স্মরণ
মৃত নক্ষত্রের রোদ

রবিশংকর বল অকালে চলে গেলেন। রবি চলে গেল। রবিকে চিনতাম প্রায় বছর চল্লিশ ধরে। আমাদের কবিপত্রের আড্ডায় রবি এসেছিল হাফ প্যান্ট পরা এক সদ্য যুবক। তারপর থেকে রবির সঙ্গে যোগাযোগ ছিলই। শেষ দেখা অক্টোবরের শেষে তানভীর মোকাম্মেলের ছবি সীমান্তরেখার প্রদর্শনে। গোরকি সদনে। আমরা পাশাপাশি বসেছিলাম। দেখলাম রবি খুব রোগা হয়ে গেছে। জীর্ণ। চোখমুখে মলিনতা। বলল, ও পুজোয় মুসৌরীর দিকে গিয়েছিল। কী অসামান্য প্রকৃতি। তার শরীর ভালো হয়ে যাচ্ছে। গল্প উপন্যাস নিয়ে কথা হলো। আমি ‘কথা সোপান’ পত্রিকায় অনুবাদ সংখ্যার পরিকল্পনা নিয়ে কথা বলতে ও আমাকে বলল, ব্রাজিলের লেখক ক্ল্যারিস নিস্পেক্টারের একটি গল্প আমাকে অনুবাদ করে দেবে। গল্পটি অনুবাদ করে পাঠাল দিন পনেরর মধ্যে। হাতের লেখা এল। স্ক্যান করে মেইল।
এরপর ফোনে কথা হতে থাকে। ওকে আমি নয় মিনিটের একটি ছবি পাঠালাম মেইল করে। দেখে আমাকে ফোন করল। অনেক কথা বলল। তারপর একটি লেখার কথা বলল। লিখবে। লেখাটা হয়নি। এই পর্ব নভেম্বরের তৃতীয় সপ্তাহ অবধি চলল। তারপর আর যোগাযোগ নেই। যোগাযোগ হলো হাসপাতালে। ঘুমিয়ে আছে হাসপাতালের বেডে। শীতের ভোরে সেই শেষ দেখা।
আমি রবির লেখা পড়তে ভালোবাসতাম। আলাদা লেখা। অনুভূতিময় লেখা। কত রকমে লেখা হয়।ওর লেখার ভিতরে পাঠ অভিজ্ঞতার বড় ভূমিকা। সঙ্গে নিজের পরিবার, মা বাবা, এই শহর, ছেলেবেলা... এসব। ওর অনুভূতিপ্রবণ গদ্য আমাকে আবিষ্ট করত। রবির লেখায় ১৯৪৭-এর দেশভাগ ঘুরে ঘুরে আসত। কীভাবে আসত? অনেক গভীর থেকে ফিরে আসত মায়ের বেদনা, বাবার কষ্ট, খিন্ন জীবনের কথা। রবির একটি উপন্যাসে দণ্ডকারণ্য পেয়েছিলাম। দণ্ডকারণ্যের কলোনিবাসী জ্যেঠামশায়ের কাছে গেছে মণিময়। দূর বরিশাল থেকে উচ্ছিন্ন হয়ে সেখানে তাঁদের শেষ আশ্রয়। নিরুপায় মানুষ। এ জীবন ফড়িঙের নয়, দোয়েলের নয়। এ জীবন কিছু ভাঙাচোরা মুখের সঙ্গে আত্মবন্ধনের। বারবার রবি এই লেখাই যেন লিখেছে। কী অসামান্য এই দেখা, এই