গল্প পড়ার গল্প
গুণী লেখক ছিলেন বরেন গঙ্গোপাধ্যায়

বরেন গঙ্গোপাধ্যায়ের সঙ্গে আমার প্রথম দেখা শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়ের প্রতাপাদিত্য রোডের
বাসায়। আমি তাঁর অনুরাগী পাঠক। দুই লেখকের আলাপ শুনতে শুনতে আমি তাঁদের কথায় নিজেকে জড়িয়ে দিলাম। তাঁরা জমি মাটি মানুষ নিয়ে কথা বলছিলেন। পানীয় ছিল সঙ্গে। শ্যামল দেখেছেন, বরেনও। তখন আমার দেখার আরম্ভ। বরেনদা ছিলেন খুব সাদাসিধে মানুষ। অকৃতদার। ধুতি পাঞ্জাবি। আমি তাঁকে প্রথম চিনি তাঁর ‘নিশীথ ফেরি’ উপন্যাসে। সেই ৪০-৪৫ বছর আগের এই শহর। ভয়ের শহর। অস্ত্র নিয়ে একজায়গা থেকে আর জায়গায় যাচ্ছে একটি যুবক। আমি পড়ে আধুনিক সাহিত্যের পাঠ নিয়েছিলাম।
বরেনদা অনেকদিন সুন্দরবনের একটি স্কুলে মাস্টারি করেছিলেন, তারপর আসেন যুগান্তরে। সেই কাগজ বন্ধ হলে তিনি লেখাতেই ছিলেন শুধু। কিছুদিন কলেজ স্ট্রিট পত্রিকা সম্পাদনা করেন। গল্প বিচিত্রা নামের একটি গল্পের কাগজ সম্পাদনা করেন। তাঁর ছিল পাহাড়ের নেশা। বছর বছর পাহাড়ে, তুষার সম্রাজ্যে যেতেন। এই স্নেহময় অগ্রজের সঙ্গে অনেক আড্ডা দিয়েছি। বরেনদার সুন্দরবনের অভিজ্ঞতা তাঁকে দিয়ে অনেক আশ্চর্য গল্প আর বাগদা, বনবিবির উপাখ্যান, নদীর সঙ্গে দেখা এসব আশ্চর্য উপন্যাস লিখিয়ে নিয়েছিল। মনে পড়ে নদীর সঙ্গে দেখা উপন্যাসের সেই আরম্ভ, ছোট নদীটা সম্পূর্ণ খালি। শূন্য হয়ে গেছে। ভাটায় জল সব টেনে নিয়েছে সমুদ্র। বরেনদার লেখায় নদীর সঙ্গে আমার দেখা হয়ে গিয়েছিল।
বরেনদার জন্ম ১৯৩০ সালে। চলে গেছেন ২০০২-এ। তার আগে একবার সেরিব্রাল হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু তাকে অতিক্রম করেছিলেন। এক অনুষ্ঠানে দেখা। তিনি বলেছিলেন, সব কিছু মনে রাখতে পারি না রে, বন্ধুরা একেকজন চলে যাচ্ছে। তখন শ্যামল সদ্য প্রয়াত। এরপর আর বেশিদিন নয়। এক দুপুরে ফোন পাই। একা মানুষটি একা চলে গেলেন।
আসলে বরেন গঙ্গোপাধ্যায় নিয়ে এত কথার কারণ এই গুণবান লেখককে ভুলে যাচ্ছি আমরা। যাঁদের নিয়ে আমরা অতি হৈহৈ-এ মাতি, তাঁদের সঙ্গে তাঁর কত পার্থক্য। কী সব গল্প লিখেছেন তিনি। তোপ, বজরা, কালবেলা, বাঘনখ, চোর, এক আঁজলা জল, নৌকা বিলাস, ভাত কাপড়, জুয়া, ফাঁদ, দড়ির খেলা, বৃহস্পতির এক বাবু ছিল, বরেন গঙ্গোপাধ্যায়ের গল্পে ছিল নিম্ন বর্গের মানুষ আর এক নিজস্ব ভুবন। নিজস্ব ভুবনের সৃষ্টি কম লেখকই করতে পারেন। বরেন দা’ তা করেছিলেন। তাঁর গল্প বলা কাহিনী কথন নয়। সেই গল্পে বিচিত্র কল্পনা, ফ্যান্টাসি এমন এক দর্শন এমন এক উপলব্ধির জন্ম দিত, যা এখনো বিরল মনে হয়। বাস্তবতা আর অলীকতা দুয়ের ভিতর পরিভ্রমণ করত বরেনদার গল্প।
