বাংলাদেশের ‘মধুর প্রতিশোধ’

এমনিতে ক্রিকেট-ঐতিহ্য বা শক্তিতে দুই দলের মধ্যে অনেক ব্যবধান। তবে গত মার্চে এশিয়া কাপে আফগানিস্তানের কাছে হার তাড়া করে ফিরছিল বাংলাদেশকে। শঙ্কা ছিল, ছিল উদ্বেগও। মাশরাফি-সাকিবরা অন্তত বুধবারের রাতটা শান্তিতে ঘুমাতে পারবেন! সব আশঙ্কা-দুশ্চিন্তা-উদ্বেগ দূর করে বিশ্বকাপে আফগানিস্তানকে ১০৫ রানে উড়িয়ে দিয়েছে বাংলাদেশ। ‘মধুর প্রতিশোধ’ দিয়ে ক্রিকেটের সেরা আসরের সূচনা—মাশরাফির দল এখন নির্ভার বোধ করতেই পারে।
ক্যানবেরার মানুকা ওভালে ২৬৭ রান তাড়া করতে নেমে লক্ষ্যের ধারেকাছেও যেতে পারেনি আফগানিস্তান। মাশরাফি-সাকিব-রুবেল-তাসকিনদের দারুণ বোলিং ৪২.৫ ওভারে ১৬২ রানে গুটিয়ে দিয়েছে আফগানদের।
ফতুল্লার সেই ম্যাচে মাশরাফি-সাকিব-তামিম খেলেননি। বুধবার তামিম ইকবাল তেমন কিছু করতে না পারলেও আফগান-বধে সাকিব আল হাসান আর মাশরাফি বিন মুর্তজার বিশাল অবদান।
ব্যাট হাতে ৫১ বলে ৬৩ রানের চমৎকার ইনিংস খেলার পর দুই উইকেট নিয়েছেন সাকিব। প্রথম স্পেলে অসাধারণ বল করে দুটিসহ মাশরাফির শিকার তিন উইকেট। ম্যাচে বাংলাদেশ অধিনায়কের বোলিং ফিগারও দুর্দান্ত, ৯-২-২০-৩। তবে ম্যাচসেরার পুরস্কার উঠেছে মুশফিকুর রহিমের হাতে। ৫৬ বলে ৭১ রানের দৃষ্টিনন্দন এক ইনিংস খেলেছেন বাংলাদেশ উইকেটরক্ষক-ব্যাটসম্যান।
টস জিতে ব্যাটিংয়ের সিদ্ধান্ত নেওয়া বাংলাদেশের শুরুটা ছিল শ্লথ। সাবধানে খেলে উদ্বোধনী জুটিতে দলকে ৪৭ রান এনে দেন তামিম ও এনামুল হক বিজয়। ১৫তম ওভারে তামিমকে কট বিহাইন্ড করে আফগানদের প্রথম সাফল্য এনে দেন মিরওয়াইস আশরাফ। ৪২ বল খেলে তামিমের অবদান ১৯ রান। নিজের পরের ওভারে এনামুলকেও (২৯) এলবিডব্লিউর ফাঁদে ফেলেন এই পেসার।
৫২ রানে দুই ওপেনারকে হারানোর পর তৃতীয় উইকেটে ৫৫ বলে ৫০ রানের জুটি গড়ে দলকে ভালো জায়গায় নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছিলেন মাহমুদউল্লাহ ও সৌম্য। দুজনই শাপুর জাদরানের শিকার। ২৮ রান করে আউট হয়েছেন সৌম্য। মাহমুদউল্লাহর ব্যাট থেকে এসেছে ২৩ রান।
৩০তম ওভারের প্রথম বলে মাহমুদউল্লাহর বিদায়ে স্কোর দাঁড়ায় ১১৯/৪। তারপরই দারুণ এক জুটির জন্ম। পঞ্চম উইকেটে সাকিব-মুশফিকের ১১৪ রানের জুটি এখন বিশ্বকাপে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ জুটিও বটে। আগের সেরা জুটি ছিল ইমরুল কায়েস ও জুনায়েদ সিদ্দিকের ৯২, গত বিশ্বকাপে নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে।