ছোঁয়া। দুটি গল্পের কথা বলি, মধ্যরাত্রির জীবনী এবং অশ্রু ও ঘামের গন্ধ। আসলে পার্টিশন জীবনকে কত ধূসরতার ভিতরে প্রবেশ করিয়েছিল, উদ্বাস্তু জীবন কত মর্মবেদনার হতে পারে রবি তা সূক্ষাতিসূক্ষ্ম আঁচড়ে আঁকত। ওর গল্প, ওর উপন্যাসে কলকাতা শহরের বড় ভূমিকা। মধ্যরাত্রির যে সন্তান, তারই জীবনী যেন লিখে গেছেন রবিশংকর বল। মধ্যরাত্রির জীবনী গল্পে আচমকা চাকরি ছেড়ে মায়ের কাছে, সেই পুরোনো ধ্বস্তপ্রায় ভাড়া বাড়িতে। কেন এলো ফিরে? সে শহরকে ছেড়ে থাকতে পারছিল না। আর স্বাধীনতা চাইছিল বিতান। গল্প থেকে একটু অংশ বলি—
‘নীহারিকা চেয়ে থাকলেন বিতানের দিকে। তিন হাজার বছরের কত আঁকিবুকি মুখে নিয়ে বসে আছে তার ছেলে। বিতানের দিকে তাকালেই তাঁর মনে পড়ে নিজের বাবার কথা। সেই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কয়েক বছর পরেই—ভারত-পাকিস্তান হয়ে যাওয়া—দূরে কাছে যখন কেবল গ্রামপতনের শব্দ—মূল্যবোধ আর নৈতিকতা যখন বুকটাকে দুফালি করে ভেঙেচুরে যাচ্ছে—তার বাবা তখন সুবচনীর খোঁড়া হাঁসের মতো মানসসরোবরের স্বপ্নে ডানা ঝাপটাচ্ছেন। রোগা, ছ’ফুট লম্বা, গৌরবর্ণ তার বাবা শহরের রাস্তায় রাস্তায় হাঁটতেন। কথা বলতেন খুব কম। ধীরে। একদিন বলেছিলেন, রাজনীতি কখনো মানুষের হৃদয়ের জিনিস নয়—
তবু রাজনীতি ছাড়া মানুষ আর কী নিয়ে লড়বে? কেউ প্রশ্ন করেছিল তখন। বাবা এর কোনো উত্তর দিতে পারেননি। সময়ের নানা বিভ্রান্তি এভাবেই আলাদা করে দিচ্ছিল সকলের থেকে, হয়তো নিজের হৃদয়ের থেকেও। মৃত্যুর কয়েক বছর আগে থেকে তিনি লিখছিলেন আত্মজীবনী, যা অসমাপ্ত, এখন নীহারিকার ট্রাঙ্কে, ন্যাপথলিনের গন্ধের ভিতরে। তার বাবা বলতেন, ও জীবনী আমার নয়—আমার নয়—
তাহলে কার?
মধ্যরাত্রির। বাবা কি শেষকালে পাগল হয়ে যাচ্ছিলেন? নীহারিকা জানেন না। বিতানও কি তবে মধ্যরাত্রির সন্তান?
এই বাড়িটায় আর থাকতে ইচ্ছে করে না। বিতান শুনল, নীহারিকার গলার ভিতরে প্রাচীন বালি ঝরছে।
কেন?
কতদিন কোথাও যাইনি।
বেড়াতে যাবে?
