মুভি রিভিউ
প্রেম, প্রতিশোধ, পাল্টা আঘাতে কতটা সফল ‘বরবাদ?’

শাকিব খানের সিনেমা আবার দেখা যায় না কি? তার সিনেমা নিয়ে কিছু লেখাও যায়? বছর কয়েক আগেও বোধহয় এমন ভাবনা ছিল অধিকাংশ সিনেপ্রেমীর মনে। শাকিব অভিনয় করেন, সিনেমা মুক্তি পায়, নির্দিষ্ট শ্রেণির মানুষ দেখে—এমনটিই ছিল ধারণা। তুফান দিয়ে সেই ধারণাকে উড়িয়ে দিয়েছেন শাকিব খান। বরবাদে করেছেন মুগ্ধ। বাংলা চলচ্চিত্রকে লম্বা সময় একা টেনে নেওয়া শাকিব আগের চেয়ে ভীষণ পরিণত হয়েছেন। কেবল হিরো থেকে হয়ে উঠেছেন অভিনেতা। যার সিনেমা দেখতে এখন এলিট থেকে আমজনতা, সবাই হলমুখী হচ্ছে।
ঈদে শাকিবের ছবি ছাড়া ঠিক জমে না, কথাটা জোর গলায় বলাই যায়। বলা যায়, নিজেকে ভেঙেচুরে অভিনয়টা করতে শিখেছেন তিনি। ঈদুল ফিতর ২০২৫-এ মুক্তি পেয়েছে ‘বরবাদ।’ ঈদের ছবিতে দর্শক যা চায়, তার প্রায় সব উপাদানই আছে বরবাদে। বাংলা সিনেমার মানদণ্ডে এত বড় মাপের ও গোছানো ছবি খুব বেশি আসেনি, এটি বললে বাড়াবাড়ি হবে না মোটেও।
বিনোদনের অন্যতম মাধ্যম সিনেমা। ঈদ এলে যার চাহিদা বাড়ে বহুগুণ। টিজার দিয়ে মাত করা বরবাদ ছক্কা মেরেছে ফাইনাল ওভারে। গল্পটা প্রেমের, প্রতিশোধের, পাল্টা প্রতিশোধের। ফ্রেম ধরে ধরে গল্পকে গেঁথেছেন নির্মাতা মেহেদী হাসান হৃদয়। দেখে বোঝার উপায় নেই, এটি তার পরিচালিত প্রথম ছবি।
গল্প নির্ভর সিনেমার মূল হিরো থাকে গল্পটাই। বরবাদ এখানে অনেকটা সফল। নিখাদ বিনোদন খুঁজতে গেলে আবার প্রায় শব্দটা বাদ দিয়ে শতভাগ সফল বলতে হবে। গল্পের হাল ধরতে প্রয়োজন দক্ষ মাঝি। শাকিব সেই কাজটি করেছেন। গোটা সিনেমায় একবারের জন্য দর্শক বলার সুযোগ পায়নি, তিনি ব্যর্থ হয়েছেন। হিরো কিংবা অ্যান্টি-হিরো, দুই ভূমিকাতেই ছিলেন অনবদ্য। সবচেয়ে ইতিবাচক দিক, কথা বলেছে তার চোখও। একজন অভিনেতার চোখ তার বড় শক্তির জায়গায়। এতদিন এই জায়গাতে শাকিবকে নিয়ে আক্ষেপ থাকলেও বরবাদে তা পুষিয়ে দিয়েছেন।
ওপার বাংলার নায়িকা ইধিকা পাল কেবলই শো-পিস হয়ে থাকেননি। সিনেমার ট্রেলারে যেমন দেখা গিয়েছিল, নিতুকে (ছবিতে ইধিকার চরিত্র) না পেলে সব বরবাদ করে দিতে পারেন হিরো, আবার নিতুর হত্যাকারীও তিনিই। দেখে মনে হবে, গোটা গল্পই বুঝি জানা হয়ে গেল! আদতে তা নয়। ছবির প্রথম ভাগের শেষটায় ইধিকা অল্প সময়ে যা করে দেখান, দর্শকের প্রত্যাশা ওঠে তুঙ্গে। থিয়েটার ভর্তি দর্শক তখন বিস্ময়ে হা করবে না শিস দেবে, খানিক দোটানায় পড়তেই হয় তাদের।
বরবাদের কাজ বেশ যত্ন নিয়ে করা হয়েছে, সেটি বোঝা যায় সিনেমা শুরুর কয়েক সেকেণ্ডের মধ্যে। দর্শক এ-ও বুঝবেন, রোলার কোস্টার রাইড অপেক্ষা করছে সামনের দু’ঘণ্টা। পুরোদস্তর বাণিজ্যিক ধারার চলচ্চিত্রে রাখতে হয় মশলা। বরবাদে তা উপচে পড়েছে। প্রতিটি সংলাপ প্রাসঙ্গিক। গানগুলো পরিস্থিতির দাবি মিটিয়েছে। ক্যামেরার কাজ, কস্টিউম ডিজাইন, ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক, কোরিওগ্রাফি, মেকআপ—চোখ ও কানের আরাম দেবে সিনেপ্রেমীদের।
তাই বলে বরবাদে উন্নতির জায়গা ছিল না? ছিল। যিশু সেনগুপ্তকে যতটা ভয়ানকভাবে দেখানো হয়েছে, প্রত্যাশা ছিল নায়কের মুখোমুখি হলে দারুণ কিছু হবে। সেই জায়গাতে হতাশ হতে হয়েছে দর্শককে। অতিথি চরিত্রে আসা ফজলুর রহমান বাবুকে আরেকটু সুযোগ দেওয়া যেত। দ্বিতীয় হাফে অবশ্য গল্প যেদিকে মোড় নিয়েছে, তাতে পরিচালক ছাড় পেতে পারেন। অন্যদিকে, মিশা সওদাগরকে এমন চরিত্রে দেখতে পাওয়াটা তার নামের প্রতি সুবিচার। এখানেও বাহবা পাবেন পরিচালক।
সহজ কথায়, বরবাদের মতো মূলধারার বাণিজ্যিক সিনেমাগুলো চেষ্টা করছে দর্শককে ভিন্নতার স্বাদ দিতে। সাধুবাদ জানানো প্রয়োজন। প্রেম, দ্রোহ, কাম, প্রতিশোধ আর ভরপুর অ্যাকশন—সাহসী এক কাজের ট্রেডমার্ক হয়ে থাকবে বরবাদ। এমন সিনেমা দর্শক কম দেখেনি, তবে পরিবেশনের ধরণ বাংলা সিনেমায় নতুন।