ভালোবাসার বিশ্বকাপ

বাংলাদেশে একসময় ক্রিকেট জনপ্রিয়তায় ফুটবলের চেয়ে বেশ পিছিয়ে ছিল। তবে বিশ্বকাপ এলেই ক্রিকেট নিয়ে শুরু হয়ে যেত মাতামাতি। ১৯৮৭ বিশ্বকাপ থেকে যার সূচনা।
’৮৭ বিশ্বকাপ ওয়ানডে ক্রিকেটের ‘আদিযুগে’ই হয়েছিল বলা যায়! তখনো টেলিভিশনের তেমন রমরমা ছিল না। খেলা হয়েছিল লাল বলে, সাদা পোশাকে। সেবার ডে-নাইট ম্যাচও হয়নি কোনো। তবু ’৮৭ বিশ্বকাপই প্রথমবারের মতো বাংলাদেশের ক্রিকেটপ্রেমীদের দিয়েছিল আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের মধুর স্বাদ। একে উপমহাদেশে প্রথম বিশ্বকাপ, তার ওপরে ভারতের দূরদর্শনের মাধ্যমে অনেকেরই টেলিভিশনে খেলা দেখার সুযোগ—ক্রিকেটভক্তদের মনে ক্রিকেট-রোমাঞ্চ অনেকখানি ছড়িয়ে দিয়েছিল সেই বিশ্বকাপ। তবে যাদের দূরদর্শন দেখার সুযোগ ছিল না, তারাও পুরোপুরি ‘বঞ্চিত’ হয়নি। বাংলাদেশ টেলিভিশন দুটি সেমিফাইনাল ও ফাইনাল সরাসরি সম্প্রচার করায় অনেকেই অস্ট্রেলিয়ার প্রথম বিশ্বজয়ের আনন্দের সঙ্গে একাত্ম হতে পেরেছিল।
প্রায় পাঁচ বছর পর, ’৯২ বিশ্বকাপের সঙ্গে পুরোপুরি মিশে গিয়েছিল বাংলাদেশের মানুষ। কারণ, বিটিভি। অস্ট্রেলিয়া-নিউজিল্যান্ডের যৌথ আয়োজনে ওই বিশ্বকাপের বেশির ভাগ ম্যাচই বিটিভি সরাসরি সম্প্রচার করেছিল। তাই ক্রিকেটপ্রেমীরাও প্রাণভরে উপভোগ করতে পেরেছিল সেই বিশ্বকাপ। প্রথমবারের মতো কৃত্রিম আলোয় (ফ্লাড লাইট) রঙিন জার্সি-সাদা বলে খেলা সেই বিশ্বকাপে এনে দিয়েছিল বাড়তি উন্মাদনা।
’৯৬ বিশ্বকাপ একই সঙ্গে বাংলাদেশের মানুষের জন্য আনন্দ ও বেদনার। বিশ্বকাপ মানেই আনন্দ-নাটকীয়তা-উত্তেজনা-রোমাঞ্চ। বেদনার কারণ, বাংলাদেশের একটুর জন্য বিশ্বকাপে খেলতে না পারা। দুই বছর আগে আইসিসি ট্রফিতে কেনিয়ার কাছে হেরে বিশ্বকাপে কোয়ালিফাই করতে না পারার দুঃখ বাড়িয়ে দিয়েছিল উপমহাদেশের দ্বিতীয় বিশ্বকাপ। সেবারও বিটিভি প্রায় সব ম্যাচ সম্প্রচার করেছিল। তবে তত দিনে কেবল টিভি দেশের অনেক জায়গায়, বিশেষ করে শহরাঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ায় বিটিভির ওপর দর্শকের ‘নির্ভরতা’ও কমে গিয়েছিল অনেকখানি।
তার পরের বছরই বাংলাদেশের ক্রিকেটের বহু কাঙ্ক্ষিত, বহু প্রার্থিত ‘ঘটনা’র জন্ম। আইসিসি ট্রফিতে চ্যাম্পিয়ন হয়ে, কেনিয়াকে হারিয়ে প্রতিশোধ নিয়েই বিশ্বকাপের টিকিট হাতে পায় বাংলাদেশ। সেই সুখস্মৃতিকে সঙ্গী করে বাংলাদেশ ১৯৯৯ সালে ইংল্যান্ডে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপে খেলতে নামে। কিন্তু মাঠে নামার আগেই বিতর্ক। মিনহাজুল আবেদীন নান্নুকে বাদ দিয়ে দল ঘোষণা নিয়ে দেশের আনাচে-কানাচে শুরু হয়ে যায় আলোচনা-সমালোচনা। শেষ পর্যন্ত মানুষের দাবির কাছে নতি স্বীকার করে নান্নুকে নিতে বাধ্য হন নির্বাচকরা। সেই ভালোবাসার প্রতিদান দারুণভাবে দিয়েছিলেন বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম সেরা ব্যাটসম্যান। স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে শুরুতে ৫ উইকেট হারিয়ে বাংলাদেশ যখন ধুঁকছিল, ঠিক তখনই বুক চিতিয়ে রুখে দাঁড়ান নান্নু। তাঁর অপরাজিত ৬৮ রানের এক অসাধারণ ইনিংসের সুবাদে বাংলাদেশ পেয়ে যায় লড়াই করার মতো সংগ্রহ। তার পর বোলারদের নৈপুণ্য এনে দেয় বিশ্বকাপে প্রথম জয়। সেই জয়ের রেশ কাটতে না-কাটতেই অবিস্মরণীয় এক জয়ের উল্লাসে মেতে ওঠে এ দেশের মানুষ। নিজেদের শেষ ম্যাচে পাকিস্তানকে হারানো শুধু বাংলাদেশের ক্রিকেটের অবিশ্বাস্য এক সাফল্যই নয়, টেস্ট ক্রিকেটের দ্বার উন্মোচনের উপলক্ষও ছিল। কোচ গর্ডন গ্রিনিজও এর চেয়ে ভালো বিদায়ী উপহার আর পেতে পারতেন না।