না। মানুষ তো নতুন-নতুন বাড়ি বদলায়—
ভালো বাড়ির লোভ হয় বুঝি।
হৃদয়পুরের দিকে একটা জমির সন্ধান পেয়েছি—
বিতান চুপ করে থাকল। মার জিজ্ঞাসার ধরন কি এইরকম? এত স্বপ্নাভাসের মধ্য দিয়ে? চাকরিটা সে এমন আকস্মিকভাবে ছেড়ে দিল—কেন—মা তবু সহজে জিজ্ঞেস করতে পারে না তাকে। সহজ জিজ্ঞাসার রক্তপাতে তারা কেউ—এই মা আর ছেলে, বিতান আর নীহারিকা দীর্ণ হয়নি কখনো, তবু স্বপ্নে তো আমরা এখনও কথা বলি, বিতান ভাবল।
আকাশ দেখছিল বিতান। তার ছেলেবেলার সেই আকাশ আর নেই। ভাড়াবাড়ির একতলার ছাদে দাঁড়িয়ে রাতের আকাশ দেখতে-দেখতে ভাবছিল বিতান, আকাশ, সমুদ্র সবকিছুই বদলায়। মাতৃত্বের সংজ্ঞা বদলায়। গন্ধের শরীর একসময় শুধু গন্ধের স্মৃতি হয়ে যায়। নীহারিকার কথা ভেবে বিতানের গলার কাছে সূক্ষ্ম ব্যথার কুণ্ডলী পাকিয়ে ওঠে। কী অসহায় তুমি নীহারিকা, যেন কুন্তীর মতো তুমি আজ আমার সামনে এসে দাঁড়ালে... ভ্রূণের সন্তানের পরিচয় এভাবেই বদলে যায়।’
এক লেখাই যেন লিখেছে রবি তার এইটুকু জীবনজুড়ে। ‘ঘুম আর অশ্রুর গন্ধ’ গল্পে বস্তির ঘরগুলো পরপর তালা বন্ধ পড়ে আছে। একজন এসেছে বহুদিন বাদে। তালা খুলে একটি ঘরে প্রবেশ করেছে। গল্পটি এক জানালার। ঘর ভর্তি ধুলো, ময়লা, চৌকিতে বইয়ের স্তূপ, কাগজের টুকরো। সে একদিন এই ঘরে থাকত। এখন থাকে না। ফিরেছে। জানালাটি খুলে দেয়। দেখল একটি অপরাজিতা ফুলের গাছ লতিয়ে উঠেছে জানালার মরচে ধরা শিক পর্যন্ত। সে জানালা খুলে ঘর বন্ধ করে বেরিয়ে আসে। ফুলটিকে দেখার জন্য চোখ দুটিকে যেন ঘরে রেখে অন্ধ হয়ে শহরে। ফুল থেকে ঘুম আর অশ্রুর গন্ধ পেয়েছিল নাকি সে?
‘সে তাই জানলাটা খোলা রেখেই ঘরে তালা লাগাল; পিছন ফিরে কেন অপরাজিতার লতার দিকে তাকায়নি তা সে-ই জানে। বা হয়তো সে জানত, এ জন্মের চোখ দুটি সে ওই ঘরের ভিতরে রেখে এসেছে, যারা দিনের পর দিন অপরাজিতা লতার বেড়ে ওঠা দেখবে, আর সে-ই অন্ধ হয়ে এই শহরের রাস্তায় রাস্তায় হেঁটে যাবে। অসুবিধে তো নেই, সব রাস্তাই তার চেনা; শুধু সে জানে না, কবে, কখন জানলার পাশে জন্ম নিয়েছিল অপরাজিতার লতা।
সেদিন রাতেই অপরাজিতার লতা ভাবছিল, লোকটা কে? এভাবে জানলাটা হাট করে খুলে দিয়ে গেল—নাকি ভুলে গিয়েছে? কষ্ট হয়, ঘরটার ভিতরে তাকাতে বড় কষ্ট হয়— সারাক্ষণ শুধু ঘুম আর অশ্রু গন্ধ ভেসে আসে।’
২
