Beta

সিরিয়া সংকট

আসাদকে ধাক্কা দিতেই কি সিরিয়ায় হামলা?

১৫ এপ্রিল ২০১৮, ১৬:৫১ | আপডেট: ১৬ এপ্রিল ২০১৮, ১১:৫৬

মুজাহিদ আহসান

সিরিয়ার তিনটি রাসায়নিক স্থাপনায় হামলার মধ্য দিয়ে যুদ্ধবাজ দেশের তকমাটি ধরে রাখল যুক্তরাষ্ট্র। শনিবারের এই হামলায় তারা পাশে পেয়েছে মিত্র দেশ ব্রিটেন ও ফ্রান্সকে। ঠিক এক বছর আগে বিরোধীদের ওপর রাসায়নিক হামলার অভিযোগে সিরিয়াতে হামলার নির্দেশ দিয়েছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। সেবার একটি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালানো হয়েছিল।

মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর পেন্টাগন দাবি করেছে,  রাতভর ছোঁড়া হয় একশোটিরও বেশি মিসাইল। হামলার লক্ষ্যবস্তুগুলোর মধ্যে ছিল রাজধানী দামেস্কের একটি গবেষণা কেন্দ্র ও হোমসের দুটি অস্ত্র মজুদের স্থাপনা। যদিও কিছুটা ক্ষতি স্বীকার করে নিয়েছে সিরিয়া।

হামলার পর পরই টুইটারে তৃপ্তির ঢেকুর তুলে ট্রাম্প লেখেন- মিশন সম্পন্ন। পাশাপাশি ফ্রান্স ও ব্রিটেনের বিচক্ষণতার জন্য ধন্যবাদ জানান। এর চেয়ে ভালো কিছু সম্ভব ছিল না বলেও জানান মার্কিন প্রেসিডেন্ট।

হামলার পর এখন অনেকের মুখে একটাই প্রশ্ন, যুক্তরাষ্ট্র কি তার লক্ষ্য অর্জন করতে পারবে ?  তবে যুক্তরাষ্ট্র বলছে যে, প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদ সরকারকে রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহার থেকে নিবৃত রাখাই হবে তাদের কাজ।

একই সুর ব্রিটিশ কর্মকর্তাদের কণ্ঠে। একে ব্যাপক হামলা বলতে নারাজ তারা। এমনকি এতে রাশিয়ার প্রতিশোধ নেওয়ার কিছু নেই। এমনটি বলছেন ব্রিটিশদের অনেকে। আর হামলার পক্ষে সাফাই গেয়েছেন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী থেরেসা মে। হামলাকে সঠিক ও বৈধ হিসেবে উল্লেখ করেছেন তিনি। বলেছেন, হামলার ব্যাপারে বেশ আশাবাদী ব্রিটেন। তবে ব্রিটিশ পার্লামেন্টের বিরোধী দলীয় সদস্যদের জোরালো সমালোচনার মুখে পড়েছেন থেরেসা।

আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলো তাদের বিশ্লেষণে বলছে, তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের যে জল্পনা-কল্পনা শুরু হয়েছিল তার ধারে কাছেও নেই হামলাটি। সর্বোপরি উদ্দেশ্য ছিল প্রেসিডেন্ট আসাদকে রাসায়নিক হামলা থেকে বিরত রাখা। অনেকে বলছেন, যুক্তরাষ্ট ও মিত্রশক্তিদের এই হামলা সংকটের সামান্য সমাধানই করতে পেরেছে।

মনিকা লিউনস্কি কেলেংকারিত জড়িয়ে সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন হামলা চালিয়েছিলেন সুদান ও আফগানিস্তানে। বিশ্লেষকরা বলছেন, ডোনাল্ড ট্রাম্প এখন পর্নো তারকা স্টর্মি ডানিয়েলস ও তাঁর আইনজীবীর কেলেংকারি নিয়ে সংকটে থাকায়, হামলার মাধ্যমে নিজেকে প্রেসিডেন্টসুলভ প্রমাণের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।

সম্প্রতি সিরিয়ায় বেসামরিকদের ওপর রাসায়নিক হামলার জবাবে যুক্তরাষ্ট্র ও মিত্র দেশগুলোর এই হামলাকে সমর্থন করছেন তুর্কি প্রেসিডেন্ট এরদোয়ান। 

ত্রয়ীদের এই হামলা সিরিয়ায় কোনো প্রভাব ফেলবে না। এমনটি বলেছে দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। আর ইরানের প্রেসিডেন্ট হাসান রৌহানিকে বাশার আল আসাদ জানান, সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে আরো দৃঢ়প্রতিজ্ঞ থাকবে সিরিয়া।

