Beta

নারী দিবস

এশিয়ার সেরা অ্যাথলেট হওয়ার স্বপ্ন দেখি : শিরিন

০৮ মার্চ ২০১৮, ১৩:৩৭ | আপডেট: ০৮ মার্চ ২০১৮, ১৩:৫১

দেশের দ্রুততম মানবী ও জাতীয় অ্যাথলেট শিরিন। ছবি : সংগৃহীত

শিরিন আক্তার।বাংলাদেশি নারী দৌড়বিদ। জাতীয় অ্যাথলেটিকস প্রতিযোগিতায় ১০০ মিটার স্প্রিন্টে টানা ছয়বার দেশের দ্রুততম মানবীর খেতাব জিতেছেন তিনি। ২০১৬ সালে রিও ডি জেনেরিওতে অনুষ্ঠিত গ্রীষ্মকালীন অলিম্পিকে ১০০ মিটার দৌড়ে অংশগ্রহণ করেছেন। এ ছাড়াও জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে বেশ কিছু প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করে সুনাম অর্জন করেছেন। আজ আন্তর্জাতিক নারী দিবসে নিজের সফলতার নানা গল্প এনটিভি অনলাইনকে জানিয়েছেন তিনি। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন নাইস নূর।

এনটিভি অনলাইন :  জাতীয় অ্যাথলেটিকস প্রতিযোগিতায় ছয়বার দেশের দ্রুততম মানবীর খেতাব জিতেছেন। আপনার সফলতার পেছনে কার অবদান সবেচেয়ে বেশি বলে আপনি মনে করেন?

শিরিন আক্তার : আমি মনে করি, কেউ কাউকে জায়গা করে দিতে পারে না, নিজেকে নিজের জায়গা তৈরী করে নিতে হয়। আমি আমার নিজের জায়গা থেকে সর্বোচ্চ পরিশ্রম করে এই জায়গায় এসেছি। এই জায়গায় পৌঁছাতে আমার অনেক কষ্ট করতে হয়েছে। আমরা চার বোন। আমি দ্বিতীয়। আমার বাবা কৃষক। আমার বাবা কখনোই চাননি আমি খেলোয়াড় হই। প্রথমে আমার পরিবারের সমর্থন একেবারেই ছিল না।

এনটিভি অনলাইন :  পরিবারের বাধা পেরিয়েছেন কীভাবে?

শিরিন আক্তার :  আমার বাড়ি সাতক্ষীরাতে। একবার সাতক্ষীরাতে অনুষ্ঠিত বিকেএসপির এক ট্যালেন্ট হান্ট  প্রতিযোগিতায় আমি অংশগ্রহণ করি। আমি নির্বাচিত হই। এরপর ঢাকায় এসে বিকেএসপির সব পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হই। তখনও আমার বাবা আমাকে খেলোয়াড় বানাতে রাজি হননি। কিন্তু যখন বিকেএসপিতে তিনি নিজে আসেন তখন আশে পাশের পরিবেশ দেখে মুগ্ধ হন তিনি। আমার শিক্ষক ও কোচদের  ব্যবহার বাবার ভালো লেগেছিল। বাবা তখন বুঝেছিলেন মেয়ে হলেও আমি আমার লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারব। এরপর থেকে আমার  বাবা ও পরিবারের সমর্থন ছিল। দেখুন, বাইরের মানুষ নানা ধরণের কথা বলতে পারে সেটা মানা যায় কিন্তু একজন নারীর সফলতার পেছনে পরিবারের ভূমিকা সবথেকে থাকা জরুরি। কারণ পরিবার থেকে মানসিক সমর্থন না থাকলে এগিয়ে যেতে অনেক  কষ্ট হয়।

যাই হোক বিকেএসপিতে আমার কোচ  আবদুল্লাহ হেল কাফি আমাকে অনেক ভাবে সাহায্য করেছেন। এ ছাড়া আমার শিক্ষক আসলাম স্যার, সামিউজ্জামান স্যার  নানাভাবে আমাকে অনুপ্রাণিত করেছেন।

এনটিভি  অনলাইন :  ছোটবেলা থেকেই কি আপনার খেলোয়াড় হওয়ার ইচ্ছে ছিল?