ইসলামি সংস্কৃতিতে রবির প্রধান আকর্ষণ ছিল। আত্মস্থ করেছিল সে। দোজখনামা এবং আয়নাজীবন দুই উপন্যাসে ছিল অভিজ্ঞতা, অবশ্যই পাঠের। দোজখনামা উপন্যাসটি দেশভাগের। দোজখনামা সাদাত হাসান মান্টোর জীবন। মহাকবি গালিবের জীবন। ১৮৫৭-র মহাবিদ্রোহে পরাজয়ের পর এ দেশের মানুষের পাকাপাকিভাবে পরাধীনতায় প্রবেশ। দোজখনামা এক বেহেস্তের দোজখ হয়ে যাওয়ার কাহিনী। দোজখ থেকে বেহেস্তের কল্পনা। এই উপন্যাসটির বহু মাত্রা আছে। আর বহুমাত্রার জন্য এই উপন্যাস কখনোই মনের ভিতরে গিয়ে শেষ হয়ে যায় না। দোজখনামা আমি পড়েছি বছর কয় আগে, গ্রন্থাকারে প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে। কোনো-কোনো পাঠ হয়ে ওঠে ধারাস্নান। সেই ধারাস্নানের অভিজ্ঞতা এখনো মিলিয়ে যায়নি। দোজখনামা নিয়ে ধারাস্নানের সেই অভিজ্ঞতার কথাই আবার বলতে বসেছি।
আসলে উপন্যাস কতরকমে লেখা হতে পারে সেই কথাটি মনে করতে চেষ্টা করি। কেউ কেউ উপন্যাসের রসদ জোগাড়ে স্থান থেকে স্থানান্তরে যাত্রা করেন। সবকিছু আগেই ঠিক করে নেন। জলঙ্গীর বন্যা নিয়ে লিখবেন কি বীরভূমের কোনো এক জনগোষ্ঠী নিয়ে লিখবেন। তথ্যই সেই লেখার মূল আধার। তথ্য জানায় ভুল থেকে গেলে, সেই ভুলই উপন্যাসে চলে আসে। আর কেউ কেউ লেখেন জীবনযাপনের অভিজ্ঞতা নিয়ে। আর যাপিত জীবনে থাকে কতরকম অভিজ্ঞতা। পাঠ অভিজ্ঞতা তার ভিতরে প্রধান। প্রধান হয়ে আসে কল্পনা। রবিশংকর বলের দোজখনামা দ্বিতীয় গোত্রের উপন্যাস। তিনি কী আশ্চর্য এক কল্পনার দুয়ার খুলেছেন ক্রমান্বয়ে, এই উপন্যাসের পরিচ্ছেদে পরিচ্ছেদে। এই উপন্যাসের দুই প্রধান চরিত্র, মহাকবি গালিব এবং মহালেখক মান্টো ভারত ও পাকিস্তানের মাটির নিচে, কবরে শুয়ে আছেন। তাঁরা যেন মাতৃগর্ভের অন্ধকারে শুয়ে পরস্পরে আলাপ করেন।
দিল্লি আর লাহোরে শুয়ে গালিবের সঙ্গে কথা হয় মান্টোর। সেই কথোপকথনের ভিতর দিয়েই উপন্যাসের বিস্তার। এই আশ্চর্য কিসসা লেখা হয়। কিসসা তো এই দুনিয়ায়। এই জল মাটি আর পৃথিবীর, উপরওয়ালার। গালিব বলছেন তাঁর বান্দা কাল্লুর কথা। তখন ১৮৫৭-র বিদ্রোহ শেষ। তারপর আরো ১২ বছর বেঁচেছিলেন তিনি। কিন্তু চুপ করে থাকতেন জীবন সায়াহ্নে এসে। ভাঙাচোরা দিবানখানায় শুধু শুয়ে থাকতেন, কাল্লু এসে একটু পরোটা, কাবাব বা ভুনা গোস্ত আর দারু দিয়ে যেত। কাল্লু খুব ভালো কিসসা বলত। জামা মসজিদের চাতালে বসা দস্তানগোর পাশে বসে কিসসা শুনত। সেই কিসসা সে বলে বেড়াত। দস্তানগোদের কাজই ছিল মানুষকে কিসসা শুনিয়ে রোজগার করা। এই উপন্যাসে রবিশংকর বল হলেন দস্তানগো। এই উপন্যাস একটি দস্তান। কিসসা। সেই কিসসা কে লিখছেন এখানে? মান্টো বলছেন তিনি লিখছেন না তাঁর ভূত? মান্টো তাঁর সমস্ত জীবন একটি মানুষের সঙ্গে কথা বলতে চেয়েছেন, মির্জা মহম্মদ আসাদুল্লা খান গালিব। মান্টোর মনে হয়েছে মির্জা আর তিনি যেন মুখোমুখি দুটি আয়না। দুই আয়নার ভিতরেই শূন্যতা। দুই শূন্যতা একে অপরের দিকে তাকিয়ে বসে আছে।
