Beta

সন্ত্রাসী হামলা

জীবনদায়ী পঞ্চাশ গজ

১৬ মার্চ ২০১৯, ১৫:৩০ | আপডেট: ১৬ মার্চ ২০১৯, ১৬:০৭

নিউজিল্যান্ডে বাইশ গজে বহুবার বিপদে পড়েছেন বাংলাদেশের ক্রিকেটাররা। কখনো উদ্ধার হয়েছেন। কখনো হতে পারেননি। কিন্তু সেই নিউজিল্যান্ডে এবার বিপন্ন 'পঞ্চাশ গজে' চরম বিপদে পড়েছিলেন বাংলাদেশের ক্রিকেটাররা। তাঁরা উদ্ধার হলেন। আসলে বলতে হবে তাঁদের উদ্ধার করা হলো। কে করলেন? আপাত উত্তর, এক ভদ্রমহিলা। কিন্তু আসলে এর বহুমাত্রিক একটা ব্যাখ্যা খুঁজতেই হচ্ছে। আর সেটা খুঁজতে গিয়ে প্রকৃতির কথা বলতে হতে পারে। উপরওয়ালার কথা বলতে হতে পারে। উঠে আসতে পারে সাংবাদিকদের কথাও।

ক্রাইস্টচার্চে  আজ শুরু হওয়ার কথা ছিল নিউজিল্যান্ড-বাংলাদেশ সিরিজের তৃতীয় এবং শেষ টেস্ট। কিন্তু ক্রিকেট বিশ্ব থেকে শুরু করে গোটা বিশ্বে আজ সেই টেস্ট মৃত। তবে একটা টেস্টের অপমৃত্যুর খবরের চেয়ে বড় খবর ক্রাইস্টচার্চে দুটো মসজিদে সন্ত্রাসী হামলা আর অর্ধশত মানুষের মৃত্যুর খবর। বিশ্বজুড়ে গণমাধ্যম থেকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সেই হামলার খবর। রক্তাক্ত ক্রাইস্টচার্চ আর বিপন্ন মানুষের খবর। আসলে খবরটা কিছু মানুষের মৃত্যু আর আহত হওয়ার খবর সেটা নয়। সেই খবর আসলে বিপন্ন মানবতা এবং হিংসা বিদ্বেষের কালো থাবায় আক্রান্ত সভ্যতার খবর!

সন্ত্রাস আজ বিশ্বের খুব বড় এক সমস্যা হয়ে ছুঁটছে এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে। সেই সন্ত্রাস ধর্মের নামে। বর্ণের নামে। তবে সন্ত্রাসের কোনো ধর্ম নেই। সন্ত্রাসের কোনো বর্ণ নেই। তার কোনো ভৌগোলিক সীমারেখাও নেই। গোটা বিশ্বে আজ সেটা প্রমাণিত এক সত্য। উগ্রবাদ কখনো ধর্মের নামে, কখনো বর্ণের নামে মানবতা আর সভ্যতাকে বিপদগ্রস্ত করছে। বিপন্ন করছে মানুষকে। আর যারা করছেন তাদের ধর্মের পরিচয় যাই হোক, তারা সন্ত্রাসী। এটাই তাদের বড় পরিচয়। সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে গোটা বিশ্ব এক হয়ে রুখে দাঁড়াতে পারা যায়নি বলেই আজ নিউজিল্যান্ডের মতো শান্তির জায়গায় অশান্তির আগুন।

ক্রাইস্টাচার্চের মসজিদ ভিজে গেল সন্ত্রাসী হামলার রক্তে। তিনি বা তারা শ্বেতাঙ্গ নাকি অশ্বেতাঙ্গ, খ্রিস্টান নাকি হিন্দু নাকি মুসলিম নাকি বৌদ্ধ সেটা তাদের পরিচয় নয়। তারা সন্ত্রাসী। মসজিদে প্রার্থনারত মানুষের প্রাণ কেড়ে নেওয়া ওরা সন্ত্রাসী।

