গল্প
লজ্জা

১
মলয় বাবুর এক নতুন সমস্যা হয়েছে। নতুন প্রতিবেশী এসেছে। লম্বা চওড়া বলিষ্ঠ চেহারার এক ইয়াং ছোকরা। বোসপুকুর লেনের বাসিন্দা মলয় রায়চৌধুরী– বয়স চল্লিশের কাছাকাছি। স্ত্রী ও পুত্রের সাথে বছর দশেকের উপর হল এখানে আছেন। স্ত্রী সুনন্দা একটা ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানিতে কাজ করে। সুনন্দার বয়স পঁয়ত্রিশ – রূপসী – বেশ রূপসী – যে কোনো যুবকেরই মন কেড়ে নেওয়ার মতো। দাম্পত্য জীবন খুব একটা সুখের নয় বললেই চলে – মিড লাইফের আগেই মিড লাইফ ক্রাইসিস এসে হাজির হওয়ায় অশান্তি, কলহ লেগেই থাকে প্রায়। একমাত্র তাদের ছেলের মুখ চেয়েই তাদের সমস্ত ঝগড়া ঝামেলার সমাধান হয়। মলয় হাই স্কুলের শিক্ষক। সুনন্দা অনেক সকালেই অফিস বেরিয়ে যাওয়ায় মলয়ই ছেলে সোহমকে তার স্কুলে নামিয়ে দিয়ে নিজে স্কুলে যান।
সমস্যাটির উদ্ভব হয় সকাল বেলায়। মলয় তার দৈনিক অভ্যাসবশত সকাল বেলায় এক কাপ গরম চায়ের সাথে খবরের কাগজটি নিয়ে ব্যালক্যানিতে রাখা আরামকেদারায় বেশ জুতসই করে বসেন পড়বেন বলে। সুনন্দাও আসে হাতে টাইমস অফ ইন্ডিয়া নিয়ে। সমস্যাটি হয় যখন তার সামনের ফ্ল্যাটের উড়ে এসে জুড়ে বসা নতুন ছেলেটি বেরিয়ে আসে। ছেলেটিও ঠিক একই সময় করে তার ব্যালকানিতে এসে দাঁড়ায় খালি গায়ে হাতে একটা কফি মগ নিয়ে। সিনেমার তাড়কাদের ভঙ্গিমায় দাঁড়িয়ে রেলিঙের উপর ভর দিয়ে কফি হাতে যেন কোনো গভীর চিন্তায় নিমজ্জিত হয়। সুঠাম চেহারা– বলিষ্ঠ গঠন- শরীরে মেদের চিহ্নমাত্র নেই– ঠিক যেন পথে ঘাটে যেতে নামি দামি ব্র্যান্ডের বিজ্ঞাপণে যাদের ছবি দেখা যায় তাদের মত। কফি হাতে এভাবেই দাঁড়িয়ে থাকে অনেকক্ষণ – চুমুক দেয় – কফিমগ খালি হতেই আবার ভিতরে ঢুকে যায়। মলয়ের ধারণা ছেলেটি সুনন্দাকে বিমুগ্ধ করার জন্য এভাবে প্রতিদিন বেরিয়ে আসে। তাই মলয়ের আজকাল খবরের কাগজে কম, ছেলেটির নড়াচড়ায় চোখ বোলানো বেশি হয়। আরামকেদারাতে আজকাল আরাম উধাও।
‘দেখেছো? এই তুমি পেপার পড়তে এলে, আর ওমনি ইনিও খালি গায়ে এসে হাজির হলেন নিজের ব্যালকানিতে।’ মলয় সুনন্দাকে বলে ওঠে।
‘বলতে কী চাইছ? ওর সাথে আমার কিছু চলছে?’ সুনন্দার সোজাসাপ্টা প্রশ্ন।
‘না। ও তোমাকে ওর ওই জিম করা চেহারা, ওই মাসল প্যাক দেখানোর জন্য বেরিয়ে আসে।’
‘আমি কি ভিতরে চলে যাব?’
‘না। উফ। বাপরে! কিছু বলাও বিপদ তোমায়! কোথাকার কথা কোথায় টেনে লাগিয়ে দেবে!’
