Beta

অভিমত

ঢাকাকে নিরাপদ করার কিছু প্রস্তাবনা

০৪ এপ্রিল ২০১৯, ১৭:১৬

ডা. ফেরদৌস খন্দকার

ঢাকায় অগ্নিকাণ্ড কিংবা ভবন ধসের ঘটনা শুনে অনেক দূরে থেকেও মর্মাহত হই। ভীষণ কষ্ট লাগে। বিশেষ করে যখন ভাবি, কিছু মানুষের দুর্নীতি এবং নিয়মতান্ত্রিক একটি প্রক্রিয়া না করতে পারার কারণে একের পর এক মানুষের প্রাণ যাচ্ছে। আমার প্রাণের প্রিয় মাতৃভূমির রাজধানী এমনই একটি জায়গা, যেখানে ১৯ তলার পরিকল্পনা নিয়ে ২১ তলা করা সম্ভব। অগ্নিনির্বাপণের সঠিক ব্যবস্থা না থাকা, পরিকল্পনা না মেনে ভবন তৈরি কিংবা গলি-ঘুপচির পুরান ঢাকায় রাসায়নিক কারখানা গড়ে তোলা, যার যা খুশি করছে। রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ বা রাজউক এখানে কী করছে? তাদের কোনো ধারণাই নেই কীভাবে একটি শহর কিংবা ভবনগুলোকে নিরাপদ করা যায়।

আমি যেহেতু উত্তর আমেরিকায় থাকি, নিউইয়র্ক শহরের কিছু উদাহরণ তুলে ধরতে চাই। দেখুন নিউইয়র্ককে বলা হয় পৃথিবীর রাজধানী। একই সঙ্গে পৃথিবীর সবচেয়ে উন্নত দেশটির গুরুত্বপূর্ণ শহর এটি। ফলে কোনো অবস্থাতেই ঢাকার সঙ্গে মিলিয়ে সেভাবে আলোচনাটি করতে চাই না। তবে কেবল সততা এবং নিয়মতান্ত্রিক প্রক্রিয়া সৃষ্টির মধ্য দিয়ে অনেক কিছুই করা সম্ভব। আমার আলোচনার জায়গাটি সেখানেই।

নিউইয়র্ক ঢাকার মতোই বড় একটি শহর। অনেকটাই ঘনবসতিপূর্ণ। এখানে পাঁচটি অঞ্চল রয়েছে। প্রতিটিতে রয়েছে আলাদা বিল্ডিং ডিপার্টমেন্ট। আবার ছোট ছোট বিভাগে ভাগ করা প্রতিষ্ঠানও রয়েছে। এখানে এতটুকু জায়গায় প্রায় পাঁচ হাজার বিল্ডিং ইন্সপেক্টর কয়েকটি লেয়ারে কাজ করে। একেবারে মাঠ পর্যায়ে যারা কাজ করে, তাদের শরীরের সঙ্গে জিপিএস এবং বডিক্যামেরা যুক্ত থাকে। তারা কোথায় যাচ্ছে, কীভাবে কাজ করছে সেটা তদারকি করার জন্য। যেন কোনো অবস্থাতেই অনিয়মে জড়িয়ে পড়তে না পারে এসব কর্মকর্তা। প্রতি পাঁচজনের একজন সুপারভাইজার থাকে। তারা সারা দিন মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের কাজ তদারক করে। কীভাবে কাজটি হচ্ছে, সেটা পর্যালোচনা করে। যেন ঘুষ কিংবা অপরাধের সঙ্গে কেউ জড়িয়ে পড়তে না পারে। সকালে মাঠ পর্যায়ের লোকেরা কোথায় যাবে, এমনকি আগের রাতেও তারা জানতে পারে না। যখন সকালে তারা টাইম পাঞ্চ করে, তখন তার জন্য অটোমেটিক একটি রুট তৈরি হয় এবং সে সেখানে যায়। অনেক ধরনের অভিযোগ জমা হয়।

সেইসব অভিযোগ কিংবা নতুন ভবনের পরিস্থিতি দেখতে তারা সেখানে যায়। এটি একটি নিয়মতান্ত্রিক পদ্ধতি। আবার ফিল্ড কর্মকর্তা যে বাড়িগুলোতে যাচ্ছে, তার মধ্য থেকে কোনো একটিতে সুপারভাইজার গিয়ে হাজির হয়। মিলিয়ে দেখার জন্য। অর্থাৎ মাঠ কর্মকর্তা যে রিপোর্ট দিচ্ছে, সেটা ঠিক আছে কি না সেটি দেখার জন্য। আবার নির্দিষ্ট সময় পরপর সুপারভাইজারও পরিবর্তন করা হয়। কারণ দীর্ঘ সময় একসঙ্গে থেকে অনেক সময় একটি টিমের মধ্যে এক ধরনের বোঝাপড়া তৈরি হয়, এতে অনিয়ম দেখা দিতে পারে।