কিসসায় এক কাহিনীর সঙ্গে আর এক কাহিনী জুড়ে যায়। তার কোনো শেষ নেই। এই উপন্যাস আরম্ভ হয় লখনউ-এর ওয়াজিরগঞ্জে এক কিসসা লেখক ফরিদ মিঞার মুখে মুখে। লেখক লখনউ গিয়ে ফরিদ মিঞার সঙ্গে দেখা করেন নানা সূত্রে তাঁর কথা জানতে পেরে। তিনি লখনউ গিয়েছিলেন তবায়েফদের নিয়ে একটি লেখার খোঁজে। লিখেই তাঁর দিন চলে, তিনি তো যাবেনই লেখার খোঁজে। ফরিদ মিঞা হলেন এক কিসসা লিখিয়ে। লিখতেন, কিন্তু ছেড়ে দিয়েছেন লেখা কেন না কিসসা লিখিয়েকে বড়ো একা হয়ে যেতে হয়। তার জীবন কারবালা হয়ে যায়। ছায়া ছায়া মানুষের সঙ্গে কাটাতে হয় জীবন। সেই ফরিদ মিঞা এই দস্তানের কথক বা দস্তানগোর হাতে তুলে দেয় নীল মখমলে মোড়া একটি পাণ্ডুলিপির পুঁটুলি, উর্দুতে লেখা একটি উপন্যাস, লিখে গেছেন সাদাত হাসান মান্টো। মান্টোর লেখা এই অলীক উপন্যাস মির্জা গালিবকে নিয়ে। কথক উর্দু জানেন না, কিন্তু ফরিদ মিঞা তাকে দিয়েছে পাণ্ডুলিপি অনুবাদ করে প্রকাশের জন্য। তিনি কলকাতায় ফিরে উর্দু শিখতে যান। তবসুমের কাছে। তবসুমের কাছেই জানে উপন্যাসে একটি ভূমিকা আছে মান্টোর— ১৮ জানুয়ারি, ১৯৫৫— সেই ভূমিকা লিখনের তারিখ, যে তারিখে ইন্তেকাল হয়েছিল মান্টোর। তখন তিনি লেখার অবস্থায় ছিলেন না।
রোগজর্জর হয়েই পাকিস্তানে মারা গিয়েছিলেন মান্টো। সেই উপন্যাসই বুঝি এই দোজখনামা। দোজখের কিসসা। রবিশংকর বল এই আশ্চর্য উপন্যাস লিখেছেন এক বিচিত্র আঙ্গিকে। আসলে যে কোনো আখ্যানের মূল শক্তি তার লিখন ভঙ্গি, লিখন প্রক্রিয়া, আঙ্গিক। রবি লিখবেন গালিবের জীবন বা মান্টোর জীবন। তিনি তার কথন ভঙ্গিতেই আমাকে নিয়ে গেছেন ফরিদ মিঞা বা তার চারপাশে ঘোরা ছায়া ছায়া মানুষের ভিতর। মান্টো আরম্ভ করেন আলাপ| গালিবের পূর্ব-পুরুষকে স্মরণ করেন। একটি ধুলোর ঝড়। অশ্বারোহীরা নদী পেরিয়ে আসছে সমরখন্দ থেকে। সূর্যের আলোয় ঝলসাচ্ছে তাদের ঘুরন্ত তরবারি। হত্যা আর রক্তের কারবালা পেরিয়ে তারা আসছে ভারতবর্ষের দিকে। নিজে কোনোদিন তরবারি স্পর্শ করেননি মির্জা গালিব, কিন্তু তাঁর পূর্বপুরুষ ছিল তুর্কি সৈনিক। বিভক্ত হয়ে যাওয়া দেশের পশ্চিম পাকিস্তানের শহর লাহোরের মাটির নিচে শুয়ে মান্টো এইভাবে শুরু করেন গালিবের কথা।