‘প্রতিদিন তো সেই একই কথাই বলো।’
‘বেশ আর বলব না।’
‘প্রতিদিন ওভাবে ওর দিকে তাকিয়ে নালিশ না করে নিজেও একটু দৌড়ঝাঁপ – ব্যায়াম করতে পারো তো! নিজের চেহারার অবস্থা দেখেছো আয়নায়?’
‘দ্যাখো কিভাবে বেহায়ার মতো দাঁড়িয়ে আছে খালি গায়ে সামনে একটা মেয়ে বসে থাকা সত্ত্বেও।’
‘ও তো তাও শুধু দাঁড়িয়েই আছে চুপচাপ – তোমার তো আমি কোলে বসলেও …।’
‘হ্যাঁ – ওটাই তো তোমার সব। ওই জন্যই তোমার পেপার পড়ার সময়টাও বেড়ে গেছে আজকাল।’
‘এই গোঁয়ার তক্কগুলো তাকে তুলে ভালো করে একটু ডাক্তারটা দেখাতে পারো তো। আর ছেলেটিকে নিয়ে আমায় সন্দেহ করার মানে হয় না। আমার তো মনে হয় ছেলেটি ‘গ্যে’ – মানে হোমোসেক্সুয়াল।’
‘গ্যে?’
‘এদ্দিনে একবারও দেখলাম না তার ঘরে কোনো প্রেমিকা বা মেয়েবন্ধু অব্দি আসতে। ঘরে কোনো পার্টি হলেও শুধুই ছেলে দেখি। এতসুন্দর ইয়াং ছেলের একটিও নারীসঙ্গ থাকবে না এটা হতে পারে না। আর তাছাড়াও এখনও অব্দি একদিনও দেখলাম না ছেলেটি আমার দিকে ঠিকঠাক করে তাকিয়েছে – একপ্রকার তাকায় না বললেই চলে আমার দিকে।’
‘তুমি চাও তোমার দিকে তাকাক! আর ঠিকঠাক করে তাকায়নি মানে?’
সুনন্দা বেজার মুখ করে চুপচাপ খবরের কাগজটা গুটিয়ে চেয়ার থেকে উঠে গটগট করে ব্যালকানি ছেড়ে ভিতরে চলে যায়।
২
দরজার বাইরে আটকানো নেমপ্লেটে একটিই মাত্র নাম – তন্ময় মজুমদার। মলয় বাবু কলিং বেলটা টিপতেই দরজা খোলে ছেলেটি – গায়ে একটি ঢিলেঢালা গেঞ্জি এবং কোমর থেকে হাঁটু অব্দি ঝুলতে থাকা একটা রগচটা প্যান্ট – ছিটেফোটা রঙও লেগে তাতে কিছু।
‘তন্ময়?’
‘ওহ আপনি! হ্যাঁ আমি তন্ময়। আপনি তো. . .’