‘তোপ’ গল্পটি কী নিয়ে ? কিছু নিয়েই নয়, আবার সব কিছু নিয়ে। দখিন বঙ্গের গঙ্গার তীরে পড়ে ছিল এক বেওয়ারিশ তোপ—গোদা কামান। জায়গাটার নাম তোপহাটি। সারা বছর সেই তোপহাটির তোপ ঘুমিয়ে থাকে, পড়ে থাকে গঙ্গাতীরে। আর চৈত্র সংক্রান্তির দিনে সেই তোপকে ঘিরে বসে যায় মেলা। তোপের মুখে সিঁদুর লেপে লেপে এয়োতিরা তাদের শাঁখা সিঁদুর অক্ষয় হওয়ার আরজি জানায়। আমাদের গ্রাম আমাদের দেশ কী নিয়ে বাঁচে তার খোঁজ আমরা রাখি না। আমরা যা জানি তা আমাদের অনুমান। নিজেদের মতো করে বানিয়ে নিতে চাই। কিন্তু শিকড়চ্ছিন্ন মানুষ শিকড়ের কথা কতটা বানাবে? বরেনদার ভিতরে সেই বিচ্ছিন্নতা ছিল না। বরেনদা গত শতাব্দীর ছয়ের দশকে যে গল্প লিখেছিলেন, যে স্মৃতি আর কল্পনার কথা, তার আধুনিকতা এই নতুন শতকেও সত্য। আসলে তিনি এগিয়ে থাকা লেখক ছিলেন। কাহিনী কথক ছিলেন না, ছিলেন গল্প বলিয়ে।
যে তোপটির কথা বরেনদা তাঁর গল্পে বলেছেন, তাকে নিয়ে নানা রকম কল্পনা আছে। তোপকে ঘিরে গাঁয়ের মানুষের বানানো যে গল্প তাই যেন ক্রমশ হয়ে ওঠে লোককাহিনী। গঙ্গার তীরে ওই তোপ এল কোথা থেকে ? কেউ বলে, সেই যে জনাবালি, যার দা-ঠাকুর যে বার হেঁদু থেকে মোছলমান হল, সেই বার চান্দ রাজা কিনেছিল তোপটাকে। জনাবালি নেই, থাকলে সে বলত, “বুয়েচ, দা-ঠাকুর এর গোলার মুখেই নিজেকে কোরবানি করেছিলেন প্রথম।” কিন্তু কেন? জনাবালি তখন মস্ত-সস্ত কেচ্ছা গাইত। সে কেচ্ছা নাকি এক বাবু এক কেতাব বানিয়ে তাতে লিখে রেখে গেছে। আহা তোপ নিয়ে কত কাহিনী আছে, তা প্রচলিত না বরেন গঙ্গোপাধায়ের লেখা সে কথা বলবে কে? তিনিই যা বলেছেন তাই-ই সত্য। জনাবালি সেই বিশ্বাসেই বাঁচে। গল্প তো একটা লেখেন নি বরেন, বনবিবির কাহিনীর সঙ্গে অনায়াসে জড়িয়ে গেছে ওই তোপ। সেই যে জব্বার নামেতে এক মোছলমান, বনবিবির কৃপা লাভে হয় মহীয়ান। সব হারিয়ে বনে বনে ঘোরে জব্বার। তখন দেখা বনবিবির সঙ্গে। তাঁর কৃপায় জব্বার সব ফিরে পায়। লোকলস্কর সৈন্য তো ফিরে পেল আর সঙ্গে পেল ওই তোপ। আর তোপকে ঘিরে চৈত্র সংক্রান্তির সারাদিন মেলা।