আবার যখন ভবন নির্মাণ হচ্ছে, তখন আলাদা টিম কাজ করছে। কোনো একটি ভবনের ২৫ ভাগ কাজ শেষ হলে মাঠ পর্যায়ের অফিসাররা সেটা ইন্সপেকশনে যায়। আবার ৫০ ভাগ শেষে আবারও যায়। এভাবে ভবন নির্মাণের কাজ শেষ হওয়ার পর বিল্ডিং ডিপার্টমেন্ট এক দফা ইন্সপেকশন করে। পরে যায় ফায়ার ডিপার্টমেন্ট। কেবল আর্কিটেক্ট সার্টিফাই করলেই হবে না। প্রতিটি ডিপার্টমেন্ট নিজেদের মতো করে কাজ করে। আবার কেউ চাইলেই নিজের স্থাপনায় পরিবর্তন আনতে পারে না। তার জন্য অনুমোদন নিতে হয়। অনুমোদন ছাড়া কিছু করলে, তা যদি ধরা পড়ে বিরাট জরিমানা। তাতে হয়তো গোটা ভবনটাও হারাতে হতে পারে। আইন এবং নিয়ম এখানে সবার জন্যই সমান।

বাংলাদেশে সব ক্ষেত্রেই দায়সারা কাজ হচ্ছে। সেখানে লেয়ারিংটা নাই। এতবড় একটা ঢাকা শহরে কীভাবে ৫০ জন কর্মকর্তা দিয়ে ইন্সপেকশন করা সম্ভব? আমরা কেন এই সংখ্যাটা বাড়াচ্ছি না? এখানে যদি পাঁচ হাজার ইন্সপেক্টর নিয়োগ দেওয়া যেত, তাহলে তো জবও তৈরি হতো। অনেকেই হয়তো আশঙ্কা করবে, আমরা হয়তো আরো দুর্নীতিপরায়ণ কর্মকর্তা তৈরি করব এতে। আমি মনে করি, সবকিছু একটা সিস্টেমে নিয়ে আসতে পারলে, দক্ষতা বাড়াতে পারলে দুর্নীতি কমবে। কাজ হবে। ডিজিটাল দেশ বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে রাজউককেও ঢেলে সাজাতে হবে। তাহলে পাঁচ হাজার লোকের নিয়োগ ও তাদের বেতন নিয়ে ভাবতে হবে না। সেই প্রক্রিয়াই অর্থের জোগান দেবে। সব কাজের আলাদা ডিপার্টমেন্ট থাকবে। যাদের কাজ রাস্তা ম্যানেজমেন্ট করা, তারা তাই করবে। একদল ভবনের দেখভাল করবে। সবকিছু কেন প্রধানমন্ত্রীকে দেখতে হবে? একটি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে কেন চলবে না?

এটি হবে প্রতিদিনকার রুটিন কাজ। অনিয়ম দূর করতে হবে। দেশপ্রেম বাড়াতে হবে। কেবল দু-একটি দুর্ঘটনার সময় এসব নিয়ে হৈচৈ করে লাভ হবে না। কাজটা করেই ফেলতে হবে। সে জন্য গোড়াতে থাকা গলদ উপড়ে ফেলতে হবে। দেশটা আমাদের। দেশকে ভালোবেসে, দেশের প্রয়োজনেই কাজটা করতে হবে। উন্নত দেশের মতো হতে বলছি না, কেবল ভালো উদাহরণগুলো গ্রহণ করতে বলছি। আর দেশের সাধারণ নাগরিকদেরও অনেক দায়িত্ব রয়েছে। মনে রাখবেন, আপনার একটি অনিয়ম আপনিসহ অন্যদের ঝুঁকির মধ্যে ঠেলে দিচ্ছে। নিজে অনিয়ম করবেন না, অন্য কেউ যেন সেটা করতে না পারে, তার দিকেও চোখ রাখবেন। আমরা সবাই চাইলেই প্রাণের ঢাকাকে অনেকটাই নিরাপদ করতে পারি।

লেখক : নিউইয়র্কের বিশিষ্ট মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ও সংগঠক।

Advertisement