‘আমি মলয় রায়চৌধুরী। এই সন্ধ্যেবেলায় একটু হাঁটতে বেরিয়েছিলাম তাই ভাবলাম ফেরার পথে আপনার সাথে একটু পরিচয় করে নিই।’
‘হ্যাঁ আপনাকে তো প্রতিদিনই দেখি সকালে খবরের কাগজের সাথে। খুবই খুশী হলাম আপনার আসায়। ভিতরে আসুন।’
ঘরটি বেশ বড় - একা থাকার পক্ষে বেশ বড়। দুটো বেডরুম – কিচেন – বাথরুম – বেশ বড় ড্রয়িংরুম। ঘরে ঢুকতেই মলয় বাবু দেখেন দেয়াল জুড়ে সারি সারি ফ্রেমবন্দী বেশ কিছু দামি চিত্র। একদিকের দেয়াল ঘেসে একটি সোফা – একটা তৈলচিত্রের ক্যানভাস – ছবিটা সবে মাত্র আঁকা শুরু হয়েছে। সামনে একটা ছোট্ট টুল – তাতে দুটো ব্রাশ – কিছু রঙ এবং একটা রঙ মোছার ছেঁড়া কাপড়। ‘আপনি ছবি আঁকেন?’ মলয়বাবু জিজ্ঞেস করেন। ‘হ্যাঁ – ওই টুকটাক আঁকি মাঝে মাঝে। পেইন্টিং-এ আমার ভীষণ ইন্টারেস্ট।’
‘হুম। সে বুঝতেই পারছি। সাথে বোধহয় বই পড়ারও ভীষণ ভাবে অভ্যাস আছে দেখছি। তাই না?’ ডানদিকের দেওয়ালের সারিসারি বই ঠাসা বুকশেলফ দেখে মলয়বাবু জিজ্ঞেস করেন। ‘সেটাও আমার আরেক নেশা বলতে পারেন।’ বুকশেলফের কাছে গিয়ে একটার পর একটা বইয়ের নামে চোখ বোলাতে থাকেন মলয়বাবু। বেশিরভাগই ইংরেজি সাহিত্যের বই। একটার পর একটা নাম দেখতে থাকেন। হঠাৎ একটা নাম তার চোখে ধরে – ‘আ সিঙ্গেল ম্যান’ ক্রিস্টোফার আইজারউডের লেখা। মলয়বাবু বইটি শেলফ থেকে বের করেন – ‘আপনার এল.জি.বি.টিস নিয়ে লেখা পছন্দ?’
‘না সেরকম বিশেষ কিছু না। যা পাই পড়ি। ভালো লেখা হলে এমনিতেই মনে ধরে যায়। তবে এই বইটি বেশ ভালো। একা থাকার গল্প নিয়ে। আ সিঙ্গেল ম্যান।’
‘আপনি একা থাকেন?’
‘স্বেচ্ছায় নির্বাসন নিয়েছি বলতে পারেন।’ তন্ময় একটু হেসে উত্তর দেয়। ‘আমার আসল বাসা টালিগঞ্জে। এখানে একটু কাজের অবসরে একা থাকার জন্য এপার্টমেন্টটা নেওয়া।’
‘কি করেন আপনি?’
‘আমি ফ্যাশন ডিজাইনার। অবসর সময়ে লিখতে, ছবি আঁকতে ভালো লাগে বলে এখানে চলে আসা। সম্প্রতি একটা নভেল লিখছি – ইংরেজি।’
‘বাহ। এতো দারুন ব্যাপার! কি নিয়ে নভেলটা?’
‘এই ধরুন আমার মতই একটা লোকের একা থাকার গল্প নিয়ে।’
‘আপনার তো বিয়েশাদি হয়নি মনে হয়. . . প্রেমিকা? না এসব থেকেও নির্বাসন নিয়েছেন?’ মলয়বাবু বইটিকে আবার রেখে দেন যথাস্থানে। ‘সরি। কিছু মনে করবেন না। একটু বেশিই বলে ফেললাম বোধহয়।’ তন্ময় তৎক্ষনাত উত্তর না দেওয়ায় মলয়বাবু বলেন।
‘আরে না না। আমি অন্য কিছু ভাবছিলাম।’ তন্ময় বলে। ‘হ্যাঁ। এসব থেকেও নির্বাসন নিয়েছি।’ তন্ময় হাসতে হাসতে উত্তর দেয়। ‘আর এই মেয়েদের ঝামেলা বইতে পারিনা বাপু। তার থেকে এই নিজের কাজ আর বন্ধুদের নিয়েই বেশ আছি।’
