তুরস্কের শান্তি সমাবেশে পশ্চিমাদের ভূমিকা কী?

বিপ্লবী রাজনীতিবিদ ও আধুনিক তুর্কি প্রজাতন্ত্রের প্রতিষ্ঠাতা মোস্তফা কামাল আতাতুর্কের তুরস্ক আজকের দিনে পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদীদের নাটকের রঙ্গমঞ্চ হয়ে উঠছে। এরই মাঝে ঘটছে বিপর্যয় ও জীবনবিনাশী ট্র্যাজেডি। সর্বশেষ শনিবার তুরস্কের রাজধানী আঙ্কারার প্রধান রেলস্টেশনের কাছে ‘শান্তি ও গণতন্ত্র’ স্লোগানকে সামনে রেখে কুর্দিপন্থী লেবার ইউনিয়ন, বামপন্থী গ্রুপ, এনজিও, কুর্দিশ পিপলস ডেমোক্রেটিক পার্টি (এইচডিপি) এবং শ্রমিক ও সুশীলসমাজ আহূত শান্তি সমাবেশে ন্যক্কারজনক আত্মঘাতী বোমা হামলায় মারা গেলেন প্রায় ১০০ মানুষ। জখম হলেন আরো বহু লোক। স্বাধীন জাতিরাষ্ট্রকামী কুর্দি বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠী কুর্দিস্তান ওয়ার্কার্স পার্টির (পিকেকে) সঙ্গে সরকারের চলমান সহিংসতার অবসান চেয়ে ওই শান্তি সমাবেশটির ডাক দেওয়া হয়েছিল বলে জানা যায়। ঘটনার দুদিন পর এই হামলার প্রতিবাদে কয়েক হাজার মানুষ রাস্তায় নেমে প্রতিবাদ জানিয়েছে। এ সময় খুনি সরকারের পদত্যাগ দাবি করে স্লোগানও দেয় তারা। অন্যদিকে এই ঘটনায় কেউ দায় স্বীকার না করলেও প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান ও প্রধানমন্ত্রী আহমেত দেভুতোগলু আঙুল তুলেছেন ইসলামিক স্টেট অব ইরাক অ্যান্ড লিভান্ট (আইএসআইএল) ও কুর্দিশ পিকেকে পার্টির দিকেই।
শান্তি সমাবেশে অংশ নেওয়া কুর্দিপন্থী এইচডিপি পার্টির ট্যুইটে বহু লোক হতাহত হওয়ার কথা বলা হয়েছে। এ ছাড়া আহত লোকদের সরিয়ে নেওয়ার সময় পুলিশ লোকজনের ওপর ‘হামলা’ চালিয়েছে বলে অভিযোগ করেছে দলটি। কুর্দিরা বহুদিন ধরেই নিজস্ব রাষ্ট্রের জন্য সংগ্রাম করছেন। এই সম্প্রদায়ের মানুষজন তুরস্ক, সিরিয়া, ইরান ও ইরাকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছেন। তুরস্কের পূর্বাঞ্চল ও আশপাশের সীমান্ত অঞ্চলে পরস্পরের আক্রমণে হাজার হাজার তুর্কি সেনা, পিকেকে যোদ্ধা ও অসংখ্য বেসামরিক লোকজন মারা গেছে। অনেক দেশ মার্কস ও লেনিনপন্থী শ্রমিক দলটিকে সন্ত্রাসী সংগঠন বলে গণ্য করে আসছে। পিকেকে নেতা আবদুল্লাহ ও্যচলান বহু বছর ধরে তুরস্কের কারাগারে বন্দি। এর ফলে কুর্দিদের কাছে সংগঠনটির জনপ্রিয়তা আরো বৃদ্ধি পেয়েছে। সময় বদলেছে। পিকেকে নেতা আবদুল্লাহ দুই বছর আগে সহিংসতা বর্জনের আহ্বান জানিয়ে তুরস্কের সঙ্গে অস্ত্রবিরতি চুক্তিও সম্পাদন করেছে। এখন স্বাধীনতার বদলে স্বায়ত্তশাসনের কথা বলে যাচ্ছেন আবদুল্লাহ। বলা হতো পিকেকে ও তুরস্কের শত্রু একটাই-আইএসের সন্ত্রাসীরা। এমনকি পিকেকের যোদ্ধারা এই সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে বেশ কিছু সাফল্য দেখাতে পেরেছিলেন। কিন্তু শনিবারের শান্তি সমাবেশে সন্ত্রাসী হামলার পর খোদ তুরস্ক সরকার আইএস এবং আবদুল্লাহ ও্যচলানের পিকেকে পার্টিকে দায়ী করে মিডিয়ায় বক্তব্য দিয়েছেন। ঘটনার সূত্র খুঁজে পাওয়া যায় এখান থেকেই।
