Beta

কঁচার ইলিশ

০৭ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ১৩:২৬

মো. মহিবুবুল হক
পিরোজপুরের বাজারে কঁচা নদীর ইলিশ। ছবি : লেখক

বাংলার দক্ষিণ জনপদে নদী এক অনন্য, অবিচ্ছেদ্য ও ভাগ্যপ্রসূতির নাম। বৃহত্তর বরিশালেই ছোট -বড় প্রায় অর্ধশত নদী, শাখানদী ও উপনদী রয়েছে। চাকরির সুবাদে দক্ষিণ বাংলায় যাওয়া। সারা দেশ এমনকি প্রতিবেশী ভারতও পদ্মার ইলিশে মাতোয়ারা। কিন্তু দক্ষিণে এসে এক ইলিশের স্বাদ নিলাম। কঁচা নদীর ইলিশ। দেখতে যেমন অপূর্ব, স্বাদেও অনন্য। বর্তমানে কাজ করছি পিরোজপুর শহর থেকে ২১ কিলোমিটার দূরে ভান্ডারিয়া সরকারি কলেজে।

প্রতিদিনই টগরার মোড় থেকে চরখালির ওপারে প্রায় এক কিলোমিটার জলপথ পাড়ি দিতে হয়। দুই পাড়ের মধ্যবর্তী নদীর নামই কঁচা। বলেশ্বর নদ এ নদীর উৎসমুখ। বলেশ্বর, কালীগঙ্গা, পোনা, বিষখালী, মধুমতি, সন্ধ্যা নদীর আধিপত্য এ জনপদে। তবে কঁচা,বলেশ্বর ও পোনার সম্পর্কটা সবচেয়ে বেশি নিবিড়।

কঁচা অনেক গভীর ও খরস্রোতা বলে খুব একটা চর জাগে না, অনেকটা ভাঙনকবলিত। এখন অবশ্য পাড় রক্ষায় বাঁধ হচ্ছে। শহর থেকে তিনটি উপজেলা ভান্ডারিয়া, ইন্দুরকানী, কাউখালিকে বিচ্ছিন্ন করেছে এই কঁচা নদী। পানি ও গভীরতার জন্য ভালো মাছ মেলে ওই নদীতে। যার মধ্যে অন্যতম ইলিশ। তবে ইলিশ ছাড়াও পাওয়া যায় চিংড়ি, পোমা, তপসী/রামচোস, ফাইসা, বাঘাইড়,বড় টেংরা, বোয়াল।

তিন জেলার প্রায় হাজার দশেক মানুষ এখানে মাছ শিকার করে। স্থানীয় প্রায় ২০টি বাজারে বিক্রি হয় এসব মাছ। বরিশাল থেকে খুলনা, খুলনা থেকে কুয়াকাটা, পাথরঘাটা ও বরগুনা যাওয়া-আসার মধ্যে পড়ে এসব বাজার। আর ওই যাত্রীরাই সবচেয়ে বড় ক্রেতা। আর ক্রেতাদের প্রথম পছন্দই ইলিশ।

কঁচার ইলিশের মুখ চোখা, পেটের দিক চ্যাপ্টা আর সুবিন্যস্ত ' ভি' আকৃতির লেজ। সাগরের ইলিশের সঙ্গে কঁচার ইলিশের একটা বড় পার্থক্য হলো, কঁচার ইলিশের ঘাড়ের দিকটা কিছুটা সবুজ। সাগরের ইলিশ কিছুটা নোনতা স্বাদ হলেও কঁচার ইলিশে লবণ কম ও তুলনামূলক স্বাদবহুল। কঁচা নদীতে ধরা পড়া ইলিশের গঠন একই রকম।

স্থানীয় এসব বাজারে বছরের সবসময়ই বেচাকিনি চলে,তবে আগস্ট থেকে অক্টোবরের মাঝামাঝি পর্যন্ত জেলেরা ইলিশ শিকার করে। ঠিক ওই সময়ের ইলিশ অন্যান্য সময়ে ধরা ইলিশের চেয়ে বেশি সুস্বাদু ও পুষ্টিকর।

এখানকার ইলিশ উৎসের কাছে থাকলেও খুব একটা সস্তা নয়। জানা গেল কঁচা নদীতে ঠিক আগের মতো ইলিশ ধরা পড়ে না। নদীজুড়ে জালের বিস্তার আছে। ইলিশের গতিপথে এগুলো বড় বাধা। অবিবেচক জেলেদের কারণেই কঁচায় ইলিশ কমে যাচ্ছে।

কঁচা নদী থেকে হয়েছে উমিদপুর খাল। ওই খালের পাড়েই পাড়েরহাট বাজার। পিরোজপুরে ইলিশের সবচেয়ে বড় বাজারটা ওখানেই। কঁচার ইলিশের পাশাপাশি ট্রলারে করে ওই বাজারে যায় সাগরের ইলিশও। দুই ইলিশের একই দাম থাকে।

জানা যায়, ওই বাজারে প্রতি বছর ১৮ থেকে ২০ কোটি টাকার মাছ কেনাবেচা হয়। মাছ বিক্রি হয় ‘পোন’ হিসেবে। এক পোনে থাকে ৮০টি মাছ।

প্রতিদিন সকালে বাজার বসে। ওই বাজারে ব্যবসা করছেন আজাদ কিসলু। তিনি জানান, বাজারটি ৫০ বছরের পুরোনো। ককসিটের বাক্সে করে এখান থেকে মাছ দূর দূরান্তে নেওয়া যায়। যে কেউ নিতে পারেন।

কিসলু জানালেন, সাগরে জলদস্যুদের উৎপাত কমেছে। এটা ভালো দিক। তবে ভারত -বাংলাদেশের মাছ শিকারের নিষেধাজ্ঞার সময় এক নয়। যে সময় বাংলাদেশের জেলেদের জন্য মাছ শিকার নিষিদ্ধ সে সময়ে ভারতে নিষিদ্ধ নয়, তখন তারা বাংলাদেশের সমুদ্র সীমান্তে ঢুকে মাছ শিকার করে নিয়ে যায়।

ভান্ডারিয়া লঞ্চঘাট থেকে পিরোজপুর, হুলারহাট লঞ্চঘাটের মধ্যবর্তী এক ঘণ্টার যাত্রায় পাওয়া যায় নতুন প্রাণের স্পর্শ। বড় লঞ্চের ঢেউয়ে ইলিশ ধরার ছোট ছোট ডিঙ্গি নৌকার এলোমেলো হয়ে যাওয়ার দৃশ্য অসাধারণ। জেলেরা শক্ত করে ধরে দুর্বল মাস্তুল। চোখে রুপালি ইলিশের স্বপ্ন।

লেখক : সহকারী অধ্যাপক, ভান্ডারিয়া সরকারি কলেজ, পিরোজপুর।

Advertisement