একে অন্যের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে রান করে চলা সাকিব-মুশফিক ৩০০-এর কাছাকাছি নিয়ে যাওয়ার স্বপ্ন দেখাচ্ছিলেন দলকে। তবে ৪৫তম ওভারে হামিদ হাসানের বলে সাকিব বোল্ড হওয়ার পর প্রত্যাশিত সংগ্রহ পায়নি বাংলাদেশ। শেষ ভরসা মুশফিক ফিরে আসেন ৪৮তম ওভারে। সাকিব-মুশফিক দুজনের ব্যাট থেকেই এসেছে ছয়টি চার ও একটি ছক্কা। শেষ দিকে অধিনায়ক মাশরাফি নয় বলে ১৪ রান করলেও ২৬৭ রানে অলআউট হয়ে যায় বাংলাদেশ।
বল হাতে বাংলাদেশের শুরুটা ছিল দুর্দান্ত। প্রথম ওভারেই জাভেদ আহমাদির ফিরতি ক্যাচ নিয়ে দলকে সাফল্য এনে দেন অধিনায়ক মাশরাফি বিন মুর্তজা। পরের ওভারে নিজের প্রথম বলেই অন্য ওপেনার আফসার জাজাইকে এলবিডব্লিউর ফাঁদে ফেলেন রুবেল হোসেন। এর পর নিজের দ্বিতীয় এবং ইনিংসের তৃতীয় ওভারের শেষ বলে আসগর স্তানিকজাইকে স্লিপে মাহমুদউল্লাহর ক্যাচ বানিয়ে দলকে তৃতীয় সাফল্য এনে দেন মাশরাফি। আফগানিস্তানকে চতুর্থ ধাক্কা দেওয়ার সুবর্ণ সুযোগ নষ্ট করেছেন সাকিব। ১৫তম ওভারে তাসকিন আহমেদের বলে সহজ ক্যাচ দিয়েছিলেন নওরোজ মঙ্গল। কিন্তু থার্ডম্যানে দাঁড়ানো সাকিব বল হাতে নিয়েও ফেলে দিয়েছেন মাটিতে।
২৩তম ওভারে অবশ্য হতাশ হতে হয়নি মানুকা ওভালে প্রিয় দলকে সমর্থন জানাতে জড়ো হওয়া হাজারো বাঙালিকে। মাহমুদুল্লাহর বলে মঙ্গলের (২৭) ক্যাচ দারুণভাবে তালুবন্দী করেছেন ডিপ মিড উইকেটে থাকা রুবেল হোসেন। দুই ওভার পর ৪২ রান করা সামিউল্লাহ শেনওয়ারি সাজঘরে ফিরেছেন রানআউট হয়ে। ৭৮ রানে পাঁচ উইকেট তুলে দিয়ে মাশরাফির দল তখন জয়ের সৌরভে আমোদিত।
ষষ্ঠ উইকেটে নাজিবুল্লাহ জাদরান ও মোহাম্মদ নবীর ৫৮ রানের জুটি খানিকটা দুশ্চিন্তায় ফেলে দিয়েছিল বাংলাদেশ-ভক্তদের। তবে দুজনকে ফিরিয়ে সব শঙ্কা দূর করে দেন সাকিব ও মাশরাফি।
৩৭তম ওভারের শেষ বলে নাজিবুল্লাহকে (১৭) এলবিডব্লিউ করে জুটিটা ভেঙে দেন সাকিব। পরের ওভারের প্রথম বলে প্রতিপক্ষ অধিনায়ক মাশরাফির শিকার। ৪৪ রান করা মোহাম্মদ নবী সৌম্য সরকারকে ক্যাচ দেওয়ার পর বেশি দূর এগোতে পারেনি আফগানরা। সৌম্য-মুশফিক ‘কম্বিনেশনে’ আফতাব আলমের রানআউটে আফগানিস্তান অলআউট হওয়ার সঙ্গে-সঙ্গে আনন্দে ভেসে যায় মানুকা ওভালকে এক টুকরো বাংলাদেশ বানিয়ে ফেলা অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী বাঙ্গালিরা।
সংক্ষিপ্ত স্কোর :
বাংলাদেশ : ৫০ ওভারে ২৬৭ (এনামুল ২৯, তামিম ১৯, সৌম্য ২৮, মাহমুদউল্লাহ ২৩, সাকিব ৬৩, মুশফিক ৭১, সাব্বির ৩, মাশরাফি ১৪, মুমিনুল ৩, রুবেল ০*, তাসকিন ১; শাপুর ২/২০, মিরওয়াইস ২/৩২, আফতাব ২/৫৫, হামিদ ৬১/২, নবী ১/৫৮)।
আফগানিস্তান : ৪২.৫ ওভারে ১৬২ (আহমাদি ১, জাজাই ১, মঙ্গল ২৭, স্তানিকজাই ১, শেনওয়ারি ৪২, নবী ৪৪, নাজিবুল্লাহ ১৭, মিরওয়াইস ১০, আফতাব ১৪, হামিদ ০, শাপুর ২*; মাশরাফি ৩/২০, সাকিব ২/৪৩, তাসকিন ১/২৩, রুবেল ১/২৭, মাহমুদউল্লাহ ১/৩১)
ফল : বাংলাদেশ ১০৫ রানে জয়ী
ম্যাচ সেরা: মুশফিকুর রহিম।