ব্রিটেন ইসরাইলের লাভ চাইল্ড আইএস প্রকৃতার্থে তুরস্ক তথা এরদোয়ানদেরই বন্ধু, পুতিন তা দিবালোকের মতো স্পষ্ট করেছেন। কুর্দিদের সঙ্গে সরকারের দমন-পীড়নের প্রতিবাদে যে শান্তি সম্মেলন, সেখানে আর যাই হোক কুর্দিরা নিজেরাই বোমা হামলা করে প্রাণক্ষয়ের ঝুঁকি নিতে যাবে এমন যুক্তি ধোপে টিকবার নয়। তুরস্কের প্রতিষ্ঠাতা কামাল আতাতুর্ক নিজের দেশকে আধুনিক ও ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রে পরিণত করেছিলেন। কিন্তু বর্তমান শাসক এরদোয়ান পশ্চিমাদের নসিহত মেনে নিজের দেশে গণতন্ত্রের সঙ্গে ইসলাম ধর্মকে গুলিয়ে ফেলে স্বাধিকার আন্দোলনকারী মার্কস ও লেনিনবাদী বামপন্থী জাতীয়তাবাদী কুর্দিদের ওপর সহিংসতা ও নিপীড়ন চালিয়ে যাচ্ছে। ইরানের মতো ধর্মাশ্রয়ী রাষ্ট্র না হয়ে তুরস্ক হয়ে উঠেছে ইসরায়েল বা সৌদি আরবের মতো মৌলবাদী রাষ্ট্র। আর এসব রাষ্ট্রের নিজেদের বাঁচবার তাগিদেই পশ্চিমাদের পদতলেই দিনরাত মাথা ঠুকতে হয়। যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্র কিনে বিশ্বে একনম্বর অস্ত্র ক্রেতা হয়ে উঠতে হয়। এসবই ভূ-রাজনীতির কুৎসিত খেলা। কারণ মধ্যপ্রাচ্যের তৈলভাণ্ডার ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের চলবে কেন? যে কারণে স্রেফ যুদ্ধাবস্থা জিইয়ে রাখতেই সৃষ্টি করতে হয় তালেবান বা আইএস নামের ধর্মীয় মৌলবাদী উগ্র গোষ্ঠী। ইরাক, সিরিয়া বা তুরস্কের আজকের সংকট এসবেরই ধারাবাহিকতা মাত্র। কাসপিয়ান সাগর থেকে সিরিয়ার আইএস দখলীকৃত এলাকায় রাশিয়ান হামলার প্রতিবাদে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষামন্ত্রী অ্যাশটন কার্টার বলেছেন, সিরিয়ায় সামরিক হস্তক্ষেপের জন্য মস্কোকে শিগগিরই মূল্য দেওয়া শুরু করতে হবে। ওই অঞ্চলের দেশগুলোকে না জানিয়ে রাশিয়া সিরিয়ায় ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে। তারা তুরস্কের আকাশসীমা লঙ্ঘন করেছে। তারা কোনো সতর্কবার্তা না দিয়েই কাসপিয়ান সাগর থেকে ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করছে।
মজাটা হলো, গেল দুই বছরের অধিককাল ধরে মানবতার চরম শত্রু আইএসের বিরুদ্ধে নাকি যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু বর্তমানে পুতিনের বিমান হামলায় রাশিয়ার বাহিনীর সঙ্গে নিজেদের বাহিনীর সমন্বয় করতে যুক্তরাষ্ট্র অস্বীকৃতি জানিয়েছে। তারা বলছে, সিরিয়ায় আইএসের বিরুদ্ধে যুদ্ধরত বিদ্রোহী সংগঠনকে লক্ষ্য করে রাশিয়া যদি হামলা চালায়, তবে তারা আইএসকে শক্তিশালী করবে এবং এতে রাশিয়ার যেমন স্বার্থ রক্ষা হবে না, যুক্তরাষ্ট্রেরও না। বোঝাই যাচ্ছে, আইএস বিষয়ে পশ্চিমাদের বেকায়দায় ফেলে দিয়েছেন পুতিন। এতে যুক্তরাষ্ট্র, তুরস্ক ও ন্যাটোর সঙ্গে যে রাশিয়ার এক প্রকারের ছায়াযুদ্ধ চলছে, তা সহজেই অনুমেয়। এই ছায়াযুদ্ধে হয় তো ভ্লাদিমির পুতিনের রয়েছে নিজের দেশের জনগণ ও পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদবিরোধীদের অকুণ্ঠ সমর্থন।