মান্টো পাকিস্তানে যাওয়ার আগে বোম্বে টকিজের গালিবকে নিয়ে তৈরি একটি সিনেমার চিত্রনাট্য লিখেছিলেন। সেই সিনেমা রিলিজ যখন করে, মান্টো ওপারে। গালিব এবং মান্টো দুই মহাপ্রতিভাধরের জীবন এই উপন্যাস। মান্টোর সঙ্গে আলাপে গালিব নিজের জীবনের কথা স্বপ্নের কথা, ধুলো হয়ে যেতে থাকা জীবনের কথা শোনান। মান্টোও তাই। এই দুই প্রতিভাধরের জীবনের সঙ্গে যেন এই উপমহাদেশের ইতিহাস জড়িয়ে গেছে। ১৮৫৭-র সিপাহী বিদ্রোহ, মোগল সাম্রাজ্যের পতনের শব্দ, আর ১৯৪৭-এর স্বাধীনতা, দাঙ্গা রক্তপাতে কারবালা হয়ে যাওয়া এই উপমহাদেশ, দুই সময়ের সাক্ষী দুই নিয়তিতাড়িত মানুষ।
এই উপন্যাস ইতিহাসের দুই সন্ধিক্ষণের ভিতর যেন সেতু নির্মাণ করেছে। অতীত থেকে ভবিষ্যৎকে দেখা। বর্তমান থেকে অতীতে ফিরে তাকানো। মান্টোর জীবনকথা রচনা করতে তার গল্পের আশ্রয়েও গেছেন লেখক, আর সেই যাওয়া হয়েছে তাঁর রচনার গুণে এতই নিবিড় যে মনে হয় মান্টোর জীবনে এই পরাবাস্তবতা জড়িয়ে গিয়েছিল। গিয়েছিল তো নিশ্চিত, এই দস্তানে তো ধরা আছে মান্টো আর গালিবের আত্মার ক্রন্দন। সে ক্রন্দনধ্বনিই এই আখ্যানের মূল সুর। ক্রন্দন মানবাত্মার পচনে, মানুষের ক্রমাগত নিষ্ঠুরতায়। মান্টো আর গালিব, দুই কালের দুই প্রতিভাধর সেই নিষ্ঠুরতার সাক্ষী। লেখক আমাদের ইতিহাসকে চিনিয়ে দিয়েছেন এই দস্তানগোর তীব্র দস্তানের পুটুলি খুলে। কিসসার পর কিসসা শুনিয়ে গিয়েছেন আমাদের। সেই কিসসায় এই উপমহাদেশের পরাধীনতা, এই উপমহাদেশের রক্তপ্লাবিত স্বাধীনতা। তারই ভিতরে অতিবাহিত হয়েছিল গালিব ও মান্টোর জীবন। সেই জীবনের কথা রচনা করতে গিয়ে লেখক যেমন ইতিহাসের সত্যকে খুঁজতে গিয়ে প্রবেশ করেছেন, মান্টোর জীবনের যতটা জানা যায় তারও বেশি কিছুতে। বেশিটুকু এসেছে মান্টোর কোনো কোনো গল্প থেকে।
সাহিত্যের সত্য থেকে তিনি হেঁটেছেন জীবনের সত্যে। কী অপূর্ব এই যাওয়া। রবিশংকর বল তাঁর এই উপন্যাস শুরুই করেন হারিয়ে যাওয়া, মুছে যাওয়া সময়ের দুয়ারে দাঁড়িয়ে৷ সময় থেকে সময়ান্তরে গেছেন, ফিরে এসেছেন। সে যেমন মান্টো আর গালিবে… একশো বছরের ভিতরে যাওয়া আসা, তারও পিছনে যাওয়া আবার ফিরে আসা। ক্ষয়ে যাওয়া মোগল যুগের পদশব্দ শোনা যায় এই উপন্যাসে। অভিনব হল এই দস্তানের পুঁটুলির এক একটি গিট খুলে ফেলা। দস্তান উন্মোচনের পর দস্তানগো তাঁর ঝোলা থেকে একের পর এক কাঠের পুতুল বের করে মসজিদের চত্বরে সাজিয়ে দিতে থাকে। লেখক বলেছেন, সবই যেন তার এই উপন্যাসের চরিত্র। সবকটি পুতুল ঝলমলে। ইতিহাসের ধুলোবালিতে তারা মলিন হয়ে যায়নি। মনে হয়েছে সেই ধুলো উড়িয়ে দিয়েছেন এই দস্তানের দস্তানগো। প্রথাগতভাবে উপন্যাস লেখেন না রবিশংকর। সাহিত্যের পাঠক হিসেবে তাঁর প্রথাভাঙার ভিতরে আমি যুক্তিগ্রাহ্যতা দেখতে পাই।
