ডিপসিকের প্রভাবে বিশ্বব্যাপী প্রযুক্তি খাতের শেয়ারবাজারে বড় ধস

চীনের তৈরি স্বল্পব্যয়ের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) মডেলের উত্থান নিয়ে উদ্বেগে গতকাল সোমবার (২৭ জানুয়ারি) বিশ্বব্যাপী প্রযুক্তি খাতের শেয়ার বাজারে বড় ধস নেমেছে। এই পরিস্থিতিতে এনভিডিয়ার বাজারমূল্য থেকে প্রায় ৫৯৩ বিলিয়ন ডলার উধাও হয়ে গেছে, যা ওয়াল স্ট্রিটের ইতিহাসে কোনো কোম্পানির জন্য একদিনে সর্বোচ্চ ক্ষতির রেকর্ড।
গত সপ্তাহে চীনা স্টার্টআপ ডিপসিক একটি ফ্রি এআই অ্যাসিস্ট্যান্ট উন্মোচন করে। দাবি করা হয়েছে প্রচলিত এআই পরিষেবাগুলোর তুলনায় কম ডাটা ও খরচে অধিক কার্যকর হবে ডিপসিক। এই এআই অ্যাসিস্ট্যান্টটি দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে এবং সোমবারের মধ্যে এটি অ্যাপল অ্যাপ স্টোর থেকে ডাউনলোডের সংখ্যায় মার্কিন প্রতিদ্বন্দ্বী চ্যাটজিপিটিকেও পেছনে ফেলেছে।
চীনের এই নতুন এআই মডেলের উত্থান এআই খাতের বর্তমান নেতাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে, যা বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে। এর ফলে প্রযুক্তি খাতে শেয়ার বিক্রির প্রবণতা তীব্র আকার ধারণ করেছে।
সোমবার এআই প্রযুক্তি খাতের ধসের প্রভাবে প্রযুক্তি-নির্ভর নাসডাক সূচক ৩ দশমিক ১ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। নাসডাকে সবচেয়ে বড় প্রভাব ফেলেছে এনভিডিয়ায়, যার শেয়ারের দাম প্রায় ১৭ শতাংশ কমেছে এবং ওয়াল স্ট্রিটে একদিনে বাজারমূল্যে রেকর্ড ক্ষতির নজির স্থাপন করেছে। এলএসইজি ডাটা অনুযায়ী, সোমবার এনভিডিয়ার বাজারমূল্যের ক্ষতি ছিল পূর্বের রেকর্ডের দ্বিগুণেরও বেশি।
নাসডাকে দ্বিতীয় বৃহত্তম প্রভাব ফেলেছে চিপ নির্মাতা ব্রডকম ইনকরপোরেটেড, যার শেয়ারের দাম ১৭ দশমিক ৪ শতাংশ কমেছে। এর পরেই রয়েছে চ্যাটজিপিটির সহযোগী মাইক্রোসফট, যার শেয়ার ২ দশমিক ১ শতাংশ পড়ে গেছে এবং গুগলের মূল প্রতিষ্ঠান অ্যালফাবেট, যার শেয়ার মূল্য ৪ দশমিক ২ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, চীনা স্টার্টআপ ডিপসিকের নতুন কম খরচের এআই অ্যাসিস্ট্যান্টের জনপ্রিয়তা এবং এর প্রভাব প্রযুক্তি খাতে বড় ধরনের অস্থিরতা সৃষ্টি করেছে। এর ফলে শেয়ারবাজারে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে অনিশ্চয়তা বেড়েছে, যা নাসডাক সূচকের নিম্নমুখী প্রবণতাকে বাড়িয়ে দিয়েছে।
সোমবার ফিলাডেলফিয়া সেমিকন্ডাক্টর ইনডেক্স ৯ দশমিক ২ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে, যা ২০২০ সালের মার্চ মাসের পর একদিনের সবচেয়ে বড় পতন। ইনডেক্সের সবচেয়ে বড় ক্ষতিগ্রস্ত ছিল মার্ভেল টেকনোলজি, যার শেয়ার ১৯ দশমিক ১ শতাংশ নিম্নমুখী হয়েছে।
মার্কিন বাজারে এই পতন এশিয়া থেকে শুরু হওয়া শেয়ার বিক্রির ধারাবাহিকতার অংশ। জাপানের সফটব্যাংক গ্রুপ ৮ দশমিক ৩ শতাংশ নিচে নেমে গেছে, যখন ইউরোপের বাজারেও পতনের ধাক্কা লেগেছে। ডাচ চিপ নির্মাতা এএসএমএল ৭ শতাংশ শেয়ার হারিয়েছে।

চীনা স্টার্টআপ ডিপসিকের নতুন ও কম খরচের এআই মডেলের উত্থান বাজারে অস্থিরতা তৈরি করেছে। অ্যানেক্স ওয়েলথ ম্যানেজমেন্টের প্রধান অর্থনীতিবিদ ব্রায়ান জ্যাকবসেন বলেন, “যদি সত্যি ডিপসিক একটি ‘উন্নত পদ্ধতির ফাঁদ’ হয়, তবে এটি গত দুই বছর ধরে বাজার চালিয়ে আসা এআই-কেন্দ্রিক অবস্থাকে সম্পূর্ণভাবে বদলে দিতে পারে।”
বিশ্বজুড়ে বিনিয়োগকারীরা নতুন এআই মডেলের সম্ভাব্য প্রভাব মূল্যায়ন করছেন, যা এআই শিল্প এবং তার বাজারের ওপর দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব ফেলতে পারে।
চীনা স্টার্টআপ ডিপসিকের কম খরচের এআই মডেল প্রযুক্তি খাতের ওপর বড় প্রভাব ফেলতে পারে, যা চিপ, বিদ্যুৎ উৎপাদন ও বৃহৎ ডেটা সেন্টার নির্মাণের চাহিদা হ্রাসের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, যদি ডিপসিকের মডেল বাস্তবিকভাবে কার্যকর হয়, তবে এটি প্রচলিত এআই পরিষেবাগুলোর চাহিদা কমিয়ে দেবে। এর ফলে চিপ নির্মাণ থেকে শুরু করে বিদ্যুৎ ও ডাটা সেন্টারের মতো বড় পরিকাঠামোর প্রয়োজনীয়তাও হ্রাস পাবে।
গত ১৮ মাসে এআই প্রযুক্তির বিপুল সম্ভাবনা নিয়ে বাজারে উল্লেখযোগ্য মূলধন বিনিয়োগ হয়েছে, যা শেয়ারবাজারের মূল্যায়ন বাড়িয়েছে এবং সূচকগুলোকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে। তবে ডিপসিকের উত্থান এআই-ভিত্তিক এই অবস্থার ওপর বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ‘এআই কেন্দ্রিক বর্তমান অবস্থা যদি হ্রাস পায়, তবে এটি পুরো প্রযুক্তি খাত এবং তার বাজার মূল্যায়নের ওপর দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব ফেলতে পারে।’