বিশ্বকাপে বাংলাদেশের প্রথম অংশগ্রহণ আনন্দের বারতা ছড়িয়ে দিলেও ২০০৩ বিশ্বকাপ ছিল বিস্মরণীয়, দুঃখজাগানিয়া। টেস্ট মর্যাদা পাওয়ার পর বিশ্বকাপে প্রথম খেলতে নেমেই বাংলাদেশ ভূপাতিত! তা-ও আবার কানাডার বিপক্ষে। ওই লজ্জাজনক হার তাড়িয়ে বেরিয়েছিল পুরো টুর্নামেন্টেই। বড় দলগুলোর সঙ্গে পর্যুদস্ত হওয়ার পর শেষ ম্যাচে কেনিয়ার কাছেও হার মানতে হয়েছিল। দক্ষিণ আফ্রিকা বিশ্বকাপ তাই বাংলাদেশের ক্রিকেটের এক কলঙ্কজনক অধ্যায় হয়েই থাকবে।
তবে সেই দুঃখ অনেকখানি দূর হয়ে যায় ২০০৭ সালে। ওয়েস্ট ইন্ডিজে বিশ্বকাপের প্রথম আয়োজন বাংলাদেশের ক্রিকেটকেও এগিয়ে দেয় অনেকখানি। বাংলাদেশের প্রথম প্রতিপক্ষ ছিল ভারত। সেই ম্যাচের ঠিক আগে একটি দুঃসংবাদে শোকাচ্ছন্ন হয়ে পড়ে দেশের মানুষ। সড়ক দুর্ঘটনায় মানজারুল ইসলাম রানা ও সাজ্জাদুল হাসান সেতুর করুণ মৃত্যু নাড়িয়ে দিয়েছিল ক্যারিবিয়ানে বাংলাদেশের ক্রিকেটারদেরও। সেই শোককে শক্তিতে পরিণত করে ভারতকে হারিয়ে ক্রিকেট-বিশ্বে হৈচৈ ফেলে দেয় বাংলাদেশ। টুর্নামেন্টের অন্যতম শক্তিশালী দল ভারতের বিদায়ঘণ্টা বাজিয়ে দেওয়ার পর নামিবিয়াকেও হারিয়ে বাংলাদেশ পেয়ে যায় সুপার এইটের টিকিট। সুপার এইটেও চমক-জাগানো পারফরম্যান্স—দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে দুর্দান্ত এক জয়ের আনন্দ। সব মিলিয়ে ওই বিশ্বকাপ ভালোই কেটেছিল বাংলাদেশের।
২০১১ বিশ্বকাপ শুধু অংশগ্রহণেই নয়, ভারত-শ্রীলঙ্কার সঙ্গে আয়োজনেরও অংশীদার ছিল বাংলাদেশ। গ্রুপ পর্বে বাংলাদেশের ছয়টি ম্যাচ ও দুটি কোয়ার্টার ফাইনাল মিরপুর ও চট্টগ্রামে হওয়ায় এ দেশের মানুষ প্রথমবারের মতো মাঠে থেকে বিশ্বকাপের স্বাদ নেওয়ার সুযোগ পেয়েছিল। তবে শুধু গ্যালারিতে থাকার সুযোগ পাওয়া সৌভাগ্যবানরাই নয়, সারা দেশের মানুষই মেতে ওঠে বিশ্বকাপ নিয়ে। বাংলাদেশ দলের অভিজ্ঞতা অবশ্য অম্ল-মধুর। ইংল্যান্ডের মতো শক্তিশালী দলের পাশাপাশি আয়ারল্যান্ড-নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে জয় আনন্দের রেণু ছড়িয়ে দিয়েছিল দেশের আনাচে-কানাচে। কিন্তু ওয়েস্ট ইন্ডিজ ও দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে ৫৮ ও ৭৮ রানে অলআউট লজ্জায় ফেলে দিয়েছিল দেশের ক্রিকেটাঙ্গনকে। তাই আয়োজনে সফল হলেও মাঠের পারফরম্যান্সের কারণে উপমহাদেশের তৃতীয় বিশ্বকাপ বাংলাদেশকে তেমন সুখময় স্মৃতি উপহার দিতে পারেনি।
চার বছর পর আবার বিশ্বকাপ ক্রিকেট দরজায় কড়া নাড়ছে। অস্ট্রেলিয়া-নিউজিল্যান্ডের যৌথ আয়োজনে দ্বিতীয় বিশ্বকাপ আবার ক্রিকেট-ভক্তদের সামনে নিয়ে এসেছে আনন্দের উপলক্ষ। তবে আশঙ্কাও কম নয়। ২০১৪ সাল বাংলাদেশ দলের ভালো কাটেনি। বছরের শুরু থেকে ব্যর্থতার বৃত্তে ঘুরপাক খেতে খেতে শেষ ভাগে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে সাফল্যকে সঙ্গী করে অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে পা রেখেছেন মাশরাফি-সাকিবরা। ১৮ ফেব্রুয়ারি প্রথম প্রতিপক্ষ আফগানিস্তান, যাদের কাছে এশিয়া কাপে হারের লজ্জায় পড়তে হয়েছিল। ‘প্রতিশোধের মিশন’ সেই ম্যাচই হয়তো এবারের বিশ্বকাপে বাংলাদেশের গতিপথ ঠিক করে দেবে।