হামলা পরবর্তী প্রতিক্রিয়ায় কঠোর জবাবের হুঁশিয়ারি দিয়েছে সিরিয়ার মিত্র দেশ রাশিয়া। যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত রাশিয়ার রাষ্ট্রদূত আনাতোলি আন্তোনভ বলেছেন, রাশিয়ার প্রেসিডেন্টকে অপমান করাটা গ্রহণযোগ্য নয়।

রাশিয়ার তরফ থেকে প্রচারণা চলছে যে, রাসায়নিক হামলার কোনো প্রমাণই নেই। আর পুরো বিষয়টিই সাজানো হয়েছে মস্কো ও আসাদকে বিপাকে ফেলতে। হামলার দিন এ নিয়ে আলোচনা করতে ক্রেমলিনে মস্কোর মেয়র সার্গেই সোবিয়ানিনের সঙ্গে বৈঠক করেছেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। এক বিবৃতিতে তিনি বলেছেন, আন্তর্জাতিক সম্পর্কের দিক থেকে এটি ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ড। সিরিয়ায় পশ্চিমাদের চালানো হামলার নিন্দা জানিয়ে এটিকে আগ্রাসনের ফল বলে উল্লেখ করেছেন পুতিন।

যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্সের সমন্বিত হামলাকে অগ্রহণযোগ্য ও আইনসম্মত নয় বলছেন রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই ল্যাভরভ। এ ধরনের হামলার জন্য ট্রাম্পকে এডলফ হিটলারের সঙ্গে তুলনা করেছেন রাশিয়ার শীর্ষস্থানীয় এক রাজনীতিবিদ।

হামলার ঘটনায় সিরিয়ায় অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপের সতর্কতা দিয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন। সিরিয়ায় রাসায়নিক হামলা বন্ধে রাশিয়া ও ইরানকে এগিয়ে আসার আহ্বানও জানিয়েছে তারা।

হামলার পরিণতি ভয়াবহ হতে পারে বলে জানিয়েছে ইরাকি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। অন্যদিকে, চীন বলছে, রাজনৈতিকভাবেই নিষ্পত্তি করতে হবে সিরীয় সংকটের। হামলাকে আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন বলছে শি জিনপিংয়ের দেশটি।

চীনা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র হুয়া চুনইং এক বিবৃতিতে বলেছেন, সিরিয়ার ওপর যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্সের হামলার বিরোধিতা করছে বেইজিং। হামলাবাজ এসব দেশকে আন্তর্জাতিক আইনি কাঠামোর ভেতরে আসার আহ্বান জানাচ্ছে চীন।

এদিকে, জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের জরুরি বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত নিক্কি হ্যালি বলেন, সিরিয়ায় আবারও রাসায়নিক হামলা চালানো হলে এর জন্য চরম মূল্য দিতে হবে আসাদ বাহিনীকে। একই বৈঠকে হামলার নিন্দা জানান জাতিসংঘে রাশিয়ার রাষ্ট্রদূত ভ্যাসিলি নেবেঞ্জিয়া।

এর আগে গেল ৭ এপ্রিল সিরিয়ার দুমায় বিমান ও ব্যারেল বোমা হামলায় অন্তত ৭০ জন মানুষের প্রাণহানির পর আসাদ সরকারের ওপর চড়াও হয় যুক্তরাষ্ট্র। যার ফলাফল হিসেবে ট্রাম্পের নির্দেশে সিরিয়ায় হামলা চালানো হলো।

যুক্তরাষ্ট্রের মতো যুদ্ধবাজ দেশ যে ইস্যুতে সরব হয়েছে আজ তার স্বপক্ষে একই সুরে কথা বলছে পশ্চিমাদের মিত্র দেশগুলো। অন্যদিকে বিশ্বের অনেক দেশ চায় না, যুদ্ধ দিয়েই হোক সংকটের সমাধান। মানবতার কথা বলে নিপীড়িত, নির্যাতিত বিশ্ব জনগোষ্ঠীর কিছু অংশ একেবারে শেষ করার মনোবাসনা যাদের, তারাই কি করে শান্তি ফেরাতে তৎপর হয়ে উঠে। তবে কি আসাদকে ধাক্কা দিতেই ট্রাম্প-থেরেসা-ম্যাঁক্রো ত্রয়ীদের এই হামলা সিরিয়ায়?

লেখক : সংবাদকর্মী, আরটিভি

Advertisement