‘তা যা বলেছেন মশায়। ঝামেলায় বটে। সাথেও থাকা যায়না – ছেড়েও থাকা যায়না।’ মলয় বাবু মুখ হাসি ফুটিয়ে বলে ওঠেন। ‘আমাদের তো দিনরাত ঝগড়া লেগেই থাকে।’
‘হ্যাঁ – জানলা খোলা থাকলে মাঝে মাঝে আমিও শুনতে পাই।’ তন্ময়ের কথা শেষ হতে না হতেই মলয়বাবুর ফোন বেজে ওঠে। ফোনটা বের করেই মলয়বাবু বলেন – ‘দেখছেন – নাম নিতে না নিতেই ফোন চলে এলো। ‘হ্যালো। হ্যাঁ আমি আসছি কিছুক্ষণের মধ্যে।’ ফোনটি আবার পকেটে ভরে নেন মলয়বাবু। ‘কিছু মনে করবেন না – ডাক পড়েছে – যেতে হবে।’
‘অবশ্যই . . .অবশ্যই।’ তন্ময় হেসে উত্তর দেয়। ‘আবার আসবেন। ভালো লাগলো আপনি এলেন। ভালো থাকবেন।’
ফোনটা পকেটে ঢুকিয়েই মলয় বাবু বেরিয়ে যান ঘর থেকে।
৩
সেদিনের পরিচয়ের পর থেকে মলয়বাবুর মনে যেন শান্তি ফিরে এসেছে। পরেরদিনও তন্ময় নিজের অভ্যাসমত ব্যালকানিতে এসে দাঁড়ায় – খালি গায়ে – কফি মাগ হাতে। মলয়বাবু তন্ময়কে দেখে আর বিচলত না হয়ে নিজের মত খবরের কাগজ নিয়ে বসে থাকে। যেন কোনো বোঝা নামল মাথা থেকে – সুন্দরী স্ত্রীর জন্য দুশ্চিন্তা কমল বলে কথা! সেদিনের পরিচয় থেকে মলয়বাবু বোধহয় এই সিদ্ধান্তেই এসেছেন যে তন্ময় সমকামী – হোমোসেক্সুয়াল।
‘তুমি ঠিকই বলেছিলে সুনন্দা। আমারও মনে হয় ছেলেটা সমকামী।’
‘আমি ঠিকই বলি।’
‘আমি কাল পরিচয় করতে গেছিলাম। একাই থাকে।’
‘বাব্বা. . .তুমি আবার ঘটা করে পরিচয় করতে গেছিলে?’
‘হ্যাঁ. . . দেখে এলাম একবার। বেশ শিল্পী মানুষ। ছবি আঁকে। লেখালিখি করে। পেইন্টিং এবং সাহিত্যে ভীষণ ইন্টারেস্ট। এদের মধ্যে বেশ একটা শিল্প চর্চার প্রবণতা আছে বলো? সে আমাদের বাংলার ঋতুপর্ণ ঘোষই বোলো আর ইংরেজী সাহিত্যের অস্কার ওয়াইল্ড, অডেনই বোলো – সবাই কিন্তু সমকামী। এবং এনারা কিন্তু ভীষণ খোলামেলাও ছিলেন নিজেদের সমকামীতা নিয়ে।’
‘হওয়া উচিতও, তাদের কাছে যখন ওটাই স্বাভাবিক।’
‘হুম।’ মলয় বাবু আর কথা না বাড়িয়ে আবার নিজের খবরের কাগজের পাতায় মন দিলেন। কিছুক্ষণ পর সুনন্দাও উঠে যায় অফিসের জন্য তৈরি হতে হবে বলে। সামনের ব্যালকানিতে ছেলেটি তখনো দাঁড়িয়ে আছে – একই ভাবে – যেভাবে দাঁড়িয়ে থাকে প্রতিদিন।
মলয়বাবুর আজ স্কুল থেকে ফিরতে সন্ধ্যে হয়ে গিয়েছে। তার উপর বিকেল থেকে ঝমঝমিয়ে উটকো বৃষ্টি হঠাৎই নেমে আসে। শেষমেশ বৃষ্টি না থামায় ভিজতে ভিজতেই স্কুল থেকে ফেরেন। ভেজা জামা কাপড়ে কোনোরকমে কাঁধের ব্যাগটা গুটিয়ে কলিং বেলটা টেপেন। দরজা খোলে তন্ময় – ‘ওহ আপনি! একি অবস্থা আপনার? ভিতরে আসুন, ভিতরে আসুন। আপনিতো দেখছি একদম জবজবে ভিজে বেড়াল হয়ে গেছেন মশায়।’
