চলুন যাই কুরিয়ানায় বৌদির হোটেলে

চলছে ভাসমান পেয়ারা বাজারের মৌসুম। পরিবার কিংবা বন্ধু-বান্ধব নিয়ে দেশের সর্ব বৃহৎ ভাসমান বাজার ভ্রমণের সময় এখনই। ভাসমান পেয়ারা বাজার যাচ্ছেন, অথচ বৌদির হোটেলে খাবেন না? তাহলে পুরো ভ্রমণেই একটা অপূর্ণতা রয়ে যাবে। দেশ-বিদেশ থেকে আসা টুরিস্টরা এই এলাকার বিভিন্ন স্থান ভ্রমণের সাথে ট্যুর প্লানে রাখেন বৌদির হোটেলে একবেলা খাবার। তাই আপনিও মিস করতে চাইবেন না ঘরের বাইরে সাশ্রয়ী দামে ঘরোয়া খাবারের সুযোগ।
স্বরুপকাঠি উপজেলার কুরিয়ানা বাজারে অবস্থিত ‘সকাল সন্ধ্যা’ হোটেলই পর্যটকদের কাছে বৌদির হোটেল নামে পরিচিত। প্রায় দেড়যুগ আগে স্বামী বরুন সিকদার নিজের ঘরেই খাবার হোটেল প্রতিষ্ঠা করেন। মূলত দূর থেকে বেচা-কেনা করতে আসা ব্যাবসায়ীদের দুপুরের খাবারের ব্যবস্থা করতেই এই হোটেলের সূচনা হয়। হোটেলে রান্নার কাজ সারতেন বৌদি এবং বেচাকেনা করতেন তার স্বামী। সম্পূর্ণ ঘরোয়া পরিবেশে চলতে থাকে তাদের ব্যবসা।
সময়ের বিবর্তনে কুরিয়ানা বাজারে খাবার হোটেলের চাহিদা বাড়তে থাকে। এদিকে পেয়ারা মৌসুমে বাজার দেখতে আসা পর্যটকরা বৌদির হোটেলে দুপুরের খাবার খাওয়া শুরু করে। টুরিস্টদের মাধ্যমে ছড়াতে থাকে বৌদির হোটেলের সুনাম, এতে ক্রমশ বাড়তে থাকে হোটেলের জনপ্রিয়তা। স্বামী-স্ত্রী ও দুই সন্তান নিয়ে সুখেই কাটছিল তাদের জীবন।
ভাগ্যের নির্মম পরিহাস অল্পদিনের মধ্যেই বৌদি তার স্বামীকে হারান। দুই সন্তানকে নিয়ে অসহায় হয়ে পড়েন তিনি। বিপদে বিচলিত না হয়ে তিনি ধৈর্যের সঙ্গে স্বামীর ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান নিজেই পরিচালনা করার সাহসী সিদ্ধান্ত নেন। নিজে রান্না করে এবং কাস্টমারদের নিজেই পরিবেশন করেন। রান্নার কাজে তার সন্তানরা সাহায্য করে। এভাবে চলতে থাকে বৌদির সংসার ও ছেলেমেয়ের পড়াশোনা।
দেশ বিদেশ থেকে আসা পর্যটকদের পরম যত্নে আপ্যায়ন করে থাকেন বৌদি। তিনি মনে করেন টুরিস্টরা তাঁর মেহমান, তাদের সম্মান করলে বাইরে তাদের এলাকার সম্মান বাড়বে। এ পর্যন্ত বৌদির হোটেলে ২০টিরও বেশি দেশের পর্যটক দুপুরের খাবার খেয়েছে। সম্পূর্ণ কাঠের তৈরি ঘরের নিচতলায় খাবার হোটেল ও উপরে নিজেদের থাকার জায়গা হওয়ায় বিদেশিদের কাছেও সুন্দর লাগে এই স্থানীয় খাবার ঘরটি।
নদীর হরেক রকম তাজা মাছ ও বাহারি পদের ভর্তা দিয়ে পর্যটকদের জন্য সাজানো থাকে দুপুরের খাবার মেন্যু। ভর্তার জন্য আলাদা করে কোনো দাম দিতে হয় না অতিথিদের। সম্পূর্ণ ঘরোয়া পরিবেশে ঘরের মতো মজাদার খাবার খেতে হলে অবশ্যই আসতে হবে বৌদির হোটেলে। এমন স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যের কারণেই টুরিস্টদের পছন্দের তালিকায় শীর্ষে রয়েছে কুরিয়ানা বাজারের বৌদির হোটেল।
পেয়ারা মৌসুমে পর্যটকদের বাড়তি চাপ সামাল দিতে বৌদিকে রান্নার কাজে সাহায্য করেন তার বোন। প্রতিদিন তিন-চার হাজার টাকা বিক্রি থাকলেও শুক্রবার প্রায় ১০-১২ হাজার টাকা বিক্রি হয়।
যেভাবে যাবেন :
ঢাকা থেকে লঞ্চযোগে বরিশাল (ভাড়া ডেক ১৮০ টাকা, কেবিন সিঙ্গেল এক হাজার ১০০ টাকা, ডাবল দুই হাজার টাকা । বরিশাল থেকে বাসে বানারীপাড়া (ভাড়া ৩৫ টাকা), বানারীপাড়া থেকে অটোতে কুরিয়ানা বাজার ২০ টাকা)। এ ছাড়া ঢাকা থেকে হুলারহাট/ভান্ডারিয়াগামী লঞ্চে স্বরূপকাঠি কিংবা বানারীপাড়া আসা যায়। তারপর অটোতে কুরিয়ানা বাজার (ভাড়া ২০ টাকা)। কেউ চাইলে ঢাকা থেকে বাসে করেও আসতে পারেন সরাসরি বরিশাল। ঢাকার গাবতলী ও সায়েদাবাদ বাস টার্মিনাল থেকে প্রতিদিন ভোর থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত এসি/নন এসি গাড়ি বরিশালের উদ্দেশে ছেড়ে যায়। (ভাড়া ৫০০ টাকা)।
খাবার খরচ
বৌদির হোটেলে দুপুরের মেন্যুতে নদীর তাজা মাছ (ইলিশ, রুই, বেলে, পোয়া, চিংড়ি ইত্যাদি) কয়েক পদের ভর্তা, চিংড়ি দিয়ে সবজি ও ডালসহ ভরপুর খাবারের খরচ পড়বে ১৩০ টাকা। এ ছাড়া দেশি মুরগি কিংবা হাঁসের মাংস দিয়ে অর্ডার করলে ১৫০-১৬০ টাকা খরচ হবে। মজার বিষয় হচ্ছে এখানে আপনাকে আলাদা করে কোনো দাম দিতে হয় না, যা কিছুই খাবেন এই দামের মধ্যেই সবকিছু পাবেন।
মনে রাখবেন : কোনো গ্রুপে ৮-১০ জনের বেশি হলে অবশ্যই অগ্রিম জানিয়ে রাখতে হবে।