Beta

আন্তর্জাতিক

শ্রীলঙ্কায় বৌদ্ধ-মুসলমান দাঙ্গার কারণ কী?

০৯ মার্চ ২০১৮, ২৩:৪০

মুজাহিদ আহসান

বেশ কয়েক দিন ধরে লক্ষ করছি, আন্তর্জাতিক অঙ্গনের খবরগুলোতে আলাদা জায়গা তৈরি করেছে শ্রীলঙ্কার বৌদ্ধ-মুসলমান দাঙ্গা ইস্যুটি। উত্তেজনা প্রশমনে প্রথমে ১০ দিনের জরুরি অবস্থা জারি। আর দ্বিতীয় পদক্ষেপ হিসেবে ফেসবুকসহ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলো বন্ধ। সম্প্রতি শ্রীলঙ্কার ক্যান্ডিতে ছড়িয়ে পড়া সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা রুখতে এগুলো দেশটির সরকারের নেওয়া পদক্ষেপ এগুলো।

একটু পেছন ফিরে দেখতে চাই। ২০১৭ সালের নভেম্বরের মাঝামাঝিতে। ভুয়া সোশ্যাল মিডিয়ার পোস্ট ও গুজবকে কেন্দ্র করে গল প্রদেশের গিনটোটা শহরে মুসলিম-বৌদ্ধ সংঘর্ষ আহত হওয়ার ঘটনা ঘটে। একটি দুর্ঘটনার জেরে সৃষ্ট ওই সংঘর্ষের পর জারি হয় কারফিউ। এর আগে ২০১৪ সালে উগ্র বৌদ্ধদের হামলায় তিন মুসলমান নিহত হন।

চলতি বছর ফেব্রুয়ারির শেষে আম্পারায় সাম্প্রতিক দাঙ্গার সূত্রপাত হয়েছিল। সবশেষ দাঙ্গা হলো মার্চের প্রথম সপ্তায়। বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী একজনকে হত্যা ও মুসলমান ব্যবসায়ীর দোকান আগুনে পুড়িয়ে দেওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে শ্রীলঙ্কার ক্যান্ডিতে। সহিংসতা রোধে পর্যটন নগরীতে কারফিউ জারির পর প্রশাসন সেটি বলবৎ করে দেশজুড়েই।

১০ দিনের জরুরি অবস্থা ঘোষণার সিদ্ধান্ত হয় ৬ মার্চ (মঙ্গলবার)। সেনা মোতায়েনের পাশাপাশি বাড়ানো হয়েছে পুলিশ উপস্থিতিও। জরুরি অবস্থার মধ্যেই বুধবার (৭ মার্চ) মুসলমানদের ওপর নতুন করে হামলা চালায় কট্টর বৌদ্ধরা। ঘরবাড়ি, দোকানপাট থেকে শুরু করে হামলা চালানো হয় মসজিদেও। প্রত্যক্ষদর্শীদের অনেকেই বলছেন, ক্যান্ডির ওই হামলা সুপরিকল্পিত।

মুসলিমদের অভিযোগ, ঘরবাড়ি পোড়ানোর সময় নীরব দর্শকের ভূমিকায় ছিল পুলিশ। তবে পুলিশের দাবি, বৌদ্ধ দাঙ্গাকারীদের ছত্রভঙ্গ করেছে তারা। এরই মধ্যে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে দাঙ্গাবাজদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে নির্দেশ দিয়েছেন দেশটির প্রেসিডেন্ট মাইথ্রিপালা সিরিসেনা।

বুধবারই (৭ মার্চ) সরকারের টেলিকমিউনিকেশনস রেগুলেটরি কমিশন—টিআরসির তরফে ঘোষণা দিয়ে বলা হয়, ফেসবুক, ভাইবার, হোয়াটসঅ্যাপের মতো সামাজিক মাধ্যম বন্ধ থাকছে তিন দিন। ক্যান্ডিতে বন্ধ করা হয়েছে সব ধরনের ইন্টারনেট সেবা।

এদিকে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বন্ধ করা নিয়ে শ্রীলঙ্কা সরকারের দাবি, ফেসবুকে মুসলিমদের ওপর আরো হামলার হুমকিসংবলিত পোস্ট দেওয়া হচ্ছে, যা চলমান দাঙ্গাকে আরো উসকে দিচ্ছে। অন্যদিকে, দেশটির মানবাধিকারকর্মীরা গণমাধ্যমকে বলছে, সহিংসতা নিয়ন্ত্রণে চরম অদক্ষতার পরিচয় দিয়েছে পুলিশ। সে কারণে দাঙ্গা আরো ব্যাপক আকারে ছড়িয়ে পড়েছে।

এর আগে দেশটির কয়েকটি কট্টরপন্থি বৌদ্ধ গোষ্ঠী অভিযোগ করে আসছিল, বৌদ্ধদের সেখানে জোর করে ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত করা হচ্ছে। এর সঙ্গে বৌদ্ধ পুরাতাত্ত্বিক স্থানগুলো ভাংচুরের জন্যও দায়ী করা হয় মুসলমানদের।