‘আর বলেন না। দুম করে বৃষ্টি নেমে যাবে কেই বা জানত। এসে দেখি বৌ আর ছেলে দুজনেই বেরিয়েছে। ঘরে তালা। আজকে আবার আমি চাবিটাও নিয়ে যেতে ভুলে গেছি। পোড়া কপাল। তাই আপনার এখানেই চলে এলাম এই ভিজে অবস্থায়। কিছু মনে করবেন না।’
‘আরে না – একদম ই না। আপনি দাঁড়ান আমি আপনার জন্য তোয়ালে নিয়ে আসছি।’ মলয়বাবু দাঁড়িয়ে থাকেন – একটার পর একটা জিনিস লক্ষ্য করতে থাকেন। ড্রয়িং রুমটি ঠিক আগের দিনের মতই সাজানো গোছানো – পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই একা থাকা মানুষদের ঘরদোর একটু অগোছালোই হয়। সোফার সামনে থাকা ছোট্ট কাঁচের টেবিলটায় একটা বই নামানো – উল্টে রাখা – পাশে একটা রেড ওয়াইনের গ্লাস – অর্ধেক ভর্তি। মানুষটি ভীষণ ভাব নিঃসঙ্গতাকে উপভোগ করেন। তন্ময় হাতে একটা তোয়ালে নিয়ে ফিরে আসে – সাথে একজোড়া জামা-প্যান্ট। ‘বাথরুমে চলে যান। ওখানে ছেড়ে দিন আপনার জামাকাপড়।’
‘আপনার জামাকাপড় আমার গায়ে ঢুকবে?’ মলয় হেসে বলে। ‘ঢুকিয়ে নিন একটু কষ্ট করে, কী আর করবেন।’ তন্ময় তার প্রশ্ন শুনে হেসে উত্তর দেয়। ‘আমি যাই – পশ্চিম দিকের জানলাটা দিয়ে হুহু করে জল ঢুকছে। আর পারিনা এই জানলাটা নিয়ে। আপনি ছেড়ে নিন।’ তন্ময় চলে যায় নিজের রুমে। পশ্চিম দিকের জানলার গা বেয়ে গড়িয়ে গড়িয়ে জল ঢুকছে রুমের ভিতর। তন্ময় হাতের কাছে আর কিছু না পেয়ে নিজের পরনের গেঞ্জিটাই খুলে জানলার মুখে আঁটকায়। তার উন্মুক্ত সুঠাম পেশিবহুল চেহারা রুমের ক্ষীণ আলোয় এক নতুন রঙ ধারণ করেছে।
আচমকায় দুটো হাত এসে জড়িয়ে ধরে তাকে পিছন থেকে – শক্ত করে। ‘একি! আপনি কি করছেন?’ তন্ময় হতভম্ব হয়ে উত্তর দেয়। ‘যা আপনি মনে মনে চাইছেন অথচ সজাসুজি বলতে পারছেন না।’ মলয় বাবু জড়ানো গলায় উত্তর দেন। ‘মানে? আপনি আগে আমায় ছাড়ুন।’ মলয় বাবু তার শক্ত বাহুবন্ধন মুক্ত করতেই তন্ময় ঘুরে দাঁড়ায় তার দিকে। মলয় বাবু একদিকে দৃষ্টিতে যেন কোনো শিকারির মতো জ্বলজ্বল দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকেন তন্ময়ের দিকে – তার মুখের দিকে – তার পেশিবহুল শরীরের দিকে। ‘দেখুন মলয় বাবু আপনি. . .’ কথাটা শেষ হওয়ার আগেই মলয়বাবু একটা সজোরে একটা চুমু খান তন্ময়ের ঠোঁটে। তন্ময় তাকে ধাক্কা দিয়ে দূরে সরিয়ে দেন। ‘আপনি ভুল বুঝছেন মলয় বাবু। আপনি যা ভাবছেন আমি তা নই।’ বেশ ঝাঁঝানির সুরেই বলে ওঠে কথাটা তন্ময়। ‘আমি সমকামী নই। একবারে না।’ মলয়বাবুর টনক নড়ে। পাথরের মতো শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে থাকেন চুপচাপ। এতো অপমানিত বোধহয় আগে কখনো বোধ করেননি।’
