বিদেশি ব্র্যান্ড বাংলাদেশে
মন মাতানো সুগন্ধি

সুগন্ধি ছাড়া ঘরের বাইরে বের হওয়া ফ্যাশনসচেতন মানুষের কাছে অসম্ভব একটা ব্যাপার। এটি এখন শুধু ঘামের দুর্গন্ধ তাড়ানোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। নিজের ব্যক্তিত্ব প্রকাশে সুগন্ধি যেন অনেক বড় ভূমিকা পালন করে। তাই সুগন্ধির চাহিদায় যোগ হয়েছে ভিন্ন মাত্রা।
পশ্চিমা বিশ্বের ফ্যাশনের সঙ্গে সঙ্গে এর অনুষঙ্গ নিয়েও বেশ কড়া নজর রাখছেন এ দেশের ফ্যাশনসচেতনরা। সুগন্ধির প্রতি মানুষের আকর্ষণ সেই আদিকাল থেকে। বিশ্বজুড়ে সুগন্ধির আবেদন এতটাই যে পোশাক কিংবা অলংকার নয়, ভিড়ের মধ্যে নিজেকে আলাদা করে চেনাতে সৌরভময় উপস্থিতিই যথেষ্ট। আর বিশেষ উপলক্ষ হলে তো কথাই নেই।
ব্র্যান্ডেড পারফিউম এবং দরদাম
ঢাকায় বিশ্বখ্যাত ব্র্যান্ডের নামীদামি পারফিউম এখন হাতের নাগালেই পাওয়া যায়। তবে এত সব বিপণিবিতানের হরেক রকম পণ্যসম্ভারের মধ্যে আসল পারফিউম খুঁজে পাওয়া, কয়েক বছর আগেও একটু কঠিনই ছিল। ক্রেতাদের জন্য কাজটি সহজ করে দিয়েছে দেশের অন্যতম সুগন্ধি রিটেইল 'পারফিউম ওয়ার্ল্ড'।
আন্তর্জাতিক মানের প্রায় সব ব্র্যান্ডের সুগন্ধি মিলবে এখানে। মূলত বাংলাদেশে সত্যিকারের ব্র্যান্ডেড পারফিউমের ডিলার বাংলা পারফিউম ও স্টার এশিয়া নামে দুটি প্রতিষ্ঠান। তারাই এতদিন ধরে পারফিউম আমদানি করে আসছে। আপনার ব্যক্তিত্ব প্রকাশে সব ধরনের সৌরভের আসল পারফিউমের সম্ভার আছে পারফিউম ওয়ার্ল্ডে। সর্বনিম্ন এক হাজার ৮০০ থেকে শুরু করে ১৬ হাজার টাকার মধ্যেই পাবেন পছন্দসই পারফিউম।
তবে মেয়েদের জন্য আছে গুচি, ভার্সাচি, হুগো বস, এসকাডা, ক্রিড, বারবেরির মতো জনপ্রিয় ব্র্যান্ডগুলো। অন্যদিকে ছেলেরা নিতে পারেন বস, ডানহিল, ফেরারি, জিরো জিরো সেভেন, অ্যাজারো, ল্যাকোস্টের মতো ব্র্যান্ড।
ফুলেল সৌরভে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করলে হুগো বসের ফ্লোরাল কালেকশন থেকে বেছে নিতে পারেন। এই ব্র্যান্ডের বস জুওর সুগন্ধিও ফ্লোরাল ফ্লেভারের। দাম চার হাজার ১৭০ থেকে আট হাজার ২৫০ টাকা। ফ্লোরাল ফ্লেভারের অন্য সুগন্ধির ভেতরে রয়েছে গুচির এনভি মি, গিল্টি ও ইনটেন্স নামে পারফিউমগুলো।
মেয়েদের জন্য তৈরি পারফিউমগুলো পাওয়া যায় ৫০ থেকে ১০০ মিলিলিটারের বোতলে। দামের পার্থক্য নির্ভর করে পারফিউমের গুণাগুণের ভিন্নতার ওপর। অপেক্ষাকৃত লঘু বা হালকা তরলের পারফিউমকে বলা হয় ‘অ দি তোয়ালেত’। এর অর্থ ‘সুগন্ধিযুক্ত পানি’। এ ধরনের সুগন্ধির দাম অপেক্ষাকৃত কম। আর ‘অ্যাবসোলিউট পারফিউম’ সংগ্রহ করতে চাইলে দামটা একটু বেশিই পড়বে। গুচির এ দুই ধরনের পারফিউমের দাম চার হাজার থেকে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত।
