ হোসেন বাবলু, জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি শরীফুল ইসলাম এবং ফেনী পৌর যুবদল নেতা কাজী সোহাগকে ষড়যন্ত্রমূলকভাবে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। আমি নেতাদের গ্রেপ্তারের ঘটনায় তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাচ্ছি এবং অবিলম্বে তাঁদের নিঃশর্ত মুক্তির জোর দাবি করছি।’

Advertisement