‘আপনি?. . .নন? ক্ষীণ স্বরে কথা গুলো চুইয়ে পড়ে তার ঠোঁট থেকে। ‘আপনি যে বলেছিলেন আপনি মেয়ে সঙ্গ পছন্দ করেন না। আপনার ছেলেদের সাথে থাকতেই ভালোলাগে। আপনার তাক ভর্তি সমকামী লেখার উপর বই। তাহলে. . .এই একা থাকা?’ গলা শুকিয়ে আসে।
‘সেগুলো আমার ব্যক্তিগত কারণ মলয়বাবু – মেয়ে সঙ্গ অপছন্দটাও আমার ব্যক্তিগত কারণ। আমি ডিভোর্সি। তাই আমি একা থাকি – দ্বিতীয় প্রেম বা বিয়েরও ইচ্ছে নেই কোনো। তার মানে সেদিন থেকে আপনি আমায় ভুল বুঝছেন?’ মলয় বাবু কোনো উত্তর দেন না – চুপচাপ পাথরের মত দাঁড়িয়ে থাকেন। ‘কিন্তু আপনার তো স্ত্রী আছে মলয় বাবু! ছেলে আছে! আপনি কী করে. . .?’
‘বাধ্য হয়ে – পুরোটাই নাটক। পারিনা, একটা দিনও পারিনা থাকতে। দম বন্ধ হয়ে আসে মাঝে মাঝে। ইরেক্টাইল ডিস্ফাঙ্কাশনের নাম করে বিছানাতেও দেওয়াল তুলেছি দুজনের মাঝে।’
‘কিন্তু আজকালকার দিনে এটা লুকানোর কী আছে? আপনাদের সাপোর্টের জন্য এখন তো অনেক কিছুই হচ্ছে।’
‘তাই? বলছেন?’ তাচ্ছিল্যের সুরে ভাসে তার গলায়। ‘আপনি বুঝবেন না তন্ময় বাবু। আমি রায়চৌধুরী পরিবারের ছেলে – জমিদার বংশের। সে এক দাপট ছিল বটে আমাদের পিতৃপুরুষদের। পরিবারের কাছে আমি কখনোই যোগ্য ছেলে হয়ে উঠতে পারিনি। একটু বয়স হতেই বুঝলাম যোগ্য পুরুষও হতে পারিনি – না আর পারব। বাড়ির লোককে কিছু বুঝতে দিইনি জানেন। আমার নরম স্বভাবের জন্য সবাই আমায় মেয়েলী বলত – বলত আমার মধ্যে নাকি আমার পিতৃপুরুষদের মতো পুরুষালি ব্যাপারটাই নেই. . .আমি নাকি. . .।’ মলয় বাবু থেমে যান।
‘আপনি একদম এসব কথা মাথায় আনবেন না। আপনি যেমন আছেন. . .’ তন্ময় বৃথায় তাকে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করে। সে কোনো কথা না কানে না নিয়ে আপন মনে বলে যায়, ‘একটা ভীষণ লজ্জা চেপে ধরে জানেন তো! আসলে পুরুষ হওয়ার ব্যাপারটা যে কি তা আজও বুঝতে পারলাম না তন্ময় বাবু। পুরুষের শরীরে যা আছে আমার শরীরেও তাই-ই আছে।’ মলয় বাবু জ্বলজ্বল চোখে তাকিয়ে থাকে তার দিকে। দুজনেই নিশ্চুপ। ঘরের বদ্ধ নীরবতা ভেঙে মলয় বাবুর ফোন বেজে ওঠে। ‘আসছি।’ ফোনটা ধরেই তিনি উত্তর দেন। ‘স্ত্রী ফোন করছে – যেতে হবে। আজ আসি তন্ময় বাবু। আরও একবার নতুনভাবে আপনার সাথে পরিচয় করে ভালো লাগলো। ভালো থাকবেন।’
মলয় বাবু আস্তে আস্তে ড্রয়িংরুমে রাখা ব্যাগটি কাঁধে ঝুলিয়ে নিঃশব্দে বেরিয়ে যান ঘর থেকে।