সমর্থন থাকতেই পারে। সেই সমর্থন নিয়েই এবারের জাতিসংঘ সাধারণ অধিবেশনে পুতিন জোর গলায় বলতে পেরেছেন, আইএস আসলে পশ্চিমা স্বার্থবাদীদের ঘাতক পুতুল। এমনকি হুমকি পর্যন্ত দিয়েছেন, টুইন টাওয়ার ধ্বংসের ‘আসল’ স্যাটেলাইট ভিডিও দেখিয়ে সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধের জারিজুরি ফাঁস করে দেবেন তিনি। এতে পেন্টাগনের জেনারেল, ন্যাটোর যুদ্ধবাজ লিডার কিংবা মার্কিন ওবামা বা ব্রিটিশ গর্ডন ব্রাউনদের মধ্যপ্রাচ্য দখলের স্বপ্নসৌধ ভাঙার আশঙ্কাই এখন প্রকট হয়ে দেখা দিয়েছে। তুরস্কের হবু সুলতানের ওসমানিয়া সাম্রাজ্য পুনঃপ্রতিষ্ঠার খোয়াব যেমন খতম হতে চলেছে, পাশাপাশি সৌদি আরব বা ইসরাইলের মনোবাসনাও তিরোহিত হতে চলেছে। আইএসের বিনাশ নিয়ে রাশিয়া যে বাজিটা ধরেছে, এই বাজিতে জিতলে চীন বা ইরানের সঙ্গে বিশ্বের প্রগতিশীল, মানবতাবাদী ও সত্যিকারের ইসলামী চেতনাধারী মানুষ পুতিনের পক্ষেই থাকবেন, এ কথা বলা যায়। কিন্তু তার আগেই মধ্যপ্রাচ্যের তেলভাণ্ডারের স্বপ্নবিলাসী এবং স্বাধীন সীমান্ত বিধ্বংসী নতুন মধ্যপ্রাচ্যের সাম্রাজ্যবাদী কারিগর যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন, ফ্রান্স, ইসরাইল ও তাদের বশংবদ সৌদি আরব বা তুরস্কে শুরু হয়ে গেছে শোকের ঘনঘটা। আর সেই শোক স্তব্ধতায় এদের প্রকৃত বন্ধু আইএস কিছু জীবনবাদী মানুষের প্রাণ হরণ করে রক্তের হোলি খেলায় মেতে দুঃসময় ভুলতে চাইবে না, তা কি হয়?
রাশিয়ান বিমান হামলার সুযোগে কুর্দি ওয়ার্কার্স পার্টি (পিকেকে) সিরীয় শাখা নিজেদের এলাকায় মুক্তাঞ্চল গড়ে নিয়েছে। ঠিক এই সময়ে তুরস্কের ভেতরে পিকেকে সরকারের নাকের ডগায় শান্তি সমাবেশ করবে তা কি হতে পারে? তাই বোমা খেয়ে রক্তের বন্যায় ভেসে যাও কুর্দিরা। যে বোমার নাড়ি এরদোয়ানের বন্ধু যুক্তরাষ্ট্রের পেন্টাগনের আঁতুড়ঘরেই পোতা। তবে একজন বৈশ্বিক মানুষ হিসেবে পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাওয়া এই সময়ের মধ্যপ্রাচ্যের শোকবিহ্বলতায় আমাদের সর্বাত্মক সমবেদনা থাকুক নিরন্তর। ‘কাটা দিয়ে কাটা তোলার’ নীতিতে পুতিনের রক্তচক্ষুকে ভয় পেয়ে পশ্চিমারা যদি আদৌ সংযত হয়, তবে শান্তিপ্রিয় মানুষের জয় হবেই এ আশাবাদ করা যায়। আর সেই শান্তির সুকঠিন সংগ্রামে বীর হিসেবেই পূজিত হবেন ‘পেশমারগার’ বা মৃত্যুর মুখোমুখি মানুষরা।
লেখক : গাজীপুর প্রতিনিধি, মাছরাঙা টেলিভিশন।