শিরিন আক্তার :  সেটা চেয়েছিলাম কিনা ঠিক জানি না তবে খেলাধূলার প্রতি অনেক বেশি ঝোঁক ছিল। স্কুল ও কলেজে দৌড় প্রতিযোগিতাগুলোতে সবসময় প্রথম হওয়ার চেষ্টা আমার ছিল। আমি হতামও। এ ছাড়া হেঁটে  কোথাও কারো সঙ্গে গেলে দ্রুত হাঁটার চেষ্টা করতাম।

তবে ছোটবেলা থেকেই একটা জায়গায় আমাকে  স্থান করে নিতে হবে এই স্বপ্ন আমার ছিল। আমি সবসময় চেয়েছি আমাকে যেন অন্য কারো উপর কখনো নির্ভর করতে না হয়। সবাই যেন আমাকে সম্মান করেন।

এনটিভি অনলাইন :  ২০১৩ সালে ভারতে অনুষ্ঠিত সার্ক জুনিয়র অ্যাথলেটিক্সে বাংলাদেশ দলের হয়ে আপনি খেলেছিলেন। কেমন ছিল সেই অভিজ্ঞতা?  এ ছাড়া আপনার অন্যান্য  উল্লেখযোগ্য গেমসের অংশগ্রহণের কথা জানতে চাই।

শিরিন আক্তার :  খুব ভালো। আমি সিনিয়র সার্ক অ্যাথলেটিক্সেও অংশগ্রহণ করেছিলেন। চারটি গোল্ড মেডেল পেয়েছিলাম। এ ছাড়া আমি ব্রোঞ্জ পদকও লাভ  করেছিলাম।

২০১৪ সালে কমনওয়েলথ গেমসে বাংলাদেশের হয়ে ১০০ মিটার দৌড়ে আমি অংশগ্রহণ করেছিলাম।  এর আগে ২০০৯ সালে সিঙ্গাপুরে অনুষ্ঠিত এশিয়ান ইয়ুথ গেমসে ১০০ মিটার দৌঁড়ে ১৬তম স্থান করে নিয়েছিলাম।

এনটিভি অনলাইন : এবার ভিন্ন প্রসঙ্গে কথা বলি। আজ আন্তর্জাতিক নারী দিবস। আপনি কি নারী দিবসকে সমর্থন করেন?

শিরিন আক্তার : মাঝে মাঝে আমি ভাবি নারী দিবস কেন হবে? প্রতিটা দিনই যেন আমাদের হয়। আমি সমঅধিকারের কথা বলছি না কিন্তু সবাই যেন আমাদের মানুষ হিসেবে দেখে। কোন বিশেষ দিবস যেন আলাদা করে পালন করতে না হয়। আমাদের দেশে রাতে একটা মেয়ের বাইরে চা খেতে ইচ্ছে হলেও সে পারে না। ঘুরতে পারে না। অন্যদিকে, ছেলেরা কিন্তু ঠিকই পারে। এই যে মেয়েরা এখনো স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারছে না এ জন্যই নারী দিবসের প্রয়োজন হচ্ছে।  আমি এমন দিনের স্বপ্ন দেখি যেখানে নারীরা স্বাধীনভাবে চলাফেরা করতে পারবে। এখনো সমাজে অনেক বিষয়ে ঘাটতি আছে বলেই নারী দিবসের প্রয়োজন হচ্ছে।আর একটা কথা কী, কেউ কখনো কাউকে জায়গা করে দিতে চায় না। এটা নিজেকেই অর্জন করে নিতে হয়।

আমাদের দেশে মানুষের চিন্তা-ধারা একেক জনের একেক রকম। মেয়েদের ক্ষেত্রে এক ধরণের  চিন্তা পোষণ করে কেউ আবার  ছেলেদের ব্যাপারে অন্য ধারণা পোষণ করে। অনেকের হয় তো ধারণা হতে পারে এমন, ‘একজন নারী কেন ক্রীড়া সাংবাদিক হবে? মেয়ের জায়গায় ছেলে সাংবাদিক হলে কাজটা আরও ভালো হত!’ একটা বিষয় আমি মানি তা হলো,মেয়েদের শারীরিক ক্ষমতা হয়ত ছেলেদের থেকে কম। তবে মেধার দিক দিয়ে মেয়েরা কিন্তু পিছিয়ে নেই। নারীদের নারী না ভেবে মানুষ ভাবলেই বোধহয় ভালো। বছরের পর বছর যে নারী দিবস পালন হচ্ছে এ কারণেই হচ্ছে যে, এখনও কিছু মানুষ নারীদের কাজে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে।  এই সমস্যা যেমন একটা গ্রামের মেয়ের হয় তেমনি একজন শহরের মেয়ের ক্ষেত্রেও  হয়। যেমন অনেকের চাওয়া তাঁদের বাচ্চা ডাক্তার অথবা ইঞ্জিনিয়ার হবে। কিন্তু বড় হয়ে কে কী হতে চায় সেটা তার উপর ছেড়ে দেয়াই ভালো। যার যেটা করতে ইচ্ছে হয় না সেটা করার কী মানে ?