তাঁর উপন্যাস বাস্তবতার দাসত্ব করে না। তা পেরিয়ে তিনি পরাবাস্তবতা বলি আর কল্পনার জগৎ বলি সেখানে পৌঁছে যান। সেখানেই তিনি স্বচ্ছন্দ। এই উপন্যাসে কত অলীকদৃশ্য নির্মাণ করেছেন তিনি। ফরিদ মিঞার হাভেলি থেকে তা আরম্ভ হয়। তবসুমের ঘরে উর্দু শিক্ষা থেকে তা ঘনীভূত হয়। তারপর সমস্ত দোজখনামায় সেই অলীক দৃশ্যাবলিতে মুগ্ধ হই। উপন্যাসের অস্তিমে এসে লেখক মিঞা তানসেনের জীবনের এক ঘটনার কথা বলেন তবসুমকে। লেখক বলছেন, মির্জা ও মান্টোর জীবন যেন মিঞা তানসেনের গাওয়া দীপক রাগ। অগ্নিদগ্ধ ইতিহাসের এই দুই প্রগাঢ় পিতামহ। মিঞা তানসেনের দগ্ধ শরীর মেঘ রাগে স্নিগ্ধ করেছিল তার পুত্রী সরস্বতী ও তার স্বামী হরিদাসের শিষ্য রূপবতী। কিন্তু তারা তখন কোথায় যে গালিব ও মান্টোর অগ্নিদগ্ধ দেহকে শীতল করবে? এই দোজখের জন্য মেঘরাগ কে বাজাবে?
৩
‘দোজখনামা’র পর রবি লিখেছেন ‘আয়নাজীবন’। পারস্যের সুফী কবি মাওলানা জালালুদ্দিন রুমিকে নিয়ে এই উপন্যাস। কিন্তু রবি তো জীবন কাহিনী লিখতে যাননি। তিনি ধরতে চেয়েছেন সুফী দর্শন। আয়নাজীবন আমাদের ভাষার এক গুরুত্বপূর্ণ উপন্যাস। তা নিয়ে অন্য লেখা হবে। অন্য লেখা হবে বরিশাল জেলায় তাঁর পিতৃভূমি দেখতে গিয়ে মায়ের মৃত্যু সংবাদ পেয়ে না দেখে ফিরে আসা সেই ‘জন্মযান’ উপন্যাসটি নিয়েও। রবি বলতেন, তাঁর ভিতর থেকে অনেক কণ্ঠ কথা বলে। সেই কথাই তাঁর গল্প। রবি বলছেন—
“আর্জেন্তিনার কবি পিজারনিক—মাত্র ছত্রিশ বছর বয়সে এই মহিলা আত্মহত্যা করেন, ১৯৭২-এ—একটি কবিতায় লিখেছিলেন, ‘I can not speak with my voice, so I speak with my voices’ তো এই কণ্ঠস্বরগুলি কার—কাদের-আমার ভিতরে কারা কারা কথা বলে? তাদের গল্পই কি আমি লিখতে চাইনি? তবু বলা যাক, ‘কেন গল্প লিখতে শুরু করলাম’ এ-প্রশ্নের উত্তর আমার কাছে স্পষ্ট নয়। কেন? যদি জানতাম, তাহলে কি আর গল্প লিখতাম? হোর্হে লুইস বোরহেস শেষ সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ‘My only destiny is literary.’ একটুও বাড়িয়ে না বললে, এটাই সবচেয়ে স্পষ্ট উত্তর। লেখা একটি প্রবৃত্তিগত প্রক্রিয়া, যার মানচিত্র অস্পষ্ট।”
রবিশংকর বল একটি তরুণ নক্ষত্র। মৃত্যু হলো তাঁর। কিন্তু অনেক আলোকবর্ষ দূর থেকে আসা সেই নক্ষত্রের রোদ আমাদের ভাষা বহুদিন পাবে।