তবে ফুলেল সৌরভ পছন্দ না হলে মৌসুমি ফল কিংবা চকলেটি ফ্লেভারের পারফিউমও দেখতে পারেন। এ ক্ষেত্রে এগিয়ে এসকাডা, মোশিনো, থেরি মাগলারের মতো ব্র্যান্ডগুলো। এসকাডার রয়েছে ডিজায়ার মি, অ্যাবসোলিউট মি, ইনক্রেডিবল মি নামের পারফিউম। আরো আছে চেরি ইন দি এয়ার, আইল্যান্ড কিস ও রকিং রিও। ফ্রুটি ফ্লেভারের এসব পারফিউমের দাম তিন হাজার ২০০ থেকে সাড়ে সাত হাজার টাকার মধ্যে।
ইতালির ব্র্যান্ড মোশিনোর আছে ফ্রুটি ফ্লেভারের হ্যাপি ফিজ ও চিপ অ্যান্ড শিক নামে দুটি পারফিউম। আছে ক্যান্ডি ফ্লেভারের পিংক বুকে। দাম সাড়ে তিন হাজার থেকে সাত হাজার টাকার মধ্যে।
ছেলেমেয়ে সবার জন্যই পারফিউম তৈরিতে প্রসিদ্ধ ফরাসি সুগন্ধি ব্র্যান্ড ক্রিডের দাবি, তিন নোটের নিখুঁত সংমিশ্রণে সবচেয়ে ভালো মানের পারফিউম তারাই তৈরি করে। এই ব্র্যান্ডের সুগন্ধিগুলোর দামও তাই সবচেয়ে বেশি। ফ্লোরাল ফ্লেভারের ‘লাভ ইন হোয়াইট’ ও ‘লাভ ইন ব্ল্যাক’-এর মতো পারফিউমগুলো পাওয়া যাবে ১৬ হাজার টাকায়।
এ সময়ে ফরাসিদের মধ্যে অন্যতম খ্যাতিমান পারফিউমার হলেন থিয়েরি মাগলার। তাঁর ব্র্যান্ডের সুগন্ধিগুলোতেও তিন নোটের সুষম সংমিশ্রণ পাওয়া যায়। এই ব্র্যান্ডের সুগন্ধিগুলোর আরকটি বিশেষত্ব এর বোতলের নকশা। কেবল স্বতন্ত্র ও নান্দনিক নকশার কারণেই অনেকে এই ব্র্যান্ডের পারফিউম সংগ্রহ করে থাকেন। চকলেটি, ক্যান্ডি, স্পাইসি—নানা রকম সৌরভের এই ব্র্যান্ডের পারফিউমের দাম পাঁচ হাজার থেকে ১২ হাজার টাকার মধ্যে।
শুরুতে একটু ঝাঁজালো গন্ধ, অথচ কয়েক মুহূর্ত পরই অন্য এক সুবাসের মাদকতা—এমন সৌরভকেই বলে স্পাইসি ফ্লেভার। ছেলেদের মধ্যে এমন সৌরভের জনপ্রিয়তা বেশি। এ ক্ষেত্রে এগিয়ে অ্যাজারো, ডিএসকোয়ার্ডটুর মতো ব্র্যান্ডগুলো। কানাডীয় ব্র্যান্ড ডিএসকোয়ার্ডটুর বিশেষ পারফিউমগুলোর মধ্যে রয়েছে ‘উড’ কালেকশনটি।
নামের মতোই এই পারফিউমের সুবাস কাঠের মতো। শুরুতে ঝাঁজালো এক গন্ধের পর কাঠের হালকা সৌরভের আবেশ ছড়ায় এই পারফিউম। ছেলেদের মধ্যে জনপ্রিয় ওশেন ওয়েট উড, রকি মাউন্টেইন উড, সিলভার উইন্ড উড নামে পারফিউমগুলো।
মেয়েদের জন্য আছে ক্রিস্টাল ক্রিক উড, গোল্ডেন লাইট উড, ভেলভেট ফরেস্ট উড নামে পারফিউম। দাম পড়বে সাড়ে পাঁচ হাজার থেকে সাত হাজার ৬০০ টাকার মধ্যে। ছেলেদের জন্য স্পাইসি ফ্লেভারের ল্যাকোস্টে ব্র্যান্ডেরও গাঢ় সুবাসের সুগন্ধি আছে। ব্ল্যাঙ্ক পিওর, ব্লু-পাওয়ারফুল ইনটেন্স, ভার্ট-রিল্যাক্সড, এনার্জেটিক টিজার—এই নামের পারফিউমগুলো পাওয়া যাবে পাঁচ হাজার ১০০ থেকে সাড়ে পাঁচ হাজার টাকার মধ্যে।
কোথায় পাবেন