মিয়ানমারের রাখাইনে বসবাস করা রোহিঙ্গা মুসলমানদের ওপর সামরিক জান্তা সরকারের নির্যাতনের মাত্রা বাড়লে তারা বাংলাদেশসহ আশপাশের দেশগুলোতে আশ্রয় খোঁজে। মানবিক দিক বিবেচনায় নিয়ে বাংলাদেশ লাখো রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিলেও এ ক্ষেত্রে অন্যদের সাড়া দেওয়ার হার খুবই নগণ্য।

গত বছরের শেষে বৌদ্ধ সংখ্যাগরিষ্ঠ মিয়ানমার থেকে শ্রীলঙ্কায় গিয়ে আশ্রয় নিতে শুরু করে রোহিঙ্গা মুসলমানরা। এতে আপত্তি জানিয়ে সরব হয় দেশটির কয়েকটি বৌদ্ধ গোষ্ঠী।

কয়েক বছর ধরে শ্রীলঙ্কার বৌদ্ধ চরমপন্থীরা বেশ অদ্ভুত দাবি করে আসছিল। তাদের দাবি, রেস্তোরাঁগুলোয় খাবারের সঙ্গে জন্মনিরোধক ট্যাবলেট মেশানো হচ্ছে। ফলে সিংহলির নারী ও পুরুষরা সন্তান জন্মদানের ক্ষমতা হারাচ্ছে। মুসলিমরা দ্বীপে সংখ্যাগরিষ্ঠ সম্প্রদায়ে পরিণত হওয়ার লক্ষ্যে ওই কাজ করছে বলে তারা দাবি করে। অবশ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, মুখে জন্মনিরোধক বড়ি খেয়ে কেউ বন্ধ্যা হয়ে যাবে—এমন অদ্ভুত দাবি মোটেই বাস্তবসম্মত নয়। অবশ্য চরমপন্থী বৌদ্ধদের ওই দাবির প্রতি সমর্থন দিয়েছে উগ্র বৌদ্ধবাদী সংগঠন বদু বালা সেনা-বিবিএস।

মুসলমানদের হামলা করতে বিবিএস নজিরবিহীনভাবে মানুষকে উসকানি দিয়ে যাচ্ছে। শ্রীলঙ্কায় বিবিএস বরাবরই মুসলিমবিদ্বেষী হিসেবে পরিচিত । ২০১৪ সালে দক্ষিণ অঞ্চলের আলুথগামা এলাকায় মুসলিমবিদ্বেষী ভূমিকা পালন করেছিল সংগঠনটি। তখন বিবিএসের মদদে মুসলিমদের বহু ঘরবাড়ি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে ভাংচুর করা হয়।

এ ছাড়া বিবিএস ওই দেশে হালাল খাবারের ধারণায় বেআইনি ঘোষণার দাবি করে আসছিল। বিবিএসের নেতৃত্বে ‘বৌদ্ধ ব্রিগেড’ গত বছর মুসলিমদের বিরুদ্ধে র‌্যালির আয়োজন করে, যার নেতৃত্বে ছিল খোদ বৌদ্ধভিক্ষুরাই। এমনকি ওই দেশের চরমপন্থী বৌদ্ধরা মুসলমানদের বিরুদ্ধে প্রত্যক্ষ সংগ্রামের ডাক দিয়ে মুসলিমদের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বর্জনের আহ্বানও জানিয়ে আসছিল।

শ্রীলঙ্কার দুই কোটি ১০ লাখ জনগণের মধ্যে ৯ শতাংশ মুসলিম। বাকি ৭০ শতাংশ বৌদ্ধ। আর ১৩ শতাংশ তামিল নৃগোষ্ঠীর, তারা হিন্দু।

গেল কয়েক বছরে শ্রীলঙ্কায় মুসলিম বিদ্বেষ ক্রমাগত বেড়েই চলেছে। যদিও দেশটির মুসলমানরা বরাবরই শান্তিপ্রিয় হিসেবে পরিচিত। তামিল গেরিলাদের সঙ্গে শ্রীলঙ্কার ২৬ বছরের রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধের সময়ও মুসলিমদের সহিষ্ণু অবস্থায় দেখা গেছে। ফলে ভয়াবহ রূপ নিতে যাওয়া মুসলমান বিরোধী দাঙ্গা দমনই এখন প্রধান চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে প্রধানমন্ত্রী রনিল বিক্রমাসিংহের জন্য।

সংখ্যাগরিষ্ঠ বৌদ্ধ সিংহলি জনতার সঙ্গে মুসলমানদের দাঙ্গার পেছনে তবে কি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, রোহিঙ্গা মুসলিমদের শ্রীলঙ্কায় প্রবেশ নাকি উগ্র বৌদ্ধ গোষ্ঠী? এসব প্রশ্ন নিয়ে সামনের দিনগুলোতে আলোচনা চলতেই পারে।

লেখক : সংবাদকর্মী

Advertisement