সেই সন্ত্রাস কবলিত মসজিদে নামাজ পড়তে যাওয়ার কথা ছিল বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের। বৃষ্টির কারণে বাংলাদেশ অধিনায়কও এসেছিলেন একটু দেরি করে। আর সাংবাদিকরা একটু বেশি প্রশ্ন করে সেই সংবাদ সম্মেলনকে আরো একটু প্রলম্বিত করেছিলেন। দেরি করে মসজিদের দিকে রওনা হয়েছিলেন বাংলাদেশ ক্রিকেটাররা। তবে মসজিদের কাছে পৌঁছেও গিয়েছিলেন তাঁরা।  মসজিদ থেকে পঞ্চাশ গজ দূরে যখন বাংলাদেশের টিম বাস তখন এক নারীর চিৎকারে থেমে যায় বাংলাদেশ। ‌'ওদিকে যেও না। সন্ত্রাসীরা মসজিদ হামলা চালিয়ে মানুষ মারছে।' তারপর যা দেখেছেন বাংলাদেশ ক্রিকেটাররা, তাতো সিনেমাকেও হার মানায়। ‌স্বয়ং উপরওয়ালই হয়তো এই নারীকে ওদিকে পাঠিয়েছিলেন। তা না হলে! ভাবতেই রক্তহিম হয়ে যায় বাংলাদেশের আঠারো কোটি মানুষের।

নিউজিল্যান্ডে এই মর্মান্তিক হামলার ঘটনায় নিন্দা জানানোর ভাষা জানা নেই! সেটাই স্বাভাবিক। আর যদি ক্রিকেটাররা ওখানে থাকতেন তাহলে গোটা বাংলাদেশের হৃৎপিণ্ডই থমকে যেত। কিন্তু যারা মারা গেছেন, যারা আহত হয়েছেন, তাদের মধ্যে প্রবাসী বাঙালিরাও আছেন। তাঁদের মর্মান্তিক মৃত্যু আর আহতদের আর্তনাদে শোকস্তব্ধ বাংলাদেশসহ গোটা বিশ্ব। নিন্দার ঝড় বইছে বিশ্বজুড়ে। নিউজিল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী নিজে এই হামলাকে বলেছেন, নিউজিল্যান্ড ইতিহাসের 'অন্ধকারাচ্ছন্ন' একটি দিন হিসেবে। ক্রিকেট বিশ্বে বইছে নিন্দার ঝড়। গোটা ক্রিকেট বিশ্ব শোকস্তব্ধ অবস্থায় সহমর্মিতা জানাচ্ছে।

হয়তো আর কয়েক ঘণ্টা পরই নিরাপদে দেশে ফিরবেন বাংলাদেশ ক্রিকেট টিমও। কিন্তু সেই হামলার মানসিক অভিঘাত সামলাবে কীভাবে তারা? ২০০৮ সালে লাহোরে শ্রীলঙ্কা টিমের বাসে সন্ত্রাসী হামলার শিকার হয়েছিলেন যারা সেই কুমার সাঙ্গকারাদেরও সময় লেগেছিল সেই ধাক্কা কাটিয়ে উঠতে। বাংলাদেশ ক্রিকেটারদেরও সময় লাগবে ভয়ঙ্কর সেই সময়ের দুঃস্বপ্ন ভুলে যেতে।

কিন্তু বাংলাদেশ ক্রিকেট কর্তারা সত্যি কী বুঝতে পারছেন কত দুর্বল ব্যবস্থাপনার ভেতর দিয়ে তাঁরা বিদেশে টিম পাঠান? অস্ট্রেলিয়া-নিউজিল্যান্ড-ইংল্যান্ড দল বাংলাদেশ সফরের আগে কতবার নিরাপত্তা ব্যবস্থা খতিয়ে দেখেন। কতবার বাংলাদেশ ক্রিকেট কর্তারা তাদের পেছন পেছন ঘুরে বহুস্তর বিশিষ্ট নিরাপত্তার চিত্র দেখান! তাঁদের কাছে থেকে টেস্ট স্ট্যাটাস পাওয়ার আমাদের কর্মকর্তারা কী শিখলেন? ক্রিকেটাররা শিখছেন। সেটা তাঁদের পারফরম্যান্সে প্রতিফলিত হচ্ছে। কিন্তু কর্মকর্তাদের পারফরম্যান্স প্রশ্নবিদ্ধ নিউজিল্যান্ড সফরে। যে কারণে আজ প্রধানমন্ত্রীকে বলতে হলো 'আগামীতে আমাদের ক্রিকেট দলকে বিদেশ পাঠানো হলে নিরাপত্তা বিষয়টা খতিয়ে দেখা হবে।' বিসিবি সভাপতিও একদিন আগে একই কথা বলেছেন। প্রশ্নটা সেখানে থেকে গেল, তাহলে কী আমাদের ক্রিকেট টিম বাইরে পাঠানোর আগে নিরাপত্তা ব্যবস্থা খতিয়ে দেখা হয়নি? ‘সেফটি ফার্স্ট’ কথাটা কি আমাদের ক্রিকেট ব্যবস্থাপনা যারা করেন তাদের অজনা! অবিশ্বাস্য।

লেখক : সিনিয়র স্পোর্টস জার্নালিস্ট

Advertisement