ঢাকায় পারফিউম ওয়ার্ল্ডের শোরুম আছে—পান্থপথের বসুন্ধরা সিটি শপিংমল, ধানমণ্ডির প্লাজা এ আর, বনানী ১১ নম্বরের চাঁদনীওয়ালা ম্যানশন, উত্তরার পলওয়েল কার্নেশন এবং যমুনা ফিউচার পার্কে। গুলশানবাসীর জন্য সুগন্ধির পসরা সাজানো আছে রেইনবো পারফিউম ওয়ার্ল্ড নামে আরেকটি দোকান। পিংক সিটি মার্কেটের এই দোকানে পরিচিত ব্র্যান্ডগুলোর পাশাপাশি পাওয়া যাবে বুলগারি, লানভিন, নিনা রিচি, গিভেশি, পাকো রাবান, লোলিটা লিমপেকা, ক্যারোলিনা হেরেইরা, পল স্মিথ-এর মতো ব্র্যান্ডের আসল পারফিউম।
এ ছাড়া বড় বড় লাইফস্টাইল শোরুমেও পাওয়া যাবে আসল পারফিউম। স্টার এশিয়া তাদের নিজস্ব আমদানীকৃত পারফিউমের সম্ভার সরবরাহ করে এসব দোকানে। এই শোরুমগুলোর মধ্যে রয়েছে—গুলশান-১-এর ডায়মন্ড, জারা ফ্যাশন মল, নেহা ফ্যাশন, গুলশান-২-এর ইউনিমার্ট, বিউটিশপ, আর্টিস্টি, ঢাকা রিপাবলিক, বেইলি রোডের স্টারডাস্ট, আমেজিং ডিসকাউন্ট, ফ্যাশন হাউস এক্সটেসির উত্তরা ও বসুন্ধরা সিটি আর যমুনা ফিউচার পার্কের শোরুমেও বিক্রি করা হয় পারফিউম।
ধানমণ্ডি ২৭-এর ট্রেন্ডজ আউটলেটেও পাওয়া যাবে পারফিউমের বিশাল সমাহার। এ ছাড়া বন্দরনগরী চট্টগ্রামে রয়েছে দুটি শোরুম—জিইসি মোড়ের ইউনেস্কো সিটি সেন্টার আর পাঁচলাইশের আফমি প্লাজায়। আর সিলেটের একমাত্র শোরুম জিন্দাবাজারের আলহামরা শপিংমলে।
কিছু পরামর্শ
আসল পারফিউম চেনার উপায় : প্রথমবার স্প্রে করার পর গন্ধটা যদি ১৫ ঘণ্টার বেশি টিকে যায়, তাহলেই বুঝবেন সেটা আসল সুগন্ধি। আর যদি না টেকে, তাহলে বুঝতে হবে আপনি ঠকেছেন।
সুগন্ধির মেয়াদ : অন্য সবকিছুর মতো পারফিউমেরও রয়েছে নির্দিষ্ট মেয়াদ। কেনার আগে মেয়াদোত্তীর্ণ কি না, সেটা বোঝার সবচেয়ে ভালো উপায় স্প্রে করার পর অ্যালকোহলের গন্ধ কতক্ষণ থাকে, সেটা দেখে নেওয়া। পারফিউম স্প্রে করার পরপর আগে পাওয়া যায় অ্যালকোহল সলভেন্টের গন্ধ। ১০-১৫ সেকেন্ড পরও যদি সেটা থেকে যায়, তাহলে বুঝতে হবে পারফিউমের মেয়াদ শেষ। কারণ, পারফিউমের আসল সৌরভ বের হয় ১০-১৫ সেকেন্ডের মধ্যেই।
পারফিউম সংরক্ষণ : অনেক দাম দিয়ে পারফিউম কিনলেন, তবে কিছুদিন পরেই কার্যকারিতা হারিয়ে ফেলল সেই সুগন্ধি। এমনটা হলে পানিতেই যাবে কষ্টের টাকা। পারফিউম সঠিকভাবে সংরক্ষণের নিয়ম হলো, কেনার পর একে রাখতে হয় শীতল স্থানে। সূর্যের আলো যাওয়া-আসা করে, এমন জায়গায় পারফিউম রাখা মানা। তাহলে কিছুদিনের মধ্যেই কর্পূরের মতো উড়ে যাবে আপনার প্রিয় সুগন্ধির সুবাস।
কোন মৌসুমে কোন সুগন্ধি : বাংলাদেশের আবহাওয়ার কারণে মৌসুম বুঝেই বেছে নিতে পারেন সুগন্ধির ধরন। গরমের মৌসুমে চিটচিটে আবহাওয়ায় বেশি টিকবে গাঢ় পারফিউমগুলো। অন্যদিকে শীতকালে হালকা সুবাসের সুগন্ধিই টিকে থাকবে অনেকক্ষণ।