এনটিভি অনলাইন : আপনার বন্ধুদের কাছ থেকে অনুপ্রেরণা পেয়েছেন কি?

শিরিন আক্তার : আমি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিষয়ে অনার্স শেষ বর্ষে পড়াশোনা করছি। বিশ্ববিদ্যালয়ের সব বন্ধুরা আমাকে উৎসাহিত করে। আমার শিক্ষকরা আমাকে অনেক সমর্থন করেন এবং অনুপ্রেরণা দেন। আমি বিশ্ববিদ্যালয়ে অনুশীলন করি। আর আমি আমার কাজে সব থেকে বেশি অনুপ্রাণিত হই আমাদের প্রধানমন্ত্রীকে দেখে।

এনটিভি  অনলাইন :  এখন কী নিয়ে ব্যস্ত  আছেন?

শিরিন আক্তার :  আগামী ৮ এপ্রিল অস্ট্রেলিয়ায় কমনওয়েলথ গেমস অনুষ্ঠিত হবে। আমি অংশগ্রহণ করব। এখন আর্মি স্টেডিয়ামে নিয়মিত অনুশীলন করছি।

এনটিভি অনলাইন :  আর পড়াশোনা?

শিরিন আক্তার :  আমি ঢাকা থেকে রাজশাহী নিয়মিত যাতায়াত করি। অনুশীলন শেষ করে বিকেল ৩ টায় রাজশাহী যাওয়ার জন্য গাড়িতে উঠি। পরের দিন বিশ্ববিদ্যালয়ে পরীক্ষা কিংবা ক্লাস করে আবার ঢাকায় ফিরি। এভাবেই চলছে।

এনটিভি অনলাইন : একজন  সফল অ্যাথলেট হওয়ার জন্য কোন বিষয়গুলোতে বেশি জোর দেয়া প্রয়োজন বলে আপনি মনে করেন?

শিরিন আক্তার :  অবশ্যই বেশি বেশি অনুশীলন করতে হবে। সফল অ্যাথলেট হওয়ার জন্য ভালো কোচের দরকার হয়। চারপাশের লোকজনের উৎসাহ প্রয়োজন। স্পোর্টস ম্যানদের অনেক স্পন্সর দরকার হয়। মেয়ে খেলোয়াড়দের স্পন্সর দেয়ার মানুষ আমাদের দেশে কম। স্পন্সর বেশি পেলে কাজের উৎসাহ আরও বাড়ে।

এনটিভি অনলাইন :  আপনি  তো অনেক দেশ ঘুরেছেন। কোন দেশে ঘুরতে বেশি ভালো লেগেছে?

শিরিন আক্তার :  ব্রাজিল। এ ছাড়া সিঙ্গাপুর,চায়না,থাইল্যান্ড,গ্রিস,লন্ডন ও ভারতে ঘুরতেও দারুণ লেগেছে।

এনটিভি অনলাইন :  আপনার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কী?

শিরিন আক্তার :  পুরো বিশ্বে পারব কিনা জানি না তবে এশিয়ার মধ্যে সেরা অ্যাথলেট হওয়ার  স্বপ্ন দেখি। ২০২০ সালে অলিম্পিকে অংশগ্রহণ করে দেশের সুনাম আনতে চাই। এখন থেকে  কঠোর অনুশীলন করছি। এক সময় আমি আর্মি অফিসার হতে চাইতাম। এখন পারব কিনা জানি না। তবে বিদেশে গিয়ে উচ্চতর পড়াশোনা করার ইচ্ছে আছে। পড়াশোনা শেষ হলে  দেশ কিংবা দেশের বাইরের কোন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হওয়ার পরিকল্পনাও আমার রয়েছে।

Advertisement