সেই মেলার কথা লিখতে লিখতে তোপের কথা লেখেন বরেন। তোপ নাকি জাহাজে করে নিয়ে এসেছিল পর্তুগিজ দস্যুরা। তারপর লড়াই করেছিল ভুঁঞা প্রতাপের সঙ্গে। তোপের মুখে কত মরেছিল প্রতাপের সৈন্য। খুব যুদ্ধ হলো। প্রতাপ এগোয় তো লালমুখোরা পেছয়। তারা এগোয় তো প্রতাপ পেছয়। শেষে গোলা ফুরোলে লালমুখোরা তোপ ফেলে পালায়। সেই থেকে পড়ে আছে এ। সারাবছর ঘুমোয় আর একদিন জাগে। জাগে মানে তোপের মুখ থেকেই যেন বেরিয়ে আসে মানুষগুলো। মেলা বসিয়ে দেয়। মেলার কথা দিয়েই আরম্ভ হয় তোপের গল্প।
বরেন লিখছেন, “উই পোকার মতো ঢিবি ভেঙে ছড়িয়ে লোকগুলি চারদিকে থিকথিক করছে। সরষে ছড়িয়ে দাও, ঘাড় গর্দানের ফাঁক গলিয়ে একটি কণাও নিচের দিকে নামবে না। এত্ত লোক জমেছে।” গল্পের হেথাহোথা মেলার বিবরণ, মাদারির খেল, পাঁপর, ফুল বাতাসা, পাঙ্খা, লজেনস, চাল মুগরার তেল, কালী মার্কা সাবান, জাল-পলুই, কুলো, সরা পাতিল, প্লাস্টিক চিরুনি আগড়ম-বাগড়ম কত কী! তারই ভিতর তোপ নিয়ে কিসসা ওড়ে। অনেককালের পুরোন এই তোপ। অনেককালই পড়ে ছিল এখানে বুনো বিচুটির জঙ্গলের ফাঁকে। স্বাধীনতা এল দেশে। তারপর এক বাঙালি এক পাঞ্জাবি সায়েব এসে কী সব দেখল এখানে, কী দেখল জানিয়ে গেল না। কিন্তু কমাস বাদে চৈত্র সংক্রান্তির আগে বিলিতি মাটি দিয়ে বাঁধিয়ে দিয়ে গেল। ধাপে ধাপে গঙ্গার সিঁড়ি আর পাড় বাঁধান হল। তারপর বুঝি তোপের কপাল ফিরল। তোপহাটির ভাগ্য ভাল, একে নিয়ে গিয়ে তারা জাদুঘরে মজুত করে নি। তোপ থাকল, তোপের মেলাও থাকল। তোপটা যেন রামায়ণ মহাভারতের যুগের।
বোষ্টম পাড়ার ছ’কড়ি বোষ্টম আগের বছরের মেলায় এক রামায়ণ গান ফেঁদেছিল। রাম রাবনের যুদ্ধ, সীতাহরণের পরিণাম, লঙ্কাকাণ্ড। বিভীষণ কী নিয়ে যুদ্ধ করল, না এই তোপ নিয়ে। মনে নেই সে কথা ? কে আবার বলেছিল এ হলো মীরজাফরের তোপ। আর তাই নিয়ে কাল্লু আর পচা, দুজনায় লাগে হাতাহাতি, কেন, না একজন আর একজনকে বলেছিল মীরজাফরের বংশধর। তোপের গল্প আর মেলার গল্প চলতে থাকে, বেলাও গড়াতে থাকে। ভালুকচন্দ্রের শ্বশুরবাড়ি যাওয়াও শেষ। অন্ধকার নামতে থাকে। অন্ধকারে মেলার লোকগুলি ছোট হয়ে যেতে যেতে মাছির মতো এইটুকু হয়ে যেতে থাকে। তারপর যেন তোপের হাঁ মুখে ঢুকে যেতে থাকে। তারা তোপ থেকে বেরিয়ে এসেছিল, তোপের ভিতর তোপের কাহিনী নিয়ে ঢুকে যেতে থাকে। তারা তোপের আশ্রয়ে আছে চার পুরুষ বা আরো আগে থেকে। এইদিনে বেরিয়ে এসে হাত-পায়ের জং একটু ছাড়িয়ে নিয়েছিল। পাঠক ভাবুন বরেন কী লিখে গেছেন। কোন বাস্তবতা, বাস্তবতার জাদু। ১৩৬৫ বা ১৯৭২ এ লেখা সোনা দিয়ে বাঁধানো এই গল্প।